বহু বছর বাদে সিনেমা হল-এ গেলাম। আবারও বহু বছর বাদে যাবো। বা হয়ত যাবোই না।
গত শনিবার সংগীতার ফোনে উত্তেজিত হয়ে "আমরা" ব্রাত্য বসু পরিচালিত "তারা" দেখতে যাই। মাথাপিছু নব্বই টাকার বিনিময়ে টিকিট দেয় "ওরা।" পাছে ভিড়ে হুমড়াতে হয়, তাই আগেভাগেই টিকিট কেটে তৈরি ছিলাম।
আমার বোন - পাওলি দাম। জামাইবাবু - টোটা রায়চৌধুরি। আমার মাও-প্রেমিক ইন্দ্র বোস - প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। আমার মাও-দাদা নাইডু - ব্রাত্য বসু। আমার সিপিএম নেতা সুবীর সেন - গৌতম হালদার। আর হাড়েবজ্জাত সিপিএম ক্যাডার - চন্দন সেন। আমার পরিচালক - ব্রাত্য বসু। (খেয়াল রাখবেন, এই ছেলেমানুষ অনুচ্ছেদে "আমার" বলতে যিনি লেখাটি পড়বেন "তাঁর"-ই বোঝাবে, লেখককে বোঝাবে না। - অনুমত্যানুসারে)।
সিনেমার থিম বলতে আমার খুব ভালো লাগে। (এই অনুচ্ছেদ "আমার" মানে "লেখকের")। প্রফেসর মনোজ রায় ও প্রফেসর-এর মা-হারা মেয়ে মধুজা। পাওলিকে ওরফে মধুজাকে দূর থেকে দেখত প্রসেনজিৎ ওরফে ইন্দ্র। আর তার রূপে মুগ্ধ হয়ে স্কেচ করত। ফ্লাশব্যাক থেকে যা পেয়েছি, দুড়দাড় টুকছি। কিন্তু প্রসেনজিতের জীবনের ভবিষ্যত অনিশ্চয়তায় ভরা। মাওবাদে হাতেখড়ি তখন তার অলরেডি শেষ। তাই বাকি জীবন মধুজাকে মনেপ্রাণে ভালোবেসে অর্থশক্তি, পেশিশক্তি ও কার্তুজশক্তি সঞ্চয় করে রাষ্ট্রশোষণের বিরুদ্ধে কামান দাগে। ঘুটঘুটে জঙ্গলে সে শৈল্পিক মাও নেতা ইন্দ্র বোস। যাক, এই ভাবে মিউজিকে ভাসতে ভাসতে সময় চলে যায়। অন্য দিকে ঘটে যায় জবর কাণ্ড। আশিস বলে একটি ছেলেকে কলেজ জীবনে একটা ছেলের (যা বুঝলাম এসএফআই করে) হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন মনোজবাবু। কৃতজ্ঞতাময়ালে আবদ্ধ হয় আশিস। তো প্রত্যেক জন্মদিনে জন্মভূমির যে কোণায় সে ঘাপটি মেরে থাকুক না কেন, স্যারকে প্রণাম করতে চলে আসে। এই রকম এক জন্মদিনে মেনি হ্যাপি রিটার্নস অভ দা ডে শোনার জন্যই বোধ হয় সে বেরোয় এবং বারুইপুর থেকে ওঁত পেতে থাকা পুলিশের কাছে ধরা পড়ে। সিনটা এরকম, পুলিশ আশিসকে পেঁদিয়ে জানতে পারে মনোজবাবুর কথা। মাওবাদীর মদতদাতা হিসেবে সন্দেহ করে পুলিশ অ্যারেস্ট করে মনোজবাবুকে। বাবার এই দুর্দিনে ব্রাত্য বসু সবার মনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে মেয়ে মধুজাকে। দুই বন্ধু ছিল, তারাও চন্দন সেন-এর থ্রেট খেয়ে ভেগে গেল, সামনেই বিয়ে বলে কথা। কারও কাছে কোনো সাহায্য না পেয়ে সে যখন হতাশ, সংবাদমাধ্যমের এক সহৃদয় প্রতিনিধির কাছে জানতে পারে জাহাঙ্গির খান এবং তার টোটাগিরি সম্পর্কে। ঘর্মাক্ত জাহাঙ্গির খান, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি টাকার নয়ছয় করা নেতা-পুলিশদের ধরে সাসপেনশনের কাগজ চিবোচ্ছেন, ক্যামেরা-বীক্ষণে মজবুত শরীর দেখাচ্ছেন। তিনি অন্যান্য সিনেমার মতো মশলাদার চমক দিয়ে টাওয়েলে মুখ মুছতে মুছতে ক্যামেরার সামনে এলেন। মনের ভিতরটা টোটা টোটা বলে চেঁচিয়ে উঠতে চাইছিল। বলেন কী, আনন্দ হবে না, যা আমার নেই তা ওর আছে, যেমন বাইসেপস, যা ও পারে তা আমি পারি না, যেমন একা হাতে অসুরদমন। ফিল্মিস্টাইলের হিরো। কিন্তু চেঁচাতে পারলাম না। যাক, পাওলি টোটা-র কাটাকাটা উত্তরে অপমানিত বোধ করে উলটে দাবড়ানি দেয় ভীরু বোলে। আর এতেই টোটার প্রেস্টিজ প্রেসার কুকার বাস্ট করে। বাইরে সেই মুহূর্তে কী দিয়ে এদের সম্পর্ক স্থাপন করবে ভেবে না পেয়ে একটা কিডন্যাপের ঘটনা ঘটান ব্রাত্য। স্বভাবতই টোটাকে কিডন্যাপারদের মেরে মেরে ওদের গাড়িতেই ফেরত পাঠাতে হয়। আর তারপর পাওলির শোলডারপিসে হাত রেখে চূড়ান্ত আশ্বাস। জড়াবে কি জড়াবে না, ক্যামেরা আকাশে অভদ্রের মতো উঠে গেল। অতঃপর, স্ক্রিনে বড়ো ছাঁদের অক্ষরে ভেসে উঠল "বিশ্রাম"। হাসতে হাসতে আমরা বিরতি উদ্যাপন করি। বিশ্রাম শেষ। সা-ব-ধা-ন! আবার যে যার মূর্তি ধারণ করে মূর্ত হয়ে উঠল। আর এইভাবে, ধুর্! ছাইভস্ম লিখতে ইচ্ছে করছে না। মোদ্দা কথা সব মিটমাট হয়ে গেল। মনোজবাবু মাওবাদী প্রমাণিত হলেন না। বাঁচালেন ইন্দ্রপ্রস্থের মাওবাদীরাই, সুবীর-কে মেরে। বাবা-কে জড়িয়ে কেঁদে মেয়ে জামাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করালো। জাহাঙ্গিরের সঙ্গে ইন্দ্রপ্রস্থের মূল আকর্ষণ ইন্দ্রের পরিচয় হল। ইন্দ্র দুঃখ পেল, মধুজা কিনা জাহাঙ্গির-কে ভালোবাসে। এদিকে সিনেমা শেষ করার জন্য ব্রাত্য উদ্গ্রীব। জানেন, এ সিনেমা বেশিক্ষণ টানলে খুব খারাপ হবে।... কাজেই দুটো টিমের লিডার, বসু আর নাইডু, মতাদর্শগত দ্বন্দ্বে গিয়ে মুখোমুখি বন্দুক উঁচিয়ে ধরল। এখানে কার এন্ট্রি হওয়া উচিত? ঠিক! আবার টোটা! সকল মাওয়িস্টদের একসঙ্গে থাকতে হবে ইত্যাদি জ্ঞান দিয়ে ওদের চলে যেতে বলল। ক্যামেরা উঠে গেল। বড়ো রাস্তার ফর্কে পৌঁছে টোটা একদিকে গাড়ি ছোটালো এই ভেবে যে যাক শ্যুটিং শেষ! অন্য পথে নাইডু আর বসুর গাড়ি ধাবমান হল। শেষে কী হইল? পাওলি পুরোপুরি জীবনে আসতেই টোটা টোটা ভরার জায়গা পেয়ে গেল।
নোংরা লোক সুবীর-এর প্রতি জাহাঙ্গিরের একটা ডায়লগে সিটি এক্সপেক্টেড ছিল।... কী সারাদিন পিচির পিচির করেন, পিক ফেলেন, লাল।... ওঃ! মরতে গেছিলাম স্টার-এ। ভদ্রলোকের জায়গা, সিটি-টিটি পড়ে না।
পাওলির কী দাম মাইরি! এক ফুল অর হাজারো মালি। কীসের মাওবাদ! কীসের জাহাঙ্গিরি! সব হাওয়া! মধুজা নিঃসন্দেহে ভালো মেয়ে, তার ওপর প্রফেসর-এর মেয়ে, সর্বোপরি পাওলি দাম। আর দামি মেয়েকে ভালোবাসে অগুনতি লোক। ইন্দ্র, জাহাঙ্গির, রেপিস্ট সুবীর, আরেকটা পুলিশক্যাডার। পাওলিকে কত বার কিডন্যাপ করতে চাইল সবাই মিলে! একবারও পারলে নে কো! (অপরাধ নেবেন না, সিনেমায় পরিবেশনটা কিন্তু কতকটা এই রকম।)
স্টার-এ তখন উপচে পড়া ভিড়। সরি, অতিআবেগ বর্জন করে বলি - সংখ্যাটা পঞ্চাশ কিংবা ষাট। পরিবার-টরিবার বন্ধু-টন্ধু নিয়ে যারা এসেছে, তাদের মধ্যে মনে হয় আমরা ছজনই অসহ্যকর বোকা। বোকাতর সুপ্রিয়, বোকাতমা সংগীতা, বোকাবোকা শুভ্রজিৎ, বোকাপাগলা কার্তিক, কমবোকা প্রশান্ত ও বোকা** আমি। ৯০ গুণ ৫ = ৪৫০ + ৬০ = ৫১০ টাকার মাংসভাতও যদি খেতাম অন্তত একটু রেয়াজি পুণ্য হত। প্রশান্ত এই জন্যই কমবোকা উপাধি পেল, কারণ সে ষাট টাকার টিকিট কেটেছে। পিছনের দিকে মিডল মার্চ-এর অংশীদার আমরা। আমাদের সামনের রো-তে দুজন বোকা আর তাদের সামনে সুনসান প্রেক্ষাগৃহে ছককাটা চেয়ারগুলো। পড়েছিলাম কোনো এক কালে, "ছককাটা মাঠ জুড়ায় চাষার আঁখি"। আর সেই মাঠজুড়ে ভয়ংকর ভিলেন-এর রোল প্লে করলেন বড়দা গৌতম হালদার। স্বয়ং দেববাবু বা নন্দীবাবু এর থেকে ঢের ভালো অভিনয় করতেন। তার মানে বলছি না গুতমা ভালো করেছে। গুতমা অসম্ভব বাজে রোল প্লে করেছে। নাটক আর সিনেমাকে এক ভেবে সারাক্ষণ মামামিঞাঁ মামামিঞাঁ চিল্লিয়েছে। প্রসেনজিৎ-এর টোটা গিলে অক্কা পাবার সময়ও আমাদের সর্বক্ষণের সঙ্গী এই ভাঁড়টি মামামিঞাঁ বলে মরল। কী খুশি আমরা, আর ওঁর অভিনয় দেখতে হবে না!
সাদা উর্দি পরা এক কলকাতা পুলিশ প্রত্যেকটা সিন-এ কিছু না কিছু খাচ্ছিল। মাংস, স্যান্ডউইচ, ভুট্টা, আপেল। আরে বাবা, শরীরটাকে তো রাখতে হবে! তবে ওই ভদ্রলোক-এর অভিনয় অবশ্য আমার মন্দ লাগেনি। মঞ্চাভিনেতাদের মধ্যে চন্দন সেন-এর অপেক্ষাকৃত কম ডায়ালগ ছিল। সে-কারণেই বোধ হয় তাঁর অভিনয়ে একটু চান্দনিক আঁচ পেলাম। ওদিকে প্রসেনজিৎ অন্য রকম। গভীর জঙ্গলে বাস করেও ক্যানভাস রং জোগাড় করে একজনের ছবিই এঁকে চলেছেন বিগত কুড়ি বছর। বুঝলেন না কার, কী ঢ্যাঁড়শ রে বাবা, মধুজার! মধুজা, থুড়ি পাওলি দ্য টেলিগ্রাফ-কে বলেছেন, "In some of the scenes, I looked very pretty too" chirped Paoli। সত্যিই সুন্দর লেগেছে। তবে আমি বলছি টেলিগ্রাফ-এর ইংরাজির ম-ম ব্যবহারটার দিকে তাকাতে, "chirped"। উঁউঁ... পাওলি-র জন্য আমার কষ্ট হয়। মনে মনে জিজ্ঞাসা করি, পাওলি দাম পাইলি দাম?
তপন সিনহা-র মিউজিক সম্পর্কে আলাদা করে কিছুই বলার নেই। এক উদ্দাম ড্রাম-আটিক যন্ত্রণায় ভুলেই গেলাম কটা দৃশ্য নীরব ছিল। ভাবুন একবার, একটা ট্র্যাজিক কিছু দেখার জন্য বসে আপনাকে যদি কমেডি দেখতে হয় তাহলে সেটা কত বড়ো ট্র্যাজেডি! রশিদ খান নিজগুণে সমৃদ্ধ। কিন্তু গান সম্পর্কে, মিশ্রণ সম্পর্কে কত কিছু ভাবতে হয় শুনেছি, তার কিছুই পেলাম না।
তবে, ব্রাত্য বসু-র অবদান নিঃসন্দেহে মনে থাকবে। "আমরা" অ্যান্টি সিপিএম। "ওরা" অ্যান্টি শাসক গোষ্ঠী। "তারা" অ্যান্টি শোষক গোষ্ঠী। সবকটা লোককে অ্যান্টি-সিপিএম দেখিয়েছে। খ্যামতা আছে! খ্যামতা না থাকলে শাবল-গাঁইতি মেরেও একদলা মাটি তোলা যায় না! খ্যামতা না থাকলে ব্রাত্য হওয়া যায় না। দ্য টেলিগ্রাফ-এ ব্রাত্য বলেছেন, "I have made Tara for both the plex audience as well as the masses. I hope people like the film"। ওই বোথ-দের জন্য মেশাতে গিয়ে ঘোঁট পাকিয়ে গেছে। আর ঘোঁটপাকানো সিনেমা ভোটপূর্ববর্তী বাজার টানার কৌশলটা জানে কি না, সেইটেই এখন দেখার। নাইডু-র মতো পোড়খাওয়া মাওনেতা কীভাবে জাহাঙ্গির খান-কে গড়গড় করে সব প্ল্যান বলে গেল তা এখনও স্পষ্ট নয়। আর পরিশেষে ভিক্ট্রি সাইন দেখানোয় দর্শককুল তো জীবন্মৃত। এখানেও সিটি পড়তে পারত। যদিও মাস্টার স্ট্রোকটা অন্য কোথাও ছিল, শুভ্রজিতের কল্যাণে আমার দৃষ্টিগোচর হল। ব্রাত্য বসু বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন গৌতমমোহন চক্রবর্তী এবং শোভন চট্টোপাধ্যায়কে। বিষয়টা বেশ মজাদার। কুলকুল করে হেসে বুঝলাম, আমরা বোধ হয় এ জীবনে আর নিজেদের "আ-ও-তা"-ভুক্ত করতে শিখলাম না।
প্রেমগাথায় নিজেদের গেঁথে বেরিয়ে আসলাম। পরে ভাবলাম, লাভ হয়েছে দুটো। এক, কদিন ধরে বমি ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অত্যন্ত কাহিল হয়ে পড়া সুপ্রিয় বেচারা সবকটা ভীষণ সিরিয়্যস সিনেও দুর্ধর্ষ হেসে তরল পেটে একটু খিল ধরাতে পেরেছে। আর দুই, সংগীতা ওর বিরুদ্ধে মুখ না খোলার জন্য তুখোড় পলিটিশিয়ানের মতো চা-এর দোকানে আমাকে সকলের পক্ষ থেকে পঞ্চাশ টাকা ছাড় (ঘুষ) সহ প্রাপ্য অর্থ প্রদান করেছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সংগীতা এরপর গৌ-ব্রা পরিহিত সিনেমা দেখানোর ইচ্ছাটুকু প্রকাশ করবে না।
সকল কথার হক কথা, সিনেমাটা কয়েকটা কাট-অ্যাকশনে ভরা মুখরোচক বাপি চানাচুর!
লেখাটা ভাল জমেনি।
ReplyDeleteঠাণ্ডাটা বেশি পড়লে আর একবার পড়িস। দেখবি অনেকটা জমাট বলে মনে হবে।
ReplyDelete