গোড়ার কথা - জানলা ও দরজা

আজ আমার বাংলা ব্লগ-এর জন্ম হল। কত দিনের ইচ্ছা আজ বাস্তবে। ভেবেছিলাম বেশ কিছু দিন। কোন্ বিষয় নিয়ে লেখা যায়। আমার রাজনৈতিক বেঁচে থাকা, আমার লেখাপড়া, আমার স্কুল, আমার বাড়ি, আমার পরিবেশ ও পরিবেশ দূষণ, দাদার মেয়ে, মাদারবোর্ড খারাপ হয়ে যাওয়া-হেতু আমার মন খারাপ, নাকি অন্য কিছু। মাথাতেই আসছিল না। এবং সে কারণে, অনেক আগেই ব্লগ-এর বাড়ি নির্মাণ করলেও অন্তরটা ফাঁকা রেখে দিয়েছিলাম। পরে মনে হল, বাংলা ব্লগ লেখার উৎসাহে জোর করে কিছু লিখতে চলেছি। সে লেখা ভালো হবে না, শুধু আগডুম বাগডুম বা ঘোড়াডুম পেনডুম জাতীয় কিছু হবে, আর সে-রকম কাজের আমি পরিপন্থীও বটে। তাই ব্লগের বাড়িতে ধুলো পড়ল। অযত্নে খোলা যাচ্ছিল না জানলা। ক্যাঁচকোঁচর আওয়াজ হল।

আসলে নিজের ভাষায় কিছু লিখবো, মাতৃভাষা বাংলায় - এমন ইচ্ছা জানলারা সইবেই বা কেন। আমার মাদারবোর্ড বিকল হওয়ার পর থেকে তাকে "কারেকশন সেন্টার"-এ পাঠানো ও পাঠানো-পরবর্তী সময়ে আমার যে কী কষ্ট গেছে আমিই জানি। পুজোয় সার্ভিস সেন্টার বন্ধ। আর স্কুল ছুটি বলে একটু ঘোরার মুডেও ছিলাম। নচেৎ মন খারাপ হতে হতে খারাপতর হয়ে কোথায় গিয়ে ঠেকত, জানা নেই। যাই হোক, অনেক হ্যাপা পুইয়ে দাদার মেশিনে উইন্ডোজ-এ বাংলা লিখলাম। আমি এর আগে প্রায় সাত বছর এই ভাবে বাংলা লিখেছি, যখন লিনাক্স কী ও কেন, অজানা ছিল।

বর্তমানে চারচক্ষু হওয়ার সুবাদে আমার দূরদৃষ্টি প্রখর হয়ে উঠেছে। তবুও জুম করে করে হাত ব্যথা হয়ে গেল। ফন্টগুলোকে মোটামুটি দৃষ্টিসুখ মোতাবেক ফুলিয়ে তুললাম। কিন্তু অমন অমানবিক ওয়ে-তে কতক্ষণই বা লেখা যায়। পুরো লেখাটা চোখের সামনে থাকলে ভালো লাগে। লেখার প্রতি আরও আন্তরিক হওয়া যায়। কেমন একটা মমত্ববোধও জাগে। জুম করলে ফন্ট বড়ো হয় ঠিকই, কিন্তু সে ফন্ট, যতই কন্ট্রোল প্যানেলায়িত ফন্টস-এ সোলেইমান-লিপি ঠাসি না কেন, খুব বিশ্রী লাগে। এক হয়, যদি লেখাটা আগে থেকেই খাতায় থাকে, শুধু টাইপ করে ফাটিয়ে দিলাম। (যদিও দ্বিতীয় বারের জন্য পড়া এবং ভুল থাকলে সংশোধন করার কথা ভাবলেই আমার গায়ে জ্বর চলে আসে।) কিন্তু যে-লেখার জন্মই হচ্ছে সরাসরি মনিটরের ওপর, সে-লেখা কতক্ষণই-বা ওই ভাবে তোলা যায়। লেখা কষ্টার্জিত ফসল। তাই বলে উইন্ডোজ-কে মাধ্যম করে বাংলা হরফে সরাসরি ইন্টারনেটখাতা-য় লেখা বহুকষ্টার্জিত ফসল।

এবং তা করতে আমি বিলকুল রাজি নই। কষ্ট করব, অথচ বহু কষ্ট করব না কেন? যদি অন্যান্য ফন্টের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটা দেখা যেত, তাহলে আমি তারিয়ে তারিয়ে বাংলার ক্ষেত্রেও বহু কষ্ট উপভোগ করতাম। কিন্তু কোনো ইংরেজি ফন্ট-এর ক্ষেত্রে এই সমস্যা হয় না। যত ছ্যাবলামো সব আঞ্চলিক ভাষাকে ঘিরেই। এই যেমন মাস দুয়েক আগেই আমার এক ছাত্র লেনোভো-র লোভনীয় ল্যাপটপ-এ লালায়িত হয়ে উইন্ডোজ এক্সপি লোড করেছে। মানে ও সরাসরি করেনি। লেনোভো কোম্পানি থেকে কোনো দেবদূত এসে করে দিয়েছে। তা যখন এক্সপি লোডরত অবস্থায় সে ছাত্রটির প্রশ্নের উত্তরে জানায় উইন্ডোজ এক্সপি-র সিডি সে অন্য সিডি-তে লিখে দেবে না, ছাত্রটি আমায় ফোন করে। আমি জানি এরা দেয় না। দেবদূত এবং দেবদূতের দ্যূতিমান কোম্পানিরা দেয় না। আমি এই জন্যই যারা উইন্ডোজ এক্সপি-র চওড়া বরাবর কাটা বাঁধাকপির মতো দেখতে সিডিকপি নিয়ে আসে, তাদের আমি বিলক্ষণ শ্রদ্ধা করি। নতুন নতুন সফটওয়্যার কেনার আর্থিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাসোহারা ক্ষমতা আছে খুব কম মানুষেরই। তবুও তারা লিনাক্সগামী হয় না এক অদ্ভুত কারণে। যাই হোক, ছাত্রকে সে বলে যখন কিছু হবে তাকে খবর দিতে। সে আমায় ফোন করে। দাদা, কী করব? আমি খালি তার বাংলা পড়ার একটু সুবিধা করে দেওয়ার জন্য প্রথমে রিজিওন্যাল ল্যাংগোয়েজগুলো লোড করে দিতে বলি। ভাবলাম, এক্সপি-র সিডি যখন দিয়ে যাবে না, ওইটুকু অন্তত করে দিয়ে যাক। সে দেবদূত বলে তার কাছে এরকম কোনো সিডিই নেই। আমি বললাম ওটা এক্সপি-র সিডি-তেই থাকে। উইন্ডোজ খুলে একটু কারিকুরি করার পর কম্পিউটার নিজেই ওই সিডিটা ড্রাইভারে ঢোকাতে আদর্শ বাবার মতো নির্দেশ দেবে। আমি তাকে স্টেপ বাই স্টেপ বলে দিলাম। সে, পরে শুনেছিলাম, আমার এই নির্দেশগুলো ম্লানবদনে মেনে চলছিল। হবে না-ই বা কেন, মেনে নেওয়াটাই তার কাজ। উপার্জনের তাগিদে তার লেনোভো কোম্পানি-তে যুক্ত হওয়া আর বাড়ি বয়ে গিয়ে কম্পিউটারে এক্সপি ইন্সটল করে দেওয়া। উইন্ডোজ তার কোম্পানিকে যে ভাবে চালায় সে সেই চালনার অন্তর্গত রোদে-পোড়া জলে-ভেজা একটি ভারবাহী পশু মাত্র। স্বভাবতই আরও কোনো বহির্নির্দেশ তাকে মেনে চলতে হবে, এটা ভাবলেই তার বিরক্তি ও কিছুটা আতঙ্ক জাগে। আর উইন্ডোজ-এ থাকতে থাকতে যা হয়, শেখার ইচ্ছেটাই মর্মান্তিকভাবে হারিয়ে যায়। এবং সে কারণেই বিগত বছরগুলোয় উইন্ডোজ ইন্সটল করতে করতে এবং একই রকম ভাবে ইন্সটল করতে করতে সে কোনো দিনই এই রিজিওন্যাল ল্যাংগোয়েজ বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করেনি। আরও কিবোর্ড ইন্সটল করা যায় এইটুকু সে জানতে চায়নি। আর একজন পরিচিত জানালো, গত মাসেই সে পাঁচশো টাকা দিয়ে অ্যান্টিভাইরাসের জগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী আসলি ক্যাসপারস্কাই কিনেছে, তবু তার কম্পিউটার-এ ক্রীড়ারত ভাইরাসের সংখ্যা অগুনতি। খুব মজা হচ্ছিল এই ভেবে, যে-মহিলাকে সে-বেচারা অনন্ত যৌবন সমৃদ্ধ বলে নিয়ে এসেছিল, সে আসলে কুঞ্চিত ত্বকের তাকিয়া-তে পরিণত। কোনো সুখ নেই। কাজেই তার পাঁচশো টাকাই জলে। অবশ্য আমার জানা নেই আসলি অ্যান্টিভাইরাস-এর আসলি দাম কত। আসলি-র পিছনে কত কত কত এমন আসলি খেলা চলে। নর্টন যে ভাইরাস-দাদারাসকে কোয়ারেন্টাইন করে, আভাস্ত তা করে না, আভাস্ত যা করে, তা এভিজি করতে অভ্যস্ত নয়। কারা যে কী অনন্য চুকলিবাজি করে চোখে ধুলো দিয়ে পাবলিকের অর্থ চুষে বার করে নিচ্ছে, তা পাবলিক জানবে আর কবে।

সারা শরীরে আমার ভয়ানক পরিমাণে রোম আছে, আর তাই বিবিধ বিষয়ে আমার রোমাঞ্চ বেশিই জাগে। তেমন একটি বিষয়, উইন্ডোজ ইউজার-ফ্রেন্ডলি। এ কথাটা আমার কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। তবে এটা জেনে গেছি, এটা প্রবাদ হয়ে মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ইউজার-ফ্রেন্ডলি শব্দের মাধ্যমে মনে হয় "পাঁড় গবেট বানিয়ে রাখে এমন" বোঝায়। যা চাইবে ইউজার, ইয়াহু! তাই পাবে, হুক্কাহুয়া! সহজে সবকিছু ইন্সটল করতে পারবে, যে গেমস চাইবে তা-ই খেলতে পারবে! ওঃ ইউজার-কে দেখো, লোভে ল্যাদল্যাদ করছে! বিষয়টা কতকটা এই রকম। ব্যবহারকারী-সহায়ক। যে ব্যবহার করবে অর্থাৎ ইউজার - সে হল জম্মের আকাট, গবেটান্নভোজী। এটা আগেভাগেই বুঝতে পেরে চালাকচতুর উইন্ডোজ ফ্রেন্ডলিপনা দেখাতে শুরু করেছে। আসলে ইউজার-এর ফ্রেন্ড সে কোনো দিনই ছিল না। বরং সে যা যা করতে বলবে ইউজার তাই করবে। ত্রিদিবদা একদিন বলেছিলেন, "বোমের আঘাতে ব্রেইন-এর অর্ধেকটা যাদের উড়ে যায়, তারাও উইন্ডোজ ব্যবহার করতে পারে।" আমার মাথাটা যদিও বোমারু-র কাছে নতিস্বীকার করেনি, কিন্তু হঠাৎই মাথাটা বেশ হালকা হালকা লাগছিল। কারণ দুটো। এক, আমরা (অর্ণব, সুপ্রিয়, দিবাকর) তখনও উইন্ডোজে দাঁড়ানো ত্রি-বোকা। দুই, মাথাটা একটু পরিষ্কারও হল। বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম, কেন উইন্ডোজ নয়, কেনই বা লিনাক্স। দিন গেল। কিছু রাতও। দেখতে দেখতে আমার মেশিন-এ হার্ডডিস্কে পার্টিশন করে দেবাশিসদা লিনাক্স আর উইন্ডোজ ভরে দেয়। ভয়ে ভয়ে লিনাক্স-এ ঢুকি, ত্রিদিবদার একটা কথা কানে বাজে, লিনাক্স কিন্তু সিরিয়্যস লোকের জন্য। আর নির্ভয়ে খুলি উইন্ডোজ, কারণ উইন্ডোজ লোককে সিরিয়্যস থাকতে দেয় না। যা খুশি তাই করি। মেশিনে ভাইরাসও বাসা করতে থাকে। কোনো কিছু ইন্সটল করতে গেলে সতর্কতার সঙ্গে সাইটে ঘোরাফেরা করতে হয়। মাইক্রোসফট যদি জানে, সব দেবে চৌপাট করে।

তারপর কোনো একদিন বহুক্ষণ লিনাক্সে থাকা। ফেদোরা-র সাথে। সাবলীলতার সঙ্গে পাতার পর পাতা বাংলা টাইপ করা। ঝপাঝপ পিডিএফ করা। সরাসরি মেইল কম্পোজ করতে লাগলাম বাংলায়। ফন্ট সাইজ নিখুঁত। দেখার কোনো সমস্যা নেই। বাংলা সাইট খোলা যাচ্ছে। ইংরেজির হরফের মতোই বাংলা হরফ। মানানসই আকার। মনটা বিহঙ্গ হয়ে উঠল। উইন্ডোজ খোলা হতে লাগল কম। লিনাক্স বেশি। এখন মনে হতে লাগল, বাংলার হরফের মতোই ইংরাজি হরফ। আর তারপর অতি উৎসাহে ও উদ্দীপনায় একদিন ত্রিদিবদা-কে কী একটা ভুলভাল মেইল-ও পাঠালাম। ওভার ফোন কী ঝাড়! ব্যথাতুর হয়ে পড়লাম। একই সঙ্গে ফেদোরাতুর। যে-দিবাকর লিনাক্স-এর লি-ও জানে না, সে কি-না সবাইকে নাক্স খেতে উৎসাহিত করতে লাগল। আর ছেলেবেলার ধারণা, নাক্স ভোমিকা খেলে সব রোগ ঠিক হয়ে যায়, তাই হল। ধীরে ধীরে।

এবং ধীরে ধীরে এই গোটা লেখাটাই নির্মিত হল আমার প্রিয় লিনাক্স-এ। এই তীব্র গরমে মাথায় সার্দুর হাল্কা টুপির আশীর্বাদ থাকলে যা হয়! আরাম-ই আরাম। ছেলেবেলায় বাহাদুর-এর কীর্তি আমার ঠোঁটস্থ ছিল। রক্তে রাঙা অর্জনগড়-এর জঙ্গলময় রাস্তার ভিতর দিয়ে বাহাদুর কমলারঙা পাঞ্জাবি আর জিনস-এর প্যান্ট পরে ঘোড়ায় ছুটছে। ছামিয়া পিছে। ওঃ কী রোমহর্ষক দিন গেছে আমার শৈশবের। যাকে মারবে, তার দোর্দণ্ডপ্রতাপে আমি কিছু পাতা আগেই ধরাশায়ী, একটু-আধটু কান্নাও পাক দিয়ে উঠছিল গলার কাছে, - তার দশাসই দেহটা চোখের সামনে ঘুরছে ফিরছে। কালো মুষকো টেকো বদমায়েশ, যার সামনের একটা দাঁত আবার সোনার। দেখলেই সর্বাঙ্গ রি রি করে উঠত! সততা এবং ন্যায়ের প্রতীক বাহাদুর তাকে লাথি চড় ঘুঁষি এমন মারল যে সে চিৎপাত! ততক্ষণে অবশ্য আমিও পাশবালিশটাকে কেলিয়ে দলা পাকিয়ে দিয়েছি।

আমার সিডি আছে। ফেদোরা-র সাইটেও ঢুকি। কিছুই বলে না। একেই তো বলে ইউজার-ফ্রেন্ডলি। আমার কাছে গোটা একটা মাছ আছে, যতটুকু যেভাবে ইচ্ছে হবে খাবো। সিরিয়্যসলি খেতে শিখবো। পারি, না পারি - গোটা মাছটা কে যেন অজ্ঞাতসারে আমার থালার ওপর দিয়ে গেছে। আমি খেতে শুরু করেছি। কম্পিউটার শেখার জগতেও এরকম কিছু ভয়ানক অসাধু লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে মাইক্রো থেকে ম্যাক্রো বড়ো, জানলা থেকে দরজা।

আর তাই পুনরায় দেবাশিসদাকে তলব, এবং গোটা মেশিনেই লিনাক্স ইন্সটল করা!

No comments:

Post a Comment

মতামত