অ্যাকখান বই দ্যাখলাম বটে!

বহু বছর বাদে সিনেমা হল-এ গেলাম। আবারও বহু বছর বাদে যাবো। বা হয়ত যাবোই না।

গত শনিবার সংগীতার ফোনে উত্তেজিত হয়ে "আমরা" ব্রাত্য বসু পরিচালিত "তারা" দেখতে যাই। মাথাপিছু নব্বই টাকার বিনিময়ে টিকিট দেয় "ওরা।" পাছে ভিড়ে হুমড়াতে হয়, তাই আগেভাগেই টিকিট কেটে তৈরি ছিলাম।

আমার বোন - পাওলি দাম। জামাইবাবু - টোটা রায়চৌধুরি। আমার মাও-প্রেমিক ইন্দ্র বোস - প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। আমার মাও-দাদা নাইডু - ব্রাত্য বসু। আমার সিপিএম নেতা সুবীর সেন - গৌতম হালদার। আর হাড়েবজ্জাত সিপিএম ক্যাডার - চন্দন সেন। আমার পরিচালক - ব্রাত্য বসু। (খেয়াল রাখবেন, এই ছেলেমানুষ অনুচ্ছেদে "আমার" বলতে যিনি লেখাটি পড়বেন "তাঁর"-ই বোঝাবে, লেখককে বোঝাবে না। - অনুমত্যানুসারে)।

সিনেমার থিম বলতে আমার খুব ভালো লাগে। (এই অনুচ্ছেদ "আমার" মানে "লেখকের")। প্রফেসর মনোজ রায় ও প্রফেসর-এর মা-হারা মেয়ে মধুজা। পাওলিকে ওরফে মধুজাকে দূর থেকে দেখত প্রসেনজিৎ ওরফে ইন্দ্র। আর তার রূপে মুগ্ধ হয়ে স্কেচ করত। ফ্লাশব্যাক থেকে যা পেয়েছি, দুড়দাড় টুকছি। কিন্তু প্রসেনজিতের জীবনের ভবিষ্যত অনিশ্চয়তায় ভরা। মাওবাদে হাতেখড়ি তখন তার অলরেডি শেষ। তাই বাকি জীবন মধুজাকে মনেপ্রাণে ভালোবেসে অর্থশক্তি, পেশিশক্তি ও কার্তুজশক্তি সঞ্চয় করে রাষ্ট্রশোষণের বিরুদ্ধে কামান দাগে। ঘুটঘুটে জঙ্গলে সে শৈল্পিক মাও নেতা ইন্দ্র বোস। যাক, এই ভাবে মিউজিকে ভাসতে ভাসতে সময় চলে যায়। অন্য দিকে ঘটে যায় জবর কাণ্ড। আশিস বলে একটি ছেলেকে কলেজ জীবনে একটা ছেলের (যা বুঝলাম এসএফআই করে) হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন মনোজবাবু। কৃতজ্ঞতাময়ালে আবদ্ধ হয় আশিস। তো প্রত্যেক জন্মদিনে জন্মভূমির যে কোণায় সে ঘাপটি মেরে থাকুক না কেন, স্যারকে প্রণাম করতে চলে আসে। এই রকম এক জন্মদিনে মেনি হ্যাপি রিটার্নস অভ দা ডে শোনার জন্যই বোধ হয় সে বেরোয় এবং বারুইপুর থেকে ওঁত পেতে থাকা পুলিশের কাছে ধরা পড়ে। সিনটা এরকম, পুলিশ আশিসকে পেঁদিয়ে জানতে পারে মনোজবাবুর কথা। মাওবাদীর মদতদাতা হিসেবে সন্দেহ করে পুলিশ অ্যারেস্ট করে মনোজবাবুকে। বাবার এই দুর্দিনে ব্রাত্য বসু সবার মনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে মেয়ে মধুজাকে। দুই বন্ধু ছিল, তারাও চন্দন সেন-এর থ্রেট খেয়ে ভেগে গেল, সামনেই বিয়ে বলে কথা। কারও কাছে কোনো সাহায্য না পেয়ে সে যখন হতাশ, সংবাদমাধ্যমের এক সহৃদয় প্রতিনিধির কাছে জানতে পারে জাহাঙ্গির খান এবং তার টোটাগিরি সম্পর্কে। ঘর্মাক্ত জাহাঙ্গির খান, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি টাকার নয়ছয় করা নেতা-পুলিশদের ধরে সাসপেনশনের কাগজ চিবোচ্ছেন, ক্যামেরা-বীক্ষণে মজবুত শরীর দেখাচ্ছেন। তিনি অন্যান্য সিনেমার মতো মশলাদার চমক দিয়ে টাওয়েলে মুখ মুছতে মুছতে ক্যামেরার সামনে এলেন। মনের ভিতরটা টোটা টোটা বলে চেঁচিয়ে উঠতে চাইছিল। বলেন কী, আনন্দ হবে না, যা আমার নেই তা ওর আছে, যেমন বাইসেপস, যা ও পারে তা আমি পারি না, যেমন একা হাতে অসুরদমন। ফিল্মিস্টাইলের হিরো। কিন্তু চেঁচাতে পারলাম না। যাক, পাওলি টোটা-র কাটাকাটা উত্তরে অপমানিত বোধ করে উলটে দাবড়ানি দেয় ভীরু বোলে। আর এতেই টোটার প্রেস্টিজ প্রেসার কুকার বাস্ট করে। বাইরে সেই মুহূর্তে কী দিয়ে এদের সম্পর্ক স্থাপন করবে ভেবে না পেয়ে একটা কিডন্যাপের ঘটনা ঘটান ব্রাত্য। স্বভাবতই টোটাকে কিডন্যাপারদের মেরে মেরে ওদের গাড়িতেই ফেরত পাঠাতে হয়। আর তারপর পাওলির শোলডারপিসে হাত রেখে চূড়ান্ত আশ্বাস। জড়াবে কি জড়াবে না, ক্যামেরা আকাশে অভদ্রের মতো উঠে গেল। অতঃপর, স্ক্রিনে বড়ো ছাঁদের অক্ষরে ভেসে উঠল "বিশ্রাম"। হাসতে হাসতে আমরা বিরতি উদ্‌‌যাপন করি। বিশ্রাম শেষ। সা-ব-ধা-ন! আবার যে যার মূর্তি ধারণ করে মূর্ত হয়ে উঠল। আর এইভাবে, ধুর্! ছাইভস্ম লিখতে ইচ্ছে করছে না। মোদ্দা কথা সব মিটমাট হয়ে গেল। মনোজবাবু মাওবাদী প্রমাণিত হলেন না। বাঁচালেন ইন্দ্রপ্রস্থের মাওবাদীরাই, সুবীর-কে মেরে। বাবা-কে জড়িয়ে কেঁদে মেয়ে জামাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করালো। জাহাঙ্গিরের সঙ্গে ইন্দ্রপ্রস্থের মূল আকর্ষণ ইন্দ্রের পরিচয় হল। ইন্দ্র দুঃখ পেল, মধুজা কিনা জাহাঙ্গির-কে ভালোবাসে। এদিকে সিনেমা শেষ করার জন্য ব্রাত্য উদ্‌‌গ্রীব। জানেন, এ সিনেমা বেশিক্ষণ টানলে খুব খারাপ হবে।... কাজেই দুটো টিমের লিডার, বসু আর নাইডু, মতাদর্শগত দ্বন্দ্বে গিয়ে মুখোমুখি বন্দুক উঁচিয়ে ধরল। এখানে কার এন্ট্রি হওয়া উচিত? ঠিক! আবার টোটা! সকল মাওয়িস্টদের একসঙ্গে থাকতে হবে ইত্যাদি জ্ঞান দিয়ে ওদের চলে যেতে বলল। ক্যামেরা উঠে গেল। বড়ো রাস্তার ফর্কে পৌঁছে টোটা একদিকে গাড়ি ছোটালো এই ভেবে যে যাক শ্যুটিং শেষ! অন্য পথে নাইডু আর বসুর গাড়ি ধাবমান হল। শেষে কী হইল? পাওলি পুরোপুরি জীবনে আসতেই টোটা টোটা ভরার জায়গা পেয়ে গেল।

নোংরা লোক সুবীর-এর প্রতি জাহাঙ্গিরের একটা ডায়লগে সিটি এক্সপেক্টেড ছিল।... কী সারাদিন পিচির পিচির করেন, পিক ফেলেন, লাল।... ওঃ! মরতে গেছিলাম স্টার-এ। ভদ্রলোকের জায়গা, সিটি-টিটি পড়ে না।

পাওলির কী দাম মাইরি! এক ফুল অর হাজারো মালি। কীসের মাওবাদ! কীসের জাহাঙ্গিরি! সব হাওয়া! মধুজা নিঃসন্দেহে ভালো মেয়ে, তার ওপর প্রফেসর-এর মেয়ে, সর্বোপরি পাওলি দাম। আর দামি মেয়েকে ভালোবাসে অগুনতি লোক। ইন্দ্র, জাহাঙ্গির, রেপিস্ট সুবীর, আরেকটা পুলিশক্যাডার। পাওলিকে কত বার কিডন্যাপ করতে চাইল সবাই মিলে! একবারও পারলে নে কো! (অপরাধ নেবেন না, সিনেমায় পরিবেশনটা কিন্তু কতকটা এই রকম।)

স্টার-এ তখন উপচে পড়া ভিড়। সরি, অতিআবেগ বর্জন করে বলি - সংখ্যাটা পঞ্চাশ কিংবা ষাট। পরিবার-টরিবার বন্ধু-টন্ধু নিয়ে যারা এসেছে, তাদের মধ্যে মনে হয় আমরা ছজনই অসহ্যকর বোকা। বোকাতর সুপ্রিয়, বোকাতমা সংগীতা, বোকাবোকা শুভ্রজিৎ, বোকাপাগলা কার্তিক, কমবোকা প্রশান্ত ও বোকা** আমি। ৯০ গুণ ৫ = ৪৫০ + ৬০ = ৫১০ টাকার মাংসভাতও যদি খেতাম অন্তত একটু রেয়াজি পুণ্য হত। প্রশান্ত এই জন্যই কমবোকা উপাধি পেল, কারণ সে ষাট টাকার টিকিট কেটেছে। পিছনের দিকে মিডল মার্চ-এর অংশীদার আমরা। আমাদের সামনের রো-তে দুজন বোকা আর তাদের সামনে সুনসান প্রেক্ষাগৃহে ছককাটা চেয়ারগুলো। পড়েছিলাম কোনো এক কালে, "ছককাটা মাঠ জুড়ায় চাষার আঁখি"। আর সেই মাঠজুড়ে ভয়ংকর ভিলেন-এর রোল প্লে করলেন বড়দা গৌতম হালদার। স্বয়ং দেববাবু বা নন্দীবাবু এর থেকে ঢের ভালো অভিনয় করতেন। তার মানে বলছি না গুতমা ভালো করেছে। গুতমা অসম্ভব বাজে রোল প্লে করেছে। নাটক আর সিনেমাকে এক ভেবে সারাক্ষণ মামামিঞাঁ মামামিঞাঁ চিল্লিয়েছে। প্রসেনজিৎ-এর টোটা গিলে অক্কা পাবার সময়ও আমাদের সর্বক্ষণের সঙ্গী এই ভাঁড়টি মামামিঞাঁ বলে মরল। কী খুশি আমরা, আর ওঁর অভিনয় দেখতে হবে না!

সাদা উর্দি পরা এক কলকাতা পুলিশ প্রত্যেকটা সিন-এ কিছু না কিছু খাচ্ছিল। মাংস, স্যান্ডউইচ, ভুট্টা, আপেল। আরে বাবা, শরীরটাকে তো রাখতে হবে! তবে ওই ভদ্রলোক-এর অভিনয় অবশ্য আমার মন্দ লাগেনি। মঞ্চাভিনেতাদের মধ্যে চন্দন সেন-এর অপেক্ষাকৃত কম ডায়ালগ ছিল। সে-কারণেই বোধ হয় তাঁর অভিনয়ে একটু চান্দনিক আঁচ পেলাম। ওদিকে প্রসেনজিৎ অন্য রকম। গভীর জঙ্গলে বাস করেও ক্যানভাস রং জোগাড় করে একজনের ছবিই এঁকে চলেছেন বিগত কুড়ি বছর। বুঝলেন না কার, কী ঢ্যাঁড়শ রে বাবা, মধুজার! মধুজা, থুড়ি পাওলি দ্য টেলিগ্রাফ-কে বলেছেন, "In some of the scenes, I looked very pretty too" chirped Paoli। সত্যিই সুন্দর লেগেছে। তবে আমি বলছি টেলিগ্রাফ-এর ইংরাজির ম-ম ব্যবহারটার দিকে তাকাতে, "chirped"। উঁউঁ... পাওলি-র জন্য আমার কষ্ট হয়। মনে মনে জিজ্ঞাসা করি, পাওলি দাম পাইলি দাম?

তপন সিনহা-র মিউজিক সম্পর্কে আলাদা করে কিছুই বলার নেই। এক উদ্দাম ড্রাম-আটিক যন্ত্রণায় ভুলেই গেলাম কটা দৃশ্য নীরব ছিল। ভাবুন একবার, একটা ট্র্যাজিক কিছু দেখার জন্য বসে আপনাকে যদি কমেডি দেখতে হয় তাহলে সেটা কত বড়ো ট্র্যাজেডি! রশিদ খান নিজগুণে সমৃদ্ধ। কিন্তু গান সম্পর্কে, মিশ্রণ সম্পর্কে কত কিছু ভাবতে হয় শুনেছি, তার কিছুই পেলাম না।

তবে, ব্রাত্য বসু-র অবদান নিঃসন্দেহে মনে থাকবে। "আমরা" অ্যান্টি সিপিএম। "ওরা" অ্যান্টি শাসক গোষ্ঠী। "তারা" অ্যান্টি শোষক গোষ্ঠী। সবকটা লোককে অ্যান্টি-সিপিএম দেখিয়েছে। খ্যামতা আছে! খ্যামতা না থাকলে শাবল-গাঁইতি মেরেও একদলা মাটি তোলা যায় না! খ্যামতা না থাকলে ব্রাত্য হওয়া যায় না। দ্য টেলিগ্রাফ-এ ব্রাত্য বলেছেন, "I have made Tara for both the plex audience as well as the masses. I hope people like the film"। ওই বোথ-দের জন্য মেশাতে গিয়ে ঘোঁট পাকিয়ে গেছে। আর ঘোঁটপাকানো সিনেমা ভোটপূর্ববর্তী বাজার টানার কৌশলটা জানে কি না, সেইটেই এখন দেখার। নাইডু-র মতো পোড়খাওয়া মাওনেতা কীভাবে জাহাঙ্গির খান-কে গড়গড় করে সব প্ল্যান বলে গেল তা এখনও স্পষ্ট নয়। আর পরিশেষে ভিক্ট্রি সাইন দেখানোয় দর্শককুল তো জীবন্মৃত। এখানেও সিটি পড়তে পারত। যদিও মাস্টার স্ট্রোকটা অন্য কোথাও ছিল, শুভ্রজিতের কল্যাণে আমার দৃষ্টিগোচর হল। ব্রাত্য বসু বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন গৌতমমোহন চক্রবর্তী এবং শোভন চট্টোপাধ্যায়কে। বিষয়টা বেশ মজাদার। কুলকুল করে হেসে বুঝলাম, আমরা বোধ হয় এ জীবনে আর নিজেদের "আ-ও-তা"-ভুক্ত করতে শিখলাম না।

প্রেমগাথায় নিজেদের গেঁথে বেরিয়ে আসলাম। পরে ভাবলাম, লাভ হয়েছে দুটো। এক, কদিন ধরে বমি ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অত্যন্ত কাহিল হয়ে পড়া সুপ্রিয় বেচারা সবকটা ভীষণ সিরিয়্যস সিনেও দুর্ধর্ষ হেসে তরল পেটে একটু খিল ধরাতে পেরেছে। আর দুই, সংগীতা ওর বিরুদ্ধে মুখ না খোলার জন্য তুখোড় পলিটিশিয়ানের মতো চা-এর দোকানে আমাকে সকলের পক্ষ থেকে পঞ্চাশ টাকা ছাড় (ঘুষ) সহ প্রাপ্য অর্থ প্রদান করেছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সংগীতা এরপর গৌ-ব্রা পরিহিত সিনেমা দেখানোর ইচ্ছাটুকু প্রকাশ করবে না।

সকল কথার হক কথা, সিনেমাটা কয়েকটা কাট-অ্যাকশনে ভরা মুখরোচক বাপি চানাচুর!

গোড়ার কথা - জানলা ও দরজা

আজ আমার বাংলা ব্লগ-এর জন্ম হল। কত দিনের ইচ্ছা আজ বাস্তবে। ভেবেছিলাম বেশ কিছু দিন। কোন্ বিষয় নিয়ে লেখা যায়। আমার রাজনৈতিক বেঁচে থাকা, আমার লেখাপড়া, আমার স্কুল, আমার বাড়ি, আমার পরিবেশ ও পরিবেশ দূষণ, দাদার মেয়ে, মাদারবোর্ড খারাপ হয়ে যাওয়া-হেতু আমার মন খারাপ, নাকি অন্য কিছু। মাথাতেই আসছিল না। এবং সে কারণে, অনেক আগেই ব্লগ-এর বাড়ি নির্মাণ করলেও অন্তরটা ফাঁকা রেখে দিয়েছিলাম। পরে মনে হল, বাংলা ব্লগ লেখার উৎসাহে জোর করে কিছু লিখতে চলেছি। সে লেখা ভালো হবে না, শুধু আগডুম বাগডুম বা ঘোড়াডুম পেনডুম জাতীয় কিছু হবে, আর সে-রকম কাজের আমি পরিপন্থীও বটে। তাই ব্লগের বাড়িতে ধুলো পড়ল। অযত্নে খোলা যাচ্ছিল না জানলা। ক্যাঁচকোঁচর আওয়াজ হল।

আসলে নিজের ভাষায় কিছু লিখবো, মাতৃভাষা বাংলায় - এমন ইচ্ছা জানলারা সইবেই বা কেন। আমার মাদারবোর্ড বিকল হওয়ার পর থেকে তাকে "কারেকশন সেন্টার"-এ পাঠানো ও পাঠানো-পরবর্তী সময়ে আমার যে কী কষ্ট গেছে আমিই জানি। পুজোয় সার্ভিস সেন্টার বন্ধ। আর স্কুল ছুটি বলে একটু ঘোরার মুডেও ছিলাম। নচেৎ মন খারাপ হতে হতে খারাপতর হয়ে কোথায় গিয়ে ঠেকত, জানা নেই। যাই হোক, অনেক হ্যাপা পুইয়ে দাদার মেশিনে উইন্ডোজ-এ বাংলা লিখলাম। আমি এর আগে প্রায় সাত বছর এই ভাবে বাংলা লিখেছি, যখন লিনাক্স কী ও কেন, অজানা ছিল।

বর্তমানে চারচক্ষু হওয়ার সুবাদে আমার দূরদৃষ্টি প্রখর হয়ে উঠেছে। তবুও জুম করে করে হাত ব্যথা হয়ে গেল। ফন্টগুলোকে মোটামুটি দৃষ্টিসুখ মোতাবেক ফুলিয়ে তুললাম। কিন্তু অমন অমানবিক ওয়ে-তে কতক্ষণই বা লেখা যায়। পুরো লেখাটা চোখের সামনে থাকলে ভালো লাগে। লেখার প্রতি আরও আন্তরিক হওয়া যায়। কেমন একটা মমত্ববোধও জাগে। জুম করলে ফন্ট বড়ো হয় ঠিকই, কিন্তু সে ফন্ট, যতই কন্ট্রোল প্যানেলায়িত ফন্টস-এ সোলেইমান-লিপি ঠাসি না কেন, খুব বিশ্রী লাগে। এক হয়, যদি লেখাটা আগে থেকেই খাতায় থাকে, শুধু টাইপ করে ফাটিয়ে দিলাম। (যদিও দ্বিতীয় বারের জন্য পড়া এবং ভুল থাকলে সংশোধন করার কথা ভাবলেই আমার গায়ে জ্বর চলে আসে।) কিন্তু যে-লেখার জন্মই হচ্ছে সরাসরি মনিটরের ওপর, সে-লেখা কতক্ষণই-বা ওই ভাবে তোলা যায়। লেখা কষ্টার্জিত ফসল। তাই বলে উইন্ডোজ-কে মাধ্যম করে বাংলা হরফে সরাসরি ইন্টারনেটখাতা-য় লেখা বহুকষ্টার্জিত ফসল।

এবং তা করতে আমি বিলকুল রাজি নই। কষ্ট করব, অথচ বহু কষ্ট করব না কেন? যদি অন্যান্য ফন্টের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটা দেখা যেত, তাহলে আমি তারিয়ে তারিয়ে বাংলার ক্ষেত্রেও বহু কষ্ট উপভোগ করতাম। কিন্তু কোনো ইংরেজি ফন্ট-এর ক্ষেত্রে এই সমস্যা হয় না। যত ছ্যাবলামো সব আঞ্চলিক ভাষাকে ঘিরেই। এই যেমন মাস দুয়েক আগেই আমার এক ছাত্র লেনোভো-র লোভনীয় ল্যাপটপ-এ লালায়িত হয়ে উইন্ডোজ এক্সপি লোড করেছে। মানে ও সরাসরি করেনি। লেনোভো কোম্পানি থেকে কোনো দেবদূত এসে করে দিয়েছে। তা যখন এক্সপি লোডরত অবস্থায় সে ছাত্রটির প্রশ্নের উত্তরে জানায় উইন্ডোজ এক্সপি-র সিডি সে অন্য সিডি-তে লিখে দেবে না, ছাত্রটি আমায় ফোন করে। আমি জানি এরা দেয় না। দেবদূত এবং দেবদূতের দ্যূতিমান কোম্পানিরা দেয় না। আমি এই জন্যই যারা উইন্ডোজ এক্সপি-র চওড়া বরাবর কাটা বাঁধাকপির মতো দেখতে সিডিকপি নিয়ে আসে, তাদের আমি বিলক্ষণ শ্রদ্ধা করি। নতুন নতুন সফটওয়্যার কেনার আর্থিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাসোহারা ক্ষমতা আছে খুব কম মানুষেরই। তবুও তারা লিনাক্সগামী হয় না এক অদ্ভুত কারণে। যাই হোক, ছাত্রকে সে বলে যখন কিছু হবে তাকে খবর দিতে। সে আমায় ফোন করে। দাদা, কী করব? আমি খালি তার বাংলা পড়ার একটু সুবিধা করে দেওয়ার জন্য প্রথমে রিজিওন্যাল ল্যাংগোয়েজগুলো লোড করে দিতে বলি। ভাবলাম, এক্সপি-র সিডি যখন দিয়ে যাবে না, ওইটুকু অন্তত করে দিয়ে যাক। সে দেবদূত বলে তার কাছে এরকম কোনো সিডিই নেই। আমি বললাম ওটা এক্সপি-র সিডি-তেই থাকে। উইন্ডোজ খুলে একটু কারিকুরি করার পর কম্পিউটার নিজেই ওই সিডিটা ড্রাইভারে ঢোকাতে আদর্শ বাবার মতো নির্দেশ দেবে। আমি তাকে স্টেপ বাই স্টেপ বলে দিলাম। সে, পরে শুনেছিলাম, আমার এই নির্দেশগুলো ম্লানবদনে মেনে চলছিল। হবে না-ই বা কেন, মেনে নেওয়াটাই তার কাজ। উপার্জনের তাগিদে তার লেনোভো কোম্পানি-তে যুক্ত হওয়া আর বাড়ি বয়ে গিয়ে কম্পিউটারে এক্সপি ইন্সটল করে দেওয়া। উইন্ডোজ তার কোম্পানিকে যে ভাবে চালায় সে সেই চালনার অন্তর্গত রোদে-পোড়া জলে-ভেজা একটি ভারবাহী পশু মাত্র। স্বভাবতই আরও কোনো বহির্নির্দেশ তাকে মেনে চলতে হবে, এটা ভাবলেই তার বিরক্তি ও কিছুটা আতঙ্ক জাগে। আর উইন্ডোজ-এ থাকতে থাকতে যা হয়, শেখার ইচ্ছেটাই মর্মান্তিকভাবে হারিয়ে যায়। এবং সে কারণেই বিগত বছরগুলোয় উইন্ডোজ ইন্সটল করতে করতে এবং একই রকম ভাবে ইন্সটল করতে করতে সে কোনো দিনই এই রিজিওন্যাল ল্যাংগোয়েজ বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করেনি। আরও কিবোর্ড ইন্সটল করা যায় এইটুকু সে জানতে চায়নি। আর একজন পরিচিত জানালো, গত মাসেই সে পাঁচশো টাকা দিয়ে অ্যান্টিভাইরাসের জগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী আসলি ক্যাসপারস্কাই কিনেছে, তবু তার কম্পিউটার-এ ক্রীড়ারত ভাইরাসের সংখ্যা অগুনতি। খুব মজা হচ্ছিল এই ভেবে, যে-মহিলাকে সে-বেচারা অনন্ত যৌবন সমৃদ্ধ বলে নিয়ে এসেছিল, সে আসলে কুঞ্চিত ত্বকের তাকিয়া-তে পরিণত। কোনো সুখ নেই। কাজেই তার পাঁচশো টাকাই জলে। অবশ্য আমার জানা নেই আসলি অ্যান্টিভাইরাস-এর আসলি দাম কত। আসলি-র পিছনে কত কত কত এমন আসলি খেলা চলে। নর্টন যে ভাইরাস-দাদারাসকে কোয়ারেন্টাইন করে, আভাস্ত তা করে না, আভাস্ত যা করে, তা এভিজি করতে অভ্যস্ত নয়। কারা যে কী অনন্য চুকলিবাজি করে চোখে ধুলো দিয়ে পাবলিকের অর্থ চুষে বার করে নিচ্ছে, তা পাবলিক জানবে আর কবে।

সারা শরীরে আমার ভয়ানক পরিমাণে রোম আছে, আর তাই বিবিধ বিষয়ে আমার রোমাঞ্চ বেশিই জাগে। তেমন একটি বিষয়, উইন্ডোজ ইউজার-ফ্রেন্ডলি। এ কথাটা আমার কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। তবে এটা জেনে গেছি, এটা প্রবাদ হয়ে মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ইউজার-ফ্রেন্ডলি শব্দের মাধ্যমে মনে হয় "পাঁড় গবেট বানিয়ে রাখে এমন" বোঝায়। যা চাইবে ইউজার, ইয়াহু! তাই পাবে, হুক্কাহুয়া! সহজে সবকিছু ইন্সটল করতে পারবে, যে গেমস চাইবে তা-ই খেলতে পারবে! ওঃ ইউজার-কে দেখো, লোভে ল্যাদল্যাদ করছে! বিষয়টা কতকটা এই রকম। ব্যবহারকারী-সহায়ক। যে ব্যবহার করবে অর্থাৎ ইউজার - সে হল জম্মের আকাট, গবেটান্নভোজী। এটা আগেভাগেই বুঝতে পেরে চালাকচতুর উইন্ডোজ ফ্রেন্ডলিপনা দেখাতে শুরু করেছে। আসলে ইউজার-এর ফ্রেন্ড সে কোনো দিনই ছিল না। বরং সে যা যা করতে বলবে ইউজার তাই করবে। ত্রিদিবদা একদিন বলেছিলেন, "বোমের আঘাতে ব্রেইন-এর অর্ধেকটা যাদের উড়ে যায়, তারাও উইন্ডোজ ব্যবহার করতে পারে।" আমার মাথাটা যদিও বোমারু-র কাছে নতিস্বীকার করেনি, কিন্তু হঠাৎই মাথাটা বেশ হালকা হালকা লাগছিল। কারণ দুটো। এক, আমরা (অর্ণব, সুপ্রিয়, দিবাকর) তখনও উইন্ডোজে দাঁড়ানো ত্রি-বোকা। দুই, মাথাটা একটু পরিষ্কারও হল। বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম, কেন উইন্ডোজ নয়, কেনই বা লিনাক্স। দিন গেল। কিছু রাতও। দেখতে দেখতে আমার মেশিন-এ হার্ডডিস্কে পার্টিশন করে দেবাশিসদা লিনাক্স আর উইন্ডোজ ভরে দেয়। ভয়ে ভয়ে লিনাক্স-এ ঢুকি, ত্রিদিবদার একটা কথা কানে বাজে, লিনাক্স কিন্তু সিরিয়্যস লোকের জন্য। আর নির্ভয়ে খুলি উইন্ডোজ, কারণ উইন্ডোজ লোককে সিরিয়্যস থাকতে দেয় না। যা খুশি তাই করি। মেশিনে ভাইরাসও বাসা করতে থাকে। কোনো কিছু ইন্সটল করতে গেলে সতর্কতার সঙ্গে সাইটে ঘোরাফেরা করতে হয়। মাইক্রোসফট যদি জানে, সব দেবে চৌপাট করে।

তারপর কোনো একদিন বহুক্ষণ লিনাক্সে থাকা। ফেদোরা-র সাথে। সাবলীলতার সঙ্গে পাতার পর পাতা বাংলা টাইপ করা। ঝপাঝপ পিডিএফ করা। সরাসরি মেইল কম্পোজ করতে লাগলাম বাংলায়। ফন্ট সাইজ নিখুঁত। দেখার কোনো সমস্যা নেই। বাংলা সাইট খোলা যাচ্ছে। ইংরেজির হরফের মতোই বাংলা হরফ। মানানসই আকার। মনটা বিহঙ্গ হয়ে উঠল। উইন্ডোজ খোলা হতে লাগল কম। লিনাক্স বেশি। এখন মনে হতে লাগল, বাংলার হরফের মতোই ইংরাজি হরফ। আর তারপর অতি উৎসাহে ও উদ্দীপনায় একদিন ত্রিদিবদা-কে কী একটা ভুলভাল মেইল-ও পাঠালাম। ওভার ফোন কী ঝাড়! ব্যথাতুর হয়ে পড়লাম। একই সঙ্গে ফেদোরাতুর। যে-দিবাকর লিনাক্স-এর লি-ও জানে না, সে কি-না সবাইকে নাক্স খেতে উৎসাহিত করতে লাগল। আর ছেলেবেলার ধারণা, নাক্স ভোমিকা খেলে সব রোগ ঠিক হয়ে যায়, তাই হল। ধীরে ধীরে।

এবং ধীরে ধীরে এই গোটা লেখাটাই নির্মিত হল আমার প্রিয় লিনাক্স-এ। এই তীব্র গরমে মাথায় সার্দুর হাল্কা টুপির আশীর্বাদ থাকলে যা হয়! আরাম-ই আরাম। ছেলেবেলায় বাহাদুর-এর কীর্তি আমার ঠোঁটস্থ ছিল। রক্তে রাঙা অর্জনগড়-এর জঙ্গলময় রাস্তার ভিতর দিয়ে বাহাদুর কমলারঙা পাঞ্জাবি আর জিনস-এর প্যান্ট পরে ঘোড়ায় ছুটছে। ছামিয়া পিছে। ওঃ কী রোমহর্ষক দিন গেছে আমার শৈশবের। যাকে মারবে, তার দোর্দণ্ডপ্রতাপে আমি কিছু পাতা আগেই ধরাশায়ী, একটু-আধটু কান্নাও পাক দিয়ে উঠছিল গলার কাছে, - তার দশাসই দেহটা চোখের সামনে ঘুরছে ফিরছে। কালো মুষকো টেকো বদমায়েশ, যার সামনের একটা দাঁত আবার সোনার। দেখলেই সর্বাঙ্গ রি রি করে উঠত! সততা এবং ন্যায়ের প্রতীক বাহাদুর তাকে লাথি চড় ঘুঁষি এমন মারল যে সে চিৎপাত! ততক্ষণে অবশ্য আমিও পাশবালিশটাকে কেলিয়ে দলা পাকিয়ে দিয়েছি।

আমার সিডি আছে। ফেদোরা-র সাইটেও ঢুকি। কিছুই বলে না। একেই তো বলে ইউজার-ফ্রেন্ডলি। আমার কাছে গোটা একটা মাছ আছে, যতটুকু যেভাবে ইচ্ছে হবে খাবো। সিরিয়্যসলি খেতে শিখবো। পারি, না পারি - গোটা মাছটা কে যেন অজ্ঞাতসারে আমার থালার ওপর দিয়ে গেছে। আমি খেতে শুরু করেছি। কম্পিউটার শেখার জগতেও এরকম কিছু ভয়ানক অসাধু লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে মাইক্রো থেকে ম্যাক্রো বড়ো, জানলা থেকে দরজা।

আর তাই পুনরায় দেবাশিসদাকে তলব, এবং গোটা মেশিনেই লিনাক্স ইন্সটল করা!