অনেক দিন বাঁচলাম। ত্রিশটা বছর। এবার মরতে চাই। সারা শরীরে যে-পরিমাণ শেওলা পড়ে গেছে, তার থেকে গতির মুক্তি আর চাই না। গতি যখন শ্লথ হয়েই গেছে, শজারুর কাঁটা-লাগা যক্ষের মতো পা টেনে টেনে হেঁটে চলেছি যখন, তখন অকাল বার্ধক্য মার্কা শিরোনামের যেকোনো প্রবন্ধের গোটাটাই আমি। আমার নিভৃত গতিপথে যারা হেঁটে চলে, কিছু মানুষ কিছু মানবিকতা, তাদের প্রণাম জানাতে চাই সর্বাগ্রে এই বলে যে তারা আমার মতো সাড়াশব্দহীন একজন অমানুষকে স্থান দিয়েছে এত কাল। তাদের প্রীতি প্রেমে চোখের জলস্তরে চাঞ্চল্য অনুভূত হয়। যত দিন যাচ্ছে, মানবতন্ত্রহীন অস্থিচর্মসার যন্ত্র-বিশেষে পরিণত হচ্ছি। পিছনের দেশে লাথি মারলে এগোই। সামনের দেশে লাথি কঁকিয়ে বসিয়ে দেয়। আমাকে নিয়ে অনু দত্ত সরোজ পাল-এর নীলান্ধ পৃথিবী অবিরাম প্রদক্ষিণ করে চলে সূর্য এবং অন্যান্য অজানা সৌর সদস্যকে। ফিরোজ এই আতপ-দহন সহ্য করে আমার ইচ্ছে করে না প্রাত্যহিক সূর্যোদয়ে মাথা তুলতে, মাথায় মাথায় ঠোকাঠুকি লাগাতে, আর সূর্যাস্তে বিছানায় সকল প্রতিবাদের অবসান ঘটাতে। গড্ডলিকা প্রবাহে বিসিজি, গান চর্চা, কলেজ, পূজাপরিক্রমা, মাংস ভক্ষণ, অফিস-অফিস, খেউর, স্কুল শিক্ষকতা, রাজনীতি, সরস্বতী পুজো, ক্রিকেট – সবই তো হল। কচুরিপানায় তছনছ হয়েছে ত্রিশটা বছর। তবে হ্যাঁ, অনেকেই বলতে পারেন – বাপু, দুটো কাজ এখনও বাকি, বিয়ে এবং বিয়োনো। হুঁ, তা ঠিক। একটা স্ত্রীলিঙ্গ জোগাড় করতে হবে। আমার সাইজ মতো। তাকে বলতে হবে, বিয়ে করবি? সে রাজি হলে বলা যাবে, নে, এবার শুয়ে পড় দেখি। বুড়ো আঙুলের দাগ ছোপানো সার্ভিস বুকের গুণে তোকে পেয়েছি। পরের দশ বছর বাৎসায়নের চৌষট্টি কলা। চল্লিশ-বিয়াল্লিশ। তখন তো সেই স্ত্রীলিঙ্গ পুরো মেডুসা। আর আমি মার্কামারা যোবন-গোঁসাই। তখন আর কোনো অসুবিধা নেই আশা করি, সবার কথা শুনে টিকে রইলাম তো। এবার অনন্ত রৌরব যাত্রা করা যেতে পারে। যোবন গো সাঁই, যাক না অস্তাচলে! উত্তেজনার অত খিদে থাকা উচিত নয়। লোভ করেছিলাম, লুব্ধক হাতে এসেছে। আর কত চাই? আমার মারা যাওয়ার সাথে আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছা লোভ-লালসা মরে যাবে। মূলে পচন ধরলে কাণ্ডটিও যায়। পৃথিবীর ঘাড় থেকে একটি ফালতু বোঝা নামবে। কিন্তু বোঝাই কী করে যে আমার সামনের দশ-বারো বছর কাটানোই বিরাট ঝক্কির লাগছে। এত ঝক্কি নিয়ে বেঁচে থাকতে আর মন চায় না। হাতে দস্তানার মতো গলিয়েছি সংসার। পায়ে মোজার মতো লেপটে স্কুল। মাথায় ন্যায়নিষ্ঠার শিরস্ত্রাণ। আমার এসব পরতে ইচ্ছে করে না। খালি মনে হয়, প্যাকেজ ট্যুরের অংশ হয়ে গেছি। ঘুরছি ঠিকই, কিন্তু প্রাণহীন সেই বেড়ানো। চুপটি করে বসা নেই, অন্তর ও বাহির-এর অন্তরঙ্গ সহবাস নেই, যা দেখছি তার ভিতর আত্মগোপন করে থাকা অজস্র দ্রষ্টব্য স্থান সন্ধান করার অবসর নেই। শুধু ঘূর্ণন রয়েছে। পৃথিবীব্যাপী জ্বলন্ত অঙ্গারের অদৃশ্য ঘূর্ণন।
পাঠকের অবধারিত প্রশ্ন, এক, এটা কি প্রবন্ধ না আত্মজীবনী? একটি প্রবন্ধে এত আমি-র কী আছে!
লেখকের উত্তর, হ্যাঁ, এটা প্রবন্ধই হচ্ছে, তবে এই প্রবন্ধের সমাজ-সংস্কারমূলক কোনো দায়দায়িত্ব নেই। এটি তেমন প্রবন্ধ নয় যেখানে প্রাবন্ধিক ক্ষুরধার কৌশলে নিজেকে, সবার থেকে দূরে রেখে টাটকা ভাবনার স্রষ্টা রূপে আলাদা মর্যাদার ঘি মাখিয়ে রাখেন। সে-ধরনের প্রবন্ধ লেখার শক্তি আমার নেই যে ইচ্ছে থাকবে। আমি এই প্রবন্ধের একটি পার্ট। প্রবন্ধ আমার পার্টি। আমার মতো ঝুড়ি ঝুড়ি আমি জুড়ে এই পার্টি গড়ে উঠেছে।
পাঠকের অবধারিত প্রশ্ন, দুই, তাহলে আমি কে আর এই পার্টির ম্যানিফেস্টো কোথায়?
দ্বিতীয় প্রশ্নের আমি-র বর্তমান আস্তানা লেখকের বর্তমান ভগ্নদেহ। এ-ভগ্নদেহ আমি-র পূর্বপুরুষ বা উত্তরপুরুষ, বা উভয়ের সংযোগ, বা উভয়ের কিছুটা। জৈবিক বিবর্তনের দৌলতে একটি দোষ আমার আমি-র মধ্যে পরিলক্ষিত – আমি কমিউনিস্ট নই। আমি ততটা দুখি মানুষ, যতটা সুখি। আলস্য-পরিশ্রম চোবানো আমার একটিই শরীর। কাঠামোগত সংজ্ঞায় আমি মানুষ। তবে শরীর নামক দুর্ভেদ্য গড়ের ভিতর রুদ্ধ সিংহদ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে অঞ্চল-খোয়ানো ক্ষতবিক্ষত কুকুরটি কেঁদে ওঠে। বড়ো মায়া লাগে তার জন্য। সে তো আমারই অন্তরাত্মা। ব্রাত্যজন। সেই জখম ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত আমি প্রতিমুহূর্তে শুনে চলি। নিহত মায়ের প্রসব বেদনা কেউ যেমন শুনতে পায় না, তেমনি আমার রুদ্ধসংগীতও বাইরের জগতের কাছে চির-অশ্রুত থেকে যায়। তখন দুখুমিঞা কী আর করবে, পাতার ঘন সবুজ ও জবার ঘন লাল জমে থাকা অন্ধকারে নিজের খোয়ানো খোয়াইশ কুড়াতে কুড়াতে পীরের ঝোলায় ভরে চলে। অলি থেকে গলি, পথ থেকে রাজপথ, কণ্ঠ থেকে উপকণ্ঠে অকাল বার্ধক্য ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটতে থাকে।
শহরে আস্ত আকাশ দেখা যায় না। ওই মোটামুটি এদিক-ওদিকে কুড়ি ডিগ্রি করে খোয়াতে হয়েছে বেশ কিছুদিন। যা বাতাস বলছে তাতে এই কৌণিক ব্যাধি বাড়তেই থাকবে। তাই আকাশের থেকে স্বপ্ন দেখা সোজা। স্বপ্ন দেখা শেষে প্রতিদিন উঠে বসে দেখি পীরের ঝোলা ক্ষুদ্রকায় হতে হতে মানিব্যাগে রূপান্তরিত; আর অধিবাস্তব স্বপ্নের অতিবাস্তব রূপ হিসেবে প্রাপ্তি হয় একমুঠ খুচরো, দশ টাকার নরম দুটো নোট, নোংরা পাঁচ টাকা আর এটিএম-বিয়ানো দুটো ঝকঝকে একশো টাকা। হাতে পুঁজি থাকলে যা হয়, বেরোই বাড়ি ছেড়ে, ডাঁটা থেকে ডাঁট, সকল পণ্যদ্রব্য আমার সামনে শহরজুড়ে সাজানো, তা কিনতে কিনতে কেনার ফুরসতটুকু কখন হারিয়ে ফেলি। আমার ভিতরের পরিশ্রান্ত ব্যবসাদার তখন শুয়ে পড়ে। শহরে আস্ত আকাশ দেখা যায় না বলে তার খুউব দুঃখ। সব কেনা হলেও সময়াভাবে আকাশ কেনা বাকি থেকে যায়। তবে টেকনোলজির বাগদা তার বেডরুমে আছে বলে নিকটবর্তী দেশের আকাশ খুবলে আনে সে। থ্রু থ্রিজি। সারা দিন হাঁ জি হো গ্যায়া, ও জি সুনতে হো, আর রাতে, চলো আব থ্রিজি অন করো।
থ্রিজি অন। আদমের ফেস। ইভের বুক। উভয়ের ফেসবুক। দেয়ালজুড়ে এক আকাশ গপ্পোসপ্পো। জগতটা পুঁচকে হয়ে মোবাইলের গদগদ স্ক্রিনে। Hi...! ব্যস, একবার হাই তোলা হলেই বেদম লাইক করা শুরু হয়। কীসে লাইক করা হল, কেনই বা লাইক করা হল, সেই লাইক-এ দুজনের উষ্ণ দহন হল কী না, তা কেউ জানতে চেষ্টা করে না। একজনের ভরাট ক্লান্তি আরেকজনের ক্লান্তিতে মিশিয়ে দেওয়াই মূল লক্ষ্য। সারাদিন আর্থিক এবং পরিবেশের ঐতিহ্যের ক্ষতিসাধন করেও আমার চলে না, শেষে সামাজিক সেতুবন্ধনের নামে মানুষের চেতনাশক্তির বেদনাদায়ক ধ্বংসসাধনেও লিপ্ত হই। বন্ধুত্ব স্থাপনে বন্ধ্যা বলেই সারাদিন আমার চারপাশে বয়ে যাওয়া মানুষকে দেখলে বন্ধু বলে মনে হয় না। অসামাজিক-এর মতো সমাজবন্ধন অস্বীকার করে সামাজিক সেতুবন্ধন বা সোশাল নেটওয়ার্কিং-এ নিমজ্জিত হই। আমার স্বভাব অন্যের ক্ষতি করা, তাই সর্বক্ষণ অন্য মানুষ ক্ষতি করবে বলে ভাবি। অর্থ এই দাঁড়ায়, নিজের ক্ষতি সম্পর্কে আমি যথেষ্ট সজাগ। নিজেকে অক্ষত রেখে দৃষ্টিপথ থেকে দূরে অদৃশ্য বন্ধুর প্রতি নিজে কতটা বিশ্বস্ত তা প্রমাণ করার উদ্দীপনায় মাউস ক্লিক করি। কতখানি অবিশ্বস্ত আমার সামগ্রিক সত্তা! কতটা হৃদয়-বর্জিত! কতটা শেওলা-তছনছ! অন্যের অনুভূতি কিনতেও আমার এতটুকু বাধে না। দুনিয়াদারি করতে গিয়ে নিজের দূষিত হৃদয় হাজার টুকরো করে ফেলে রেখে আসি পথে। দূষণ ছড়ায়। দূষণের শিকার হয় অন্য আমি, আর ভগ্নদেহে-বাসা-বাঁধা আমি আরও দূষিত হই। আমার প্রাত্যহিক পরাজয়ের কথা কাউকে বলতে পারি না বলে অন্যকে পরাজিত করার উত্তেজনায় আমি ছটফট করি। ব্রিটিশদের অত্যাচারের ভঙ্গিমা আমার ভগ্নদেহ থেকে আমি এখনও অপসারিত করিনি। যদিও যার সঙ্গে নিত্য কথা বলা, যার ওপর জয়লাভের প্রবল লালসা – সেই মানুষটিও আমারই অপরূপ আয়নাচিত্র। পরাজিত! বহু আগেই সে পরাজয় স্বীকার করেছে। জলঢলা চোখে করজোড়ে বলেছে, আমি পারছি না। তাকে পরাজিত করে আকস্মিক উত্তেজনায় আমি বন্ধুত্ব নয়, বন্ধ্যাত্ব স্থাপন করে চলি প্রতি মুহূর্তে। সামাজিক অস্থিরতার ট্রলারে ভাসি দুই বিজয়ী অথবা দুই পরাজিত। দুই বিজয়ীর কথায় লিটারেচার মাড়ানো হয়, দুই পরাজিতের কথায় সৃষ্টি হয় সাহিত্য। আমার ডিজলাইক করার যান্ত্রিক ত্রুটি ফেসবুক-এ নেই বলেই আমি লাইক করে চলি ক্রমাগত। আর খণ্ড খণ্ড সাহিত্য সৃষ্টি হতে থাকে দুই একজন মানুষের সাথে। আমার শূন্যতায় বিলিতি মদে দুঃখ দিশি করে তোলাই আমার জিজীবিষার অঙ্গ – আমার ময়াল-ভয়াল ম্যানিফেস্টো।
ভেতরে কুকুরটা, ঘাড় উঁচিয়ে দেখে, এই সিংহদুয়ারটি ডিঙানোর কোনো প্রশ্নই নেই। বড়ো সঙ্গীবিহীন বলে মনে করে নিজেকে। অঞ্চল খুইয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে ক্লান্ত সারমেয়, আমার জখম অন্তরাত্মা, পরাজয়ের গ্লানিতে যার কোনো শিবমন্দিরের আশপাশ শুঁকে পা তোলার ইচ্ছাও জাগে না। বুঝেছে, যে-মুহূর্তে মুক্তির স্বাদ পাবে বলে ভেবেছে সে, সে-মুহূর্তেই তাকে ঘিরে অসংখ্য দেয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে। অনিশ্চয়তার ধসে সমস্ত পথ অবরুদ্ধ। চেয়েছিল সে, ভূমি থেকে আকাশে পক্ষীরাজকীয় উড়ান দেবে, কিন্তু জীবনের অনিশ্চয়তা তাকে ভূমি-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রে পরিণত করেছে।
জীবনের অনিশ্চয়তা, সে তো আর আমার মতো মাথামোটার ধারণা মোতাবেক চলে না। অনিশ্চয়তা নিজের শক্তি ও শক্তির অনুরণনে অনুরণিত হয়ে এগিয়ে চলে। ভূমিস্তরে সে গাছের শিকড় হয়ে জল শোষণ করে, আবার ভূমিকে দিয়ে আকাশের জল শোষণ করায়। ফুলের সঙ্গে দলাদলি করে অভিব্যক্তিকে রঙ দেয়, আবার রঙের সঙ্গে সমঝোতা করে দলীয় পতাকা হয়ে ওঠে। অনিশ্চয়তার ছলাকলা বোঝা কার সাধ্যি! কখনও সে দেবালয় হয়ে ওঠে, কখনও দেবালয়ে সে হয়ে ওঠে। কখনও তাকে পুরোহিত, কখনও দেবতা, কখনও মন্দিরের দ্বাররক্ষক রূপে দেখা যায়। মানুষকে সে কাজের শক্তি জোগায় কখনও কখনও। কখনও-বা এমন শক্তিহীন করে তোলে যে মনে হয় না এই দ্বিপদ নিজেকে পৃথিবীর অধীশ্বর রূপে ভাবে। যখনই দর্প-সম্মোহিত স্বভাব মাথা চাড়া দিয়েছে, অনিশ্চয়তা তখনই তাকে চুরমার করে দিয়ে অভাব-এ পরিণত করেছে। অনিশ্চয়তার এ এক বড়ো গুণ – উভয় দিকেই জ্যা রোপণ করতে পারে। সে তীরন্দাজের আশ্চর্য শর উভয় অণীকেই তীক্ষ্ণ ত্রিভুজ গঠন করে। যে চাইছে মারতে আর যাকে চাইছে মারতে, উভয়ের জীবনই তখন বিপন্ন। আর এই বিপন্নতা আছে বলে এখনও মানুষ ততটা অধীশ্বর রূপে নিজেকে ভাবতে পারে না, যতটা সে প্রকাশ করে তার উচ্চবর্ণীয় শব্দে, উচ্চমার্গীয় বাক্যে। যা হবে, তা অবশ্যম্ভাবী। যা হয়েছে, তা নিঃসংশয়ে হওয়ার কথা ছিল। মানুষের জীবনধারণ এক সুস্থির বর্তমানে জীবন-মৃত্যুর অতিক্ষুদ্র ব্যবধানে। বর্তমানের রক্তাক্ত ঘটমানতার বিরুদ্ধে সে গর্জে ওঠে, কখনও বা প্রশস্তি ছোটায় অভিমুখ বদল করে। তাই এমন ক্ষমতা তার নেই যে জীবনের অনিশ্চয়তাকে এক সুনিশ্চিত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে। নিয়মের চাকায় বেনিয়ম-এর স্পোক জুড়ে কতই বা অবরুদ্ধ করা যায় যুগের আহ্নিক গতি। প্রগতির নিজস্ব গতিশক্তির নিকট সময় নিজেই তো লোহার বেড়ি পরা দাসের মতো খাটে। সেখানে মানুষ তো সময়ের ক্রীতদাস! সে কিনা গলা ফাটায় প্রগতির হয়ে। ওই যেমন, কৃত্রিম উপগ্রহ পৃথিবীর বাইরে নিক্ষেপ করতে পারলে নাসারন্ধ্র থেকে সুতীব্র চিৎকার বেরিয়ে আসে; তেমনি লক্ষ লক্ষ কৃত্রিমতায়, কোটি কোটি অনুকরণে তার মনে চৌর্যবৃত্তির আনন্দ নানা কারিগরি জৌলুশ ধারণ করে বেরিয়ে আসে।
আমাদের এখানে একটি মন্দির, পাড়াতুতো মা-মাসিমা যেখানে উপাসনা করে থাকেন, সেখানে শিবলিঙ্গের লিঙ্গাংশ সম্প্রতি উধাও হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই কোনো ইতর ভেঙে নিয়ে গেছে। সেই ভগ্নাংশ দিয়ে সেই ভ্যান্ডাল কী করবে তা সে-ই জানে। তথাকথিত চোরের থেকে এ কিঞ্চিত আলাদা বলে কোনো বাঁধা ছকে তার হদিশ মিলছে না। ফলে সেই বাহাদুরের নামে নিন্দা করা ছাড়া তেমন বিশেষ উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়নি। উলটে নিন্দা এমন করা হয়েছে যা স্তুতিকেও হার মানায়। লিঙ্গহীন সেই খণ্ডপ্রস্তর এক অদ্ভুত রূপ পরিগ্রহ করাতে ভদ্দর পোশাক পরা লোকে তাকে নিয়ে বেশ হাসাহাসিও করল। পুরুষানুক্রমে তারা ছড়াতে লাগল, "ইট'স সো টাফ আ জব, না? গোটা একটা স্টোনের ওপর বিল্ড করা। হরিবল্! হাউ কুড হি ডু দিস..."
হঠাৎ শিবলিঙ্গ নিয়ে পড়লাম কেন জানি না। কেউ অভিজ্ঞতায় শান দিয়ে বলতে পারে, "বয়স বাড়ছে আর যত খারাপ দিকে নজর পড়ছে"। অভিজ্ঞ মানুষের কথা একেবারে নস্যাৎ করে দিচ্ছি না। তবে আমার কাছে বিষয়টা সম্পূর্ণ অন্য বার্তা নিয়ে এসেছে। চোর-এর নতুন সংজ্ঞা, চৌর্যবৃত্তির নতুন ডাইমেনশন নিয়ে এসেছে। ছোটবেলায় অনেক চোরের গল্প শুনেছি। লিচুচোর থেকে শুরু হয়েছিল। কিন্তু কিছু দিন আগে লিঙ্গচোরের কথা শুনে যারপরনাই চিন্তিত। আমারটা যদি এভাবেই কোনো দিন উপড়ে নিয়ে যায়! ভাবলেই শিউরে উঠছি। তাহলে কি লিচুচোরই অনেক বছর বাদে এখন লিঙ্গচুরিতে হাত পাকাচ্ছে? আমি নিজেরটা সামলে রাখি। সেফটির জন্য যদি অ্যাবডোমেন গার্ড পরতে হয় তাতেও রাজি। কারণ, আমার শিক্ষা আমার অন্তরকে বরাবর অরক্ষিত রেখেছে, পাখিপড়ার মতো শুধু শিখিয়েছে কীভাবে বাহ্য উপাদানে বহিরঙ্গ সুরক্ষিত রাখা যায়।
হঠাৎ শিবলিঙ্গ চুরি নিয়ে কেন উদ্বিগ্ন তা হয়ত স্বয়ং শিবই জানেন। শুনেছি, করজোড়ে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ডুকরে ডুকরে কেঁদে মনের বাসনাটি উজাড় করে দিলে তিনি দুর্ধর্ষ বিহিত করেন। এই আশাতেই তাই দিন কাটাচ্ছি। কিন্তু যতদিন না শিবের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারছি, ভয় তো থেকেই যায়। স্কুলে যাওয়ার পথে ভিতরে ভিতরে শঙ্কিত থাকি বইকি। না চাইলেও শিবাংশ চোখে পড়ে আর মাথার ভিতর বনবন করে পাক খায় ভরদুপুরে গোশালা থেকে গোরু চুরি হওয়া, মায়ের দেশের বাড়িতে সাতসকালে বাঁদরের আটার দলা নিয়ে চম্পট দেওয়া, বৃন্দাবনে কাকুর সানগ্লাস উধাও হয়ে যাওয়া, ইত্যাদি নানা কাহিনি।
আর একটা ঘটনা বলার জন্য ছটফট করছে মনটা। ছোটবেলায় একদিন মাকে বিস্তর অপদস্থ করেছি ভরা রাস্তার মাঝখানে। "গোরুর অতগুলো পাখি কেন?" লোকজনের মাঝে আরক্ত মুখে মা বোঝানোর চেষ্টা করছেন বাঁট কী কাজে লাগে ইত্যাদি। আমি বুঝলাম আমার মতো করে; কিন্তু আমার পাখি আর গোরুর বাঁটের পজিশনিং মোটামুটি একই হওয়ায় সন্দেহ দূর হল না। কিন্তু মা বলেছেন; বেদ মিথ্যে হতে পারে, মা নয়। আজ মনে হচ্ছে সময়-স্বয়ং মায়ের প্রতি সন্দেহের বদলা নিচ্ছে। ওইটুকু বয়সে বাঁট নিয়ে ঠাটবাট বিশেষ পছন্দ করেননি শিব।
শিব যেমন চটেছেন, আমাকে ঘিরে থাকা অনেক মানুষও তেমনি চটেছে। প্রায়শই শুনতে হয়, "আজকাল তো রিকশা ছাড়া এক পা-ও যাস না।" আমি নানা মিথ্যে বলি, ঢপ দিই। কিন্তু কখনও মুখফুটে বলি না, রিকশায় গেলে কত সেফ লাগে নিজেকে। লিঙ্গ চুরি যাওয়ার ভয় থাকে না। তবে হ্যাঁ, এত প্রিকশন নিয়েও যদি চুরি যায়, তাহলে রিকশাওয়ালাকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে। এবং পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করলে নিশ্চয়ই তাকে ডাণ্ডা মেরে ঠান্ডা করে দেবে। আমার সম্পদ উদ্ধার হোক বা না-হোক, আমি সম্পদ হিসেবে ভাবছি যাকে তার ওপর কতটা আমার অধিকার সে নিয়ে বিতর্ক হোক বা না-হোক, মারের মজায় ক্ষতস্থান ভরবে কিছুটা হলেও। কারণ, শ্রমজীবী প্রলেতারিয়েত ভার্সাস পুঁজিবাদী শিক্ষিতের অসম লড়াইয়ে শ্রমজীবী মানুষ নিদারুণ পরাজিত পরাভূত হয়, সেকথা তো বাচ্চার বাচ্চাও জানে।
পাড়ার শিবলিঙ্গ অথচ শিবলিঙ্গ নয় এমন প্রস্তরখণ্ড এক অদ্ভুত রূপ পরিগ্রহ করাতে প্রবীণেরা তাকে নিয়ে বেশ কৌতুক করলেন। সেই হর্ষ-মুখর কল্লোলিনী মোড়ে এর কানের কাছে ওর মুখ নিয়ে কী কী কথা হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। তাঁরাই বলে চলেছেন যাঁরা রোঁয়া-ভাঙা কিশোর-কিশোরীদের মুখে এসব কথা শুনলে চোখ পাকান এবং দেশটা উচ্ছন্নে গেছে বলে বউয়ের কাছে পিচ পিচ করে হাপিত্যেশ করেন। এমনিতে কী সেই অজ্ঞাত কারণ, যার জন্য ভারতীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে আমরা বহন করি না, তা আমার মাথায় ঢোকে না, তার ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে জ্বালাচ্ছে এই পুংলিঙ্গ-ভিত্তিক ধর্মাচার। যাই হোক, এলাকার মুখরোচক ভ্যান্ডাল-অ্যান্ড-স্ক্যান্ডাল সম্পর্কে হাসি পেলেও হাসি দলা পাকিয়ে রইল গলায়। মর্নিং ওয়াক বিশেষজ্ঞ ভারতীয় প্রবীণদের মুখ থেকে এই ভাষা নির্গত হওয়ামাত্র বুঝতে পারলাম, মূর্তিপূজার ঘনঘটা বৃদ্ধি পেলেও এই ভুবনডাঙা, নবীনে-প্রবীণে মিলে যার পত্তন হয়েছিল গ্রামীণ গৃহস্থের মন জুড়ে, বর্তমানে এই বাসনা-বিক্ষত শহরের অন্তরে সে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করতে চায় না।
আসলে চেষ্টা করছি হালকা হতে। কিছু গল্পের মাধ্যমে অনেক পরিবেশ হালকা হয়। হালকা হতে হতে ধীরে ধীরে বিশেষ কোনো বিষয়ে ঢোকার চেষ্টা করছি অথবা চেষ্টা করছি কোনো বিশেষ বিষয় থেকে বেরোতে। আড়াই মাসের ওপর হয়ে গেল, বেশ অবসাদে ভুগছি। অবসাদের কোনো নির্ভরযোগ্য কারণ হয় না। অনেক কারণের বড়সড় একটা যোগফল। অবসাদহেতু কাজকর্ম শিকেয় উঠেছে। অনুশীলনেও গাফিলতি হয়েছে। নিজের মেহনত করার সদিচ্ছাতেও চিড় ধরেছে। বন্ধুদের সঙ্গে ফোনাফুনি পর্যন্ত হয়নি। জালাধানে বসে ফেসবুক-এ মগ্ন হয়েছিলাম। যা করি না, তাই করছিলাম। দেখছিলাম, অজানা অচেনা মানুষের সঙ্গে চ্যাট করলে কীসের এত আনন্দ, যা আমার ছাত্রছাত্রীরা আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করে অহরহ। লেখাটা যখন গড়াচ্ছে তখন যন্ত্রণার পর যন্ত্রণা ধারণ করতে করতে কেমন একটা শূন্যতা নেমে আসছে মাথার দুপাশ দিয়ে। শূন্যতা থেকে শরীর ভাঙা। শরীর ভাঙা থেকে আবারও সিঁড়ি ধরে উঠে যাওয়ার প্রচেষ্টা। অসাড় মনটায় সতেজতা ফিরে আসছে, বুঝতে পারছি, কিন্তু বিষাদের ছাই উড়ছে চারপাশে। এও বুঝতে পারছি, ফিরে আসাটায় তেমন নিপুণতা নেই। শূন্যতা ভেঙে ঘষটে ঘষটে কোনোক্রমে এগোনো। এই অদ্ভুত এগিয়ে যাওয়ার সূত্রপাত হয়েছে সেই কলেজ জীবন থেকে। এসএফআই-এর নোংরামো, কিছু শিক্ষকের সূক্ষ্ম রাজনৈতিক চাল, ধ্বংসের মুখে পড়া অ্যাকাডেমিক কেরিয়ার, মিটিং মিছিল এবং প্রতিবাদে বন্ধুকে ঘাড় ধরে লাইন থেকে বের করে দেওয়ার শত শত দৃশ্যের ভিতর দিয়ে আমি এগিয়ে গেছি। এই এগিয়ে যাওয়ায় কিছু নাতিশীতোষ্ণ মানুষের মুখোমুখি হয়েছিও বহু বার। এরা অতি-শীত অতি-উষ্ণ আবহাওয়ায় সুদীর্ঘকাল কাটিয়েছে। তাদের দেখেই আরও এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পেয়েছি। প্রেরণা পেয়েছি, ক্ষমতার নয়, অক্ষমতার স্বাদ পূর্ণ করার। কতটা অক্ষম তা চেখে নেওয়ার মোক্ষম সুযোগ পেয়েছি। দিনান্তে হেঁটে ফিরি যখন, সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে মুহ্যমান, তখন ওই মেঘলা পথে আনীল-হলুদে স্নান করি। ভেসে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ, আমার জীবন-তরণির কাণ্ডারি যিনি। রেখার মতো ভেসে ওঠে তাঁর একটি লাইন... "জ্যোতিষ্কলোকের পথে রেখামাত্র চিহ্ন রাখিবে না।" অর্থাৎ পণ্যবাহী সেনাদল, সে যারই নিয়ন্ত্রণে থাকুক না কেন, মিলিয়ে যাবে, নিয়ন্ত্রক সহ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। পূর্বে হোক অথবা পশ্চিমে, উত্তর-দক্ষিণ নির্বিশেষে, ইতিহাস নিজেকে যুগ যুগ ধরে এভাবেই ইতিহাস করে তোলে। তাই ইতিহাস নিজের কাছেই বহুঋণে ঋণী। একই জায়গায় স্থির হয়ে জীবন-মরণের সীমানা ছাড়িয়ে সম্প্রসারিত করে তোলে নিজেকে। যেখানে তার বাহু আছে, বন্ধন নেই; যেখানে বন্ধন আছে, বাহু নেই। কোনো কিছুরই রেখামাত্র চিহ্ন থাকে না। তবু কেন জানি না, শূন্যতা ভেঙে বেরিয়ে আসার সময়েও আমার কোথাও যেন মনে হচ্ছে, কোথাও কোথাও যেন বেয়নেটের খোঁচায় মনে হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম আসলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি, মোটা রেখায় বেঁচে আছে। ক্ষমতার উৎস এবং ক্ষমতাকে গলাধঃকরণ করতে করতে সেই রেখাটি দীর্ঘ হয়েছে, বহু জায়গায় বাঁক খেয়ে গোলকধাঁধার মতো ছড়িয়ে আছে। গোলকধাঁধার রেখাংশ যে-যে জায়গা ছুঁয়ে গেছে, তাতে আর লিচুচোরের বেঁচে থাকার কথা নয়। লিঙ্গচোরও মারা যাবে। কিন্তু ভূমিচোর? ভূমিকে চুরি করতে করতে, গিলতে গিলতে সে প্রকাণ্ড হয়ে গেছে। আমার নোকিয়া মোবাইলে সাপের খেলা আছে – Snake Xenzia। অনেকটা তার মতো। কিন্তু সেই অরাজনৈতিক সাপকেও মাথায়-লেজে সংঘর্ষ বাধিয়ে নিমেষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে দেখেছি বহু বার।
কেন হঠাৎ ভূমিচোর সিপিএম-এর পিছনে পড়লাম। দুহাজার এগারোর বিধানসভা নির্বাচনের পর ওরা তো গেছে। পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক ভূমিদূষণ ভূমিক্ষয় ঘটালেও ওরা থেকে যেতে পারেনি। জনগণ ওদের রেয়াত করেনি। ওরা গেছে এবং স্বাভাবিক ভাবেই যা রেখে যাওয়ার কথা ছিল, তাই রেখে গেছে। এক পাহাড় আঁধার। এই আঁধার বড়ো বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন। যে-অন্ধকারে ওরা পরিকল্পিত হত্যার ভাস্কর হয়ে ওঠে। আর এই নিকষ অন্ধকারে কখন এসে ওরা আমার শ্বাসরোধ করবে, আমি টেরও পাবো না। চোখ আর কতটুকু দেখে। যা দেখার তা অন্য কোনো ইন্দ্রিয় গভীরভাবে বীক্ষণ করে। তবু আমরা এই মন নামক অশরীরী শরীরটাকে আজ অবধি ইন্দ্রিয়ের মর্যাদা দিতে পারলাম না। সেই মন কত দুশ্চিন্তিত, আজ তুলোমাত্র হলেও বুঝতে পারছি। অবসাদের সর পড়ে আছে এখনও। মনের ওপর জমে থাকা সেই সর কাটিয়ে যখন বর্তমান রাজ্যের দিকে তাকাই, তখন দেখি এক নতুন দল। নতুন ক্ষমতায়ন। নতুন ভাবনাচিন্তা, বসার আয়োজন। এখন যে দলটি মন্ত্রক-মসনদে তৎপরতা দেখাচ্ছে, সেই তৃণমূল কী করবে জানি না। এই মুহূর্তে কী করণীয় তার স্পষ্ট কোনো রূপরেখা আমার দৃষ্টিপথে আসে না। অতিরিক্ত ভাবলে বলিরেখা সুস্পষ্ট হবার সম্ভাবনা থাকে, শরীর-টরিরও খারাপ হয়, তাই চিন্তার পথ থেকে সরে আসাই ভাল। আমার যেটুকু জানা আছে তাই নিয়েই বরং লেখালিখি সারি।
জানা আছে কর্মক্ষেত্রে যেতে হবে, নিয়মিত ক্লাসরুমে ঢুকতে হবে, ক্লাসরুম টিচিং যা আমার কাছে একটা আর্ট বলে মনে হয়, তাকে বাস্তবায়িত করার প্রচেষ্টা করতে হবে। এবং প্রতিদিন নিজের ওপর সমবেদনার ঝুড়ি উলটে দিয়ে মাথা হেঁট করে বাড়ি ফিরে আসতে হবে এই ভেবে যে শিক্ষকই যখন দিশেহারা, সমস্ত পরিস্থিতি যখন তার প্রতিকূল, সে তখন নামেমাত্র শিক্ষাদাতা। আসলে সে, যে-অন্ধকারে পরিকল্পিত হত্যার ছক নিপুণভাবে সাজানো হয়, তাতে হারিয়ে গেছে কবে। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, যাকে সে এখনও চিনে উঠতে পারল না, বুঝে উঠতে পারল না। যে নিজেই পথ দেখতে পাচ্ছে না, অন্যকে পথ দেখাবে কী করে। যদি অন্ধকারে সে পথ খুঁজে না-ই পেয়ে থাকে, তবে এই পথ হারানোকে কীভাবে সে প্রতিষ্ঠা করল? এতকাল সে এগিয়ে গিয়েছে কোন মাধ্যমে? তার তো মানুষজন্ম; ওড়ার সাধ্যি নেই যে পাখসাটে বাতাস উতলা করে তুলবে; সাঁতারেও অপটু, তাই জলপথের সঙ্গেও তার জল-অচল বিভাজন। তাহলে কোন মাধ্যমে এগিয়েছে সে এত পথ বা শূন্য মাধ্যম? কে দেখিয়েছে তাকে? কী দেখিয়েছে তাকে?
কেউ দেখায়নি। কেউই পথে শিক্ষা দান করে যায়নি। পৃথিবীতে কেউ শেখাতে পারে না। শিক্ষা এমন এক আলো যা শুধু গ্রহণ করা যায়, আলোকিত করা যায় নিজেকে, অভ্যন্তরকে পূর্ণ প্রতিফলক রূপে ব্যবহার করা যায়। সেই প্রতিফলকে ঠিকরে পড়া আলোয় নিজের আত্মার মেঝে ও পরমাত্মার ছাদ মিশে এক আলোক-সত্তায় পরিণত করা যায় অন্তর। অন্তরে আলো-আহরণ ক্ষেত্রের সেই পরিধিটাকে ক্রমশ বাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। ব্যাসার্ধ থেকে ব্যাসে বর্ধিত করা যায় নিজের অজানাকে, নিজের জানার দীনতাকে। জানা আর অজানা নিক্তিতে ফেললে অজানার পাল্লা ওই যে ভূমি ছোঁবে, আর উঠবে না। না উঠলই বা, তাতে কী এমন আসে যায়! সত্যিই তাতে নিজের কোনো দিনই কিছু আসে যায় না। ওটাই তো জানার মজা। বলা ভাল, জানতে গিয়ে অনুশীলন-জাত আক্ষেপ-জাত মজা। তবে সমস্যা অবশ্য ওখানে নয়। অন্য কোথাও। জীবন একটি আদ্যপ্রান্ত প্রশিক্ষণ, আর তার অনুশীলনে কোনো কোনো প্রশ্ন আমাকে খুব বিচলিত করে। উত্তর খুঁজে পাই না। আমার ভাঙন ঘটায়। আমাকে ছুরিকাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে। যেমন একটি প্রশ্ন বিগত দুমাসে আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। আমি কতটুকু শিক্ষক, যতটুকু হেঁটমুণ্ড? আকস্মিক বজ্রপাতের মতো এই প্রশ্ন মনে উদয় হওয়ামাত্রই বুঝতে পারলাম আমি সরকারি স্টিকার লাগানো শিক্ষক হলেও এখনও প্রকৃত শিক্ষক হয়ে উঠতে পারিনি।
শিক্ষক শব্দটি বাদ দিই বরং। শিষ্টাচার, ক্ষমা ও কর্তব্যপরায়ণতা আমার ওপর প্রয়োগ করতে পারছি না। নিজের সততার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে বলা উচিত আবরণহীন আমিই আসল মানুষ। আবরণহীন মানুষটার রূপ কেমন? সে একজন স্থলবাসী, গৃহকাতর, কিছুটা দৃষ্টিহীন, কিছুটা অদৃষ্ট-নির্ভর, লোভী, বর্বরতা-প্রিয় একজন অপদার্থ। এবং অবশ্যই হেঁটমুণ্ড। সর্বত্র সে মাথা উঁচু করে মাথা হেঁট করে থাকতেই পছন্দ করে।
হেঁটমুণ্ডের পরিস্থিতি এখনও অনেক স্কুলে রয়েছে। ক্রুর রাজনীতির শিকড় চলে গেছে ভূনিম্নস্থ গভীরতায়, আর ডালপালা ছড়িয়ে পড়েছে স্কুল থেকে স্কুলের বাইরে। প্রশাসনিক কাঠামোয় এত ছিদ্র যে প্রধান শিক্ষক থেকে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পর্যন্ত সিপিএম-এর সার্বত্রিক বিচরণ। আশ্চর্যের বিষয় এখনও তার কামড়ের দাগ আমার গায়ে। কামড়ের ক্ষতচিহ্নও পুরোপুরি শুকায়নি। থেকে থেকে জ্বালা করে ওঠে। কোথাও সেই ভয়ংকর সিপিএম নেই; কোথাও নেই বলা ভুল, কোথাও কোথাও আছে এবং আমাদের স্কুল তাদের মধ্যে অন্যতম, যেখানে সিপিএম বিগ্রহ রূপে পূজিত হয়। সিপিএম কী? একটা সময়ের পর সিপিএম কার্যত কোনো দল ছিল না। দলীয় কাঠামোর বিন্যাসে ময়ালের মতো শুয়ে থাকা এক শীতল ভয়। দলীয় রাজনীতিতে ঘৃণ্য বাহুবলী লোকদের অন্তর্ভুক্ত করতে করতে শেষমেশ এই প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক নিয়ম বলে প্রদর্শিত করে এসেছে।
বিগত আড়াই মাসে আড়াইশো বার ভেবেছি চাকরিটা ছেড়ে দেবো। এই রাজনৈতিক চুল্লি থেকে আমার নিষ্কৃতি প্রয়োজন, নয়ত অন্তরের অন্তঃস্থলটা দগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিছু দিন যেতে না যেতেই মনে হল, চাকরিটা তো সহজেই ছেড়ে যাওয়া যায়, কিন্তু শিক্ষকতা তো ছাড়তে পারব না। ও ক্ষমতা আমার নেই। ক্লাসে যাওয়ায় একটা মজা পাই, শেখাতে কি আর পারি? যা শেখার ওরা শেখে। উপরন্তু ছাত্রদের ভালবাসলে, যৎসামান্য ভালবাসলে ওদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা যায়, আর এই শিক্ষা আমার কাছে মহার্ঘ; তাকে আমি ছাড়ি কী করে? তাহলে কেন চাকরি ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা এসেছিল? নিজের পরাজয়কে মেনে নিতে পারিনি বলে? চাকরি গেলে স্ব-নির্মিত স্কুলেই কি সারা জীবন কাটানো যেত? প্রাইভেট টুইশন করেই কি হিঁচড়ে হিঁচড়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যেত মায়ার সংসার, অক্ষ(র)যাত্রা এবং পরশমেলা-দের?
বন্ধুরা আছে। শেষ দুই ক্ষেত্রে অর্থের সংকট আসবে না। কিন্তু সংকট তখন অর্থের নয়, অন্য কিছুর। আর্থিক অস্তিত্বহীনতা এখন একটা সংকট বটে, কিন্তু তার থেকেও গভীরতর সংকটে বসে আছি আমি যা আমার তোমার আমাদের মায়ার সংসারকে তছনছ করে দিচ্ছে। আমি শিক্ষক বা শিক্ষক নামের আড়ালে এক বহুরূপী। আমার কত রূপ, কতশত ছদ্মবেশ, তাদের বিস্তারিত বর্ণনা আমার দুঃসাধ্য। কারণ, প্রতিটি নতুন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার বহুরূপতার বাড়বাড়ন্ত দেখে নিজেই বাকরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছি।
যে শিক্ষক লিখছে সে শিক্ষিত, এমন দাবি করে না। বিচার-বিবেচনায় সে-ই সবথেকে অশিক্ষিত। হ্যাঁ, আমার মনে হয় আমার ন্যূনতম শিক্ষা নেই। বাংলামাধ্যম বিদ্যালয়ের এই শিক্ষক অর্ধ-ইংরেজি শিক্ষিত দরিদ্র পিউপিলদের ট্রেনার তিনি। আমি নাকি ভাষা শেখাই। কীভাবে শেখাই? না, বাংলা বোঝাই ইংরাজি দিয়ে আর ইংরাজি বোঝাই বাংলা দিয়ে। যে-কোনো ভাষার প্রতি এহেন দুর্বিনীত আচরণে ভাষার সংহার করে চলি প্রতি মুহূর্তে। তাই ভাষা-শিক্ষক হলেও ভাষা-বিনাশের এক অবিনাশী শক্তি হয়ে উঠেছি ক্রমশ। আমারই অযত্নে-লালিত যে-ভাষা, তাকে আমি ছড়াব কীরূপে? যেমন আমি, তেমনি আমার চারপাশ। কত আমি ছড়িয়েছিটিয়ে সেখানে। কেমিস্ট্রিতে দিগ্গজ মানবিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী নয় এবং অন্য দুই মানুষের সম্পর্ক নিয়ে নিরন্তর কাটাছেঁড়া করে চলেন, তিনি নাকি সমীকরণ ব্যালান্স করার জন্য ছাত্রদের খুব পীড়াপীড়ি করেন। পদার্থবিদ্যা গুলে খাওয়া শিক্ষকের মুখে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রও শোনে অপদার্থ শব্দটি। অ্যাকাউনট্যান্সি-র শিক্ষক কতিপয় মানুষের ষাট-সত্তর লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। উনি নিশ্চয়ই সে-আর বাজার-এ দক্ষ। না, কাউকে আমি দোষ দিচ্ছি না। এঁদের প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত জীবনে চরম অসুখী। স্ত্রীকে চেনেন না ঠিকমতো, বা তিনিও পুরোপুরি চিনতে সাহায্য করেন না। বিছানায় লেনদেন আর সামগ্রিক অপরিচিতি। অসুখী বলেই এই শিক্ষকরা গোটা দুনিয়া কিনতে দুনিয়াশুদ্ধু লোকের কাছে ধার চেয়ে বেড়ান। স্কুলের নির্ধারিত সময়ে দেদার হাসিঠাট্টা বিলালেও দিনের শেষে তাঁরা হ্যাঙারে ঝোলানো কান্নাঘামভেজা নিঃসঙ্গ শার্ট। ভাতের অন্তিম গ্রাস দাপটের সঙ্গে মুখে তোলার সময়ও রসায়ন, পদার্থবিদ্যা বা অ্যাকাউনট্যান্সির কালিঝুলি মাখা শিক্ষক গিলে নেন তেতো আত্মগ্লানি।
আমি লিখছি, কিন্তু অক্ষরের বিদঘুটে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছি। অট্টহাসি শরীর চনমনে রাখে। ইনকাম বেশি করতে হলে শরীর চনমনে রাখতে হবে। আমরা ইনকাম করি। ইনকাম দরকার চুনকামের জন্য। চুনকাম দরকার কামের জন্য। অর্থাৎ চাকরি, মাইনে, ঘর, বউ। জয়োল্লাসে কেটে যায় সারাটা জীবন। তাই, আমাদের সমগ্র লেখা-পড়া-শোনা চলছে কর্মক্ষেত্র আর কর্মসংস্থান সঠিক ভাবে পড়তে পারা ও বুঝতে পারার জন্য। প্রত্যেকটি সম্পর্ককে কত দ্রুত অর্থে রূপান্তরিত করা যায়, তার শিক্ষায় আমরা শিক্ষিত হয়ে চলেছি। জীবনবিমা পরিষেবার হালহকিকত যে বুঝতে পারে না, তার মতো অশিক্ষিতের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমাদের বেঁচে থাকার গণ্ডিটা এতটা সীমিত হয়ে এসেছে যে বাড়ি থেকে স্কুল, স্কুল থেকে ব্যাংক এবং আপ-টু-ডেট থাকার প্রচেষ্টা। এবং জঘন্য কর্তৃপক্ষের পদলেহনে নিরন্তর নির্যাতন করে চলা অন্যকে।
অন্য কে? কর্তৃপক্ষ, না কর্তৃত্বের পক্ষ, না কর্তৃত্বের বিপক্ষ?
নতুন এসেছেন যিনি, তিনি সুবিধার জন্য পরীক্ষা শেষ না-হতেই বেরিয়ে যাচ্ছেন। তিনটে পঁয়ত্রিশে পরীক্ষা শেষ। তল্পিতল্পা গুটিয়ে দোড় মারলেন আগের গাড়ি ধরার তাগিদে, তিনটে পঁচিশ নাগাদ, যদিও ডিপার্চারের সময় দিলেন তিনটে পঁয়তাল্লিশ। "সুবিধা দিলে কে না সুবিধা নেবে?" এ-রকম একটি কথা, বাজারে যার বেশ প্রচলন, চড়া দাম, দারুণ বিক্রিও হচ্ছে আজকাল। আসলে, সরকারি চাকরির সিলমোহর পিঠে পড়লে একটা উষ্মা প্রদর্শন করার ইচ্ছা থাকে। আমাকে সুবিধা দিচ্ছে না, আমিই সুবিধাবাদী, কর্তৃত্বের পক্ষ। সিপিএম জমানায় আমার বাপ-ঠাকুর্দার অকর্মণ্যতার অহংকার আমি বয়ে বেড়াচ্ছি। আমাকে স্কুলে সাড়ে চারটে অবধি থাকতে হয় না। আমি তাকে সুযোগ করে দিচ্ছি আমার ওপর থাবা বসানোর জন্য, পঁচিশ আর পঁয়তাল্লিশের প্রভেদ জানা সত্ত্বেও। কিন্তু কাগজে-কলমে লিখতে গেলেও কি হাত কাঁপে না? কর্তৃপক্ষ দয়ার সাগর, তিনি বলেছেন – "লেখো।" দয়া পারস্পরিক বিনিময়যোগ্য অপরাধ। কর্তৃপক্ষের দিকে তার একটি দয়ার ভোটও আবশ্যক। কারণ এরাই কর্তৃপক্ষের বিরাট শক্তি। এই বিপরীত অপরাধে তাই তিনি অবাধে সায় দেন।
আচ্ছা, কতটা সুবিধা নেবো? সরকারি বা আধা-সরকারি স্কুলের চাকরি সতত সুখের। পাঁচটা ক্লাস + মোটা মাসমাইনে = শিক্ষক/শিক্ষিকা। মাঝে মাঝে খাতা দেখা। একজন রিকশাওয়ালা, যাঁকে ছটাকা উপার্জনের জন্য প্রায় ছয় মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করতে হয়, পরবর্তী যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে একজন শিক্ষকের প্রতি মিনিটে কমপক্ষে দুটাকা আয়, ঘুমালেও আয়, ঝিমালেও আয়, রাজনীতির আলোচনা করলে আয়, নারীর দেহসুষমা বর্ণনাতেও আয়, ব্লু-টুথে আদান-প্রদান করলেও আয়, ক্লাস ছেড়ে ক্লাসের বাইরে গ্যাঁজালেও আয়। পড়তি বিকালে রোদে বাড়ি যেতে কষ্ট হয় তাঁর। তিনি রিকশা ধরেন। রিকশাওয়ালা বলেন, "ছটাকা খুচরো হবে তো?" শিক্ষক জানান, "না, দশ টাকার নোট।" রিকশাওয়ালার মুখ অন্য দিকে ফেরে, "ও অধীরদা, নিয়ে যাও তো।"... তিনি অপেক্ষা করেন এমন যাত্রীর জন্য যার কাছে খুচরো থাকবে। শিক্ষকের আয় কিন্তু শিক্ষকের কাজের অনুপাতে হয় না। ক্লাসের বাইরে কথা বললেও তাঁর নির্ধারিত মাইনের একচুলও কেউ কমাতে পারেন না। সেই কারণেই আয়মুখী শিক্ষক আয়েশ করতে শেখেন প্রথম দিন থেকেই। আমরা শ্রমিক নই; প্রথম দিন থেকেই বাবু। আর বাবুরা শ্রমিকদের বাবু হয়ে ওঠার অধিকার শোষণ করেই বেঁচে থাকে। যে-ভাবে বেঁচেছিল বা আছে সিপিএম, যে-ভাবে বেঁচে আছি আমরা।
শিক্ষাক্ষেত্রে সরকার অনুমোদিত বাংলা-মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়ে নানা প্রশ্ন উঠে থাকে। যেমন, শিক্ষকদের বিএড-ওলা কোট-প্যান্ট আছে কী না। বিএড-ওলা কোট-প্যান্ট আছে অথচ পড়ানোর সদিচ্ছা নেই এমন শিক্ষক কতটা শিক্ষক সেই প্রশ্নটাই অধিক গুরুত্ব পায়। আমাদের যাঁরা শিক্ষক ছিলেন, তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা আমাদের ভাবায়নি কোনো দিন। আমরা তাঁদের অন্তরের চোখ দিয়ে দেখে এসেছি। মজ্জাগত হয়েছে – শিক্ষক হলেন শিষ্ঠাচার, ক্ষমা এবং কর্তব্যপরায়ণতা-র এক অত্যাশ্চর্য সম্মিলন। এখনও তাঁদের কণ্ঠস্বর কানে বাজলে তাঁদের আমরা দেখতে পাই। তখন ভয় ছিল, শ্রদ্ধাও ছিল। প্রাথমিকে, যে বড়দিমণি আমার বন্ধুকে ক্লাসে পড়া না-পারার অপরাধে বেত্রাঘাত করেছিলেন, সেই বড়দিমণিকে দেখেছি, টিফিন না আনার জন্য তার সামনে নিজের টিফিনবক্স খুলে দিয়েছেন। বিজ্ঞানের যে-শিক্ষককে দেখলে হাড় কেঁপে যেত, তাঁকে দেখেছি এক বন্ধুর মাথা ফেটে গেলে স্টাফ রুম-এ চোখের জল ফেলতে। যে-শিক্ষক "শরণাগত" বানান ভুল করার জন্য আমাকে তিনটে চড় কষিয়েছিলেন, তিনি কিছু দিন আগে আমি শিক্ষক হতে পেরেছি জেনে জড়িয়ে ধরলেন। সারাজীবন এই মানুষগুলো শিক্ষকতা ধারণ করে এসেছেন বলে এঁরাই প্রকৃত ধার্মিক শিক্ষক হয়ে উঠেছেন। শিক্ষা কাকে বলে, খুব বড়ো মাপের শিক্ষক কারা, এই কথা বোঝেন তাঁরাই যাঁরা শিক্ষা এবং সাক্ষরতার ভেদ সম্পর্কে অবগত। বিগত ইতিহাস বলে, সরকার-এর মূল লক্ষ্য ছিল ভোট ব্যবসা। আর তার জন্যই বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে পাশ করিয়ে সংখ্যাতত্ত্বের খেলায় মেতে উঠেছিল। প্রত্যেকটি নীতি শিক্ষকের শিক্ষাদান পদ্ধতিকে ভেঙেচুরে তছনছ করে ছাত্রকে প্রকৃত ছাত্র হয়ে ওঠা থেকে বাধা দিতে শুরু করল। যেন-তেন-প্রকারেণ কৃতকার্য-এর তকমা ধরিয়ে দেওয়া যখন একটা রাজ্যের শিক্ষানীতির মানদণ্ড হয়ে ওঠে, আমার গর্বের উত্তর চব্বিশ পরগনায় ২০১১ সাল অবধি সাক্ষরতার হার যেখানে ৭৮.০৭ শতাংশ১ তুলে শিক্ষার হইহই-রইরই পড়ে যায়, সে-রাজ্যের ভবিষ্যৎ অতল অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে বাধ্য।
খাতা দেখতে গিয়ে বুঝতে পারি, কী কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টা এ রকম দাঁড়ায়, কালির আঁচড় কাটলেই নম্বর দিতে ইচ্ছে করে। যতই উৎসাহ দেওয়া হোক, কতিপয় শিক্ষার্থী ছাড়া কেউ পড়াশোনার ধার ঘেঁষবে না। না-ঘেঁষারই কথা। কারণ অপ্রীতিকর রাজনৈতিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক অসাম্য, বেশ কিছু দলদাস শিক্ষকের ছাত্রছাত্রীর প্রতি দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, এবং বছরশেষে তাদের কেউ আটকাতে পারবে না এই প্রকট জাতীয়তাবাদী সত্য। তারা সোৎসাহে গুলাল মেখে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হবে এবং যথা সময়ে মাধ্যমিক/উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বিদ্যালয়ের গণ্ডি টপকাবে। আর আমি, নম্বর বিক্রির ব্যবসাদার, খাতা দেখেই চলব আর পাঁচ লাইন দশ নম্বর হারে নম্বর বেচতে থাকব। ক্লাসের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে সুকৌশলে হরণ করে নেওয়া হয়েছে অবসর ও আনন্দ, যা না থাকাতে ইন-ডেপ্থ রিডিং হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। স্কুলফেরত ছেলেপিলে সাইবার ক্যাফে-তে ভিড় করে। পড়তে যাওয়ার আগে পনেরো মিনিট বা আধঘণ্টা মনিটরে সেরে নেয় ক্রিকেট ফুটবল, অথবা বাবা-মা-র মোবাইলে খুঁজে নেয় সমস্ত ক্রীড়াজগতের আনন্দ, মুক্তির উল্লাস। এই মুক্তি মোহগর্তে পড়ার মুক্তি। উল্লাসের মুক্তি মোটেও নয়। উল্লাসের মুক্তি সমূল উপড়ে ফেলা সিপিএম-এর প্রাথমিক লক্ষ্য। পড়তে যাওয়া, নোট গলাধঃকরণ, আর পরিণতি... তোতাকাহিনি-র শেষটুকু। তবেই রাজার উল্লাস। বছরের পর বছর রাজদম্ভে পূর্ণ সিংহাসনে অলস ভাবে বসে থাকতে গেলে কৌশলে নির্যাতন করা রপ্ত করতে হয়।
আমরা বাবু এবং অলস বাবুরা প্রথম থেকেই ত্রুটিহীন নির্যাতনে বিশ্বাসী। ছাত্রছাত্রীদের নির্যাতন করার পিছনে উদ্দেশ্য হল এই, যারা আমাদের বিশ্বাস করছে, খাতা-বই খুলে হাতে ধরছে কলম, আমরা যদি নিজেদের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে তাদের বিরাট বর্তমানকে ছারখার করে দিতে পারি, তবে তারা তাদের কর্মজীবনে আয়ের মুখ দেখতে পাবে সামান্যই অথবা পাবে না। আমরা কর্মসংস্থান পড়ে বুঝতে পেরে ফর্ম ফিলাপ করে চাকরির পরীক্ষায় পাশ করে অর্থোপার্জনে মনোনিবেশ করেছি। তাই তারা ভবিষ্যতে আয় না করতে পারলে বা অত্যল্প আয়ের মুখ দেখলে অনেক অর্থ, যা গ্রহণ করার জন্য তারা কর্মসংস্থান-জয়ী হতে পারেনি এবং যা বিশ্বসংসারের বাটোয়ারার নিয়ম অনুযায়ী তাদেরই প্রাপ্য, তাদের হাতে না পৌঁছে উড়ে বেড়াবে সদরে বাজারে আড়ালে। সেই অর্থেও আমরা চাইবো দাঁত বসাতে। আমাদের খাটাখাটনির জিগির তুলে একটু গণ-আন্দোলন করলেই মাস মাইনে চাঁদ-চুম্বনে মত্ত হবে। আমরা তখন শ্রেণীকক্ষে উজ্জীবিত প্রাণশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব নির্যাতনের পরিমাণ কতটা বাড়িয়ে দেওয়া যায় তার ওপর। অথচ আমাদের বিশ্বাস করে খাতা-বই খুলেছিল যারা, তারা সেই দিনেও খাতা-বই খুলতে ভুলবে না, শিক্ষকের চরণে আস্থা অর্পণ করে আবারও শিকার হবে নিপীড়নের, প্রকল্পিত হত্যার। সকল উদ্দীপনা হারিয়ে সংসার বাঁচানোর তাগিদে বা অর্থের প্রয়োজনে এরা বাধ্য হবে রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের দ্বারস্থ হতে। সামান্য অর্থের বিনিময়ে তারা দাসখত লিখে দেবে ক্যাডারবাহিনীতে।
এই যাতনার কথা, সিপিএম-প্রদর্শিত শিক্ষাব্যবস্থার ভরাডুবির কথা এক ডব্ল্যুবিটিএ সদস্যকে কথা প্রসঙ্গে জানিয়েছিলাম। তিনি হাসলেন। সত্যি, ওষ্ঠ-অধরের সংযুক্ত-দিগন্তে কত রকম হাসিই না চলে। সেই হাসিটার দুটো ভাগ ছিল। প্রথমটি ছিল আমাকে তুষ্ট করার। অর্থাৎ, হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ – এই গোছের। পরেরটি ছিল অন্য রকমের। অনেকটা – আগে ওরা শাসন করেছে, এখন আমরা – এই টাইপের। মূল সমস্যার শিকড় সেই হাসিতে আরও গভীরে প্রোথিত হল। নৃমুণ্ড থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসা অট্টহাস্যের ঝাপটা গায়ে লাগতেই বুঝতে পারলাম আমরা এখনও প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠিনি। সিপিএম-আশ্রিত সুবিধা থেকে কংগ্রেসী বা তৃণমূলীয় সুবিধায় রূপান্তরিত হয়েছি মাত্র। কলপ হোক আর কেশকালা – লক্ষ্যটা তো স্থির – চুলকে চকচকে করে তোলা। আর চকচকে হলে তবেই না শিক্ষার চাকচিক্য!
একটা চিঠির কথা উল্লেখ করা যাক। সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ-এর সেক্রেটারি পার্থ রায়-এর সই-বাহিত সার্কুলার। সার্কুলার নং EMU/C/38A/10। সার্কুলাইজ করার দিনটি ছিল দশ নয় দুহাজার দশ। তখন সিপিএম জমানা। গোটা সার্কুলার এখানে তোলার ইচ্ছে নেই। শেষে তথসূত্রে ই-ঠিকানা২ দিয়েছি; প্রয়োজন হলে দেখে নেবেন। কী লেখা ছিল তাতে? তর্জমা করলে দাঁড়ায়, "সকল উচ্চবিদ্যালয় প্রধানদের জানানো হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের পরিপূর্ণ সজাগ করার জন্য যাতে তারা নজরদারদের প্রতি দুর্ব্যবহার এবং পরীক্ষার নিয়মনীতি লঙ্ঘন না করে। পরীক্ষাকেন্দ্রের আসবাব, উপকরণ অথবা অন্য যেকোনো বস্তুর ক্ষতিসাধন করার প্রচেষ্টাকে কঠোরভাবে বিচার করা হবে। উল্লিখিত ঘটনাগুলোয় জড়িত থাকা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীদের ফলপ্রকাশ স্থগিত রাখা হবে।"
পরীক্ষাকেন্দ্রের প্রকৃত ছবিটা কী রকম? মাধ্যমিক/উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাকেন্দ্রে নজরদারি করা এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। পরীক্ষা চলাকালীন গার্ড বেশি দেওয়া হচ্ছে বলে তারা যে-কোনো সময়েই দাবি তোলে এবং নিজেদের মধ্যে অশ্রাব্য ভাষায় কথাবার্তা চালায়। বেশ কিছু দিন যাবৎ শিক্ষকদের ওপর শারীরিক নিগ্রহ হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক অতীতে এ রকম ঘটনার নজির আছে। পত্রপত্রিকায় তা আলোচিত এবং সমালোচিত। ছাত্রদের অশ্লীল ভাষা শুনে শিক্ষকদের মানসিক নির্যাতন সহ্য করে যেতে হয় ৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিট। বকাঝকা করলে তা মানসিক অত্যাচার রূপে পরিগণিত হতে বিশেষ সময় লাগবে না। আর গায়ে হাত দেওয়ায় তো সম্পূর্ণ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলত তারা শিক্ষক-শিক্ষিকাকে হেনস্থা করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। দুঃখের বিষয়, একগুচ্ছ সরকারি নিয়ম বলবৎ করতে গিয়ে শিক্ষাদান পদ্ধতিই মার খেয়ে বসে আছে। পরীক্ষাকেন্দ্রে পাশে বা পিছনে বন্ধুর খাতা দেখে অথবা মাইক্রো-জেরক্স থেকে নকল করা ঘোরতর অপরাধ। আগে খাতা কেড়ে নেওয়া হত; এখন সে পদক্ষেপও গ্রহণ করা যায় না। বারংবার টুকলির শিল্পবিপ্লবে রাশ টেনে কাগজপত্র জানলা দিয়ে ফেলে দিতে দিতে একটা সময় নিজেকেই বড়ো অসহায় বলে মনে হয়। এবং এই অসহায়তায় তারা বেশ মজা পায়, হাসাহাসি করে। একটি দিন শাস্তি দিয়ে যদি ছাত্রটিকে ফিরিয়ে আনা যায়, কত কঠিন শ্রমের বিনিময়ে অন্নসংস্থান করতে হয় তা বোঝানো যায়, তাহলে সেই শাস্তি, হোক দৈহিক, প্রয়োগ করা উচিত বলেই আমি মনে করি। পরিস্থিতি কেন সেই রকম ভয়ানক পর্যায়ে যাবে যে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলাকালীন পুলিশি প্রহরা নিতে হয়? এই চিঠি পেয়েও আমরা কিন্তু অবলীলায় পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রহসন প্রবাহিত করে চলেছি। এই দুঃসাহস কি ৯৯৯টা সাবইন্সপেকটরের পদ থাকলেও ২০১১-র এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৬১৪টা১.১ পূর্ণ আছে বলে? ঘাড় ধরে কাজ করিয়ে নেওয়ার লোকের অভাব বলে?
মহাভারত-এ আমরা দেখেছি এক অদ্ভুত প্রবহমানতা। সাত্যকি কৃষ্ণের সারথি, আবার কৃষ্ণ, অর্জুনের। অর্থাৎ প্রয়োজনবোধে যে-কোনো কাজ দেশ ও দশের জন্য কাঁধে তুলে নেওয়া। মানুষ বড়ো চালাক। লালসার লাল পড়ে তার। বিভিন্ন কর্ম একই দেহে স্থান দেওয়া এবং বিভিন্ন দেহ একই কর্মের জন্য নির্মাণ করা – এই রহস্যময় জটিল অথচ সুন্দর এককর্ম-বহুমানব এবং বহুকর্ম-একমানব-যোগের ঐক্যবদ্ধ প্রবহমানতা নস্যাৎ করল অত্যাধুনিক মানুষ। দেখুন না, ওই চিঠিটা কি আমরা মেনেছি বিশেষ? একটি এককর্মের নির্দেশকে বহুমানব আমরা প্রবহমান করে তোলা থেকে বিরত থেকেছি।
তবে সিপিএম মেনেছে। রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট কাঠামো যখন নেই, পর্ষদের নির্দিষ্ট কাঠামো থাকতে পারে না। কাজেই এই চিঠিটা এসেছে ধারণা নিয়ে, শরীর নিয়ে নয়। কাজেই শিক্ষক পরীক্ষাকক্ষে থাকলেও সাধারণ মালিকানা ছড়িয়ে যাবে পরীক্ষাকক্ষে। নির্দেশ দেওয়া হবে, নির্দেশ লঙ্ঘন করার নির্দেশও দেওয়া হবে। এটাই সিপিএম-এর নীতি যা তারা অক্ষরে অক্ষরে মেনেছে।
আচ্ছা আমারই এত অস্বস্তি হচ্ছে কেন? জাতীয় সংগীতের সময় একাদশ-দ্বাদশের ছেলেগুলো যা খুশি করুক, আমার কী! আমি কেন সুবিধা নিতে পারছি না? আমি কি বোকা? সংকল্পের সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য ঘটাতে পারছি না বলে নিজেকে কি ভিতর-ভিতর অযোগ্য বলে ভাবছি? অন্যেরাও তো বাড়ি থেকেই আসে, পড়ায় আর কথা বলে, কথা বলে আর পড়ায়, বাড়িও যায়। সমস্যা কোথায়? নাকি সমস্যা তাদেরও হয়, তারা বুঝতে দেয় না। তেত্রিশ নম্বর ঘরে বসেছে বিড়ি সহযোগে তাসখেলার আসর। আমার এত উদ্বেগ কীসের? গোল্লায় যাক – আমি বলতে পারছি না কেন। ও স্যার, আপনাকে যদি বোকাচোদা বলি, আপনি কি সত্যিই আমার বিরুদ্ধে কোনো স্টেপ নিতে পারবেন? – এতে এত যন্ত্রণা পাওয়ার কী আছে। হতে পারে, শিক্ষকতা প্রবাহিত না করতে পারলেও, ছেলেটি যে কুরুচিপূর্ণ সংস্কৃতির প্রবাহ ঘটিয়েছে তার আঘাতে আমার রুচিপূর্ণ সংস্কৃতির নদীতে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ সৃষ্টি হয়েছে।
যন্ত্রণার সোপান বেয়ে উঠে এসে একটু খোঁজখবর নিয়ে বুঝলাম ছেলেটির বাচনভঙ্গির দশা এমন কেন। ছেলেটি আসলে আমাকে গালিগালাজ করেনি। ও আসলে গোটা শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকসমাজকে হেয় করে, পারলে থুথু ছিটিয়ে প্রতিবাদ করেছে। পঞ্চম শ্রেণি থেকে অকারণে মার খেতে খেতে বড়ো হয়েছে। ওর মায়ের প্রতি কোনো প্রাক্তন স্যারের অন্য নজর ছিল। বাবা নেই। আট বছর বয়স থেকে এই ষোলোর কোঠায় এসে সে সেই স্যারকে এক বিশেষ হাসি বিকিরণ করতে করতে ঘরে ঢুকতে দেখেছে বহু বার। ছেলেবেলা থেকে জীবনযন্ত্রণার শিকার হতে হতে বর্তমানের ঝাঁ-চকচকে শিক্ষায় শিক্ষিত হতে সে উৎসাহ বোধ করেনি। এদিকে পাশ করতে হবে। তাই সেদিন যখন পরীক্ষায় টুকতে দিইনি ওকে, ওর ক্রোধ তায় ওই সেকশনে ক্লাস না থাকার কারণে প্রকৃত স্নেহ-শাসন-বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ সেদিন আমার সামনে চলে এসেছিল। তার মায়ের সংসারে দারিদ্র্যের প্রবাহে ভাঙন ঘটিয়েছিলাম রুচিপূর্ণ সংস্কৃতিবান আমরাই। আমরা তার বিক্ষুব্ধ কলজেতে স্নেহ-মমতার এক মগ জলও ঢালতে পারিনি, অথচ শ্রদ্ধা তার কাছে আশা করেছি বালতি বালতি।
ষষ্ঠ শ্রেণির অপুষ্ট ছেলেটি, দু' বছর আগে ঝড়ে যাদের চাল উড়ে গেল, কত দিন স্কুলে আসেনি। একদিন আমাকে জানালো, ক্লাস এইটের পর সে ঠেলাগাড়ির বেগুনবিক্রেতা। "বাবার শরিল খারাব, বাবার পাশে দাঁড়াতে হবে।" একে কী শিক্ষা দেব আমি! পঞ্চম শ্রেণির ছোট্ট গোলগাল কঠোরতম মনিটর, যার দিকে কোনো সহপাঠি তাকালেই নাম লিখবে, তার বন্ধুর হার্টে ছিদ্র আছে বলে খেলতে পারে না, এই কথাটা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে ফেলল। তার বন্ধু হারিয়ে যাবে এই ভেবেই সে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে, অথচ আমরা বড়োরা, শিক্ষকরা ছাত্রদের হারিয়ে ফেলছি এর জন্য কী ফুলে উঠছে? দাদাগিরি-র প্রশ্ন হতে পারে। নবীনে-প্রবীণে কুৎসিত হাসি ছড়িয়ে উত্তর খুঁজতে পারে। সঠিক উত্তর – পার্স বা পকেটবুক। শিক্ষক-শিক্ষিকা-অভিভাবক-অভিভাবকের কৌশলজাত অহেতুক বিশৃঙ্খলা, লোকদেখানো ব্যস্ততা ও তার ছুটক্লান্তির ভিতর একমাত্র যাদের ভিতর অপূর্ব সময় কাটানো যায়, তাদের আমরা প্রতিনিয়ত ধ্বংস করে চলেছি সোল্লাসে। এই মুহূর্তেই যেমন একজনের কথা জোয়ারে ভেসে এল। সাত্যকি। মহাভারত-এ সে কৃষ্ণের সারথি হলেও তার সারথি এই যুগে হয়েছিল এক জটিল ব্যাধি। মাসকিউলার ডিসট্রফিতে আক্রান্ত হয়ে চলে গেল আমার পরম প্রিয় মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। প্রি-বোর্ড পরীক্ষা তার জীবনের অন্তিম পরীক্ষা ছিল। ভেবে দেখিনি আমরা একবারও, ওকে ওই গালিগালাজ দেওয়া ছেলেটি কী সাহায্যই না করত! পরিস্থিতির বলি হয়ে সেই চওড়া-কলজে ছেলেটি যদি হেঁটমুণ্ড না হতে শেখে, যদি সে জীবনভর কৃতবর্মা হয়ে অনুশোচনা করে কেন সাত্যকি এই যুগে তার কর্তব্য পালন করল না, উপরন্তু তাকে হত্যা না করে নীরবে নিজের প্রাণনাশ করল, তাহলে এই শিক্ষকের নিজেকে পরাজিত ভেবে আকণ্ঠ নীল অবসাদে ডুবিয়ে রাখার কোনো অর্থ আছে কী? ছাত্রদের প্রতি অনুরাগে দ্রবীভূত হতেই, চোখের কোণে তপস্যা-স্নিগ্ধ জল মহাপ্লাবনের অঙ্গীকার নিয়ে আসতেই মনে হল, আমি ততটুকু শিক্ষক, যতটুকু হেঁটমুণ্ড নই।
"রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছিল খুব ছেলেবেলায়। দেখতে দেখতে রাজনীতির অঙ্গনে কেটে গেল পঁচিশটা বছর। বিবেকের অমোঘ দংশন কখনও সঠিক স্বীকারোক্তির পথ প্রশস্ত করেছে; কখনও বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আত্মসমালোচনা – উন্মোচিত করেছে অন্তরের অন্তঃস্থলে জমে থাকা বাস্তব কিছু ঘটনা – যা একান্তভাবেই আমার নিজের উপলব্ধি।" (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কৈফিয়ত, উপলব্ধি)
বাস্তব একটি ঘটনা বিবৃত করা যাক। তখন খুব ছোটো, ভোটের সময় আঙুলে কালি লাগানোর জন্য বায়না করেছিলাম বাবার কাছে। ঘর্মাক্ত লাইনে শিশুমন যুদ্ধজয়ের বাসনায় তার পিতার সঙ্গে একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে। হঠাৎ একটি গুলির শব্দ ও হাজার কাকপক্ষীর ভয়ার্ত চিৎকার। শূন্যাকাশে ত্রাস ছড়িয়ে দিয়ে একটা শীতল কণ্ঠস্বর ছুটে এসেছিল, "সব ভোট যেন সিপিএম-এর দিকেই পড়ে।" যা হয় এরপর, শ্মশান-স্তব্ধতা এবং মানুষের লাইনের পিঁপড়ে-শান্ত অগ্রসর হওয়া। বিরাট অশ্বত্থগাছের পাতা ফুঁড়ে, বায়স-কুলের স্বচ্ছ চোখে চঞ্চলতা সৃষ্টি করে সেই ছোট্টো গোল গুলি কোন গন্তব্যে পাড়ি দিয়েছিল জানি না। তবে, পাড়ি দেওয়ার সময় ভীতি গতি ধারণ করে আমার বুক না ছুঁলেও প্রাণ ছুঁয়ে গেছিল। শৈশবের ভীতিই পরবর্তীকালে আমাকে শক্তি জুগিয়েছে। ভাঙনের নদী যে-প্রত্যয়ে নিজেকে গড়ে তোলে, সেই প্রত্যয়ে আমার শক্তি অর্জন সম্ভব হয়েছে। আর সেই অর্জিত শক্তিই কখন কানের কাছে শক্তিমুখ এনে বুঝিয়ে দিয়েছে, ঈশ্বর আসলে আমার নিহত সত্তার অন্তঃস্থলেই বর্তমান। গাছের গুঁড়ি, পায়রার ডিম, কাঠবিড়ালির বাদাম, ক্রিকেট বল হারিয়ে যাওয়া ইঁদুরের গর্ত – সমস্ত শক্তির কেন্দ্রস্থলে সমস্ত শক্তির আধার হয়ে ঈশ্বরের উপবেশন। সেদিনের সেই ছোট্টো গুলিটা ঈশ্বরকে বিদ্ধ করেছিল, আজ আমি নিশ্চিত, কিন্তু মারতে পারেনি। আমরা ধরাকে সরা জ্ঞান করে তুমুল চিৎকারে ঘোষণা করেছিলাম ঈশ্বরের অনস্তিত্ব।
তখন সিপিএম কংগ্রেস বুঝতাম না। আর তৃণমূল না-থাকার কারণে তার চিন্তাও আসত না। আমার খালি মাথায় আসত টারজান আর অরণ্যদেব। যে খবরের কাগজ বাবার পড়া হয়নি, সেখান থেকেই অরণ্যদেব-এর অংশ কেটে নিতাম। আঠা দিয়ে পুরোনো খাতায় সেঁটে সপ্তাহশেষে আবার পড়তাম। এবার টানা। এ এক বিরল অনুভূতি যেখানে রাজনৈতিক অপমিশ্রণের পোড়া-ছোঁয়া লাগেনি। নিজের সত্তার সঙ্গে খোলামেলা বৈঠক সারতাম দিন রাত। ঘুমের মধ্যেই অরণ্যদেব হয়ে উঠতাম, বনে-বাদাড়ে দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম বদমাইশ পেটানোর জন্য। তবে একলা নয়, সঙ্গে পেয়ে যেতাম হি-ম্যান এবং বাঁটুল দি গ্রেট।
আমারও... শীতল-শোণিত রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছিল খুব ছেলেবেলায়।... দেখতে দেখতে যে অঙ্গনে কেটে গেল তিরিশটা বছর তার নাম পশ্চিমবঙ্গ। বঙ্গের চেহারা বলতে কলকাতার চেহারা। অবক্ষয় আমার চেহারায় পড়লেও পশ্চিমবঙ্গের চেহারায় বড়ো বেশি যে। সেই কলকাতার বুকে বইয়ের স্তূপে ডুবে যেত কিশোর চোখ... এবিটিএ টেস্ট পেপার্স...
সেই এবিটিএ আমার মাধ্যমিক উত্তরণের সোপান ছিল। আশ্চর্য, বর্তমানে জীবিকাসূত্রে সেই এবিটিএ শব্দটি কানে এলেই গা গুলিয়ে ওঠে।... "বিবেকের অমোঘ দংশন," যদি জানতাম এই ভয়ংকর লোকগুলো ওই সংগঠনের সঙ্গে সজনে-গাছে-শুঁয়োপোকার মতো সংযুক্ত, পড়াশোনা চুলোয় যাক, টেস্ট পেপারস জীবনেও সলভ করতাম না। এখন... "উন্মোচিত করেছে অন্তরের অন্তঃস্থলে জমে থাকা বাস্তব কিছু ঘটনা" – আমার ভিতরের শিশুর বিস্ময়ে ত্রাসে রিভলবারের দিকে চেয়ে থাকা; সন্ত্রস্ত শিক্ষকের আড়াই বছরের সন্তান, স্ত্রী ও মা-কে বেঁচে থাকতে দেখেও নির্মূল না-হওয়া ভয় এবং একসঙ্গে বেঁচে থাকার ভয়-জারিত ক্রোধ। এইখানে কেউ হয়ত বলতে পারেন, এ-ব্যাটা তো ভাল মতো তৃণমূল ঘেঁষা, নেপথ্যে মমতার লেখা রেখে নিজের লেখাকে একটা কালজয়ী পথ্য রূপে সমাজ সংশোধনে মগ্ন হয়েছে।
আত্মসমালোচনার বিরাট মঞ্চ অক্ষ(র)যাত্রা-র পাতা, যেখানে আমি এখনও অব্দি কোনো রাখঢাক না রেখেই নিজেকে প্রবাহিত করেছি অক্ষরে। লেখা ও জীবনকে শব্দে বিঁধিয়ে এগিয়ে গেছি। এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হচ্ছে না। বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলতে দ্বিধা নেই, আমার ভিতরের কিশোরের সঙ্গে নন্দীগ্রামের কিশোরের একটা পার্থক্য বরাবর রয়েই গেছে। স্কুলের পড়াশোনায় ভাল ফলাফল করার নাকউঁচু ভাব আছে আমার। আমি ভাষার প্রতি যত্নবান, রুচি ও শুদ্ধতা নিয়ে আমি খুব পিটপিটে। ওই দিকে ওই কিশোরের স্কুলের প্রতি বিশেষ কোনো তৃষ্ণা নেই, বিতৃষ্ণাও নেই। সর্বশিক্ষা অভিযানে এই ছেলেটিকে আদৌ আওতাভুক্ত করা যায় কী না, বা সে স্কুলছুট কী না, সে নিয়ে কৃত্রিম টেবিলঝড় ওঠানো ছাড়া আমরা আর কী করতে পারি। যত বয়স বাড়ছে, আমার মধ্যে অভাবটা ক্রমশ গাঢ়তর হয়েছে; স্কুলের পড়াশোনা না করলে বরং প্রচুর বাজে সময় নষ্ট করার অনুভূতি থাকত না। আর একটু প্রকৃত কিছু, নিখাদ কিছু শিখতে পারতাম। আমার ভৌগোলিক পৃষ্ঠায় নদী ও গ্রাম কালো হরফ ছাড়া কিছুই নয়। সে কিন্তু কত কিছুই শিখেছে। সে এলিট নয় বলে তার কাছে ভাষা নয়, ছবিই প্রধান। নদীর প্রকৃত সংজ্ঞা তার অজানা নয়, গ্রামের ধারণাও তার নিখাদ। নিজের চোখের জলে সে ওই নদীটাকে ভাসিয়ে দিয়েছে; উপুড় হয়ে নিজের পাঁজর দিয়ে গ্রামকে ছুঁয়ে দেখেছে; ডিমের মতো একটা পাথরকে শুধু বিশ্বাস করেছে শিব রূপে, শিবলিঙ্গ রূপে নয়। ঈশ্বরের শক্তির আধার রূপে; উপেন, বিষ্ণু আর ঢ্যাবলাকে নিয়ে মাছ ধরেছে ঘন্টার পর ঘন্টা। চারের ওপর অগাধ আস্থা তার। আমি তো আস্থাহীন; তাই আমার কাছে চার থাকলেও আমি নাচার।
সিপিএম ভুলে গিয়েছিল, নিটোল বিশ্বাস যার আছে সে-ই পৃথিবীতে সবথেকে বলীয়ান সশস্ত্র সৈনিক। তাই গুলি চালিয়ে উপেন, বিষ্ণু আর ঢ্যাবলাকে মারলেও – মৃতদেহে ফ্ল্যাগ পুঁতলেও পুরো গ্রামটাকে নিস্তব্ধ নিস্তেল করে দিতে পারল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লিটল বয় যেমন হিরোশিমাকে ধ্বংস করলেও তার ঠিকানা বদল করতে পারেনি। বন্ধু বিয়োগে কিশোরটির যন্ত্রণা পরিমাপ করা আমার অসাধ্য। বুঝতে পারি সে ভয় পেয়েছিল এবং এটুকুই। সন্ত্রস্ত হয়ে গুদামে চালের বস্তার পিছনে লুকিয়ে ছিল সারারাত। আর ঠিক ওই বয়সে আমি... হোমওয়ার্ক শেষ করে ঘুমোনোর আগে রোমহর্ষক গল্প পড়ছি। অরণ্যদেবের খুলিগুহায় প্রবেশ করছি অ্যাডভেঞ্চারের অন্বেষণে।
হায় রে জীবন! আমি শুধু সাক্ষর হয়েই থাকলাম; ও কিন্তু ভয়াবহ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে চালের বস্তার পিছন থেকে বেরিয়ে এলো দিনের আলোয়। যেখানে দাঁড়ালো সেই ভূমিখণ্ডের নিচেই তার বন্ধুকে পুঁতে দেওয়া হয়েছে। ভাবলো সে, বন্ধুরা নিখোঁজ। গুলির শব্দ নেই। নিঝুম সকালবেলা। ততক্ষণে অনেকটাই শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু যেটুকু শেষ হয়নি, ওটুকুই ছিল শিখা। শিখা শাখা পেল, প্রশাখা পেল। লেলিহান হতে বিশেষ সময় নিল না; ছড়িয়ে পড়ল বহ্নিশিখা হয়ে।
ঘন্টার পর ঘন্টা মাছ ধরতে পারি না বলেই আমি সিপিএম-এর বিরুদ্ধে শক্তিহীন মূঢ়তা নিয়ে বাঁচি এবং বিপুল ঐশ্বর্যশালী বুদ্ধ চাই। আর সে পারে বলেই, সিপিএম ওর বিরুদ্ধে গিয়ে শক্তিহীন মূঢ়তা নিয়ে ভূলুণ্ঠিত হয় এবং সেই ভূমিতে দাঁড়িয়েই সে তাদের দিকে না তাকিয়ে সব হারানোর বেদনা নিয়ে চায় একটু মমতা। আমরা শিক্ষকরা কি তাহলে মমতা চাইনি? অনেকে চেয়েছেন। আমিও ব্যতিক্রম নই। কিন্তু অনেক আমি-ই পালাবদলের সুযোগে চেয়েছেন ষোল শতাংশ খাঁটি মমতা। অর্থাৎ, ১৬% ডিএ। অসুখ ট্যাবলেটে সারলেও লোভ তো ট্যাবলেটে সারে না। অনেকেরই এখনও আকাশ কেনা বাকি। তাই ষোলো শতাংশ মমতার কথা মাথায় আসতেই মনে হল যুগটা তো ট্যাবলেট-পি.সি.-র।
উপেন, বিষ্ণু আর ঢ্যাবলা গ্রামবাসী। মাছ ধরার কৌশল নিয়ে ওদের মধ্যে মতানৈক্য থাকলেও ওরা বিভেদহীন। ওরা প্রকৃত সারসের কাছে গেলেও সারস উড়ে যায় না। শহরের মানুষের কে বাঁচল, কে মরল তাতে কিছু আসে যায় না। এই শহর শুধু মানুষের অর্থ বোঝে। যেখানেই আর্থিক মধু সেখানেই হানাদারি মধুকরের ভিড়। অভিবাদন হ্যালোজেনের বিস্ফোরণে। হাটেবাজারে একসঙ্গে বাঁচার অনুভূতি এবং শপিং মল-এ একা বাঁচার অনুভূতি দৃশ্যত অনুভূত হয়। মলে যে-টাইলের ওপর হাঁটছি, তা আমার হাঁটাকে নিয়ন্ত্রিত করে। অনেক বেশি নিজের প্রতি আকর্ষিত হতে শেখায়। অন্যের দিকে চোখ পড়ে কম। আর বলবেন না দিদি, যা দাম – হাটেবাজারের এই অর্থহীন শব্দমণ্ডলী সেখানে অশ্রুত থেকে যায়, বা হয়ত সেখানে অশ্রাব্য। কিন্তু যাঁরা পুরাতন বৃক্ষশাখায় দোল খেতে পছন্দ করেন তাঁরা মলত্যাগেই বিশ্বাসী – এই অলাভযোগ্য কথা ট্রেডারদের কর্ণগোচর হতেই তারা তাঁদের মলমুখী করার অশ্রুস্নিগ্ধ আয়োজন করল। গ্রাম উঠিয়ে আনা হল শহুরে বিপণনকেন্দ্রে। মোক্ষম ইমোশনাল বিটিং! ফাইভ-পয়েন্ট-ওয়ান থেকে স্টিরিও সারাউন্ড ঢাকের বাদ্যি এবং হোম থিয়েটারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। কিন্তু আত্মীয়তা ঘনিষ্ঠতার তল ছুঁল না। বরং তাঁরা হাঁটতে শুরু করলেন ভয়ে ভয়ে, আশ্চর্যান্বিত পদক্ষেপে। নিজেকে সামলানোই দায় তো পাশে সন্তানের দিকে নজর দেবেন কী করে। সন্তান অবশ্য অনেকটাই এগিয়ে গেছে। এতটা এগিয়ে গেছে যে এখন সে কোথায়, কত দূরে, তাঁরা আর দেখতে পাচ্ছেন না। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ও ঢাকের শ্রুতিমধুর শব্দের ওড়না এসে পড়ছে চোখেমুখে। শান্তি তৃপ্তি আসছে, কিন্তু স্বাভাবিক ছন্দ কেটে যাওয়াতে পূর্বপুরুষ আর উত্তরপুরুষের নৈকট্য ও সান্নিধ্য ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে এই করিডরের মধ্যস্থতায়। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ থেকে রাতারাতি ডিজে-কে বরণ করে নেওয়া স্বাভাবিক ও সংগত কারণেই মুশকিল হল।
যেখানে এখনও গ্রাম আছে, সেখানে এখনও ভারতীয় প্রদীপের শিখা ওড়ে। গ্রামভিত্তিক সভ্যতার রস পান করেই যে ভারতের মাটির উর্বরতা বজায় থাকে তা নানা ছলেবলে শহর ভুলতে শিখেছে। ব্যবসার প্রয়োজনে শহর মানুষের নিবিড়তা লাভ করেছে। আর্থিক স্টেশন ছাড়া শহর নির্গুণ সত্তা। গ্রামবাসীদের একে একে শহরমুখী করার কারণে চামড়ায় বিচ্ছিন্নতার রং ধরেছে। আর বিচ্ছিন্নতা যেখানে, সেখানে আত্মিকতা-বিচ্ছিন্ন ভোগসুখবাদী বীজকে বপন করা যায় সহজে। সে বীজ কালক্ষেপণে চারা, চারা থেকে উদ্ভিদকুলের মধ্যে গরিমা-প্রদর্শনকারী মহীরুহে রূপান্তরিত হলে মানুষের মাথা থেকে চিরকালের মতো বেরিয়ে যাবে, প্রাচীন কালে মানুষ মানুষ হয়ে মানুষের পাশেই থাকত। একসঙ্গে বাঁচার অঙ্গীকার এবং পরস্পরকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস নষ্ট করে দেওয়া বর্তমান বাণিজ্যের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। নাহলে "এটা আমার কাঁচি, ওটা আমার পেস্ট, ওটা আমার ফোন," ইত্যাদি অপকথার জন্মই হত না, আর তা নাহলে পরিবারের সদস্যপিছু কাঁচি-পেস্ট-ফোন বিকোতো না। পশ্চিমবঙ্গের সর্ববৃহৎ ব্যবসায়িক প্রশাসন সিপিএম তার লক্ষ্যে পৌঁছেছিল পারিবারিক সদস্যদের মেরুকরণের মাধ্যমে। জন্মলগ্ন থেকে শিশুকে আমি কী শেখাবো তার ওপরই নির্ভর করে ভবিষ্যতে সে কী শিখবে, কীভাবে শিখবে এবং কীভাবে শেখাবে তার পরবর্তী প্রজন্মকে। ভোর ভোর টাটার টুথপেস্টে ছেলে রাহুলের মুখ ধুইয়ে, টাটার তেল মাখিয়ে স্নান করিয়ে, টাটা স্টিলের থালায় ভাত খাইয়ে, টাটার ব্যাগে বইপত্তর গুছিয়ে বাসে উঠিয়ে টা টা দিলে তবে না শিক্ষা। সন্ধেবেলা বাবা পড়া পেয়ে খুশি, নাও এবার টাটা স্কাই! রাতে দুষ্টুমি করে বাবার পাতে টাটা সল্ট ছিটিয়ে দেয়। রাহুল যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন এই পুরোনো বাড়ি আর ভাল লাগে না তার মায়ের। সোহাগ জড়ানো গলায় ঘড়ঘড়, "টাটা প্রজেক্টের ইডেন কোর্ট দ্যাখো না, জাস্ট সেভেনটি ফাইভ ল্যাক অনওয়ার্ডস।" মায়ের ভাল্লাগছে না তো বাবার কী করেই বা ভাল্লাগে! আর এই গোটা সাম্রাজ্যের মুক্তধারায় সিপিএম-এর চকচকে হাসি ঠিকরে বেরিয়ে আসে। ঠিক সেই মুহূর্তে আমি, দোর্দণ্ডপ্রতাপ শিক্ষক, প্রস্তুতি নিচ্ছি পরের দিন দশম শ্রেণির শুরুর ক্লাসেই পার্ল এস বাক-এর উদ্বাস্তু-গাথা "The Refugee" পড়ানোর লক্ষ্যে।
আমরা ভুলেই গেছি, গণমাধ্যমের দৌলতে, দেশে কত খবর রয়েছে কুৎসিত মর্মান্তিক রাজনীতি ব্যতীত। হিংসার ডালপালা বিস্তৃত হতে হতে এখন যে-স্তরে এসে পৌঁছেছে তা বড়ো ভয়ংকর। কতটা সুখকর একটি পত্রিকার প্রথম পাতার গুলিবিদ্ধ রক্তাপ্লুত লাশ, একটি শিশুর কাছে? যে এখনও বিছানা ভেজায়, ঠাকুমা-দিদিমা যার পশ্চাদ্দেশে আদরের বাড়ি মেরে ঘুম থেকে জাগান, মা যাকে পরম আদরে কাঁথা-কাপড় বদলে দেন, সেই শিশুটি তার বাবার কোলে বসে সংবাদপত্রের প্রথম পাতাটা প্রত্যক্ষ করে। ছোট্ট গোল মাথা। ছোট্ট ছোট্ট চোখ। ছোট্ট ছোট্ট হরেক চিৎকার। আমরা বলি সে কিছু বোঝে না, সে ছোটো। বিষয়টা গা ছাড়া দিয়ে ভাবার নয় মোটে। তার কথা ফোটেনি, তাই সে বলতে পারে না যে সে বোঝে সবই, প্রত্যেক দিন একটু একটু করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে সে বড়ো হচ্ছে। আমাদের দায়িত্ববোধও কম নয়। প্রত্যেক দিন আমরা তাকে বোঝাতে শুরু করি আমরা বড়োরা কতটা ধ্বংসপ্রবণ ও হত্যাপ্রিয়।... সে সেজে ওঠে পরম আদরে বিলাসে। নিত্য আমরা তাকে সাজিয়ে তুলি পাউডার, ক্রিম, রঙিন জামা আর... রক্তে।
ছোটোবেলায় কী শেখাচ্ছি? শিশু যখন খিলখিলিয়ে হাসে, বড়ো বন্ধুর পকেটে হাত চালান করে ক্যাডবেরির লোভে, তখন তাকে আমরা অতিমাত্রিক শুদ্ধতা ধারণ করে শেখাতে শুরু করব, গঙ্গা শুধু নদী নয় বাবা, গঙ্গা আমাদের মা। সেই শিশু বেশ খানিকটা বড়ো হওয়ার পর তাকে নিয়ে যাওয়া হল নদীমাতার সামনে। কত জল! অকুল পাথার! সে নির্নিমিখ চোখে দেখতে থাকল। আরও বড়ো হলে সপরিবার হরিদ্বার। কী অপূর্ব মহিমা! মা দুটো বোতলে প্রণাম করে গঙ্গাজল ভরে নিলেন। পুজোয় লাগে, সে দেখেছে। কিশোর থেকে অতি-কিশোরে রূপান্তরিত হওয়ার সময় একদিন তার চঞ্চল চোখে স্থির হয়ে গেল, "৩৬ বছরের স্বামী নিগমানন্দ কোম্পানি-সরকার যোগসাজশের বিরোধিতায় অনশনে বসেছিলেন হরিদ্বারের আশ্রম মাতৃসদনে।" আরে! এইখানে তো সে গিয়েছিল! অনশন শব্দের অর্থও তারা জানা। কতটা কষ্ট হতে পারে অনেক দিন না খেলে সে বোঝার চেষ্টা করে। হিমালয়ান স্টোন ক্রাশার কোম্পানি গঙ্গাবক্ষ জুড়ে বসিয়েছে স্টোন ক্রাশার ইউনিট। স্টোন ক্রাশার শব্দের অর্থ সে পাশের ঘরে অফিসগামী বাবার কাছে জেনে আসে। এই বার সে ভাবে, গঙ্গা তো আমাদের মা, তার বুকে স্টোন ক্রাশার! পাথর ভেঙে তার থেকে স্টোন চিপস তৈরি করছে কিছু বদমাইশ। তাহলে ওদের কাছে কি গঙ্গা মা নয়? মা তো কত আদরে বুকে জড়িয়ে ধরেন সন্তানদের। সেই বুকেই চলছে যন্ত্রাংশের অত্যাচার! পরিবেশের ক্ষতি! পবিত্রতার ক্ষতি! "উত্তরাখণ্ড সরকার ও প্রশাসনের পূর্ণ মদতেই পাথর খাদান ব্যবসার রমরমা বাজার।" সন্ধেবেলা। বাড়ি ফিরলেন বাবা। ছেলে সংবাদপত্রে যা পড়েছে, স্কুলের অংক-ইংরাজি-পড়া মুখস্থ করার পর, তা সবিস্তারে বলল। এবার তার প্রশ্ন, "আচ্ছা, এই নিগমানন্দ কাকুর কী হল?" বাবা-মা একটু হাসলেন নিগমানন্দ-এর পর কাকুর প্রয়োগে। তারপর অফিসফেরত জুতোর গিঁটজব্দ লেস খুলে বললেন, "কে জানে! মারা-টারা যাওয়ারই কথা। আটষট্টি দিন অনশন-ফনশন কেউ করতে পারে নাকি? কী পড়ছিস ছাইপাশ রাহুল! এখন থেকেই রাইস-এর অ্যাডের দিকে চোখটোখ রাখ!" বকুনি খেয়ে সে চোখ রাখতে চায় রাইস-এর অ্যাডে, কিন্তু সংবাদপত্রটা বড়ো পিছল, তাই চোখ পিছলে যায় সংবাদের বাকি অংশের দিকে... "আটষট্টি দিনের লাগাতার অনশনের পর মৃত্যু হল..."
মা রাইস-নিষিক্ত অ্যাডে পুরোপুরি সহমত পোষণ করলেন। "ওসব গঙ্গা-টঙ্গা রাখ, বাবা যা বলছে শোন্! পরে ইডেন কোর্ট-এ জায়গা পেতে হবে তো নাকি! গা রি রি করে এখানে থাকতে!" ছেলের কাছে গঙ্গা সচকিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। সে ভাবতে লাগল, তার মা-ও কি গঙ্গাজল এনেছিলেন শুধু ব্যবহার করার জন্য? সেই প্রণামের মধ্যে প্রণম্য অহংকারবোধ ছিল, কিন্তু তার পুজোর জন্য হরিদ্বার থেকে আনা বোতলভর্তি গঙ্গাজলে প্রকৃত অর্থেই ছিল "আমার প্রয়োজনে ওকে ব্যবহার" – এই রকমের একটি মানসিকতা।
এক গভীর যন্ত্রণা কিশোর মনে দানা বাঁধতেই সে বুঝে গেল, আমাদের দেশের সম্পদে শুধু অধিকার আমাদের। দেশের প্রধান সম্পদ মানুষ। কাজেই মানুষের ওপর অধিকার বসানোও আমাদের অধিকার। এই অধিকারের শিকড় বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবার পর তার রূপ হয়ে ওঠে অন্যরকম। আমাদের কারোর ওপর সর্বাধিকার আমাদেরই কারোর। যেমন জঙ্গলমহল-এর মানুষের ওপর যৌথবাহিনীর অধিকার। যৌথবাহিনীকে যারা চালায়, অর্থাৎ কেন্দ্র সরকার-এর অধিকার আবার যৌথবাহিনীর ওপর। তাহলে কেন্দ্র সরকার জঙ্গলমহল-এর মানুষের ওপর সর্বাধিকারের অধিকার কায়েম করতে পারে। ছেলেটি কলেজে পড়ে। সার্ফিং চলে ইন্টারনেটে। আর জালে মাছ পড়ার মতো তার চোখে এসে পড়ে তিউনিশিয়ার গণ অভ্যুত্থান ও স্বৈরাচারী প্রশাসক যাইনুল আবেদিন বিন আলি-র সরকারের পতন, মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক-এর তিরিশ বছর ধরে ক্ষমতার বুলডোজার চালানো এবং তার পুত্র গামাল-এর অর্থ গায়েব করার ইতিহাস। পশ্চিমবঙ্গে গণতান্ত্রিক কঙ্কালে স্বৈরাচারের মাংস-পেশি-স্নায়ুর অবস্থান তার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। সে বোঝে, কুঠার মুষ্ঠিবদ্ধ, যেমন খুশি তেমন কাটো। জঙ্গলমহলবাসী বলে, কাট বাঁশ; যৌথবাহিনী শোনে, কার্ট ব্লাঁচ!
আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় স্বেচ্ছাচারিতার ওপর গণতান্ত্রিক পালিশটা খুব ঝকঝকে। তিনি তো রাজ্ঞী নন, গণতান্ত্রিক ভারতের সোনিয়া গান্ধি এক অতিসাধারণ মানুষ। নিউ ইয়র্ক-এর মেমরিয়াল স্লোন-কেটারিং ক্যানসার সেন্টার-এ ভর্তি ছিলেন। সাধারণ মানুষ তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছিলেন। একজন দুবেলা ভালো খাবার খাওয়া মানুষও সেখানকার খরচপাতির হিসাব শুনলে আঁতকে উঠবে। যাই হোক, তিনি আরোগ্য লাভ করলেন কী না জনগণের প্রশ্নোত্তর পর্বের ঘূর্ণন সেখানেই। আমাদের কি ওঁকে বিদ্যাসাগরের মা প্রভাবতী দেবীর সঙ্গে তুলনা করা উচিত? প্রভাবতী দেবী ছেলের দেওয়া নতুন উলের শাল পরেননি, কনকনে শীত মোকাবিলা করার গরম জামাকাপড় গ্রামবাসীদের ছিল না বলে। সোনিয়া গান্ধি যদি গ্লোবাল ভিলেজের একখণ্ড ভারতের অধিবাসীদের সন্তানের চোখে দেখতেন, তাহলে পুত্র তথা ন্যাসরক্ষক রাহুলকে বলতেন, "সুইস ব্যাংক থেকে টাকাগুলো এনে দরিদ্র সাধারণদের রোগব্যাধি দূর করার জন্য ওষুধ কিনে দে।"
কলেজ পড়ুয়া ভাবে, সে যদি ভাল ভাবে পাশ করে চাকরি পেয়ে এলআইসি-র তাৎপর্য বুঝতে পারে, অ্যাকসিডেন্ট বেনিফিট পাওয়ার জন্য যদি বাবাকে অ্যাকসিডেন্টের আওতাভুক্ত করতে পারে, ঘরবাড়ি জায়গা-জমি সবই তার সর্বাধিকারে চলে আসবে। মাকে রেখে আসবে বৃদ্ধাশ্রমে। মাকে দ্বিধাবিভক্ত করে দিতে মা তো নিজেই শিখিয়েছেন। আর সে-ছেলেটিও সেই ধারাকে অক্ষুণ্ণ রেখে স্বপ্ন দেখছে সেভেনটি ফাইভ ল্যাক অনওয়ার্ডস...
যখন ক্লাসে যাই, আমার মূল লক্ষ্য থাকে আমরা এক সঙ্গে কিছু কাজ করতে চলেছি, তাই পারস্পরিক সহায়তা আবশ্যক। যেমন, বেঁচে থাকার ঐতিহ্য পারস্পরিক সহায়তা ব্যতিরেকে অসম্পূর্ণ। বাবা-মার অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত দায়িত্ব গ্রহণ করা, তাদের দ্বিতীয় শৈশবে যথাসম্ভব তাদের পাশে থাকা। টেক্সটবুকের পাতায় তাকে আশ্রয় করেই কিশোর মনে চিরপুরাতন উদ্দীপনার আঁচ জ্বেলে দিতে পারি কী না চেষ্টা করি। কিন্তু এখন বেঁচে থাকার সংজ্ঞা পাল্টেছে। মেয়েটিকে তৈরি করা হচ্ছে একা বাঁচতে পুংলিঙ্গের সাথে। ছেলেটি তৈরি হচ্ছে একা বাঁচতে স্ত্রীলিঙ্গের সাথে। উভয় বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। অর্থের নিজস্বতায় কর্তব্য-বিযুক্ত হয়ে স্বেচ্ছাচারী থাকার, সতত সুখে থাকার সংকল্প এদের মজ্জায় প্রবিষ্ট হবে, যা বাবা-মা শুরুতে শিখিয়েছিলেন। "তোরা তোদের মতো সুখে থাক, এইটুকু চাই। যা আছে, তোদের দিয়ে-থুয়েও আমাদের দিব্যি কেটে যাবে।" আর্থিক অহংকার প্রদর্শনের এর থেকে বড়ো নমুনা আর কী-ই বা হতে পারে। পাড়ার পুজো ছাড়া কোথাও কোনো অর্থদণ্ড না দিয়ে অর্থের যে সান্দাকফু গড়ে উঠেছে তার উচ্চতা এবং উচ্চতার অহমিকা মিলে আমাদের বেঁচে থাকার যুগপৎ ঔদ্ধত্য আকাশ ছাড়িয়েছে। ভোগ সম্ভোগে পর্যবসিত হলে যা হয়। জীবন অর্থোপার্জনের উত্তেজনায় কেটে যায়। বেঁচে থাকার সংজ্ঞা বহুপর্যায়ে শল্কপত্র মোচনের পর এখন শুধু এলআইসি বা মণিপুরম গোল্ডেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন ডাউন পেমেন্ট ক্যাশে। সঞ্চয় নামমাত্র করে কাঁচা পয়সায় নিজের জীবন উপভোগের মজা বেশি। আর দুজনের জীবন নির্বাহ করা তো আরও সহজ। কার্যত, বাবা-মায়ের শ্রাদ্ধতে তাক লাগিয়ে অন্যান্যদের সাধ্যাতীত ব্যয় করা যায়। সমাজ আশুতুষ্ট হবে। মৎসমুখী স্তুতি দেবে, "এইব্বড়ো মাছের পিস, খুব ভাল রান্না হয়েছে বাবা, খালি শেষে একটা গাদা চাইলাম, দিলই না! তোমার কোনো দোষ নেই, ক্যাটেরারগুলো যা!" অর্থাৎ, আনন্দম অর্থম। আন্না হাজারের পুঁজিশক্তি-সাহায্যপ্রাপ্ত বারো দিনের অনশনে ঢেকে যায় নিগমানন্দের আটষট্টি দিনের অনশন এবং আফস্পা৩(AFSPA)-নীতির বিলোপ চেয়ে মণিপুরের লৌহমানবী ইরম ছানু শর্মিলা-র প্রায় এগারো বছরের "অর্থ"হীন অনশন। কিন্তু সত্যিই কি ঢেকে গেল? মনোরমা হত্যাকাণ্ডের কথা মনে আছে? গা রি রি করা হত্যা? সিঙ্গুর নন্দীগ্রামেও কিন্তু এই ঘটনার পুনরাবর্তন হয়েছে। জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে আমার স্কুল পর্যন্ত এরকমই দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসন চলছে। স্থান মোতাবেক তার রূপের রূপান্তর ঘটেছে। সামরিক বাহিনীকে যা খুশি করার নির্দেশ যে-আইনে লিখিত, সেখানে বিচারে-ধর্ষণ নির্বিচারে-নিহিংসন ছাড়া সুশাসন আশা করা অসম্ভব। স্কুলে ডোনেশন নেওয়া হচ্ছে কার কাছ থেকে, যার দাদা চায়ের দোকানে কাজ করে, যে-রাহুলের মা সকালে বাসন মাজতে বেরিয়ে যান। সেই ছেলেটির জ্যামিতি বক্স নেই। সেই ছেলেটি যে-ঘরে বসে, সে-ঘরে ফ্যান ঘোরে না ঠিকমতো, অথচ প্রধান শিক্ষক-এর ঘর সহ অফিস ঘরে বসেছে ফ্লোর টাইলস। দিনে দিনে স্টাফ রুম স্বাচ্ছন্দ্যের বার্তা বহন করবে আশা করি। আমরা নাকি ছাত্রদরদি; ছাত্রদের কাছে শ্রদ্ধা আশা করি। হত্যার এও এক নিপুণ ছক। এই ছকে আমি কিন্তু আর্য-অনার্য সবাইকে মিশে যেতে দেখি। অন্যকে হত্যা করে আমার বেঁচে থাকা। যার দোকানে চা পান করি, তার ছেলেকে হত্যা করেই আমার দৈনন্দিন বেঁচে থাকার উৎকর্ষ কতটা বাড়লো বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করি। নোংরা বোতামহীন জামা পরে আসার কারণে সর্বশিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষক স্বাধীনতা দিবসের দিন তাকে সারির শেষে পাঠিয়ে দেন। সেই অপুষ্ট দুর্বল ছেলে মাটিতে মিশে যায়, যখন বোঝে সে মিশে যাচ্ছে, মাটির ভিতর ঢুকে যাচ্ছে তার হাত পা মন মানসিকতা, তার মনে পড়ে তার মাকে, রোজগেরে দাদাকে। স্বাধীনতা এই সার্ফ-সোডা-বর্জিত প্রোলেতারিয়ান বালকটির কাছে তখন বোঝাস্বরূপ। সেও হয়ত বুঝবে, এইট বা তার আগেই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে দিয়ে, জঙ্গলমহল জনমানবহীন না করতে পারলে জঙ্গলে মহল বানানো যায় না।
আমরা যে-শিক্ষা দান করি, সিপিএম-প্রশিক্ষিত বাকপটুতার গুণে, তার সঙ্গে আমাদের জীবনের কোনো যোগ নেই। ছেলেবিলে বোঝে, রবীন্দ্রনাথ এদের মুখোশ, মুখোশ তুলে ফেললে ডিজে গেয়ে চলেছে – রবীন্দ্রনাথের রিমিক্স – থোড়ি সি তো লিফট করা দে।
ফেসবুক-এ পরিচয় হওয়া আমার এক অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু নিছক মজা করেই বলেছিলেন, "চাইলে মাসে প্রচুর টাকা আপনি আয় করতে পারেন।" আমি তাঁকে আমার সীমিত আয়ের প্রতি দুর্বলতা এবং আস্থাশীলতার কথা জানিয়েছিলাম। এই কথার পিছনে যথেষ্ট ভাবনা ছিল। আমি যা কাজ করি, শিক্ষক হিসেবে, ধ্বংসের যে-পরম্পরায় আমার অঙ্গীভবন, তাতে আমার মনে হয়, আমার মাসমাইনে অনেক কম পাওয়া উচিত, তৎসহ ডিএ, ইনক্রিমেন্টেও ইতি টানা উচিত সরকারের। শিক্ষকের কর্মসূচক অনুযায়ী আমার বাড়তি প্রাপ্তিযোগ ঘটছে ফিমাসে। দেশ ও রাজ্যে গণতান্ত্রিক কাঠামোয় ছোটো ছোটো অসংখ্য স্বৈরতন্ত্র রয়েছে, পরিবার থেকে শুরু করে উচ্চতম প্রশাসনিক কাঠামোয় অস্থিমজ্জার মতো যা গ্রথিত; মূল লক্ষ্য অন্যকে ধ্বংস করে এবং অন্যের অন্নকে কেড়ে নিয়ে হত্যাকারী শাসক বা একাপ্রভু রূপে বেঁচে থাকা। সৌরজগতে সূর্য-তারকা-গ্রহ-উপগ্রহগুলোর ব্যবধানেও কোথাও এই বিধ্বংসী মনোভাব গোচরে আসে না। কান পাতলে সূর্যকেও বলতে শোনা যায় – "ওরে বৃহস্পতি, কক্ষ-চ্যুত হ'সনে বাপ, আমি ভারসাম্য হারাবো।"
আমি ভার, তোদের ওপর চেপে বসব। তোরা সেই ভার গ্রহণ করে আমায় সাম্য প্রদান করবি। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম এই কাজটি করে গিয়েছে নিপুণভাবে। পোপ ষোড়শ বেনেডিক্টের কথা মনে পড়ছে। দুহাজার সাতে রোমে ফিরে আসার আগের এক রবিবার – "মার্ক্সিস্ট সিস্টেম, যেখানেই সরকারে প্রবেশ করেছে, শুধু আর্থিক এবং পরিবেশের ঐতিহ্যের ক্ষতিসাধনই করেনি, মানুষের চেতনাশক্তির বেদনাদায়ক ধ্বংসসাধন করেছে।" একের থেকে অন্য এক-কে আলাদা করতে শিখিয়েছে এবং প্রত্যেককেই শিখিয়েছে, "তুমি প্রভু হয়ে ওঠো।" অন্যকে ডলে পিষে প্রভু হয়ে ওঠার ইচ্ছা প্রত্যেকের মধ্যে জাগানো মাত্রই প্রভুর স্থান দখলের জন্য খেয়োখেয়ি বেশ ভালই চলতে শুরু করল এবং পরিশেষে মার্ক্স-এর তত্ত্বের ওপর যুযুধান দুই শ্রেণি সংগ্রাম করতে করতে মারা গেল। মার্ক্স দাসত্বকে ঘৃণা করতেন বলে তাঁর উত্তরসূরী সিপিএম অন্যকে ক্রীতদাস রূপে চালাতেই পছন্দ করে। তাদের চোখে শ্রেণিশত্রু বলে কিছু নেই; গোটা শ্রেণিটাই শত্রু। একের পর এক ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে একচ্ছত্র ক্ষমতা নিয়ে বেঁচে থাকে সিপিএম এবং তাদের ন্যাওটারা। এটাই সিপিএম-এর গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র। যক্ষপুরীতে ক্ষমতার শীর্ষাসন দখল করা। যারা সমাজের প্রায় সমস্ত শ্রম নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন, সেই শ্রমজীবী মাথাগুলো থেঁতলে ব্যালান্স করে দাঁড়িয়ে থাকা। প্রকারান্তরে, গোটা সমাজকে ভারসাম্যহীন করে দেওয়া।
অবসাদের ভিতর চিন্তাস্তিত্বে ভেসে থাকতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, দুধমধুর বিলাসে বেড়ে ওঠা রাহুল, রাইসখেকো পিতামাতার নীলমণি রাহুল, এবং ক্লাস ফাইভের নোংরা রাহুল সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারত-এর সর্বসূক্ষ্ম স্বৈরতন্ত্রের শিকার হয়ে রাজা-অমাত্য-ভৃত্য হয়েই রয়ে গেছে।
আমার বেঁচে থাকার, আমার শিক্ষক হয়ে ওঠার অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন এই শেষোক্ত ছেলেটির ভিতর দিয়ে উপলব্ধি করতে চাইছি। ওকে জড়িয়ে ধরেই আমার একপ্রজন্ম বেঁচে থাকার এবং আরেক প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রাখার দুর্ভেদ্য অঙ্গীকার। ওকে জড়িয়ে ধরলেই আমার ভিতরের আলো আরও ভিতরে অন্তর্মুখী মুক্তির খোঁজে ছড়িয়ে যায়। কিন্তু যখন অবসাদ, তখন এই অঙ্গীকার অঙ্গীভূত হয় নিশ্চল মনোবেদনায়। স্তব্ধতা দণ্ডি কেটে এগিয়ে আসে। আমি পিছিয়ে যাই।
বাইরে আমি নানা বেশে, নানা ছলে ঘুরে বেড়াই। অথচ অন্তরে সেই আমিই এক ভিন্নমাত্রার স্তব্ধতায় বসে থাকি এখন। সেই স্তব্ধতাই আমার অনন্ত আকাশ। সেখানেই আমার বন্দিমুক্তির সাধনা। পিছিয়ে যাওয়ার তীব্র পরাজয় ও আত্মগ্লানির ছাপ চোখেমুখে। কে পরাজিত করল আমায়? কেনই বা পরাজয় স্বীকার করলাম? কেনই বা পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হলাম? যার কাছে পরাজয়, সে কি ব্যক্তিসত্তা না বস্তুসত্তা, নাকি অকিঞ্চিতকর হলেও আমার দুঃসহনীয় চিন্তার পিউপা থেকে সে তার প্রকাণ্ড শরীরটা ধারণ করেছে? যার কাছে আমি পরাজিত, সে কি আমার পরাজয়ের সময় নিজেকে জয়ী হিসেবে ভাবতে পেরেছে?
কদিন আগে কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার পড়ার চেষ্টা করছিলাম। এ-রাজ্যে যারা জয়ী, তাদের বোঝার চেষ্টা করছিলাম। অত্যাচারীর ছায়ামূর্তি চিনতে না পারলে সিপিএম-কে চেনা কঠিন, এমন একটি ভাবনা আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু আমি তো সিপিএম হতে চাই না, বা তেমন কোনো কিছু হয়ে ওঠার বিশেষ কোনো সম্ভাবনাও নেই। কিন্তু পড়তে হবে; অত্যাচারীর ছায়ামূর্তির স্বরূপ উদঘাটন হওয়া প্রয়োজন বইকী। ইন্টারনেটে marxists.org থেকে তণ্ডুলমাত্র পড়ার চেষ্টা করলাম। মার্ক্স, লেনিন পার হয়ে ট্রটস্কির একটি বইয়ে হাত দিলাম, "ফ্যাসিবাদ কি ও কিভাবে প্রতিরোধ করিতে হইবে"৪। সেই চৌত্রিশ পাতার পিডিএফ-এর "বাংলা সংস্করণের মুখবন্ধ"-তে কটি অংশ আমার কাছে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হল। তুলে ধরছি বাঁকা অক্ষরে, চেষ্টা করছি বিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ের বাইরের সমাজের সঙ্গে আমার ফ্যাসিস্ট জয়যাত্রা ও আত্মার পরাজয়কে মিশিয়ে দেওয়ার...
এই পুস্তিকাটি ট্রটস্কির ফ্যাসিবাদের উপর লেখাগুলি থেকে গৃহীত সংকলন। ট্রটস্কি লেনিনের পাশাপাশি রুশবিপ্লবের অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন। পরবর্তীকালে তৃতীয় আন্তর্জাতিক যখন ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের কৌশল হিসাবে পপুলার ফ্রন্টের লাইনকে সামনে তুলে ধরল, তিনি তার বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। ভারতবর্ষে পপুলার ফ্রন্টের ক্ষতিকর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছিল – যখন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি (সি.পি.আই) আগস্ট-৪২ এর আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল। পরবর্তীকালে বাস্তব অবস্থার চাপে তারা তাদের ভুল সংশোধন করলেও পপুলার ফ্রন্টের ধ্যানধারণা আজও ভারতবর্ষের বামপন্থীদের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে পপুলার ফ্রন্টের ধ্যানধারণাকে প্রথম থেকে বিরোধিতা করেছিল বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল (আর.এস.পি)।
আর.এস.পি ট্রটস্কির অনেক মূল্যায়ণকে সঠিক বলে না মনে করলেও তারা জন্মলগ্ন থেকে “পপুলার ফ্রন্ট” অর্থাৎ বুর্জোয়াদের এক অংশের সঙ্গে সহাবস্থানের নীতিকে বিরোধিতা করে লড়াই গড়ে তুলেছিল।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরবর্তীকালে আর.এস.পি নেতৃত্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করে “বুর্জোয়াদের সঙ্গে সহাবস্থানের” নীতিকে গ্রহণ করেছে। আজ তারা সি.পি.আই, সি.পি.আই.এম এর হাত ধরে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের চৌহদ্দির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর বিপরীতে রয়েছে সি.পি.আই.এম.এল. লিবারেশন এর মতো বামপন্থী দলগুলি যারা বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অধিকতর বিপ্লবী অবস্থান গ্রহণ করেছে। তবে ঐতিহাসিকভাবে “পপুলার ফ্রন্ট” এর রাজনৈতিক লাইনের সমর্থক হবার দরুন তারা অতীতে বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের সাথে জোট গঠন করেছিল। ভবিষ্যতে এই ধরনের ঝোঁককে প্রতিহত করার জন্য মতাদর্শ বিতর্কগুলি চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। ........
কী হবে বিতর্কগুলি চালিয়ে? বিতর্কে কি তেজদৃপ্ত পাথরকে মৃদু ঘাসে পরিণত করা যাবে? নাকি বজ্রপাতকে আকাশ করে দেওয়া সম্ভব? বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল সিপিএম-এর সঙ্গে এঁটুলির মতো এঁটে আছে, কেন? অভিলাষ, ওই গগনচুম্বী ক্ষমতার ভাগীদার হওয়া। প্রত্যেকের মূল লক্ষ্য মানিব্যাগে বিস্ফোরণ! এখন ফ্রন্ট, পপুলার ফ্রন্ট, বামপন্থা, বুর্জোয়া – এসব রাসভারী তত্ত্ব তথ্য রূপে বইয়ের পৃষ্ঠায় মুদ্রিত করা বাঞ্ছনীয়। পড়ুয়া গবেষকের জন্য আদর্শ বই – কে, কবে, কেন, কোথায়, কীভাবে-তে ঠাসা। ওসব মুদ্রণ দলীয় রাজনীতির চোখে মুদ্রণ প্রমাদ। নাহলে দলের শরীর টিকবে না, দুর্বল হয়ে যাবে। বর্তমানে, রাজা-অমাত্য-ভৃত্যের জগতে যেকোনো নীতির সর্বশেষ দুর্দান্ত রূপটি হল ফ্যাসিবাদ। সেখানে নমনীয়তার কোনো স্থান নেই। উরু কাঁপানো ত্রাস ছড়িয়ে উগ্রতা উগরে দেওয়া, ব্যাসার্ধ থেকে ব্যাসে পরিণত করা ক্ষমতাকে। যে-ছেলেকে ঘিরে আমার ঘর নির্মাণ করব, ঘর নির্মিত হলে সকলের গোচরেই তাকে আমি উঠোনে গেড়ে দেব। যদি গোচরেই হয়, তখন কেন কেউ প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠবে না? কারণ তখন প্রত্যেকেই অন্যকে ঝাঁট দিয়ে মটরদানার মতো পথ থেকে সরিয়ে একাপ্রভু হয়ে ওঠার নেশায় আরন্ধ্র মাতাল। গোটা পৃথিবীর ওপর কর্তৃত্ব স্থাপনের রীরংসা জেগে ওঠে তখন। পুঁজির পাঁজি খুলে বসে প্রত্যেকে।
মুসোলিনি বলেছিলেন – "ফ্যাসিবাদ, যা নিজেকে নির্ভীকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল বলে ঘোষণা করে, নিজেকে সমস্ত রকমের উদারনীতির বিরোধী বলে ব্যক্ত করতেও দ্বিধাবোধ করে না।" জীবনে এটা মেনে এসেছি বন্ধুত্বের একটা অদ্ভুত গুণ বর্তমান। বন্ধুত্ব আনন্দকে দ্বিগুণ করে, দুঃখকে অর্ধেক। আমার প্রিয় শ্রদ্ধেয় সেই শিক্ষক-বন্ধুর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে গাঢ়তর। তার সঙ্গে এই যোগ, চায়ের দোকানে আড্ডা, উদারমনে পারস্পরিক মত বিনিময় হচ্ছে জানতে পারলেই ফ্যাসিস্ট সিপিএম-এর গাত্রোদাহ হত। আস্থা যেখানে সম্ভ্রম, ঐক্য যেখানে অপরাজেয় শক্তি, সেখানেই তারা বিপদের গন্ধ পায়।
নরমপন্থী বুর্জোয়া এবং তাদের সাথে আপোস করা বামপন্থীদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। যেহেতু তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পুঁজিবাদের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ খুব সঙ্গত কারণেই বুর্জোয়া গণতন্ত্রের চৌহদ্দির মধ্যেই ঘুরপাক খায়। পুঁজিবাদের সংকট জনগণের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করে আর বিপ্লবী পরিস্থিতির অনুপস্থিতিতে এবং প্রতিষ্ঠিত বাম দলগুলির বেইমানি ফ্যাসিস্ট আন্দোলন এবং ফ্যাসিবাদের গণভিত্তি অর্জনে সাহায্য করে।
কোনো প্রশাসনই এখন মৌলিক চাহিদাগুলি মেটানোর দিকে নজর দেয় না। কারণ সেগুলো চোখে পড়ার মতো না। যেমন ধরুন স্কুলের কোনো ছাত্রের ঘরের চাল ছাওয়ার জন্য কোনো শিক্ষক সামান্য আর্থিক সাহায্য করলে সেটা ব্যক্তিগত স্নেহ-শ্রদ্ধার ঝাঁপি ভরিয়ে তোলে হয়ত, কিন্তু রাজনীতির সমীকরণে তার কোনো মূল্য নেই। বস্তিবাসীর জন্য গৃহনির্মাণ করে প্রশাসন আশীর্বাদ পেতে পারে, কিন্তু ঝলমলে আলোর শহরে মারাদোনা বা মেসি-কে এনে কোটি কোটি টাকার শ্রাদ্ধ করা টিআরপি-র বিচারে অনেক এগিয়ে। কলকাতার এমন এলাকাও আছে যেখানে আলো যায় না। শিল্পপতিদের খাসতালুক। সেখানে আরও আলো দিতে পারলে সরকারি প্রশাসনের ভোটের বিপুল কালো খরচ যথাসময়ে উঠে আসে। এই এত আলো, তাই এত আঁধার। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্রেই তো বিস্তীর্ণ এলাকা নিষ্প্রদীপ ছিল। হুকিং করার তারটি পর্যন্ত ছিল না। তদানীন্তন প্রশাসন এদের কক্ষণও মারেনি। কিন্তু হতাশাজনিত প্রকোপের বশে শিল্পপতির গাড়ির কাচ ভাঙলে দাগি চিহ্নিত করেছে। যখন অপরাধের প্রয়োজন, অপরাধ ঘটানো হয় এদের দিয়ে। যখন অপরাধীর প্রয়োজন, তখন "শ্রেণি-বিচ্যুত" এদেরই সংগ্রহ করতে বেরিয়ে পড়ে শৃঙ্খলারক্ষক সরকার। অর্থ যার নেই তাকে বিদ্যুতের অধিকার দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, বরং তার ভাবা উচিত, সরকারি ভ্যানে তাকে তুলে নিয়ে যেতে সরকারের অনেকটাই তেল পোড়ে এবং সেই অর্থ মেটানোর জন্য পুঁজিপতির অনেকটাই অর্থদণ্ড যায়। এভাবেই আরও বড়ো অঙ্ক কষে রাজনীতির বিচারে ফর্মুলা ওয়ান বা ক্যালকাটা আই-এর চাহিদা তুঙ্গে ওঠে।
পৃথিবীতে যে-ব্যাটা আয়না তৈরি করেছিল, তার প্রতি ক্লাস ফাইভের নোংরা রাহুল ক্ষোভে ফেটে পড়ে। এত গুলিয়ে দেয় না সবকিছু, কী আর বলব! ছোটো তো, গুলিয়ে যাওয়ারই কথা। বেচারার ডান হাত, স্বেচ্ছাচারী আয়নাচিত্র অনুযায়ী, বাম হাত হয়ে ওঠে, আর ভুল উত্তরের জন্য মাথা নিচু করে থাকে। সে কি কোনো কিছুরই যোগ্য নয়? পরের বছর শিক্ষক দিবসে হয়ত সে আর স্কুলে আসবে না। সকলের আগে এসে সকলের পিছনে নোংরা জামা পরে দাঁড়াতে হবে ভেবে তার গলার ভিতরে পাথর নামতে থাকে। নিষ্পলক চেয়ে থাকে সবার জামার দিকে আর সার্ফ-এক্সেল-এর রোদ-ঝলকানো ফেনায় রাধাকৃষ্ণণের ছবিটা সে দেখতেই পায় না।
দশ নম্বর পৃষ্ঠায় ট্রটস্কি-তে চোখ আটকে গেল। কিভাবে মুসোলিনী বিজয় লাভ করল? এরপর কি? জার্মান প্রলেতারিয়েতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ১৯৩২ থেকে উদ্ধৃত:
যে মুহূর্তে বুর্জোয়া একনায়কতন্ত্র তার সংসদীয় কাঠামো ও "স্বাভাবিক" পুলিশ ও মিলিটারি পরিকাঠামোর মাধ্যমে সমাজের ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, ফ্যাসিবাদের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
আমি টিভি ও খবরের কাগজ থেকে বহু দিন বহু দূরে। যদিও বামফ্রন্ট সরকারের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের দিনগুলোয় সময় পেলেই টিভি দেখতাম। সিঙ্গুরে হত্যালীলা সংঘটিত হবার সময় স্টার আনন্দ-তে দেখেছিলাম একজন গ্রামবাসী ঘর থেকে বেরিয়ে আসামাত্রই একটি গুলি তার মাথার পূর্ব-পশ্চিম এক করে দিয়ে বেরিয়ে গেল। ছোটোবেলায় যে-গুলি আমার অনাবৃত চোখের সামনে ঈশ্বরকে বিদ্ধ করেছিল, আজ সেই গুলিরই উত্তরাধিকার আর একজন মানুষের মধ্য দিয়ে পুরুষানুক্রমে অর্জন করা হত্যার প্রতিশ্রুতি রাখল। স্বাভাবিক পুলিশ এবং পুলিশের স্বাভাবিকতা দুই-ই ধন্দে ফেলে দেয় মানুষকে। আইন এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যারা নিযুক্ত, তাদের নির্দেশ দেওয়া হল বিকট গণহত্যার নিদর্শন রাখতে। একনায়কতন্ত্রের হুংকার রাষ্ট্রযন্ত্রের আইন তোয়াক্কা করে না। আফস্পা এখানে থাকুক বা না-থাকুক চিরকালই মানসিকতায় রয়েছে। স্বাভাবিকতায় রয়েছে। গণহত্যার তালিকায় অসংখ্য নাম নথিভুক্ত করতে হবে এমন অর্ডার মেনে নেওয়া স্বাভাবিক পুলিশের কাজ নয় ঠিকই, কিন্তু একনায়কের রোষের মুখে পড়ে অর্ডার মেনে নেওয়ার পর যে হত্যালীলা সংঘটিত হয়, তা, সেই পুলিশের স্বাভাবিকতাই হয়ে ওঠে। ভারসাম্য আনার তাগিদে নিধনযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। তারই রক্তাপ্লুত ছবি খবরের কাগজের বুকে শীর্ষস্থান দখল করে। ঘুম থেকে উঠে, বাবার রবিবাসরীয় কোলে ছোট্ট গোল মাথা নিয়ে বসে, শিশুটির শৈশব এই রোষের শিকার হয়।
সিপিএম-এর অত্যাচার যৌনপীড়নের সমান। যৌন জীবনে অসুখী বলে এরা কর্মক্ষেত্রে বিরোধীর ওপর অত্যাচারের পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। স্বাভাবিক যৌনতা না মেটার জন্য ধর্ষণোন্মুখ হয়ে ওঠে। ভারতীয় ইতিহাসে যৌনজীবনের এক সুমহান ঐতিহ্য আছে, যা শিল্প মাড়াতে আর ব্যক্তিগত অর্থোপার্জন করতে গিয়ে বিনষ্ট হয়ে গেছে। বাৎসায়নের চৌষট্টি কলা নয়, দেহের ওপর দেহের আধিপত্য বিস্তার করাই মূল লক্ষ্য। ক্ষমতা এবং অর্থের লোভ মানুষকে ধর্ষক ও শোষক করে তোলে। আমার মনে হয়, এরা যৌনজীবনে বড়োই অসুখী বা শৈশব থেকে নিপীড়নের শিকার এবং সে-কারণেই সরকারি অফিসের ছাদ ফাটিয়ে দেয় শব্দবাজিতে। অবদমিত যৌনতার কুৎসিত বহিঃপ্রকাশ ঘটে বিরোধীদের সঙ্গে বিরোধে। সরকারি শিক্ষক হিসেবে বলতে পারি, কাজ বিশেষ নেই বলে, প্রশাসকের সুশাসন ধর্ম নয় বলে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার এত সময় পাওয়া যায়। বেতালা বিক্রমে যখন স্কুলবাড়ি কাঁপে, ফাইভ-সিক্সের রাহুলরা ভয় পায়, সেভেন-এইটের রাহুলরা পায় মজা আর নাইন-টেনে ভয়-মজার মিশেল ঘটিয়ে একাদশ-দ্বাদশে গালিগালাজ করতে করতে শ্রেণিকক্ষ ত্যাগ করে।
ধুর ধুর, এসব কেন বলছি! শীলার জওয়ানি আমাদের স্ত্রীর প্রতি অবিশ্বস্ততা জাগিয়ে তোলে। একথা মানতেই হয়, বিগত বহু বছর, আমরা ইংরাজি দৈনিকের কিছু পাতা সন্তানদের অলক্ষ্যে তারিয়ে তারিয়ে গিলেছি এবং মাস্টারবেট করেছি। ঘরের নারীকে নিপীড়ন করে এসেছি। পড়াশোনার ছায়াও না পাড়িয়ে ক্লাসে গিয়ে রবীন্দ্রচর্চার নামে বুজরুকি করেছি। যত খারাপ, যত নৃশংস, যত ভুল – সবকিছুই আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোয় স্বচ্ছতা এবং লেকচারের লালিমায় গুরুত্ব পেয়েছে। আমাদের স্ত্রীর শীলা না হয়ে উঠতে পারার যন্ত্রণা আছে। ততটা মাইনে বাড়েনি যাতে শীলাকে কাছে পাওয়া যায় অর্থের বিনিময়ে, সেই যন্ত্রণাও আছে। অসুস্থ অস্বাভাবিক ফ্যাসিস্ট একনায়ক বিদ্যালয় কাঠামোয় সামাজিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলেন যৌনপীড়নমূলক বেত ও বাতেলায়। নাঃ, এখন মনে হচ্ছে লেখা চলাকালীন সিপিএম-এর প্রতি ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে গেছি। কান গরম হয়ে গেছে। ক্ষেপে যাওয়ায় লেখা ভুল রাস্তা ধরেছে।... ধরুক! ধরুক ভুল রাস্তা! যেদিকে যায় যাক। পরাজিত মানুষের জন্য সমস্ত পথ খোলা। ঠিক মনে পড়ছে না, আমি বোধ হয় মুসোলিনির সঙ্গে আগ্রাসনের হাই রোড-এর পাশের ধাবায় বসে মদ গিলছিলাম। বিলিতি মদে দিশি করে তুলছিলাম আমার যাবতীয় দুঃখ।
ফ্যাসিবাদী সংস্থার মাধ্যমে পুঁজিবাদ উন্মত্ত পেটি বুর্জোয়া জনতা, শ্রেণি বিচ্যুত এবং আত্মবিশ্বাসহীন লুম্পেন প্রলেতারিয়ত – এককথায় ফিনান্স পুঁজির দ্বারা শোষিত বেপরোয়া ও উন্মত্ত জনগণকে জড়ো করে।
আমাদের স্কুলে যখন ভোট হয়, তখন জড়ো করা হয় কিছু ছেলেকে, যাদের পঞ্চম শ্রেণি থেকেই প্রস্তুত করা হয়েছে আত্মবিশ্বাসহীন লুম্পেন প্রলেতারিয়েত রূপে। সিপিএম-এর ফিনান্স পুঁজির দ্বারা শোষিত বেপরোয়া ও উন্মত্ত জনগণ-এর উত্তরাধিকার বর্তায় এদের ওপর। জনগণের এই রূপান্তরিত বিভাগকে বলা হয় ক্যাডার। আমাদের ওই পরিচিত সহকর্মী বন্ধুর বাড়িতে এরকম ক্যাডার লেলানো হয়েছিল। ত্রাস ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁর মা ও স্ত্রীর ভিতর। আড়াই বছরের সন্তানকে করা হয়েছিল কোনো ছোট্ট পিসমেকার-এর টার্গেট। কারণ, সিপিএম অঙ্ক কষে দেখেছিল, তিনি সিপিএম-এর শিক্ষক সংগঠন এবিটিএ-কে ভোট না দিয়ে বিপরীত দিকে ভোট দেবেন। নিয়মানুযায়ী, সংগঠন-বিরোধী শ্রমিককে শায়েস্তা করা বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়ে। সিপিএম-এর কাছে দলই শেষ কথা। বাবা-মা সহ পৃথিবীর যাবতীয় সম্পর্ককে নিমেষের মধ্যে আবর্জনাস্তূপে নিক্ষেপ করে এই দল। দল নির্দেশ দিলে বাবাকে দলে পরিণত করতে হয়, অথবা, বাবাকে অস্বীকার করতে হয়।
ফ্যাসিবাদের থেকে পুঁজিপতিরা দাবি করে এক ধারাবাহিক কার্যক্রম – বস্তুত, তাদের তৈরি গৃহযুদ্ধ শেষ হবার পর তারা জোর দেয় আগামী বছরগুলিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য। ফ্যাসিবাদী সংস্থা পেটি বুর্জোয়া জনতাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে তার পথের সমস্ত বাধাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে কার্যসাধন করে। ফ্যাসিবাদ বিজয় লাভ করার পর তার হাতে ইস্পাতের আধারের মতো সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানগুলি, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক এবং শিক্ষাগত ক্ষমতা, সৈন্য বাহিনী, পুরসভা, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, প্রেস, ট্রেড ইউনিয়ন, কোঅপারেটিভ সহ সমগ্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষমতা করায়ত্ত করে।
নির্বাচনে জেতার পর শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য উঠেপড়ে লাগে স্কুল কর্তৃপক্ষ। সিপিএম রাজশক্তির রূপ চেনা বড়ো দুষ্কর। ছিল বন্দুক, হয়ে গেল বন্ধু। পালন করল রাজার আচরণীয় ষড়গুণের প্রথম গুণ অর্থাৎ সন্ধি স্থাপন। "কী খবর! কেমন আছেন!" – ইত্যাদি নানান অসভ্য ব্যঙ্গোক্তিতে ঘিনঘিনিয়ে দিল স্টাফ রুম। এটা চেনা ছক। এখানেই ওদের গিরগিটির ন্যায় বর্ণ-পরিবর্তনশীল স্বাতন্ত্র্য। কারণটা সুস্পষ্ট, এখনও কটা রয়েছে, যাদের বাগে আনা যায়নি। মসৃণ পথে তাদের আনতে হবে। তাদের পরিণত করতে হবে সংগঠনে। আর একান্তই বশীভূত করা না গেলে বর্ণের অবর্ণনীয় রূপ অর্থাৎ দমনমূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে। নতুন গৃহযুদ্ধের থিম – অশালীনতা ও হিংস্রতার প্রকাশ, নতুন গৃহযুদ্ধের রক্তিম মহড়া। ধারাবাহিক কার্যক্রমের নবীকরণ। আমরাও কেমন ভোঁতা হয়ে গেছি। দেখলাম, সিপিএম ঘরে আগুন লাগালো, তারপরও তাদেরই দ্বারস্থ হলাম এই উদ্দেশে যাতে তারা অগ্নি নির্বাপক আধিকারিককে মিস্ট কল্ দেয়। ছারখার হয়ে গেল ঘর। অর্থ ও আশ্রয় দুইই চাই। তখন তারা ছুট্টে আসে, বেপরোয়া গতিতে। "সব আছে – অফুরান টাকা, ছোট্টো ফ্ল্যাট। কিন্তু টাকা দলের, ফ্ল্যাটটাও। ইশ্! তোমার এই দুর্দিন আমি মেনে নিতে পারছি না কিছুতেই! চলো তো, দেখি কী ব্যবস্থা করা যায়!" আমি চললাম, কুত্তার মতো, চলতেই থাকলাম এবং কখন যেন সিপিএম-এর ছুড়ে দেওয়া হাড়ের টুকরো মুখে তুলে নিলাম।
আমার চিন্তায় সিপিএম কতটা দানা বেঁধে আছে ভাবুন এক বার যে যাদের ঘৃণা করি তাদের বিগ্রহই পাতার পর পাতা জুড়ে স্থাপন করে চলেছি। অর্থাৎ মনেপ্রাণে সিপিএম-এর বিগ্রহ শিরোধার্য করে আল-বাল-ছাল বলে বেড়াচ্ছি। বহুমূল্য বিগ্রহ মাথায়; হৃদয় তাই মূল্যহীন।
বরাবরই চণ্ডাশোক সিপিএম মসৃণ সাফল্য পেয়েছে, কিন্তু ধর্মাশোক সে হতে চায়নি। কারণ মানবপ্রেমের বীজ, যা আমাদের কাজ শিশুমনের শস্যক্ষেতে বপন করা, সেই কৃষিকাজে সিপিএম পদ্ধতিগত ত্রুটি খুঁজে পেল। সেই শক্তি জানিয়ে দিল, শিশুরা পাখির মতো সুন্দর, ক্লাসে গিয়ে তাই পাখিপড়াও। এমনভাবে পড়াও যাতে "তুমি আমারই" একথা ছবির মতো ফুটে ওঠে। "তুমি আমার চোখ, আমার কান, আমার স্বর।" অর্থাৎ, আমি যা দেখব, তুমি তাই দেখবে। আমি যা শুনব, তুমি তাই শুনবে। আমি যা বলব, তোমার মুখগহ্বরে তা প্রতিধ্বনিত হবে।" এতে নেচে ওঠে কিছু ঘড়ামার্কা শিক্ষক, যাদের আত্মশক্তি নেই, লড়াই করার বিচি নেই, অথচ অ্যাবডোমেন গার্ডখানা আছে। নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করল এই ভেবে যে তারা বাড়তি কিছু সুযোগ-সুবিধা পাবে। সুবিধার বৃহদাংশ প্রদান করে বামপন্থী শিক্ষক সংগঠন এবিটিএ শ্রমিক শিক্ষকদের প্রতিরোধশক্তি শুষে নিল। মোটা মাইনে নিয়ে আরামপ্রিয় শিক্ষক ভুলেই গেল তার করণীয় কাজ। কর্তব্যের বিস্মরণকে অকাতরে সাধুবাদ জানাতে লাগল এই সংগঠন। সমস্ত জায়গা করায়ত্ত করল এবং স্বতন্ত্র গণসংগঠনগুলিকে বিলুপ্ত করে দিল। পূর্বে বলেছি, মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হওয়ার সোপান ছিল এবিটিএ টেস্ট পেপার্স। এখন মনে পড়ছে, তখন কিন্তু ডব্ল্যুবিটিএ টেস্ট পেপার্স বা শুধু টেস্ট পেপার্স-ও চোখে পড়েনি। এবিটিএ কোম্পানি তখন ময়ালাকার সিপিএম-এর কণ্ঠহার হয়ে গেছে। যেমন হিন্দু শাস্ত্রে৫ বলা আছে, "যদি কোনো ব্যক্তি শূদ্রবংশ সম্ভূত হইয়াও ব্রাহ্মণের লক্ষণ সমস্ত প্রাপ্ত হন তাহা হইলে তাঁহাকে ব্রাহ্মণ বলিয়া নির্দ্দেশ করা যাইতে পারে।" অর্থাৎ যা-কিছু সাত্ত্বিক, তা-ই ব্রাহ্মণ। আমি এই কথার সূত্রে আসলে বোঝাতে চাইছি, যদি সিপিএম কেউ নাও হয়, ধ্বংসের জ্ঞান উত্তমরূপে লাভের পর তাকে অবশ্যই সিপিএম বলা যায়। কিন্তু আমার কথা হল কেউ যদি ব্রাহ্মণের লক্ষণ সমস্ত প্রাপ্ত হন, তিনি ব্রাহ্মণে উন্নীত হলেন বটে, কিন্তু তাঁর এই উন্নয়নে তিনি শূদ্রত্বকে অবহেলা করলেন! আর অবহেলা যদি নাও করে থাকেন, তাকে ব্রাহ্মণের তকমা দিয়ে কারা যেন শূদ্রত্বকে অবহেলা করলেন এবং জানালেন, ব্রাহ্মণত্ব সকল শক্তির উৎস এবং শোষক। অর্থাৎ শক্তির প্রবাহপথে মোহনা বলে কিছু থাকবে না। যা থাকবে তা সিপিএম নামক বিনাশীশক্তির অবিনাশী হয়ে ওঠার প্রবাহ। যেমন আমি, পূর্বেই কদর্য শরীরী ভাষায় জানিয়েছি, "ভাষা-শিক্ষক হলেও ভাষা-বিনাশের এক অবিনাশী শক্তি হয়ে উঠেছি ক্রমশ।"
তৃণমূলের আন্দোলন দুহাজার এগারোর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক-মুহূর্তে ফ্যাসিবাদী সিপিএম-কে প্রতিহত করতে সমর্থ হয়। এবার সেই সরকার প্রতিষ্ঠিত। তার ভিতরেও উকুনের মতো লুকিয়ে অজস্র সিপিএম। অকাতরে প্রজন্ম প্রসব করছে সেখানে। দলটাকে ময়ালাকার দিতে হবে তো। একজন মহিলা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি এই দলের চোখ, তিনি অনেকেরই চক্ষুশূল হবেন, কারণ শক্তির প্রবাহপথে তিনি এখনও অব্দি মোহনা সৃষ্টিতে বিশ্বাসী। যারা চোরাস্রোতের মতো ঢুকছে, ষড়রিপু-দংষ্ট্র শিশ্নোদরপরায়ণ, তারা একাপ্রভু রূপে অন্যকে চেটেপুটে খাওয়ার আনন্দ উপভোগ করতে এসেছে কী না তা তিনি ঝালিয়ে নেন বলেই জানি। তবে যে বর্তমান মমতাকে দেখছি তার সাথে ভবিষ্যৎ মমতার কতটা পার্থক্য হবে তা ভবিষ্যতই বলবে। আবার তিনি যাদের ওপর ভরসা করে আছেন, তারা ভবিষ্যতে তাঁকে মানবে কী না, সেখানেও প্রশ্নচিহ্ন রয়েছে। যদি তারা সেই একই কাজ করে, এবং করবে বলেই আমার ধারণা, তাহলে বলতেই হবে, ধ্বংসের যে প্রবাহ সিপিএম নির্মাণ করেছিল তাতে সিপিএম একশো ভাগ সার্থক হয়েছে। কিছু দিন আগের এক মনোরম সকালে একটা এসএমএস ইনবক্সে হুমড়াল – 2 to bhalo khabar ache. 1) 7% D.A. ghosona hoyeche (central govt.) 2) amader Mukkhyamantri Mahakarone Saratchandra-er golai mala porachche! দেড়মাস হল শিক্ষক হয়ে এসেছেন এসএমএস-দাতা। তিনি ভাবলেন বিস্তর মজা পেয়েছেন দিবাকরদা। যার যেমন পাগলু ভাবনা। তিনি যে-মহিলাকে ভালবাসেন, তাঁকে তিনি বিবেকানন্দের বাণী শোনান, যাতে তাঁকে ইমপ্রেস্ করা যায়। যদি সেই শিক্ষিকা শরৎচন্দ্র ভালবাসেন, তাহলে তাঁর বাণীও বইপত্তর ঘেঁটেঘুটে পাঠাবেন। অর্থাৎ, সমস্ত জায়গায় তিনি চাইছেন কতটা ইমপ্রেস করা যায়। আমি তৎক্ষণাৎ তাঁকে ফিরতি এসএমএস-এ জানতে চাইলাম, ETar mane ki? বেশ খানিকক্ষণ পরে তিনি উত্তর দিলেন। সময়টুকু নিলেন হয়ত এইটুকু ভাবতে, "দিবাকরদা কি তাহলে চটে গেল? ঠিক তো, তার সঙ্গে পূর্বে কথা হয়েছে, আমার বোঝা উচিত ছিল।" তারপর জানালেন, এক কো-প্যাসেঞ্জার তাঁকে এই এসএমএস-টি ফরোয়ার্ড করেছেন, তিনি আমাকে। উত্তর দিলেও উতরে গেলেন না। দিবাকরদা তাঁকে প্রচুর ঝাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। ঝাড়লাম। এসএমএস-এর ১ ও ২-এর ভিতর সম্পর্ক বুঝতে চাইলাম। কিন্তু ফোনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত পারলাম না। আর এই মাথামোটাকে তিনি বোঝাতেও পারলেন না। স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাঁর মাইনে থেকে টাকা কেটে নিয়েছেন নিজের রাজনৈতিক ফান্ডের জন্য; বাকি পাঁচজনের মতো তাঁর মাইনেমুখী মেনিমুখো জীবন, অতএব এ বিষয়ে তিনি প্রতিবাদমুখর হতে চান না। ওই সুযোগে কিছু সুযোগ আদায়ের ধান্দায় রয়েছেন। ওখানেও তাঁর পদলেহন করার মনোভাব বা ইমপ্রেস করার বাসনা জেগে উঠছে। খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ, মার্কসের জন্য তিনি বেশি পড়াশোনা করেছেন, পেয়েছেন আরও বেশি, অতএব শিক্ষক হয়ে মার্ক্স-কেই তিনি গুরুত্ব দেবেন। নিজস্ব সচেতনতাকে আকর্ষ ধরে কজনই বা আর লেখাপড়া করে। শুধু লাভ আর লাভ। তাঁরও ইচ্ছে ধীরে ধীরে পুঁজিবাদের পুজো করে পুঁজিবাদের প্রতিনিধি হয়ে ওঠা। ক্ষতি যে করে খাতির সে-ই পায়। তাঁকে যিনি ক্ষতি করলেন, জ্ঞাতসারে, সরকারি বেতনের ওপর থাবা বসালেন, তিনি তাঁর কাছ থেকেই দিব্যি খাতির পেয়ে যাচ্ছেন। অধিকাংশ শিক্ষক এরকমই বিক্রি হয়ে যাওয়া বেতনভোগী নীতিবাগিশ, অধার্মিক। সিপিএম-এর স্নেহভাজন, আস্থাভাজন শিক্ষকমণ্ডলী আসলে সবকিছু "থোড়া সা" করেই খুশি হয়। কিন্তু সব কিছুই থোড়া সা করে থোড়া-কে গোটা থোড়ের মতো যে-পূর্ণতা তাঁরা প্রদান করছেন, তাতে ডিএ-র প্রতি লালা পড়াই স্বাভাবিক। তাঁর প্রধান শিক্ষক আসলে তাঁর অজ্ঞানতার কাছে একটি প্রকাণ্ড শক্তি। শক্তির কাছে মাথা যে নোয়াবে সে পক্ষান্তরে সিপিএম-এরই শক্তি হয়ে উঠবে।
ইস্তাহার বা লেনিন বা ট্রটস্কি পড়তে গিয়ে বিপ্লব ও বিপ্লবের যে-ধারা দেখি, তাতে আমার ভিতরে ভয়ের সঞ্চার হয়। যে-স্ট্র্যাটেজি একটা গোটা সমাজকে সংগঠনে পরিণত করতে পারে এবং সেই সাংগঠনিক দৃষ্টিতে সমাজের অন্যান্য সাংগঠনিক মতামতকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে চরম ঔদ্ধত্যে উড়িয়ে দেয়, সমস্ত কিছুতে যে-স্ট্র্যাটেজি আসলে পুঁজিকেই আশ্রয় করে থাবা বসায়, তার বিক্রম-নির্ঘোষ শোনা যায় না, তার ক্ষমতার উৎস অর্থাৎ বন্দুকের নল রাতের অন্ধকারে এসে আমার হৃদ্যন্ত্রকে নিঃশব্দে নিঃস্পন্দ করে যায়। যে হত্যা করে গেল, সে কি বেতনভোগী প্রলেতারিয়েত? গুণ্ডা? লুম্পেন? শ্রেণি বিচ্যুত? কেন তাহলে আমার দুঃস্বপ্নের দিন ও রাতগুলোয় সিপিএম বলল, কোনো লুম্পেন প্রলেতারিয়েতই আমাকে হত্যা করেছে? কেন বলল, হত্যার ছক কষেছে যে, সে আসলে একনায়ক প্রোলেতারিয়েত? দলীয় রাজনীতি ভাল মুখোশ পরে তখন। অর্থাৎ, সব খারাপ কাজে আশকারা দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে নেওয়ার পর হত্যাকারীকে সে আর দলের সহচর হিসেবে দেখতে চায় না। সুশান্ত ঘোষ নির্বিচারে নরদেহ মাটিতে পোঁতাকালীন বিমান বসু কত বার চেষ্টা করেছেন কিন্তু তাঁকে ফোনে ধরতে পারেননি। কী করতেন ধরতে পেলে? বারণ করতেন, পুঁতো না? হয়ত না, বরং শুনিয়ে দিতেন রাজ্য রাজনীতির সেই অমোঘ সিপিএম-নিদান, তোমাকে জড়িয়ে ফেলেছি, তুমি আর বেরোতে পারবে না। প্রত্যেক স্তরে প্রত্যেককে দিয়ে খারাপ কাজ করিয়ে নেওয়ার ফলে দলের মধ্যে এত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করেও দল ছেড়ে তারা বেরোতে পারে না। কারণ দলে থাকলে অন্যকে মেরে চেটেপুটে খাওয়ার সুযোগ এবং শয়তানের সিকিউরিটি, দল থেকে বেরোলেই দাগি অপরাধী।
আমাদের কমিউনিস্ট প্রধান শিক্ষক মহাশয় স্কুলে আগের মিটিংগুলোতে যা ম্যানিফেস্ট করে এসেছেন তা হল আদ্যন্ত এইরকম – "সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে, আপনাদের যদি এই বিষয়ে কিছু বলার থাকে বলুন।" অর্থাৎ যা তাদের পার্টি কালচার এবং উদ্দেশ্য যেন-তেন-প্রকারেণ তা সাধন করাই তাদের পার্টি কালচার এবং অঙ্গীকার। মনে পড়ছে হুগলির জনসভায় অসতর্ক অনিল বসুর দোষ ঢেকে ফেলার সতর্ক বিবৃতি – "আমাদের পার্টির নীতি ও সংস্কৃতির পরিপন্থী।" দেখুন, দলে পরিণত হওয়া মানুষের কণ্ঠস্বরের স্বতঃস্ফূর্তি! একেবারেই অনুশোচনা নেই! তিনি বলতে পারলেন না, যা বলেছি তা আমাদের অর্থাৎ ছায়াসুনিবিড় বাংলা তথা ভারতের নীতি ও সংস্কৃতির পরিপন্থী। পার্টি কী বোঝালো? দোষ করেছ, দোষ তোমার, স্বীকার করো এবং ভাষার এলিট বয়নশিল্পে পার্টিকে নিষ্কলুষ প্রমাণ করো, পার্টি তোমাকে শুদ্ধিকরণের সংরক্ষক মাখিয়ে রাজকীয় মর্যাদায় আবারও গিলে নেবে। আমাদের জানা উচিত, দুর্গাপুজোয় ঢাকবাদকের স্থান প্যান্ডেলেই। সুশান্ত, অনিল বা প্রধান শিক্ষক পার্টির ভাড়া করা ঢাকবাদক। পার্টি প্যান্ডেলেই তাদের রুটিরুজি ও আশ্রয়। যখনই পার্টি ডাকে, তখনই তাদের ছুটতে হয়, স্টেশনে বা বাঁশ-মারা পোডিয়াম-এ শোনা যায় এদের ঢক্কানিনাদ। এরা বুঝে গেছে – এরা পরাজিত এবং দলীয় আগ্রাসনের শিকার। তাই আমার মতোই "প্রাত্যহিক পরাজয়ের কথা কাউকে বলতে" পারে না বলে "অন্যকে পরাজিত করার উত্তেজনায়" আমার মতোই "ছটফট" করে। মানবতন্ত্রহীন স্কুলশিক্ষা, স্কুলশিক্ষক, অন্তর্বিগ্রহ সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক দল এবং দলীয় রাজনীতির অশালীন দেহভঙ্গিমার অদৃশ্য মুগুরে উরু ভেঙে যেতেই মনে পড়ল – রাজকীয় সিপিএম কিন্তু ভোলেনি, রাজার আচরণীয় ষড়গুণের শেষ গুণ, আশ্রয় – আশ্রয় অর্থাৎ রাজনৈতিক সহাবস্থানের নীতি এবং পদলেহন।
স্কুলে রাজনৈতিক ময়ালের আশ্রয়ে আমিও যেন আশ্রিত। সিপিএম এবং সিপিএম-এর বুকে নোঙর বাঁধা কংগ্রেস-এর বিষক্রিয়ায় তুঁতেনীল হয়ে গেছে সবকিছু। আগে নাকি বিদ্যালয়ে পরিকাঠামোর বড়ো অভাব ছিল। বাঁশ, টালি এবং দেদার শূন্যতা। ঘর ছিল না। ঘর হয়েছে। ইটের পরে ইট সাজিয়ে খেয়ালমতো দেয়াল তোলা হয়েছে। আর এখন সেখানে তো প্রাসাদোপম ব্যাপারস্যাপার। সিমেন্টে সিমেন্টে জব্দ হয়েছে শিক্ষা। অট্টালিকা প্রায়শই কেঁপে উঠছে শৃঙ্খলার ডমরুবাদনে। যদিও আমি কেবল শৃঙ্খলের ধাতব ঝন্ঝন শুনি, শৃঙ্খলার ঘুঙুর-টুঙুর কানে আসে না। শুনতে পাব, অনেকেই বলেছেন, তবে তার জন্য আমাকে অভিভাবক সভায় কান পাততে হবে। তো, যে-কটি অভিভাবক সভা হয়েছে, সেখানে নিজেকে বেঞ্চপদ্মে উপবিষ্ট রেখেছিলাম। দুঃখিত, শ্রবণেন্দ্রিয়ের সমস্যাজনিত কারণে অথবা দাঁত ওঠার আগে থেকেই আমি সিপিএম নই বলে কোনো ঘুঙুর শুনে উঠতে পারিনি। অবশ্য আমি আর কদিনই বা এই স্কুলে। পূর্বের পরিবেশ থেকে নিশ্চয়ই উন্নততর হয়েছে বর্তমান। আমার জানা নেই। আমি তো বরাবরই সেটুকু লিখে চলেছি যেটুকু জেনেছি, দেখেছি। যেটুকু ভয় পেয়েছি, যেটুকু কেঁপেছি।
জেনেছি... এক: শৃঙ্খলা আমাদের মধ্যে এতটাই প্রবল যে স্কুল নির্বাচনে এবিটিএ-র ভোট ব্যাংকে টান পড়াতে শিক্ষকের বাড়িতে গুণ্ডা লেলিয়ে তাঁর মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে বসে থাকে সিপিএম-এর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর। দুই: পোস্টাল ব্যালট প্রধান শিক্ষককে দিয়ে আইডেনটিফাই করার অব্যবহিত পরের দিন আমার বাড়িতে লোক চলে আসে ব্যালট উদ্ধারের জন্য। তিন: কোনো ছাত্র শিক্ষকের মাথা ফাটালে বা ক্লাসে ঢুকে দিদিমণিকে কুৎসিত ইঙ্গিত বা গালিগালাজ করলে অথবা বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেও নিদ্রা যান স্কুল কর্তৃপক্ষ। চার: একজন কর্তব্যবিমুখ শিক্ষক = একটা সিপিএম-এর ভোট। পাঁচ: ভোটের পর এই কর্তৃপক্ষের পুনর্বহাল। ছয়: নতুন এসেছেন যিনি তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে সচেতন মানুষগুলি থেকে দূরে রাখা।
দেখেছি... নিচের কুপনটি। পাঁচ টাকা মুক্তহস্তে দান করার মিনতি-কুপন। কেন্দ্র সরকারের সুগঠিত প্রচেষ্টা, দুঃস্থ শিক্ষকদের দিকে আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। বিষয়টি গোলমেলে ঠেকায় আমি যত জন শিক্ষক-বন্ধুকে ফোন করেছি, তাদের বেশির ভাগ শুরু করেছে এই বলে, আজকাল আর কোন্ শিক্ষকই বা দুঃস্থ রে! আমাদের ভাবনাগুলোয় মরচে ধরে গেছে এমন যে আমি দুঃস্থ নই, আমার পয়সা-পোয়াতি রূপ ও আমার একাপ্রভু সত্তা বিকশিত হচ্ছে বলে আমি ভুলেই গেছি এখনও বহু শিক্ষক দেশে আছেন যাঁরা তীব্র অর্থকষ্টে ভোগেন। যাই হোক, তাঁদের এবং তাঁদের উত্তরপুরুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে কেন্দ্র সরকারের এই মহৎ প্রচেষ্টা। প্রতি বছর শিক্ষক দিবসের প্রাক্কালে কেন্দ্র সরকার রাজ্যস্তরের শিক্ষক সংগঠনদের অনুরোধ করেন অনুদান সংগ্রহের জন্য।
জাতীয় স্বার্থের জন্য সংগৃহীত অর্থের যে-কুপন, তাতে ভারত সরকার-এর চিহ্নমাত্র নেই। অশোক স্তম্ভের ছবি নেই। কারা সংগ্রহ করছে, রাজ্যস্তরের সেই সংগঠনের নাম বা ঠিকানা নেই, কোন্ বছরের জন্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, তাও প্রদর্শিত নয়। প্রতিটি কুপন এক টাকার হলেও গ্রহণ করতে হবে পাঁচটি কুপন। উপরন্তু, কোনো শিক্ষক এই অনুদান দিতে অস্বীকার করলে, ডিআই অফিসের কোনো এক এআই জানিয়ে দিতে পারেন, যিনি দেননি তাঁর নাম পাঠাতে। এই হুংকার পার্টির কালচারের পরিবহন মাত্র। সংলগ্ল কোনো বিদ্যালয় থেকেই সংগ্রহ করা হয়নি এই অনুদান। কেন্দ্র সরকার কি তাহলে আমাদের বিদ্যালয়কেই বেছে নিলেন? একজন দাতা হিসেবে এবং তথ্যের অধিকারবলে আমারও তো জানতে ইচ্ছে করে আমার অনুদানের সঠিক ব্যবহার হল কী না।... এরপরও শুনতে হয়েছে – যাক বাদ দে, পাঁচ টাকার ওপর দিয়ে গেছে। আমরা যারা শিক্ষক তারাই এই কথা আওড়াচ্ছি। সত্যিই যদি আমাদের হুঁশ থাকত, দানে থাকত ভালবাসা বা নিতান্ত কর্তব্যপরায়ণতা, প্রতিদানে আমরা নিশ্চয়ই জানতে অগ্রসর হতাম, শিক্ষক কল্যাণ তহবিলে সেই ক্ষুদ্র দান কোনো দুঃস্থ শিক্ষকের নিকট আদৌ পৌঁছালো কী না। আমাদের ভালবাসা ছিল না, সহমর্মী নই বলে ভিতরে-ভিতরে কর্তব্যও ছিল গরহাজির। যা ছিল তা কর্তব্যের অছিলা।
জেনেছি। দেখেছি। তারপরও আমরা প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠিনি। অনেক নাকি সমস্যা আছে। আদপে সমস্যা কিছু নেই; আছে নিজস্ব প্রতিবন্ধকতা। সেই প্রতিবন্ধকতাকে আশ্রয় করে বিছানায় শুয়ে আমরা স্বপ্ন দেখি, আমাদের ভিতরে কেউ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে উঠছে। যদিও স্বপ্নে সেই নারীমূর্তির আদলে নিজের মুখটাই বসিয়ে নিই। প্রচুর লড়াই করি এবং বিজয়োল্লাসের উত্তরীয়ে নিজেকেই বরণ করে নিয়ে চিলচিৎকার করে উঠি – হি ম্যান (শি উওম্যান), দ্য মাস্টার অভ দ্য ইউনিভার্স। বাস্তবে দেখা যায়, আমরা অলস, অল্পেই উত্তেজিত হয়ে ওঠা অপদার্থ। প্রতিবাদ অন্য কেউ করবে আর যেটুকু ফসল পাওয়া যাবে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে ক্যারাভানে ভরব সকলে। কী দুর্ভাগ্য! আমাদের এতই দীনতা যে আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর দিকে তাকিয়ে থাকি এবং ভুলে যাই, সেই নীলমৃত্যু উজাগর আসলে আমাদের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন। ফ্যাসিস্টদের কবলে বলির ছাগের মতো এতগুলো বছর ছটফট করে আমাদের স্বভাবই হয়ে গেছে কিছু না শোনা, কিছু না দেখা, কিছু না বলা। শক্তির তাঁবেদারি করে, মান-মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে, গোটা জীবন আঁশটে বিজৃম্ভণ তুলে কাটিয়ে দিতেই শিখেছি আমরা।
সকল প্রতিবাদ যেন ওই এক মহিলাই করবেন। উনি অনশন করবেন, আমরা বিড়াল-ডিঙাতে-পারে-না এমন পরিমাণ ভাতে হাত ডোবাব। উনি প্রতিবাদের উচ্চগ্রামে গলা ভাঙবেন, আমরা স্টাফরুমে বসে তাঁর ভাষার ব্যাকরণগত ত্রুটি শোধরাবো। উনি সিপিএম তাড়াবেন, আমরা গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের নন্দনকাননে বঙ্গললনাকে চুমু খাব। আমরা সিপিএম নই, সিপিএম-এর প্রশিক্ষণ-প্রাপ্ত কুকুরও নই, পদমর্যাদায় আমরা তার থেকেও ইতর। অনেকটা কুকুরের লালা-ঝলঝলে জিভের মতো। ইচ্ছে হলে সিপিএম তাকে ঠেলে বার করে, ইচ্ছে মিটলে টেনে নেয় ভিতরের দিকে। তবে দু-ক্ষেত্রেই ঢিল দেয় লালায়।
কলিম খান এবং রবি চক্রবর্তী তাঁদের বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ-এ দ্বিতীয় খণ্ডে অপদার্থ শব্দের ব্যাখ্যার্থে বলছেন ... "সালফিউরিক অ্যাসিড যদি তার স্বাভাবিক আচরণ না করে, তবে সে বিশ্বব্যবস্থায় যে আসন বা পদ দখল করে আছে, তদনুযায়ী ক্রিয়া করল না। সেক্ষেত্রে সে যেরূপ পদ দখল করে ছিল, সেইরূপ আচরণ করেনি, তাই পদার্থরূপে তার যাথার্থ্য থাকছে না। তখন সেটি অপদার্থ। কথাটি মানুষের ক্ষেত্রেও খাটে। দর্জি যদি তার স্বাভাবিক আচরণ না করে, তবে সমাজের যে আসনে সে প্রতিষ্ঠিত, সেই পদের জন্য নির্দিষ্ট ক্রিয়াটি সে করল না। তখন সে পদার্থ রূপে ব্যর্থ, তাই অপদার্থ।"
আমরা অপদার্থ, তাই শিক্ষকতার আচরণ না করে সিপিএম-এর সংস্কৃতিকে বহন করে চলেছি। একটু চিন্তা করলেই দেখতে পাবো, আমরাই চলমান সিপিএম, সিপিএম-এর রক্তবীজ। কিন্তু কীভাবে। যেদিন সাত্যকি মারা যায়, সর্বশিক্ষা অভিযানের শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রকল্প চলছে পার্শ্ববর্তী স্কুলে, সেখানে ছিলাম। পরের দিন যখন স্কুলে যাই, এক সিনিয়র শিক্ষক মহাশয় জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "তুই তো গতকাল আসিসনি, তাই জানা হয়নি, সাত্যকির বাড়ি কাদের পক্ষ থেকে যাবি – এবিটিএ না ডব্লুবিটিএ?" তখনকার মতো যত শানিত উত্তরই দিয়ে থাকি না কেন, পরে গভীর বিষণ্ণতায় মনটা ভার হয়ে যায়। দলগত বিচারে আমি কোনোটিরই অন্তর্ভুক্ত নই। বহুসংখ্যক মাস্টারমশাই যেহেতু এই দলীয় রাজনীতির পদলেহনকারী, বা তাদের সর্বৈব পরিচয় দলীয় পতাকা ধারণে, অতএব, কৃতকর্মের বিচারে আমি ঝোলে বা ঝালে কোনোটিতেই পড়ি না। ফলে, কোনো দিক থেকেই আমি তাদের সঙ্গে সাত্যকির বাড়ি যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি। স্মরণশক্তির মাথা এখনও খেয়ে বসিনি বলে মনে আছে যে এক ডব্লুবিটিএ সদস্য আমাকে এই দুষ্প্রাপ্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি যতটুকু সিপিএম-এর রাজনীতি বুঝেছি, স্বচক্ষে দেখেছি বিভীষণ অন্ধকার, তাতে দ্বিপদী সারমেয়র আখড়ায় মানবিকতা সবথেকে বেশি লাঞ্ছিত। সেই রাজনৈতিক রেড অ্যালার্টে মানবিকতার প্রদর্শনই অমানবিকতা। প্রকৃত শিক্ষার উচ্ছিষ্টটুকুও তারা গ্রহণ করেনি। ডব্লুবিটিএ-র ওই সদস্য শিক্ষক সিপিএম-এর মেরুকরণের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একই অসভ্যতার সাতকাহনে জাবর কেটে চলেছেন বছরের পর বছর। রাজনৈতিক দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও মিথ্যে বাহাদুরি ও বিড়াল তপস্যায় উপকরণের কোনো অভাব রাখেন না। বর্তমানে, তৃণমূলের কারখানার পাশে ঘর নিলেও তিনি সিপিএম-এর কোঠাবাড়ির দারোয়ান রূপেই থেকে গেছেন। এই মূলভাবটি, বাক্যে-কংগ্রেস-বিনাবাক্যে-সিপিএম, যা আগে তাঁর পোশাকে চকচকে বোতামে দেখেছি, সেদিন দেখি চামড়ায় রোমকূপ হয়ে বসে গেছে। এখন অপেক্ষা তাঁর উচ্চতর সিংহাসনে বসার, যেখান থেকে রক্তরোষে বীজ ছড়াবেন সিপিএম-এর ঢঙেই।
শিক্ষক শিক্ষার্থীর জ্ঞানের প্রসার ও মানসিক বিকাশ ঘটান – এই বাক্যটি রচনা বইয়ে লেখা থাকে এবং জ্ঞানমূলক প্রশ্নের বেস্ট নোটসে। অথচ শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় শিক্ষকের জ্ঞান বা মানসিক বৃদ্ধি কতটা হয়েছে তার বিচার করা হয় না বিশেষ। যেহেতু আমার বিষয় ইংরাজি, তাই ইংরাজির একটি প্রশ্ন না বলে থাকতে পারছি না। কোনো এক এসএসসি পরীক্ষায় ভয়েস চেঞ্জ করতে দেওয়া হয়েছিল, শাট দ্য ডোর। মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী টেস্ট পেপার্স সলভ করতে গিয়ে যার মুখোমুখি হয় বারবার এবং একটু শিখিয়ে-পড়িয়ে নিলে যাকে প্যাসিভ ভয়েসে লিখে দিতে সে সচরাচর ভুল করে না। হয়ত নয়া শিক্ষকের জ্ঞান দেখার জন্য এমন প্রশ্ন করা হয়। কিন্তু শিক্ষক হতে গেলে বিষয়ভিত্তিক দৃঢ়তা কি এই প্রশ্নটি থেকে বোঝা যায়? এযাবৎ জেনারেল নলেজ এবং ইন্টেলিজেন্স-এর ওপর একটি প্রশ্নপত্র পনেরো মিনিটে সমাধান করে জমা দিয়েছেন হবু শিক্ষক-শিক্ষিকা। এই জ্ঞানতর্পণ শেষ করে বিষয়ঘটিত প্রশ্ন-ছাওয়া ভূর্জপত্রে তুমুল আঁচড়া-আঁচড়ি। পাশ করলে তবেই পার্সোনালিটি টেস্টে টুকটুক করে আসা। আমি তো এভাবেই আসি। তাঁরা ডাঁট ছাড়লেন, আমি আমার আকার দিয়ে যতটা পারি ছিবড়ে করে ফেললাম। কিনে নিলাম তাদের। কী সৌভাগ্য আমার! কোনো পর্বেই আমাকে টিচিং অ্যাপটিটিউড সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হল না। কেন হতে হল না? কারণ, সেখানেই ছিটকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মোটা মাইনের ঝাঁপিতে ঝাঁপ দিতে পোষ্যপুত্রদের রাস্তা সহজ করে দিতে হবে বইকী। সিপিএম-দূষিত শিক্ষা সিস্টেমের জং পড়া কবজায় এইসব পোষ্য এক ফোঁটা তেলও দেয় না। তারা আসে রাজার ভৃত্য হবার জন্য এবং ক্লাসরুমে ভৃত্যের সংখ্যা বাড়িয়ে তোলার জন্য। সিস্টেম ক্রমশ দূষিত হলে বছরভর দূষণ ছড়ানোর ধারাবাহিকতায় কোনো ফাঁক থাকে না। যেকোনো খারাপ লোককে সিপিএম এভাবেই দলভুক্ত করে। তাই এক্ষেত্রে আমাকেও নিয়ে নিল, ওদের ভৃত্য-পরম্পরার বাহক হব জেনেই। যাঁরা আমাকে নিয়োগ করলেন, তাঁরাও এই সিস্টেমের শিকার বলে ভৃত্য নিয়োগে ভুল লোককে নির্বাচন করে বসলেন। তিন দশকের অধিক সময় নিয়মের প্রকাণ্ড চাকায় তাঁরাই বেনিয়মের স্পোক হয়ে বসেছিলেন বলে এই ত্রুটিটা রেখে গেলেন। জলন্ত অঙ্গারের দীপ্তি আছে, আবার চোখ ঝলসানোর ভয়ও। কিন্তু নিয়োগপর্বে অঙ্গারগুলো জলে ভিজে ছিল বোধ হয়। কর্মজীবনের প্রথম দিনই প্রধান শিক্ষক এবিটিএ-র জাতীয় সংগীত গেয়েছিলেন আমার সামনে। রাজার রাজনীতি যেমন হয়ে থাকে; পাখি খাক না খাক, মটরদানা ছড়াতেই হবে। পরে কুটনৈতিক চাল – দ্যাখ দ্যাখ! তোর জন্য কীই না করেছি...। আমরা এই অকারণ মটরদানা ছড়ানোর বিরোধিতা করিনি, বরং অতি সাবধানে মটরদানা এড়িয়ে কুশল ভঙ্গিমায় পা ফেলেছি। তাই ভয় হয়। পথে পড়ে থাকা মটরদানা ঝাঁট দিয়ে সরিয়ে না দেওয়ায় ফিরে আসার সময় পা হড়কে পড়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা।
কেন জানি না এমন কেন মনে হয় যে আমার কোনো আত্মজিজ্ঞাসা নেই। নিজেকে জিজ্ঞাসা করি না, ভিতরটা পূর্ণতায় অপূর্ণ না অপূর্ণতায় পূর্ণ। আমার বেঁচে থাকার কতটুকু প্রকৃত বেঁচে থাকা, কতটুকু সাধনা, আর কতটুকু নিজের সঙ্গে ছলনা। মানবজীবন তো বড়োই দুষ্প্রাপ্য। বিশ্ববরেণ্য বিশ্ব জটিল অণু-পরমাণুর সাধনায় মানবশুক্রে স্থান দিয়েছে আমাকে। স্থান দিয়েছে তো অণু-পরমাণুর সাধনা অক্ষুণ্ণ রাখার এবং চিরায়ত করে তোলার লক্ষ্যে। আমার কত কিছুই দেখার, চেনার, জানার ছিল। মানবচিন্তা মহামানবচিন্তায় রূপান্তরিত করার কথা ছিল। মানুষ হয়ে আমার অন্ধকারের মুক্তি ছিল আলোয়।
সেই আলো অন্ধকারের উৎস হতে এখনও উৎসারিত হয়। রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরি যখন, চওড়া পথটা পিচে মাখামাখি। এখনও সূর্যের কাঁচা হলুদ আমার কাঁধে মাথা রেখে, কখনও বুকে মাথা ঘষে চূড়ান্ত উত্তেজনায় উৎসারিত আলোকে ধরার জন্য তার দিশেহারা আকুতি। আমি যেন তখনও অনুত্তেজিত; উত্তেজিতের বিহ্বলতা কাটিয়ে আমি তখন আন্দ্রিয়া বচেল্লি৬র সন্ধানে। বারো বছর বয়েস থেকে তার দুটো চোখেই সূর্যাস্ত। বারো বছর বয়স থেকেই প্রকৃত সূর্যোদয়ের সাধনা। মঞ্চ জুড়ে আলোর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, তবু সেই বিশেষ আলোর ভিতরে সুরগুলি কোথায় গলে গলে পড়বে এই কথা ভেবে তাকে গলার অদৃশ্য চুম্বকে টেনে নেওয়ার চেষ্টায় বারো বছর বয়স থেকে সাধনা করে চলেছেন।
আন্দ্রিয়া! যত দিন যাচ্ছে, আমি অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছি। ক্রমশ ডুবে যাচ্ছি তমসায়। কিন্তু এই ডুবে যাওয়ায় কি ভেসে ওঠার তপস্যা আছে? আমার নালন্দিক শূন্যতায় আমারই ষড়রিপুর স্বর শুনতে পাচ্ছি আমি। কিন্তু অবসর নিতে চাইছে তারা। ষড়রিপুর স্বর একযোগে ক্রন্দনধ্বনি হয়ে উঠছে। সেই ক্রন্দনধ্বনি ধরিত্রীর গোঙানি হয়ে উঠছে ক্রমাগত। ঝলসে যাচ্ছে আমার দৃষ্টি, জ্বলন্ত কাঠকয়লা বিস্ফোরণ আর লাভার উদ্গারে।
মান এবং হুঁশ ধারণ করে রাখাই কি আমার একমাত্র কাজ নয়? অতি তুচ্ছ এই প্রশ্নটা দেহে আত্মগোপন করা মাত্রই বুঝতে পারলাম, ভারতে পাঁচ থেকে বারো বছর বয়সের পঞ্চাশ শতাংশের অধিক শিশু কোনো না কোনো শারীরিক অত্যাচারের শিকার হলেও আমি শিক্ষক মান ও হুঁশ ধরে রাখার প্রয়োজন বোধ করছি না এবং সেই নির্দিষ্ট ক্রিয়াটি করছি না বলেই অপদার্থ অত্যাচারী অমানুষ হয়ে পথ চলেছি। এই উৎস-মোহনা-ছিন্ন একাপ্রভুর – মহিলা দেখলে বীর্য, অর্থ দেখলে লালা, প্রতিরোধ দেখলে হত্যার অন্ধকূপ ইচ্ছা, শিক্ষক দেখলে সিপিএম আর সিপিএম দেখলে পেচ্ছাপ নিঃসৃত হতে থাকে।
হে দুঃস্থ শিক্ষক! আপনি দুঃস্থ! আর আমি অতি দুঃস্থ!
আমার হাতের তালুতে যে পথনির্দেশিকা আছে তার নির্দেশ মেনেই এগিয়ে যেতে হবে সারাটা জীবন। এ যেন নদীর মতো ধীরস্থির প্রবাহের অনুভূতি। সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের প্রাণটাকে হাতের তালুতে রেখে আঙুল দিয়ে ক্ষতস্থানে হাত বুলানো। ছিন্ন পাখাটির সন্ধান চাই। অনুসন্ধান পর্বে ক্লান্তি আসছে, হতাশা আসছে, কিন্তু মিলছে না দিশা। কিন্তু এই পাখাটার শক্তিও ছিল। শক্তি-প্রাপ্ত হয়েছিল এমন অনবদ্য শিক্ষাব্যবস্থায়, যার মূল লক্ষ্য ছিল ঐক্য ও মহানুভবতা, অন্তর্দৃষ্টির উন্মোচন ও প্রবহমানতা। সর্বত্রই ঐক্যের সুর। মা শব্দটিকে পান্নালাল যে-স্তরেই উন্নীত করুন না কেন, তা সবার হয়ে উঠেছিল। মা শব্দটি যেখানেই জড়িত সেখানেই অকাতর শ্রদ্ধা, পরম ভক্তি, আঁচলের গন্ধ। কাকিমা, জেঠিমা, পিসিমা, ঠাকুমা, দিদিমা, মাসিমা, ধাইমা, বম্মা সহ কত সম্পর্কের ছড়িয়ে থাকা আলো। মুড়কি থেকে মার সবই জুটত এই আলোয়। কত কিছুই ছিল সেখানে – পাখির কুজন, গাছের ছায়া, অন্ধ কানাই। এই আলো কোনো দিনই শপিং মল-এর চোখ ধাঁধানো আলো নয়। নিবিড় আলো। আলোর সেই নিবিড়তায় প্রিয় বিশেষণটুকুর কী ঐক্যবদ্ধ প্রবহমানতা। সেখানে শিখেছি, আমি যেখান থেকে যা পাবো তাই আমার সব থেকে বড়ো উপহার। আমি যেন তাকেই গ্রহণ করতে শিখি। তার পর চোখ মেলে তাকালাম চারিদিকে, দেখি গোটা জগতটাই আমার। তেমন করেই আমার, যেমন করে সবার। এই বিরাট উলটানো জামবাটিটার নিচে কত কী ছড়ানো থাকতে পারে তা ভাবতেই রোমাঞ্চ জেগে উঠল। লুকোনো আচারের মজা থেকে বিশ্বের বিপুল কর্মকাণ্ডের আঠালো যোগ। যেভাবেই হাঁটি, যে-পথই বেছে নিই, চিটেগুড়ের মতো জগত আমার পায়ে লেগে থাকে। যে-নদীকে গঙ্গা নাম দিয়ে আমাদের অহংকার এবং অধিকার বলে আমরা শোনাচ্ছি স্টোন ক্রাশার-এর ধাতব উল্লাস, সে-নদী কিন্তু তাকেও গ্রহণ করেছে। সে যেখান থেকে যা পেয়েছে, যুগে যুগান্তরে, তাকে তার সব থেকে বড়ো উপহার মনে করে এগিয়ে চলেছে। কারণ, প্রবহমানতাকে বজায় রাখাই তার কাজ। যে-ধরিত্রী ধর্ষণে আমাদের উত্তেজনা কখনও নিবৃত্ত হয় না, সে থাকে আমাদের পায়ের তলায়। যেন সে মহান স্রষ্টার কাছে আমাদের ধারণ করার অনুমতি পেয়ে কী আপ্লুতই না হয়েছে!
আদি, মধ্য ও অন্ত্যের মুক্তি যে দেহকল্পনা, সেই মহান স্রষ্টাকে মুগ্ধ বিস্ময়ে পুজো করা হত। নদীর জলে পা ধুয়ে তিনি বসে থাকতেন পর্বত হয়ে। আবার পর্বত থেকে সারা দিনের কাজের পর নেমে আসতেন নদী হয়ে। বনসৃজনের ফাঁকে ফাঁকে মরুমায়াজালও সৃষ্টি করতেন তিনি। নিজের সৃষ্টির প্রেরণায় রূপে-অরূপে প্রাণ সঞ্চার করলেন। অথচ নিভৃতে প্রাণের প্রবাহকে রাখলেন অক্ষুণ্ণ। সেই প্রবাহের স্রোতে মানুষ নিজেকে তাঁর উত্তরপুরুষ রূপে গণ্য করতে লাগল। জলের কুমির, ডাঙার বাঘ, আকাশের পাখি বিশ্বসাথে বিহার করতে লাগল। কুমির বাঘকে দেখে ভাবল সে প্রাণের একটি ভিন্ন আকার। বাঘ কুমিরকে দেখে ভাবল, আমার মতোন কিন্তু অন্যরকম। পাখি অন্তরীক্ষে বাতাস ঠেলতে ঠেলতে নাজেহাল হয়ে মোষের শিঙের ওপর বসল। এইভাবেই সেই মহান স্রষ্টা সর্বত্র এঁকে দিলেন স্থিতি, অথচ তুলিটা রাখলেন গতিশীল। এখন মন আঁকছে সেই মহান স্রষ্টাকে... যাঁকে আমি শৈশবে গুলি খেতে দেখেছি।
মানুষের নিজেকে সেই মহান স্রষ্টার উত্তরপুরুষ রূপে ভাবার কোনো সঙ্গত কারণই থাকতে পারে না। যদি মনে করে থাকি যে সে যা ভেবেছে তা সঙ্গত, তাহলে এই সুসংঘত জীবন-সংকলনে উত্তরপুরুষ রূপে কুমির, বাঘ, পাখি, মোষ সহ যত যত ভিন্ন অবয়ব-অন্বিত প্রাণ আছে, সবাইকেই উত্তরপুরুষ রূপে ভাবা উচিত, ভাবা উচিত বিশ্বসম্পদের অংশীদার রূপে। যেহেতু যেকোনো প্রাণ উত্তেজনাসৃষ্ট ফসল, তাই পৃথিবীতে অসংখ্য প্রাণ সৃষ্টি হবে। পৃথিবীর স্থির সম্পদ বিশ্বদলিল অনুযায়ী তাদের মধ্যেও সমহারে বণ্টিত হবে। স্নায়ুসূত্রে উত্তেজনাপ্রবাহ মাত্র বাঘের শাবক হল, পাখির হল ছানা, আর মানুষের সন্তান। নির্দিষ্ট স্বাভাবিক নিয়মে সংরাগ-উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ল প্রাণশক্তি। মানুষ কিন্তু উত্তেজনার পাশাপাশি আয়ত্ত করল লালসা। মানুষ ভিন্ন অন্য প্রাণী লালসাহীন হয়ে থেকে গেল। একমাত্র মানুষ লালসাকে গ্রহণ করে নিজের ঐক্যের প্রবহমানতায় চিড় ধরাল। বাঘ কুমিরকে কুমির হিসাবেই চিনত, মোষ পাখিকে চিনত পাখি হিসেবেই, অথচ মানুষ খেয়ালখুশি মতো তাদের শ্রেণি বিন্যাস করে বসল। কত রকমের কুকুর, বাঘের ভিন্নতা এবং পাখির রকমফের – সর্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সে আকণ্ঠ ডুবিয়ে দিল নিজেকে প্রকৃতির এই অবারিত ঐশ্বর্যে কামড় বসাতে। উদ্দেশ্য স্বচ্ছ। বাঘের ক্ষিপ্রতা, কুমিরের শক্তি, মোষের এবং পাখির সৌন্দর্যকে হরণ করা।
ঠিক এই মুহূর্তে উপেন্দ্রকিশোরের চড়াই আর কাকের গল্প মনে পড়ছে। চড়াই-কাকে খুব মিতালি ছিল। চাটাইয়ে শুকোতে দেওয়া ধান আর লংকা কে আগে খেয়ে নিঃশেষ করতে পারে সেই নিয়ে ঝগড়াঝাটি হল। একে অপরের বুক খুঁড়ে খাবে এই শর্তসাপেক্ষে ধান-লংকা খাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামল তারা। শেষপর্যন্ত খপখপ করে লংকা খেয়ে কাক বিজয়ী হল এবং খুট-খুট করে ধান খেয়ে চড়াই পরাজিত। চড়াই বলল, বন্ধুর বুক খাবে খাও, কিন্তু নোংরা-ঘাঁটা ঠোঁট ধুয়ে। এরপর কী এক অদৃশ্য সূত্রে ঘটনা-পরম্পরা সংযুক্ত সেখানে। "গেরস্ত ভাই, দাও তো আগুন, / গড়বে কাস্তে, কাটব ঘাস, / খাবে গাই, দেবে দুধ, খাবে কুত্তা, / হবে তাজা, মারবে মোষ, লব শিং, / খুঁড়ব মাটি, গড়বে ঘটি, / তুলব জল, ধোব ঠোঁট – / তবে খাব চড়াইয়ের বুক।" অথচ, কাক কিন্তু কোনো দিনই চড়াইয়ের বুক খেতে পারে না। উপরন্তু গৃহস্থের হাঁড়িভর্তি আগুনে তার ছড়ানো পাখা ঝলসে সে মারা যায়। অর্থাৎ এমন ইচ্ছা যা অন্যের ক্ষতিসাধন করে, তেমন ইচ্ছা একদিন ধ্বংস হবেই। আবার ধ্বংস করল যে, সে গৃহস্থ, মানুষ, জনবহুল পৃথিবীতে বিচরণকারী দ্বিপদ। জ্যোতিষ্কলোকের পথে তারও রেখামাত্র চিহ্ন দেখা যাবে না।
প্রথমেই প্রকৃতির ওপর শাসন চালাতে গিয়ে মানুষ বুঝল খুবই কমজোর সে, শ্রদ্ধা ভালবাসা স্নেহ ও মায়া যে সর্বব্যাপী শক্তির মধ্যে প্রবহমান, তাকে দাসানুদাসে পরিণত করা অসম্ভব। কিন্তু তার মন বহুফসলি। বহু চিন্তায় সে উন্নীত, তাই রক্ষণভাগ মজবুত করল। নিজের ঘর সামলে রাখা দরকার বইকী। সকল ভুল বুঝতে পেরে সে নিজের বোকামোকেই দোষ দিল। ভাবল, সর্বাগ্রে নিজের ভিতরের নির্বোধটাকে নিকেশ করি। যেমন ভাবা তেমন কাজ। নির্বোধের পাঁজরে পাঁজরে ভালবাসা, বুকজোড়া প্রেম। নির্বোধটাকে মারতে পারলে অনুভূতিগুলোকেও মারা যাবে। অন্যকে মারার কষ্টটা অনুভূত হবে না। আর তাই, সে সাধনা করে চলল আসমুদ্রহিমাচল বিজয় লাভ করার সেই অমোঘ সূত্রের খোঁজে। সে খুঁজেও পেল, অক্লান্ত সাধনার পর। সূত্রটি তাকে স্বপ্নে কানে কানে মন্ত্রণা দিল – নিজেরও শ্রেণিবিন্যাস করেছ দেখছি। রাজা অমাত্য ভৃত্য। শ্রেণিবিন্যাস যখন করলেই, শ্রেণিসংগ্রামই বা পিছনে থাকে কেন। স্বপ্নের মধ্যে মানুষের ওষ্ঠ আর অধরের সংযুক্ত-দিগন্তরেখায় কুটিল হাসি ছড়িয়ে পড়ল এক হিংস্র জাগরণের ইচ্ছায়। সে স্বপ্নে পেল জোরালো উৎসাহ। প্রত্যেকেই পৃথিবীকে ভোগ করছে। অতএব প্রত্যেকেরই সম্পদের হক আছে, সমতট থেকে পার্বত্যভূমির এলানো ঐশ্বর্যে দাবি ন্যায্য। যদি দুটি শ্রেণি সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় এবং উভয়কে যদি চালনা করা যায় প্রভু হয়ে উঠতে তবে, হিংসাশ্রয়ী রক্তক্ষরণ সেক্ষেত্রে অবধারিত। পারস্পরিক হানাহানিতে শক্তি হারাতে হারাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে উভয়ই। হানাহানিতে যোগ দেবে কারা, যারা গ্রাম ও নদীর সঙ্গে এক আত্মা এক প্রাণ। যাদের অপরের বিরুদ্ধে সহজে খেপিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে উভমুখী অবিশ্বাসের ঢেউ তুলে। উভয় শ্রেণিই খড়্গহস্ত হবে। উভয় শ্রেণিকেই লাঠিশোটা বল্লম তলোয়ার জোগান দেবে কোনো তৃতীয় শ্রেণি। তারা নিজেদের স্বপ্নের মানুষ বলে প্রতিপন্ন করবে এবং দেশের যে যে প্রাকৃতিক সম্পদে দুটি শ্রেণি এতকাল সমৃদ্ধ হয়েছে এবং সম্পন্ন থেকেছে, সেগুলি লুণ্ঠিত হয়ে যাবে তাদের অগোচরে। গোপন মালিকানা কায়েম করবে রাজা তার সৈন্যবাহিনী মোতায়েন করে। রাজার যত দ্বেষ দুষ্ট প্রজাশ্রেণিকে কেন্দ্র করেই। নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি করে বলে তার কুম্ভীরাশ্রু নির্গত হয় এই উদ্বেগে যে প্রজার সংখ্যা ক্রমশ হ্রাসমান হলে ক্রমশ বর্ধমান সম্পদ কীভাবে তিনি দেখাশোনা করবেন। তাঁর কান্নায় প্রলেতারিয়েত প্রজারা কাঁদেন। কারণ সরল সাদামাঠা জীবনযাপনকারীদের কাছে কান্না বেঁচে থাকার এক আশ্চর্য শক্তি। যাদের কিছু নেই তাদের কান্না শূন্যতার, আর যাদের সব খোয়া যাচ্ছে তাদের কান্না খোয়ানোর। ক্ষমতার অলিন্দ দখলের স্পৃহা এদের বিশেষ থাকে না। ধরিত্রী যদি সবাইকে ধারণ করে তার কাজ নির্বাহ করে যেতে পারে, তারা কেন তাদের শ্রমের ওপর একটা দেশকে ধারণ করতে পারবে না? এই কর্মযজ্ঞের অঙ্গীকারেই তাদের চিরমুক্তি। মহাশূন্যের পথে এই শ্রমশক্তিকে ধ্বংস করা না গেলে রাজার ক্ষমতার মুক্তি হবে কী করে। চির-অপ্রকাশিত থেকে যাবে। তাই রাজারও মুক্তি চাই। তিনি নিজেকে অবিনাশী শক্তি হিসেবে ঘোষণা না করতে পারলে সর্বাধিকারী রূপে তার মুক্তির সম্ভাবনাও ক্ষীণ। কাজেই লালসা লালন করে ক্ষমতার প্রবাহকেও জিইয়ে রাখা দরকার। ক্ষমতার একক সৈন্যবাহিনী। দলকে দল তাদের প্রবাহিত করতে হবে। গ্রামের পর গ্রাম হার্মাদ। নদীর পর নদী ভৈরব।
আমাদের ইতিহাসের মাস্টারমশাই বলতেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে যদি তোরা দেখিস, খোলা চোখে, দেখবি, বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী আর বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পৃথিবী সম্পূর্ণ আলাদা। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। স্যার বেঁচে নেই বলে জোর বেঁচে গেছেন। শান্তি স্থাপনের নামে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্বকে শেখানো হল অশান্তির পারদ চড়িয়ে নিরস্ত্র মানুষকে ধ্বংস করে তার জমি জায়গার ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য স্থাপন করা যায়। দেশের যুদ্ধে মানুষ মরে। স্কুলের যুদ্ধে ছাত্রছাত্রী।
অথচ পৃথিবীর উদার ব্যাপ্তি আমাদের কি সংঘর্ষে যেতে শিখিয়েছে? না, তিনি ধরিত্রীমাতা, তিনি এমন শেখাননি। তিনি শিখিয়েছেন ধারণ করা, বানপ্রস্থের মহিমা। তুমি তোমার মতো উৎপাদন করো। কিন্তু উৎপাদিত দ্রব্যের ওপর অধিকার সকলের। পৃথিবীব্যাপী যে অসীম ঐশ্বর্য ছড়ানো তা যদি পৃথিবীর নিজের অংশ হলেও সকলে ভোগ করার অধিকার অর্জন করে, তাহলে তুমি যা উৎপাদন করবে, তাকে ভোগ করার অধিকার তো সকলেরই থাকে। সৈন্যবাহিনী ক্ষমতার উৎপাদন। খেয়াল রাখা বাঞ্ছনীয়, (ক্ষম)তার সৈন্যবাহিনী মানে সকলের সৈন্যবাহিনী। সকলের বলতে ক্ষমতা নামক শ্রেণি-কক্ষে বসবাসকারী সকলের। ক্ষমতা যার, সৈন্যবাহিনী তার। মানুষ শুধু সন্তান জন্মই দিয়েই ক্ষান্ত হল না। লালসাকে উজ্জীবিত রেখে সে সন্তানসম মারণাস্ত্রের জন্ম দিয়েছে। বাঘ, কুকুর, মোষ, পাখির ভিতরেও মারামারি হয়। প্রজনন ঋতুতে পছন্দের নারীর ওপর উত্তেজনার অধিকার সঞ্চার এবং সুরক্ষিত জায়গা দখল করে পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যত সুনিশ্চিত করার তাগিদেই। সেখানে অস্ত্র বলতে প্রকৃতি-প্রদত্ত ধারাল নখ ও থাবা, ঠোঁট বা শিং। কিন্তু এই ঋতু ছাড়া অন্য কোনো সময় তাদের নিজেদের মধ্যে শ্রেণি-গত বিরোধ থাকে না। অথচ মানুষ, যার হাত পা থাকা সত্ত্বেও মস্তিষ্কের জিংঘাসা-কেন্দ্রের সাহায্যে অনবরত অন্য অস্ত্রের সন্ধান করেছে, সবকটি ঋতুতেই রক্ত ঝরাতে চেয়েছে, ঋতু-সংহারে মত্ত হয়েছে। লালসার সর্বঘৃণ্য এবং সর্বভয়াবহ আবিষ্কার হয়ে ধরিত্রীর বুকে জন্ম দিয়েছে পিসমেকার-এর। প্রতি মিনিটে পাঁচশো রাউন্ডের বেশি গুলি বেরোয় শিল্পজাত শান্তিস্থাপকের গলা থেকে। যারই হয়ত একটি গুলি নিরস্ত্র সিঙ্গুরবাসীর মাথার পূর্ব-পশ্চিম এক করে দিয়ে তার জীবনে অন্তত শান্তি এনেছিল। এই শান্তিস্থাপক এবং তার আপগ্রেডেড ভার্সন ক্ষমতার অলিন্দে থাকা প্রত্যেক মানুষের নিকট বর্তমান। ডাইনে-বাঁয়ে বসেছে বারুদের শপিং মল। আফস্পা থেকে স্পা, সুদৃশ্য সুশান্ত বাকশো ভর্তি স্তব্ধ বারুদ। সুশান্ত নিক্তি। সুশান্ত বাটখারা। যখন প্রয়োজন হবে, অশান্ত হয়ে উঠতে হবে, কিনে নিতে হবে, বা নিজের প্রাণের বিনিময়ে ধারণ করতে হবে। মাথায়। বুকে। তলপেটে।
ক্ষমতাকে প্রবহমান রাখা লোলুপ মানুষের কথা ভাঁজতে গিয়ে মনে হল একটা কথা সহজ ভাবে বলা হয়নি – নন্দীগ্রামের যে-কিশোরের কথা বলেছিলাম, ভূমিতে পাঁজর ঠেকিয়ে মাটিতে কান পেতে সে শুনতে পেয়েছিল, লেফট রাইট লেফট।
স্পাইক মিলিগ্যানের একটি কবিতার কথা মনে পড়ছে। সেখানে এক ব্যক্তির জলে ডুবে যাওয়ার উপক্রম; বাঁচার জন্য চিৎকার করছে। বেলাভূমিতে ডাক্তারের জন্য অপেক্ষারত অসুখ-আক্রান্ত এক ব্যক্তি জানায়, ডাক্তার আসা অবধি অপেক্ষা করতে হবে। ডাক্তার মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে তাকে উপশম দিলে সে বাঁচাতে পারবে প্রথমজনকে। প্রথমজন দ্বিতীয়জনকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে বলল; কারণ প্রথমজনের বাঁচা সম্ভব দ্বিতীয়জন বাঁচলেই। ওরা পরস্পরকে আশা জোগাতে থাকল। কিন্তু ডাক্তার না আসায় দ্বিতীয় ব্যক্তি মারা গেল। আর প্রথমজন, তলিয়ে গেল অতলান্তে। কবি শেষ তিনটি লাইনে লিখলেন, এই দুটি ঘটনা এবং তাঁর ফ্ল্যাটে আগুন লাগা ছাড়া দিনটা খুবই মনোরম ছিল।
দুঃসহ যন্ত্রণায় বিদ্ধ হতে হবে, নিজের গলার স্বর শোনা যাবে না, বেঁচে থাকার অলিন্দে মৃত্যু ঘুরে বেড়াবে – যদিও প্রতিটি দিন খুবই মনোরম, যদিও প্রতিটি দিন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়তেই থাকবে – যদিও মানুষ আপডেটেড হতেই থাকবে, যদিও প্রতিটি দিন খুবই মনোরম।
হয়ত আমরা আপডেটেড হয়েছি। পাসবুক আপ-টু-ডেট করার সাথে সাথে। কিন্তু লক্ষ্যটা স্থির থেকে গেছে। সকলের থেকে ভিন্ন হয়ে ভিন্ন কিছু করার বাসনা। অর্থাৎ নতুন ক্ষমতার প্রবাহকে নিজের ভিতরে সৃষ্টি করা এবং জিইয়ে রাখা। খেয়াল করে দেখেছি হাঁটতে হাঁটতে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়; একটি পদক্ষেপে যদি ডান পা ও বাঁ হাত এগোয় তখন বাঁ পা ও ডান হাত পিছিয়ে থাকে; আবার পরের পদক্ষেপে বিষয়টি ঠিক উলটো হয়। কদিন আগে আমি কতটা ভিন্ন ক্ষমতার অধিকারী বোঝার জন্য চেষ্টায় এতটুকু ত্রুটি না রেখে স্টেশন থেকে বাড়ি ডান পা ও ডান হাত আগে রেখে আসতে চাইলাম। এই সামান্য কাজটাই আমি করে উঠতে পারলাম না। আমাকে কেউ সেদিন বাধা দেয়নি এই বলে তুমি আগে বামপন্থী হও, বা দক্ষিণপন্থী বিপ্লবীদের মিছিলে আমি স্বেচ্ছায় আটকা পড়িনি, ফোনে আমার মাও নিরুৎসাহিত করেনি। আমার নাকি সমাজ পরিবর্তনের বাঁটুল বাসনা। আমি নাকি বিদ্রোহী রণক্লান্ত। আমার অন্তরে নাকি বিংশ শতাব্দীর মৃত্যু কাঁদে। এই তো সেদিন, আমার এক বন্ধুকে দেখলাম। সাধারণত যে-ট্রেনে ফিরি, সেখানে সে ভ্রাম্যমাণ মণিহারী নিয়ে হকারি করে। একদিন পরস্পর হেসেছিলাম। পুঁজিবাদী এবং শ্রমজীবীর কুশল বিনিময়ও হয়েছিল। আমার মনে হয়েছে, স্কুলে আমরা একই সঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিলাম। আজও আমরা একই সঙ্গে যাচ্ছি। স্কুলে লেখাপড়ায় সে আমার মতোই... থুড়ি, আমি তার মতোই ছিলাম। কিন্তু আর্থিক প্রগতির পথে তাদের সংসার হাঁটতে পারেনি। সে তার পিতার মণিহার সানন্দে গ্রহণ করে পিতাকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদান করেছে। পিতা-পুত্রের পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং স্নেহের প্রবাহ সে নিপুণভাবে বইয়ে দিয়েছে। পূর্বপুরুষ ছিলেন জল; আর উত্তরপুরুষ গর্বের জলাধার। অথচ আমি ভয়ের চোটে লেখাপড়ার সঙ্গ ত্যাগ করতে পারলাম না, পূর্বপুরুষের পুঁজির অহংকার আমায় বহন করতে হবে বলে। আগে বলেছি, স্কুলের শিক্ষা কর্মসংস্থান কর্মক্ষেত্র পড়তে পারার জন্য। এই সময় অর্থ উৎপাদনের লালসা ছড়ানো হয় কিশোর মনের মাটিতে, কম্পিটিশন-এর জাঁতাকলে ফেলে। সে-বন্ধু কিন্তু হেলায় পুঁজিবাদের বাসনা ছেড়েছে। আর আমি হকার হবার ভয়েই পুঁজিবাদী পড়াশোনা ছাড়তে পারলাম না। ভারতীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতি বহন করার পরম তেজঃ আমার বন্ধুর মধ্যেই প্রকট। আমার ঘর-ফিরতি ট্রেনে সেদিন বন্ধুত্বের কোনো গৌরবগাথা সৃষ্টি হয়নি। আমার দুর্বলতাকে আমি চাক্ষুষ করেছি মাত্র।
অঞ্চল খুইয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে ক্লান্ত সারমেয়, আমার জখম সঙ্গীবিহীন অন্তরাত্মা...
সত্যি, আমার আত্মার মেঝে আর পরমাত্মার ছাদে ফাটল সৃষ্টি করেছে আমারই ভূমি-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ। আমি বড়ো ক্লান্ত। রণে ভঙ্গ দিয়ে বদ্ধভূমি থেকে পালিয়ে এসেছি। কিন্তু বদ্ধভূমি যেহেতু ভূমিচোরদের দখলে, তাই আমার পালিয়ে আসার ইতি এখনও ঘটেনি। সে-বন্ধুটি শক্তির আধার বলে জীবনটাকে শাক্ত পদাবলি করে ছেড়েছে। আর আমি, ধূর্ত চোখে ইন্টারনেট সার্ফিং করতে করতে, ব্লগ লিখতে লিখতে, ফেসবুক-এ অদৃশ্য বান্ধবের সঙ্গে গল্প করতে করতে, এখনও পালিয়ে আসার সুচতুর কৌশলকে আপগ্রেড করে চলেছি স্বীয় দক্ষতায়।
ভূমি ছিল। বদ্ধভূমি করা হল তাকে। আমাকে শেখানো হয়েছিল একটি বুলি আওড়াতে, লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই, এবং এই লড়াইয়ে, পরিবার থেকে রাষ্ট্রে স্ফুলিঙ্গ-ছড়ানো লড়াইতে অংশগ্রহণ করতে যে গররাজি, তাকে মেরেই আমার লড়াইয়ের প্রথমভাগ-এর জন্ম হবে, আমার বাঁচার সার্থকতা নির্মিত হবে। এই কথা শেখাতেও সে রাজশক্তি ভোলেনি। আমি নোটস গুলে খেলাম এবং প্রথমেই তাকে প্রশ্ন করলাম – "তুমি কি আমার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রস্তুত?" সে বলল – "বোকা কোথাকার, তোর সঙ্গে আমার আবার লড়াই কীসের? আমিই তো তোকে শেখালুম।" বললাম, "তুমি অংশগ্রহণে গররাজি হয়েছ, অতএব তোমাকে মারার মধ্যেই আমার বাঁচার সার্থকতা।" গররাজি হওয়ার কারণে সে লড়াইয়ে হেরেই ছিল, তবু পরাজিতকে পরাভূত করার মাৎসর্য একমাত্র মানুষের মধ্যেই আছে, অতএব আমার মধ্যেও বর্তমান। তাই এই লড়াইয়ে তাকে পরাভূত করে আমার বাঁচার সার্থকতা নির্মিত হল।
বিজয়ী ও পরাজিত – উভয়েই বেঁচে থাকল – অতি-সাধারণ অস্তিত্বরক্ষাকারী প্রাণী হিসেবে। ইতিহাসের পাতায় এরাই কিলবিল করে।
এখন মনে হয়, সেই পূর্বপুরুষ লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেনি, শেখানো বুলি উত্তরপুরুষের মস্তিষ্কে সঞ্চারিত করেছে মাত্র। সেই মানুষটিকে আমি বিজিতের দলে ফেললাম কোন স্পর্ধায়? লড়াইয়ে যে অংশগ্রহণ করে না, সে তো অপরাজেয় হতে পারে। যে নিশ্চুপ রইল, তাকে পক্ষে ভাববই বা কেন, আর যে আমার পক্ষ অবলম্বন করল না, তাকে বিপক্ষ বলে আঘাত হানি কোন দুঃসাহসে। তাহলে একটি বসতবাড়িতেও গড়ে তিন-চারটি সীমারেখা বর্তমান। একটা কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে যেতে হলে ইট-সিমেন্ট-রেখাংকিত সীমারেখা পার করে যেতে হয়। প্রতিটি ঘর কি বিচ্ছিন্ন দেশ? একটি ভেসটিবিউল কি নো ম্যানস ল্যান্ড? ইতিহাসের পাতা ভারি হয়ে আছে যুদ্ধোদ্ধত বুটের চাপে, জবজব করছে কানমাথা দিয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসা রক্তে। আসলে যুদ্ধক্ষেত্র রূপে দেশকে ভাবে বা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে যারা, তাদের বিজয়ী বা বিজিত কোনো গোষ্ঠীতেই ফেলা যায় না। একটা বিরাট ময়াল-ভয়াল সিপিএম এই দুপক্ষকেই অস্ত্র জোগান দেয়। তাদের মধ্যে পারস্পরিক হিংস্রতার বীজ ছড়িয়ে লড়াইয়ে বটবৃক্ষ হতে উৎসাহিত করে। লিচুচোর পরিবেশ দূষণে মারা যায়, লিঙ্গচোর নিখোঁজ থাকে, ওদিকে ভূমিচোর ভূমিকম্পে অনন্তযৌবন লাভ করে বেঁচে থাকার নিষ্ঠুর সংজ্ঞা সৃষ্টি করে। যুদ্ধংদেহি! দৈহিক উন্মত্ততায় আমি আমাকেই মারি, এটাই আমার বিমারি।
আর যুদ্ধ যারা করে, তাদের হেব্বি পয়সা! আমিও সম্পন্ন একাপ্রভু হয়ে ওঠার পথে ভেবেছি যে আত্মসুরক্ষার অজুহাতে একটা .৩২" পিস্তল কিনব। ভাবাই সার। তার জন্য কাশিপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরিকে ৮৬,১১৭ টাকা গচ্চা দিতে হবে শুনে হিমশিম খেলাম এবং আক্ষরিক অর্থেই বিএড-এর প্রতি প্রেম জেগে উঠল। শিক্ষক হতে পারি-না-পারি, ভাবখানা শিক্ষকের মতো না হলেই নয়। কোট-প্যান্ট কার না ভাল লাগে! আচ্ছা, এই শিক্ষকের ঘরে কী আছে! বুকশেলফ ১১,০০০ + কম্পিউটার ৩০,০০০ + ইউপিএস ১১০০ + অডিও সিস্টেম ৩,০০০ + প্রিন্টার ৪,৯৯০ = ৫০,০৯০ টাহা! আআহা!! আর মাত্র ৩৬,০২৭ টাকার মালপত্তর কিনতে পারলে আমার ঘর একটা পূর্ণাঙ্গ পিস্তল হয়ে ওঠার দাবিদার হতে পারবে! আর সিপিএম-এর মেরুকরণের শিক্ষায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে আমি শূন্যে গুলি ছুড়ে পরিবারের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে বাড়িকে বানিয়েছি মহাদেশ, আমার একলা ঘর আমার দেশ, পূর্বপুরুষকে বহিঃশত্রু, সহসদস্যকে শ্রেণিশত্রু এবং উত্তরপুরুষকে ক্রীতদাস! এমন ধরণিখণ্ডের চরাচর জুড়ে সিপিএম বিগ্রহ রূপে পূজিত হয়, আর তাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে সংসার! বেডরুম থেকে বাথরুম। রক্তপাতহীন সেই যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সর্বাধিক! ধীরে ধীরে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে সাধের রাজ্য, দেশ। তখন আর রক্তপাতহীন থাকে না যুদ্ধ। প্রত্যেকের হাতেই পিসমেকার। গুলির ছররা। অর্থের ছররা! আমি তো জানি, আমি মারাত্মক ভীতু, তাই পিস্তলের প্রয়োজন হয় আমারই। বাড়ি থেকে স্কুল আর স্কুল থেকে বাড়ি, স্টেশনগুলো যখন একের পর এক পার হয়ে যায়, নিজেকে সেই ইঁদুরছানার সঙ্গে তুলনা করতে বড়ো সাধ হয় যাকে আমি-আমরা শিশুর মুখে মুখে চিরকাল দুর্বল করে রাখি। প্রজন্মের পর প্রজন্মে ইগলপাখির ডানা তার ওপর বিশালাকার ছায়া ধারণ করে নেমে আসে।
কী হবে এই ক্ষয়ক্ষতি করে! আমার পিস্তলের সরু ব্যারেল আর বিসমিল্লার সানাইয়ের ক্ষীণতনু মধ্যভাগের আকারগত বিশেষ পার্থক্য চোখে পড়ে না। অবশ্য পার্থক্য আছে কার্যক্ষেত্রে, যা এখনকার জগতের কাছে বিশেষ অর্থ বহন করে না। সুরগুলি কেটে গেছে কবে। পরস্পর যুক্ত না থেকে তারা শুধু সুর ও গুলি হয়েই রয়ে গেছে; নিকটে আসতে চায় না – সাহচর্য চায় না।
কিছু ইঁদুরছানা অবশ্য ভয়ে মরে না। হাঁটুমুড়ে বেঁচে থাকার থেকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মরা ভাল বলেই মনে করে। যে-ছেলেটি আমাকে গালাগালি দিয়েছিল, সে আমাকে একটা দিশা দেখিয়েছে। ও কিন্তু হাঁটু মুড়ে বেঁচে নেই। ছোটবেলা থেকেই ওর উরুদুটো শিল্প-সাহিত্য-শিক্ষা-রাজনীতির আঘাতে আহত। জীবন, জঙ্গল, মহল, সিপিএম, তৃণমূল – এই শব্দগুলো কানে এলে ছেলেটি প্রতিটি সাবধান-বিশ্রামে তাদের বুঝিয়ে দেয়, "সাবধান! আমি কিন্তু বিশ্রাম নিচ্ছি।"
কর্মক্ষেত্রে যারা বসে থাকে, তাদের আমার কর্মক্ষেত্র মাড়ানো লিঙ্গহীন বলেই মনে হচ্ছে এখন। আমিও বশীভূত সেখানে। একটা সময়ের পর প্রতিবাদ প্রতিরোধেও ক্লান্তি আসে! "আমার ছেলেমেয়েদের আলাদা আলাদা ব্যাচ। ক্লাস এইট-নাইনের মেয়েদের আলাদা ব্যাচ করেছি আমি। আই হ্যাভ টাচট এভরিথিং অভ এভরি গার্ল।" করজোড়ে অব্যাহতি চাইলাম সেই প্রেতাত্মার নিকট। করদুটো জুড়লাম, জীবনের তিনটি অসহায় মুহূর্তে, তিন বার। তাতেও ছুটকারা নেই। স্টাফ ল্যাভেটরির অভ্যন্তরে পাওলি দাম দেখে সেটি শিল্প না শিল্প-না, সেই নিয়ে ছিঃ, ছিছি এবং ছাইভস্ম-এর ছত্রাক গজিয়ে তুললেন চারিদিকে! অনুব্রতকে আলোচনা-বহির্ভূত রাখলেন তিনি, কারণ, ছুট্টে গিয়ে পায়খানার অভ্যন্তরে মোবাইলে চোখ রাখার সময় অনুব্রতের জায়গায় নিজেকে স্থাপন করেও সম্পূর্ণ স্থাপন করে উঠতে পারেননি। তাই তার ক্রোধ পাওলি দাম-এর দিকে চলে গেল। ষড়রিপুর পরাধীনতা এখানেই। স্বাধীন যদি না হতে পারে তবে অস্থিরতা চোখেমুখে ভেসে ওঠে। অর্থসম্পন্ন এই রিপুবিলাসী ভদ্দর লোক বড়ো একা। রিপুবিলাসেও একা। লোভ সংবরণ করতে পারেন না বলে অতি-সাবধানে থাকেন, পাছে ভুলেও সংশোধিত হয়ে যান। কর্তব্যে গাফিলতি এবং গাফিলতির কর্তব্য তিনি উত্তরপুরুষের ক্রোমোজমে এঁকে দেবেন এবং শ্রেণিকক্ষে সিপিএম-এর দাস তৈরি করবেন পড়ানোর অছিলায়। অন্ধকার থেকে আরও অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়াই তাঁর দলীয় রাজনীতি তাঁকে শিখিয়েছে। তলিয়ে যাচ্ছেন জেনেও ভেসে ওঠার বাসনা তাঁর নেই। নিজস্ব নৈতিকতার ওজনস্তরে প্রতিনিয়ত চিপিং করছেন জেনেও পরিবেশের ধ্বংসে তিনি উদ্বিগ্ন। তাঁকে দেখি আর বোঝার পরেও বোঝার চেষ্টা করি, নিজেকে কতটা বন্ধক রাখলে বিশ্বের মানচিত্রকে একটু একটু করে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবন্ধকতা প্রদান করা যায়।
সিপিএম-এর শিক্ষায় আত্মজিজ্ঞাসাহীন আমরা জেনে এসেছি, নিজস্ব প্রতিবন্ধকতাই স্বাধীনতা। এযাবৎ বেঁচে থাকায় সিপিএম আমাকে রবীন্দ্রনাথ অপেক্ষা কার্ল মার্ক্স-এর নাম বেশি শুনিয়েছে। আমার দেশের রূপ রস রঙ নিয়ে যিনি সাধনা করে গেলেন, তাঁকে সরিয়ে দিয়ে গ্রহণ করেছে এমন একজন মানুষকে যিনি এখানকার আবহাওয়া, মানুষজন, গ্রাম-শহরের জীবনের সঙ্গে জড়িত নন। অদ্ভুত লাগে, সোনিয়া গাঁধিকে যতই বিদেশিনী আখ্যা দিই মার্ক্সকে ভারতীয় বলেই মেনে নিয়েছি। পূর্ব-পশ্চিম, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটু বিভিন্নতার রেখা টেনেই বলি, পশ্চিমবঙ্গে এযাবৎ মার্ক্স-কে সামনে রেখে যথেচ্ছাচারে ব্যবহার করা হয়েছে পশ্চিমি সংস্কৃতিকে। ইংল্যান্ডের দুটো লক্ষ্য পূরণের কথা মার্ক্স বলেন তাঁর ১৮৫৩ সালে রচিত "India" প্রবন্ধে৭ – এক: প্রাচীন এশিয় সভ্যতার বিলোপ। দুই: এশিয়ায় পশ্চিমি সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। জার্মানদের হাল-না-ছাড়ার গুণপনা ভারতের নদীর বুকে হাল-না-ছাড়া নাবিকের ওপর পশুশক্তি প্রয়োগে আরোপ করা হয়েছে। কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, মার্ক্স একজন প্রথিতযশা চিন্তাবিদ এবং তাঁর তত্ত্বের মাধ্যমে কোনো সত্যের দিকে পৌঁছানোর বাসনা তাঁকে সুউচ্চ স্থান দিয়েছে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎদ্রষ্টা রূপে। কিন্তু আমরা নিজেরা যেহেতু কখনও মার্ক্স-এর বইপত্তর উলটাই না, অলস অপদার্থ বলে, কিছু লোক যারা অত্যাচার এবং শোষণ করার জন্য যেটুকু পড়লে চলে সেটুকু পড়ে নিজেদের কার্যসিদ্ধির জন্য মাইক্রোফোনের সামনে প্যারাফ্রেজ করে ত্রুটিমুক্ত ঔদ্ধত্যে, তাদের সেই সব কথা হজমি গুলির মতো চেটে-চুষে-চিবিয়ে ইতিহাসের পাতায় লীন হয়ে যেতে বসেছি আমরা। আত্মশক্তিহীন আমরাই কর্তৃপক্ষের বর্ম যাদের যুদ্ধশেষে খুলে রাখা হয়। ভারতের ইতিহাসের অদৃশ্য পাতায় সময়ের হাতকড়া পরে দাঁড়িয়ে আমি অঝোর ধারায় কেঁদেছি। কাঁদলে কী হবে, সত্য চোখের জলে ধুয়ে যায় না, বরং ঝাপসা হয়। দক্ষিণ ভারতকে সফটির কোণ ছাড়া কিছু ভাবতে পারিনি, পশ্চিমকে ভেবেছি প্লুটোর হাঁমুখ, উত্তরকে জ্বালামুখ, কখনও বা গোটা ভারতকে রেলের জালিকাকার শিরাবিন্যাস মেপেঝেপে একাকার করেছি। কিন্তু মানচিত্র-বহির্ভূত ভারত, যার মাতৃভৌম রূপ আমার মায়ার সংসারের অকল্পনীয় মজবুতি, আমার মৃত চিন্তার দোসর হয়ে অনন্ত রৌরবযাত্রা করেছে। এক অব্যক্ত অনুভূতির অশ্রুগ্রন্থি উত্তেজিত করে। সেখানে যখন দেখি মার্ক্স-কে আমরা ফোকাস করেছি আর ভারতমাতা-র পূজারী রবীন্দ্রনাথকে ব্লার করে কাজ সেরেছি, সে ভাবনা ঠিক স্বতঃস্ফূর্ত মনে মেনে নিতে পারিনি। রবীন্দ্রনাথকে বস্তাবন্দী প্রবচন রূপে রেখে দিল অধ্যাপকের দল। রবীন্দ্রনাথের ওপর বিশ্বভারতীর সর্বাধিকার প্রয়োগ করে জাতির রক্তে মিশতে দেওয়া হল না অথবা ততটুকুই মেশানো হল যতটুকু মেশালে রবীন্দ্রনাথের সমাজভাবনাকে আড়াল করা যায় জনজাতির ভাবনা থেকে। প্রায় দুশো বছরের পরাধীনতার পর স্বাধীনতার ভোর আসলেও পরাধীন করে রাখার বিকট ইচ্ছের ব্যাটনটা বহন করতে শুরু করল হাজার হাজার রাজনৈতিক পশু। ফলে আমাদেরই কারোর ওপর আমাদেরই কারোর সর্বাধিকার ঘোষিত হল নিঃশব্দে। ফেলে আসা বছরগুলোয় পশ্চিমবঙ্গবাসীর ওপর সিপিএম এই স্বঘোষিত অধিকার কায়েম করেছিল সব ক্ষেত্রে। ছিল ব্যাটন, হয়ে গেল বেয়নেট। গুলির ছররায় পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীর ভারতীয় আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিল। চোখের সামনে কর্মসংস্থানের ধুয়ো তুলে, তথ্যপ্রযুক্তি আর শপিং মল-এর ঝাঁ চকচকে ঘরবাড়ি বানিয়ে, গ্রাম-শহর ও বসতি-বস্তির দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজেরা নিজেদের সামনে রক্তকরবীর অন্ধকার জাল নির্মাণ করল। অন্য দিকে পাঠ্যপুস্তকের বিষয় সরলীকরণের নামে অতি নিম্নমানের লেখায় শিশুপাঠ্য সাজিয়ে দিল। রাহুলও অনুসরণ করতে বাধ্য হল। সরাসরি ছুরিকাঘাতে তার জ্ঞানচক্ষুতে নেমে আসল অকাল সূর্যাস্ত। সে সোনার তাল খুঁজে তুলে দিল জালের ওপারে থাকা সিপিএম শাসকের হাতে, অমাত্যদের মারফত। যক্ষপুরীর নিরন্তর উন্নতি হতে থাকল। কিন্তু সেই যে আটকা পড়ল সোনার সান্দাকফু-র অন্ধকারে সুড়ঙ্গ-খোদাইকর মানবসন্তান, সারাজীবন সে আর বন্দিমুক্তির স্বাদ পেলো না।
কিন্তু এবার সে কি মুক্ত হতে পারে? ৩৮৫টা সাবইন্সপেক্টরের শূন্যপদ পূর্ণ হলে কি সমস্ত সমস্যার নিরসন হবে? বোধহয় হবে না। আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া কাল আমাদের দোল। সকালে সিপিএম। রাতারাতি তৃণমূল। ইহাই পদবাচ্য। কংগ্রেস জমানায় অন্ধকারে হত্যার নিপুণ ছক ছিল। পরিবর্তন চেয়ে মানুষ যে-বামফ্রন্টকে আনে, সে সিপিএম হয়ে গেল অচিরেই। সেই সিপিএম-কে হটিয়ে দিয়ে মানুষ তৃণমূলকে বেছে নিল। গ্রামেগঞ্জে অসংখ্য লাশে হুমড়ি খাওয়ার পর। যদিও চৌত্রিশ বছর অতিক্রান্ত। জনসংখ্যার নিরিখে বলে দেওয়া যায়, তৃণমূলের অধিকাংশ আসলে উৎকট সিপিএম-এর বংশধর। আত্মসচেতনতাহীন বলে আমরা প্রতিক্ষণে যেভাবে বদলে যাই, তাতে কত দিন আর বদল চাইব কে জানে!
হয়ত বদল হয়ে গেছে, তবে তা হাতবদল; হয়ত হতে চলেছে যা, ভোলবদল।
আমাদের রাজনীতিতে রবীন্দ্রনাথ, জীবনবোধে রামকৃষ্ণ এবং স্বজাত্যবোধে নজরুলের কোনো স্থান নেই। কোনো একটা সময় তাঁরা করেকম্মে খেয়েছেন বলেই আমি জানি। মুখে বলি না, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন সে-স্বাক্ষর বহন করে। প্রয়োজনের সময় কাদের কীভাবে ইউজ করতে হয় তা যদি সিপিএম-এর কাছে না শিখে থাকি তাহলে পশ্চিমবঙ্গে আমার জন্ম বৃথা। এতটুকু শ্রদ্ধা এই মহান ভারতীয়দের প্রতি নেই আমাদের। সংস্কৃতিবোধের নলি কেটে আমরা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছি। সাংস্কৃতিক গৌরবের প্রদীপ দিন-ফিন উদ্যাপন করতে করতেই নিভে গেছে। বহু দিন আগেই, যে করাল অন্ধকারে পরিকল্পিত হত্যার ছক নিপুণভাবে সজ্জিত হয়, সেখানে ওঁদের দেহ টুকরো টুকরো করে কেটে ছড়িয়ে দিয়েছি। আমাদের জোর-যার-মুলুক-তার রাজনীতিতে, ভাবতন্ময়তাহীন জীবনবোধে এবং জাতি-বিনাশী স্বজাত্যবোধে ওঁরা বিরোধী শক্তিই ছিল।
একটি সুইডিশ প্রবচন বারবার আমাকে নাড়া দিতে লাগল – "একটি সাহায্যকারী হাত খুঁজে পাওয়ার সব থেকে সুন্দর জায়গা তোমার বাহুর শেষপ্রান্ত।" অর্থাৎ, নিজের সত্তাকে জাগ্রত করো। আদি অকৃত্রিম যে-মানুষটা তোমার ভিতর লুকিয়ে আছে, তোমার যাবতীয় স্নায়ুযুদ্ধ শেষে তাকে ডাক দাও। সকল চাপানউতোর থেকে অর্বুদ যোজন দূরে, জনহীন প্রান্তরে তার সাথে একা কিছুক্ষণ কাটাও। এই প্রবচনকে মাথায় রেখেই ইতিহাসের পাতায় ঝাপসা আলো ফালাফালা করে আর্তনাদ করে উঠলাম রবীন্দ্রনাথের প্রতি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সাড়া দিলেন না। মহান স্রষ্টার নিথর দেহের পাশে তাঁর নিমীলিত চোখে বসে থাকা আমাকে শুধু নাড়া দিয়ে গেল। আমার বোবাকান্না, অবসাদের স্তর পার করে যখন যুগ-যন্ত্রণাকাতর নদী হতে চাইল, দেখলাম, অসহায় ঝোপের আড়ালে দগ্ধ বৃতি থেকে নিষ্পাপ মুখ বার করে দুলে চলেছে রক্তকরবী।
আমি তাকে স্পর্শ করার স্পর্ধা দেখায়নি। বরং হতাশার কান্না মুছে ব্যস্ততা দেখিয়ে চলে
এসেছি। নিজের মোবাইলে নিজেরই মোবাইল নম্বর ডায়াল করছি এবং শুনছি সেই নম্বরটি ব্যস্ত। কই, আমি তো ব্যস্ত নই। একেবারেই নই। নিজের সঙ্গে মজা করলেই দোষ? আসলে যা বুঝলাম তা এই যে নম্বরটির মালিক এখন একা। হয় সে বলছে এবং শুনছে, নয় শুনছে কিন্তু বলছে না, নয় বলছে কিছু শুনছে না, অথবা অপেক্ষা করছে কখন ওপাশের ফোনে কেউ কথা বলবে। এই এতগুলো সম্ভাবনার যেকোনো একটি ঘটতে পারে তখন। তবু, মোবাইল পরিষেবায়, একাকিত্বের দারিদ্র্য দূর করার জন্য, একটা পুরুষ/নারী কণ্ঠ বসিয়ে রেখেছে আমাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য। অর্থাৎ কোনো ভাবেই মানুষকে কিছু ভাবতে দেবে না যন্ত্রসভ্যতা। সে-ই জানান দেবে ওপারের ব্যস্ততা সম্পর্কে। ভাবনাচিন্তার দায়িত্বও সে তুলে নিয়েছে। পৃথিবী জুড়ে এই নির্লজ্জ বেসাতির রমরমা বাজার – যন্ত্রানুসঙ্গ দিয়ে নিঃসঙ্গ করে তোলা।
যখন নিঃসঙ্গ বোধ হচ্ছে, যখন শূন্যতাই আমার শোভা, তখন দ্বিতীয় উপসর্গ আমার এই জীবনসর্গে ঢুকে পড়ল সমস্ত শক্তি নিয়ে। সমকালীন সন্ধ্যা কাঁপিয়ে দলবদ্ধ প্রশ্ন ছুড়ে দিল। বন্ধুরা কোথায়? কেমন আছে ওরা? তাদের খোঁজ রাখো?
"তারা কি খোঁজ রাখে?" চিৎকার করে উঠলাম, যেমন করে চিৎকার করে অন্যের গলার স্বরকে পরাজিত করে এতকাল বেঁচে থেকেছি, সেভাবে! শান্ত ক্ষমাহত হারিয়ে যাওয়া স্বর পুনরুদ্ধার করে সে নির্বাপিত দীপে আলো জোগাল, "কথা তো তোমার এমন ছিল না। তোমার কাজটা কী? খোঁজ নেওয়া। সেটাই তোমার জীবনের লক্ষ্য। তুমি বিচ্যুত হয়েছ। অভ্যন্তরে ক্ষয় পেতে পেতে তুমি তোমার স্বাধীনতাকে হরণ করেছ।"
অভিমানী জোয়ার ঠান্ডা হল একসময়। মনে পড়ল আমার দিনপঞ্জিতে আমি আসলে ডাকহরকরাই ছিলাম। কিন্তু পায়ের তলা থেকে সর্ষে সরিয়ে দিয়েছি। বাগবাজারের ঘাটে কতকাল যাওয়া হয় না। দেখা হয় না কতকাল বৈরাগী জলধারার সাথে। সেখানে কোনো যুদ্ধ নেই। জয়-পরাজয়ের ক্ষুদ্র তুচ্ছ চিন্তা সেখানে অবর্তমান। নিশ্চুপ বসে থেকে জলের ওপর বাতাসের শিখা উড়ে যাওয়া দেখতে কার না ভাল লাগে। প্রকৃতির রহস্য তার অসীম উন্মোচনেই। সেখানে গেলেই বোঝা যায়, জীবনভর এই মৃত্যু উপত্যকা, যে আমার মাতৃভূমি, কীভাবে শ্বাস নেয়, বেঁচে থাকে। মার্ক্সিজম, হেডনিজম, লেনিনিজম আর ফেমিনিজম-এর তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়ে কি জীবন চলে? ওসব জলে যায়। আস্থা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, স্নেহ এবং মানবতার কাছে কোনো ইজম কোনো দিন বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে পারে না।
আমার তো নিজের বলে কিছুই নেই, যা কিছু সবই এই বিশ্বের। কাজেই সবটুকু তাকে দিলেই বা আমার কী। অন্য কারোরই বা এতে সমস্যা কোথায়। মোটামুটি যা বুঝে গিয়েছি, পঞ্চমশ্রেণির নোংরা রাহুলকে আমরা আর কোনো দিনই ভাষা ও গণিত সঠিকভাবে শেখাবো না অথবা সেই পরিবেশ গড়ে তুলব না যেখানে ভাষা ও গণিত তার কাছে আলোর ছবি হয়ে উঠতে পারে। অন্য কেউ শেখাতে গেলেও সমালোচনার লালা ছড়াব। সারাদিন আমি এ.টি., মধ্যরাতের সিডি, রাতের অ্যাসিডিটি – এই করেই কর্মজীবনের অবসর নেওয়ার দিনের দিকে অগ্রসর হব। একশো কোটি টাকার ক্যালকাটা আই-এর দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে হাপিত্যেশ করে বউকে বলব, "আগের দশকে শিশুদের সাথে এই দশকের শিশুদের পার্থক্য রয়ে গেছে।" মেডুসার রোম্যান্টিক ঘড়ঘড়, "তোমার লোবোটমির প্রয়োজন!" আমরা হাসতে থাকব বৃষ্টিবিঘ্নিত দিনে। আধুনিকতাকে বহন করে চোখের সামনে শোঁ করে হয়ত একলাখি ন্যানো স্পিড বোট বেরিয়ে যাবে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমার ছাত্র, ঠেলাগাড়ির বেগুনবিক্রেতা, কীভাবে কোন পথে ঠেলবে নিজের জীবন বুঝেই উঠতে পারবে না। আর মা মারা গেলে দাদাকে পাশে নিয়ে কমিউনিস্ট সভ্যতার টার্গেট রাহুলের বাটির মুড়ি তখন ছড়িয়ে একাকার।
শুরুতে শিক্ষক হিসেবে অহংকার প্রদর্শন করেছিলাম এই বলে, একটি দিন শাস্তি দিয়ে যদি ছাত্রটিকে ফিরিয়ে আনা যায়, কত কঠিন শ্রমের বিনিময়ে অন্নসংস্থান করতে হয় তা বোঝানো যায়, তাহলে সেই শাস্তি, হোক দৈহিক, প্রয়োগ করা উচিত বলেই আমি মনে করি। এখন নিজেকে জিজ্ঞাসা করছি, "শাস্তি কাকে দেব? সে কি কোনো শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে আদৌ?" জন্মানোর পর জন্মানোদের দ্বারা যে-শাস্তি সে পেয়ে চলেছে, পূর্বপুরুষের ঋণের যে-ভার তাকে নিল ডাউন করিয়ে রেখেছে, রাজ্যকে বিকিয়ে দেওয়া কমিউনিস্ট কালচারের আড়াই প্যাঁচে প্রতিদিন তাকে যে কুরবান যেতে হচ্ছে – তাকে আর কত শাস্তি দেব? কত অত্যাচার করব?" যে শিশু হারিয়ে গেছে যন্ত্রসভ্যতার ভিড়ে, যার জীবন এতটুকু বয়সেই শ্যাওলা-তছনছ, যে নিহত তাকে আমার আহত সত্তা "The Lost Child" পড়াবে কোন মুখে?
অর্থভোগ্যা বসুন্ধরায় আমার অন্তরাত্মা কুকুরটি এখন আর কাঁদে না। নিহত আত্মার অন্তঃস্থলে সে ডগ নয়, প্রকৃত অর্থেই গড। আমৃত্যু জন্মহীন গড – যার মানুষজন্ম – যে সর্বদা মাথা উঁচু করে মাথা হেঁট করে থাকতেই পছন্দ করে। অসংখ্য দেয়াল উজিয়েছে তাকে ঘিরে। অসংখ্য ওয়াল। এখন আদমের ফেস-এ ভরাডুবির আশংকা। ইভের বুকে স্টোন ক্রাশারের ক্ষতচিহ্ন। দিনের মধ্যে কয়েকবার স্টেটাস আপডেট করার মাধ্যমে তারা জানান দেয় – আমরা, কান্নাঘামভেজা নিঃসঙ্গ শার্ট, আত্মগ্লানির হ্যাঙারে ঝুলে আছি, নরহত্যা ও দুর্ভিক্ষের মধ্যে বিদঘুটে হাসি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছি, সারা শরীর বিষে জ্বলেপুড়ে গেলেও লিঙ্গহীন প্রস্তরখণ্ডের মতো আমরা টিকে আছি, শ্বাস নিচ্ছি। এই ভাবেই বেঁচে আছি, এবং বেঁচে আছি, কিন্তু বেঁচে আছি, অথবা বেঁচে আছি – অনেকদিন।
বেঁচে যখন আছিই, সুতোচ্ছিন্ন শিক-ঠিকরানো অন্ধকারের-রং-চটা আমার কে. সি. পাল রিকশাওলাকে এগিয়ে দিতে আমার আপত্তি থাকার কথাও নয়। কেউ গ্রহণ করেন, কেউ সচেতন ভাবেই প্রত্যাখ্যান করেন। সে যাই হোক, নিয়মিত রিকশা চড়ব। লিঙ্গচুরির ভয়টয় নেই। যার সত্তাই চুরি গেছে, তার আবার লিঙ্গ চুরি যাওয়ার ভয়। আমার উপার্জনের একতুলো পরিমাণ ভাড়া রিকশাওয়ালাদের নিয়মিত দেবো। প্রতি মাসে অর্থের দানবীয় উল্লাস, যা আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়, তার অতিক্ষুদ্র পরিমাণ তাদের তুলে দেব। আমার মতে পারিশ্রমিক বলে কিছু হয় না। যদি পারিশ্রমিক বলে কিছু থেকেও থাকে, ওদের পরিশ্রমের পারিশ্রমিক আমার অর্থ থেকে দেওয়া সম্ভবপর নয়। কিছুটা স্থানগত বিনিময়। আমি হাঁটব না, চড়ব। আমাকে তিনি চড়াবেন, তাই আমি স্থানান্তরিত হব। এবার আমি বলব, এই নিন। দূরত্ব দূরীকরণের জন্য আমি তাঁকে অর্থ প্রদান করব না। আমার এই অর্থ প্রদান অভ্যাস দুই দিকে যদি এতটুকু সামঞ্জস্য আনতে পারে, এই ভেবেই এই কাজ এবং কাজের পুনরাবর্তন। আমার পুজো আছে। ওদেরও আছে। আমার ছেলের পুজো আছে। ওদের ছেলেমেয়েরও পুজো আছে। দেখুন, কীভাবে আটঘাট বেঁধে আমরা-ওরার শ্রেণি বিভাজন করে ফেললাম। কীভাবে আমি সিপিএম-এর শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে হত্যাকারী পূর্বপুরুষের ব্যাটন বয়ে বেড়াচ্ছি। রিলে রেস-এ জয়ী হবার বাসনা তো আমারও। তবু তার মধ্যেও অক্ষ(র)যাত্রা-য় ছাপানোর লালসা সংবরণ করতে না পেরে কতগুলো ভাল ভাল কথা লিখে দিলাম। উত্তরপুরুষেরও কোথাও ক্ষতস্থান রয়েছে, বুঝিয়ে দিলাম। বুঝিয়ে দিলাম শ্রেণি-ফেনি নিয়ে কত চিন্তিত। আমার দুঃখফেনায় ঢেকে দিলাম নিহত রাহুলদের শোকগাথা। আমার ভিতরেই নির্মাণ করলাম অজস্র শ্রেণি। আমার এক বাহ্যরূপ। অন্তরালে বহুরূপতা। আমার ভিতরে থাকা অসংখ্য শ্রেণিতে আসলে প্রবাহিত হচ্ছে লালসার উষ্ণ শোণিত। সেই উষ্ণতায় ভালবাসার কবোষ্ণতা বাড়ন্ত। সেখানে উচ্চ তাপমাত্রায় প্রবাহিত হচ্ছে লালসার লাভাস্রোত। সেই গলিত লালসা যে যে অঞ্চল ছোঁয়, যে যে মানুষকে স্পর্শ করে, ক্ষুধার্ত ময়ালের মতো গিলে খেতে থাকে এবং ক্রমবর্ধিত শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলে। তখন তার সচেতন রূপও ভুলে যায়, রিকশাওয়ালার ছেলেরা তার স্কুলেই পড়ে। তখন সে এই প্রকল্পিত গণহত্যার অংশ এবং অংশীদার – ময়ালাংশ। সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতির দিক থেকে সরকারের সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে আমি, দিবাকর সরকার, ওরফে পূর্বোদ্ধৃত Snake Xenzia-র সেই সাপ, আমার পাকস্থলীতে হাজার হাজার মানুষ সহ মানবিকতাকে গলাধঃকরণ করে চলেছি ক্রমাগত।
কথিত আছে, শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মের পূর্বে তাঁর পিতামাতার সম্মুখে বেশ যে-কটি অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল তাদের মধ্যে একটি ছিল: সন্তানসম্ভবা চন্দ্রমণি দেবী দেখেছিলেন শিবলিঙ্গ থেকে নির্গত একটি জ্যোতি তাঁর গর্ভে প্রবেশ করছে। ফ্রয়েডিয় ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না। আমার কাছে এই চিত্রের বিস্ময়টাই মুখ্য। আমি পূজার্চনার ধার দিয়ে যাই না ঠিকই, কিন্তু তাই বলে উপহাস করি না। আমাদের পাড়ার ওই মন্দিরে নতুন শিবলিঙ্গ আনা হয়েছে। এবার আরও দামি। কিন্তু তার থেকে আর কোনো রামকৃষ্ণ জ্যোতিরূপে বেরোবেন কী? যে সন্তানসম্ভবা মা মেয়ের সঙ্গে বসে শীলার জওয়ানি-তে গলা মেলাচ্ছেন উৎকৃষ্ট সংগীত ভেবে, তাঁর গর্ভে এরকম কোনো জ্যোতি প্রবেশ করার অধিকার পাবে কী? প্রবেশের অধিকার পেলেও হয়ত বেরোতে চাইবে না। অথবা চাইবে গর্ভপাতের বিনিময়ে জন্ম।
আমি তো আর মাতৃগর্ভে ফিরে যেতে পারব না। জ্যোতিষ্কলোকের পথে হাঁটতে হাঁটতে বিলীন হয়ে যাওয়া ছাড়া আমার আত্মসমীক্ষার অন্ত্য নেই। ইতিহাসের বাহু আছে তো বন্ধন নেই, বন্ধন আছে তো বাহু নেই। যা আছে, তা অনন্ত।
প্রাতরাশ থেকে নৈশভোজ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের রক্ত মিশিয়ে এই বেঁচে থাকার পর বাঁচার ফুরসুতটুকু হারিয়ে ফেলেছি। এখন আর শিবের সামনে দাঁড়ানো যায় না। ক্ষমা চাওয়া যায় না এত বিষাক্ত ক্ষতস্থান সৃষ্টি করার পর। ইট'স সো টাফ আ জব, না? মানুষ ও মানবিকতা মেরে ফেলে সচল পাথর হয়ে ঘুরে বেড়াই। আমি গোটা একটা স্টোনের ওপর বিল্ড করা। তাই এতটুকু অনিশ্চয়তা নেই আমার, এই মুহূর্তে। আমার বদলে দামি পাথর জায়গা করে নেবে। জবার ঘন লালের বদলে পাতার ঘন সবুজ ও অন্ধকারের মূর্ত বিস্ময়! তার মধ্যেই ভাসমান ছিন্নবিচ্ছিন্ন মায়ার সংসার। স্তম্ভ-স্তব্ধতায় এই ভগ্নদেহে বেড়ে ওঠা চেতনাহীন অধার্মিক একাপ্রভুর এখন শুধুই রৌরবযাত্রার অপেক্ষা। এই আত্মসমালোচনামূলক প্রবন্ধে, প্রবন্ধের বাইরে, রাজনীতি ও রাজনীতির বাইরে, অলি থেকে গলি, পথ থেকে রাজপথ, কণ্ঠ থেকে উপকণ্ঠে, জন্মান্ধ আঁধারে অকাল বার্ধক্য নিয়ে অপেক্ষা করে চলেছি সেই শুভক্ষণের যখন সেই রাজনৈতিক সাপ জ্বলন্ত অঙ্গারের অদৃশ্য ঘূর্ণনের ভিতর মাথায়-লেজে সংঘর্ষ বাধিয়ে নিমেষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
যাঁদের কাছে ঋণী: মা, এ, কুকি, স্নেহা, অনিন্দ্য, অর্চ, উজ্জ্বল, উমা
তথ্যসূত্র:
Restructuring of School Education System in West Bengal : Interim Report
Indian Institute of Management Calcutta , May 12, 2011
http://www.wbsed.gov.in/wbsed/readwrite/55.pdf
১। Table 2.3 District-wise Literacy rate : পৃষ্ঠা ৭৩
১.১। Table 6.32 School Inspection Staff Strength : পৃষ্ঠা ১০৩
২। সার্কুলার: http://wbbse.org/notice.htm [Sl No 05.]
৩। আফস্পা: AFSPA: Armed Forces Special Powers Act
৪। http://www.marxists.org/bangla/archive/trotsky/FascismBangla.pdf
৫। হিন্দু শাস্ত্র: http://dspace.wbpublibnet.gov.in/dspace/handle/10689/1001
বিপিনবিহারী ঘোষাল, প্রকাশকাল ১৮৮৫
৬। আন্দ্রিয়া বচেল্লি: প্রখ্যাত ইতালীয় গায়ক
৭। India: Karl Marx: New-York Daily Tribune, August 5, 1853
পাঠকের অবধারিত প্রশ্ন, এক, এটা কি প্রবন্ধ না আত্মজীবনী? একটি প্রবন্ধে এত আমি-র কী আছে!
লেখকের উত্তর, হ্যাঁ, এটা প্রবন্ধই হচ্ছে, তবে এই প্রবন্ধের সমাজ-সংস্কারমূলক কোনো দায়দায়িত্ব নেই। এটি তেমন প্রবন্ধ নয় যেখানে প্রাবন্ধিক ক্ষুরধার কৌশলে নিজেকে, সবার থেকে দূরে রেখে টাটকা ভাবনার স্রষ্টা রূপে আলাদা মর্যাদার ঘি মাখিয়ে রাখেন। সে-ধরনের প্রবন্ধ লেখার শক্তি আমার নেই যে ইচ্ছে থাকবে। আমি এই প্রবন্ধের একটি পার্ট। প্রবন্ধ আমার পার্টি। আমার মতো ঝুড়ি ঝুড়ি আমি জুড়ে এই পার্টি গড়ে উঠেছে।
পাঠকের অবধারিত প্রশ্ন, দুই, তাহলে আমি কে আর এই পার্টির ম্যানিফেস্টো কোথায়?
দ্বিতীয় প্রশ্নের আমি-র বর্তমান আস্তানা লেখকের বর্তমান ভগ্নদেহ। এ-ভগ্নদেহ আমি-র পূর্বপুরুষ বা উত্তরপুরুষ, বা উভয়ের সংযোগ, বা উভয়ের কিছুটা। জৈবিক বিবর্তনের দৌলতে একটি দোষ আমার আমি-র মধ্যে পরিলক্ষিত – আমি কমিউনিস্ট নই। আমি ততটা দুখি মানুষ, যতটা সুখি। আলস্য-পরিশ্রম চোবানো আমার একটিই শরীর। কাঠামোগত সংজ্ঞায় আমি মানুষ। তবে শরীর নামক দুর্ভেদ্য গড়ের ভিতর রুদ্ধ সিংহদ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে অঞ্চল-খোয়ানো ক্ষতবিক্ষত কুকুরটি কেঁদে ওঠে। বড়ো মায়া লাগে তার জন্য। সে তো আমারই অন্তরাত্মা। ব্রাত্যজন। সেই জখম ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত আমি প্রতিমুহূর্তে শুনে চলি। নিহত মায়ের প্রসব বেদনা কেউ যেমন শুনতে পায় না, তেমনি আমার রুদ্ধসংগীতও বাইরের জগতের কাছে চির-অশ্রুত থেকে যায়। তখন দুখুমিঞা কী আর করবে, পাতার ঘন সবুজ ও জবার ঘন লাল জমে থাকা অন্ধকারে নিজের খোয়ানো খোয়াইশ কুড়াতে কুড়াতে পীরের ঝোলায় ভরে চলে। অলি থেকে গলি, পথ থেকে রাজপথ, কণ্ঠ থেকে উপকণ্ঠে অকাল বার্ধক্য ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটতে থাকে।
শহরে আস্ত আকাশ দেখা যায় না। ওই মোটামুটি এদিক-ওদিকে কুড়ি ডিগ্রি করে খোয়াতে হয়েছে বেশ কিছুদিন। যা বাতাস বলছে তাতে এই কৌণিক ব্যাধি বাড়তেই থাকবে। তাই আকাশের থেকে স্বপ্ন দেখা সোজা। স্বপ্ন দেখা শেষে প্রতিদিন উঠে বসে দেখি পীরের ঝোলা ক্ষুদ্রকায় হতে হতে মানিব্যাগে রূপান্তরিত; আর অধিবাস্তব স্বপ্নের অতিবাস্তব রূপ হিসেবে প্রাপ্তি হয় একমুঠ খুচরো, দশ টাকার নরম দুটো নোট, নোংরা পাঁচ টাকা আর এটিএম-বিয়ানো দুটো ঝকঝকে একশো টাকা। হাতে পুঁজি থাকলে যা হয়, বেরোই বাড়ি ছেড়ে, ডাঁটা থেকে ডাঁট, সকল পণ্যদ্রব্য আমার সামনে শহরজুড়ে সাজানো, তা কিনতে কিনতে কেনার ফুরসতটুকু কখন হারিয়ে ফেলি। আমার ভিতরের পরিশ্রান্ত ব্যবসাদার তখন শুয়ে পড়ে। শহরে আস্ত আকাশ দেখা যায় না বলে তার খুউব দুঃখ। সব কেনা হলেও সময়াভাবে আকাশ কেনা বাকি থেকে যায়। তবে টেকনোলজির বাগদা তার বেডরুমে আছে বলে নিকটবর্তী দেশের আকাশ খুবলে আনে সে। থ্রু থ্রিজি। সারা দিন হাঁ জি হো গ্যায়া, ও জি সুনতে হো, আর রাতে, চলো আব থ্রিজি অন করো।
থ্রিজি অন। আদমের ফেস। ইভের বুক। উভয়ের ফেসবুক। দেয়ালজুড়ে এক আকাশ গপ্পোসপ্পো। জগতটা পুঁচকে হয়ে মোবাইলের গদগদ স্ক্রিনে। Hi...! ব্যস, একবার হাই তোলা হলেই বেদম লাইক করা শুরু হয়। কীসে লাইক করা হল, কেনই বা লাইক করা হল, সেই লাইক-এ দুজনের উষ্ণ দহন হল কী না, তা কেউ জানতে চেষ্টা করে না। একজনের ভরাট ক্লান্তি আরেকজনের ক্লান্তিতে মিশিয়ে দেওয়াই মূল লক্ষ্য। সারাদিন আর্থিক এবং পরিবেশের ঐতিহ্যের ক্ষতিসাধন করেও আমার চলে না, শেষে সামাজিক সেতুবন্ধনের নামে মানুষের চেতনাশক্তির বেদনাদায়ক ধ্বংসসাধনেও লিপ্ত হই। বন্ধুত্ব স্থাপনে বন্ধ্যা বলেই সারাদিন আমার চারপাশে বয়ে যাওয়া মানুষকে দেখলে বন্ধু বলে মনে হয় না। অসামাজিক-এর মতো সমাজবন্ধন অস্বীকার করে সামাজিক সেতুবন্ধন বা সোশাল নেটওয়ার্কিং-এ নিমজ্জিত হই। আমার স্বভাব অন্যের ক্ষতি করা, তাই সর্বক্ষণ অন্য মানুষ ক্ষতি করবে বলে ভাবি। অর্থ এই দাঁড়ায়, নিজের ক্ষতি সম্পর্কে আমি যথেষ্ট সজাগ। নিজেকে অক্ষত রেখে দৃষ্টিপথ থেকে দূরে অদৃশ্য বন্ধুর প্রতি নিজে কতটা বিশ্বস্ত তা প্রমাণ করার উদ্দীপনায় মাউস ক্লিক করি। কতখানি অবিশ্বস্ত আমার সামগ্রিক সত্তা! কতটা হৃদয়-বর্জিত! কতটা শেওলা-তছনছ! অন্যের অনুভূতি কিনতেও আমার এতটুকু বাধে না। দুনিয়াদারি করতে গিয়ে নিজের দূষিত হৃদয় হাজার টুকরো করে ফেলে রেখে আসি পথে। দূষণ ছড়ায়। দূষণের শিকার হয় অন্য আমি, আর ভগ্নদেহে-বাসা-বাঁধা আমি আরও দূষিত হই। আমার প্রাত্যহিক পরাজয়ের কথা কাউকে বলতে পারি না বলে অন্যকে পরাজিত করার উত্তেজনায় আমি ছটফট করি। ব্রিটিশদের অত্যাচারের ভঙ্গিমা আমার ভগ্নদেহ থেকে আমি এখনও অপসারিত করিনি। যদিও যার সঙ্গে নিত্য কথা বলা, যার ওপর জয়লাভের প্রবল লালসা – সেই মানুষটিও আমারই অপরূপ আয়নাচিত্র। পরাজিত! বহু আগেই সে পরাজয় স্বীকার করেছে। জলঢলা চোখে করজোড়ে বলেছে, আমি পারছি না। তাকে পরাজিত করে আকস্মিক উত্তেজনায় আমি বন্ধুত্ব নয়, বন্ধ্যাত্ব স্থাপন করে চলি প্রতি মুহূর্তে। সামাজিক অস্থিরতার ট্রলারে ভাসি দুই বিজয়ী অথবা দুই পরাজিত। দুই বিজয়ীর কথায় লিটারেচার মাড়ানো হয়, দুই পরাজিতের কথায় সৃষ্টি হয় সাহিত্য। আমার ডিজলাইক করার যান্ত্রিক ত্রুটি ফেসবুক-এ নেই বলেই আমি লাইক করে চলি ক্রমাগত। আর খণ্ড খণ্ড সাহিত্য সৃষ্টি হতে থাকে দুই একজন মানুষের সাথে। আমার শূন্যতায় বিলিতি মদে দুঃখ দিশি করে তোলাই আমার জিজীবিষার অঙ্গ – আমার ময়াল-ভয়াল ম্যানিফেস্টো।
ভেতরে কুকুরটা, ঘাড় উঁচিয়ে দেখে, এই সিংহদুয়ারটি ডিঙানোর কোনো প্রশ্নই নেই। বড়ো সঙ্গীবিহীন বলে মনে করে নিজেকে। অঞ্চল খুইয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে ক্লান্ত সারমেয়, আমার জখম অন্তরাত্মা, পরাজয়ের গ্লানিতে যার কোনো শিবমন্দিরের আশপাশ শুঁকে পা তোলার ইচ্ছাও জাগে না। বুঝেছে, যে-মুহূর্তে মুক্তির স্বাদ পাবে বলে ভেবেছে সে, সে-মুহূর্তেই তাকে ঘিরে অসংখ্য দেয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে। অনিশ্চয়তার ধসে সমস্ত পথ অবরুদ্ধ। চেয়েছিল সে, ভূমি থেকে আকাশে পক্ষীরাজকীয় উড়ান দেবে, কিন্তু জীবনের অনিশ্চয়তা তাকে ভূমি-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রে পরিণত করেছে।
জীবনের অনিশ্চয়তা, সে তো আর আমার মতো মাথামোটার ধারণা মোতাবেক চলে না। অনিশ্চয়তা নিজের শক্তি ও শক্তির অনুরণনে অনুরণিত হয়ে এগিয়ে চলে। ভূমিস্তরে সে গাছের শিকড় হয়ে জল শোষণ করে, আবার ভূমিকে দিয়ে আকাশের জল শোষণ করায়। ফুলের সঙ্গে দলাদলি করে অভিব্যক্তিকে রঙ দেয়, আবার রঙের সঙ্গে সমঝোতা করে দলীয় পতাকা হয়ে ওঠে। অনিশ্চয়তার ছলাকলা বোঝা কার সাধ্যি! কখনও সে দেবালয় হয়ে ওঠে, কখনও দেবালয়ে সে হয়ে ওঠে। কখনও তাকে পুরোহিত, কখনও দেবতা, কখনও মন্দিরের দ্বাররক্ষক রূপে দেখা যায়। মানুষকে সে কাজের শক্তি জোগায় কখনও কখনও। কখনও-বা এমন শক্তিহীন করে তোলে যে মনে হয় না এই দ্বিপদ নিজেকে পৃথিবীর অধীশ্বর রূপে ভাবে। যখনই দর্প-সম্মোহিত স্বভাব মাথা চাড়া দিয়েছে, অনিশ্চয়তা তখনই তাকে চুরমার করে দিয়ে অভাব-এ পরিণত করেছে। অনিশ্চয়তার এ এক বড়ো গুণ – উভয় দিকেই জ্যা রোপণ করতে পারে। সে তীরন্দাজের আশ্চর্য শর উভয় অণীকেই তীক্ষ্ণ ত্রিভুজ গঠন করে। যে চাইছে মারতে আর যাকে চাইছে মারতে, উভয়ের জীবনই তখন বিপন্ন। আর এই বিপন্নতা আছে বলে এখনও মানুষ ততটা অধীশ্বর রূপে নিজেকে ভাবতে পারে না, যতটা সে প্রকাশ করে তার উচ্চবর্ণীয় শব্দে, উচ্চমার্গীয় বাক্যে। যা হবে, তা অবশ্যম্ভাবী। যা হয়েছে, তা নিঃসংশয়ে হওয়ার কথা ছিল। মানুষের জীবনধারণ এক সুস্থির বর্তমানে জীবন-মৃত্যুর অতিক্ষুদ্র ব্যবধানে। বর্তমানের রক্তাক্ত ঘটমানতার বিরুদ্ধে সে গর্জে ওঠে, কখনও বা প্রশস্তি ছোটায় অভিমুখ বদল করে। তাই এমন ক্ষমতা তার নেই যে জীবনের অনিশ্চয়তাকে এক সুনিশ্চিত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে। নিয়মের চাকায় বেনিয়ম-এর স্পোক জুড়ে কতই বা অবরুদ্ধ করা যায় যুগের আহ্নিক গতি। প্রগতির নিজস্ব গতিশক্তির নিকট সময় নিজেই তো লোহার বেড়ি পরা দাসের মতো খাটে। সেখানে মানুষ তো সময়ের ক্রীতদাস! সে কিনা গলা ফাটায় প্রগতির হয়ে। ওই যেমন, কৃত্রিম উপগ্রহ পৃথিবীর বাইরে নিক্ষেপ করতে পারলে নাসারন্ধ্র থেকে সুতীব্র চিৎকার বেরিয়ে আসে; তেমনি লক্ষ লক্ষ কৃত্রিমতায়, কোটি কোটি অনুকরণে তার মনে চৌর্যবৃত্তির আনন্দ নানা কারিগরি জৌলুশ ধারণ করে বেরিয়ে আসে।
আমাদের এখানে একটি মন্দির, পাড়াতুতো মা-মাসিমা যেখানে উপাসনা করে থাকেন, সেখানে শিবলিঙ্গের লিঙ্গাংশ সম্প্রতি উধাও হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই কোনো ইতর ভেঙে নিয়ে গেছে। সেই ভগ্নাংশ দিয়ে সেই ভ্যান্ডাল কী করবে তা সে-ই জানে। তথাকথিত চোরের থেকে এ কিঞ্চিত আলাদা বলে কোনো বাঁধা ছকে তার হদিশ মিলছে না। ফলে সেই বাহাদুরের নামে নিন্দা করা ছাড়া তেমন বিশেষ উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়নি। উলটে নিন্দা এমন করা হয়েছে যা স্তুতিকেও হার মানায়। লিঙ্গহীন সেই খণ্ডপ্রস্তর এক অদ্ভুত রূপ পরিগ্রহ করাতে ভদ্দর পোশাক পরা লোকে তাকে নিয়ে বেশ হাসাহাসিও করল। পুরুষানুক্রমে তারা ছড়াতে লাগল, "ইট'স সো টাফ আ জব, না? গোটা একটা স্টোনের ওপর বিল্ড করা। হরিবল্! হাউ কুড হি ডু দিস..."
হঠাৎ শিবলিঙ্গ নিয়ে পড়লাম কেন জানি না। কেউ অভিজ্ঞতায় শান দিয়ে বলতে পারে, "বয়স বাড়ছে আর যত খারাপ দিকে নজর পড়ছে"। অভিজ্ঞ মানুষের কথা একেবারে নস্যাৎ করে দিচ্ছি না। তবে আমার কাছে বিষয়টা সম্পূর্ণ অন্য বার্তা নিয়ে এসেছে। চোর-এর নতুন সংজ্ঞা, চৌর্যবৃত্তির নতুন ডাইমেনশন নিয়ে এসেছে। ছোটবেলায় অনেক চোরের গল্প শুনেছি। লিচুচোর থেকে শুরু হয়েছিল। কিন্তু কিছু দিন আগে লিঙ্গচোরের কথা শুনে যারপরনাই চিন্তিত। আমারটা যদি এভাবেই কোনো দিন উপড়ে নিয়ে যায়! ভাবলেই শিউরে উঠছি। তাহলে কি লিচুচোরই অনেক বছর বাদে এখন লিঙ্গচুরিতে হাত পাকাচ্ছে? আমি নিজেরটা সামলে রাখি। সেফটির জন্য যদি অ্যাবডোমেন গার্ড পরতে হয় তাতেও রাজি। কারণ, আমার শিক্ষা আমার অন্তরকে বরাবর অরক্ষিত রেখেছে, পাখিপড়ার মতো শুধু শিখিয়েছে কীভাবে বাহ্য উপাদানে বহিরঙ্গ সুরক্ষিত রাখা যায়।
হঠাৎ শিবলিঙ্গ চুরি নিয়ে কেন উদ্বিগ্ন তা হয়ত স্বয়ং শিবই জানেন। শুনেছি, করজোড়ে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ডুকরে ডুকরে কেঁদে মনের বাসনাটি উজাড় করে দিলে তিনি দুর্ধর্ষ বিহিত করেন। এই আশাতেই তাই দিন কাটাচ্ছি। কিন্তু যতদিন না শিবের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারছি, ভয় তো থেকেই যায়। স্কুলে যাওয়ার পথে ভিতরে ভিতরে শঙ্কিত থাকি বইকি। না চাইলেও শিবাংশ চোখে পড়ে আর মাথার ভিতর বনবন করে পাক খায় ভরদুপুরে গোশালা থেকে গোরু চুরি হওয়া, মায়ের দেশের বাড়িতে সাতসকালে বাঁদরের আটার দলা নিয়ে চম্পট দেওয়া, বৃন্দাবনে কাকুর সানগ্লাস উধাও হয়ে যাওয়া, ইত্যাদি নানা কাহিনি।
আর একটা ঘটনা বলার জন্য ছটফট করছে মনটা। ছোটবেলায় একদিন মাকে বিস্তর অপদস্থ করেছি ভরা রাস্তার মাঝখানে। "গোরুর অতগুলো পাখি কেন?" লোকজনের মাঝে আরক্ত মুখে মা বোঝানোর চেষ্টা করছেন বাঁট কী কাজে লাগে ইত্যাদি। আমি বুঝলাম আমার মতো করে; কিন্তু আমার পাখি আর গোরুর বাঁটের পজিশনিং মোটামুটি একই হওয়ায় সন্দেহ দূর হল না। কিন্তু মা বলেছেন; বেদ মিথ্যে হতে পারে, মা নয়। আজ মনে হচ্ছে সময়-স্বয়ং মায়ের প্রতি সন্দেহের বদলা নিচ্ছে। ওইটুকু বয়সে বাঁট নিয়ে ঠাটবাট বিশেষ পছন্দ করেননি শিব।
শিব যেমন চটেছেন, আমাকে ঘিরে থাকা অনেক মানুষও তেমনি চটেছে। প্রায়শই শুনতে হয়, "আজকাল তো রিকশা ছাড়া এক পা-ও যাস না।" আমি নানা মিথ্যে বলি, ঢপ দিই। কিন্তু কখনও মুখফুটে বলি না, রিকশায় গেলে কত সেফ লাগে নিজেকে। লিঙ্গ চুরি যাওয়ার ভয় থাকে না। তবে হ্যাঁ, এত প্রিকশন নিয়েও যদি চুরি যায়, তাহলে রিকশাওয়ালাকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে। এবং পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করলে নিশ্চয়ই তাকে ডাণ্ডা মেরে ঠান্ডা করে দেবে। আমার সম্পদ উদ্ধার হোক বা না-হোক, আমি সম্পদ হিসেবে ভাবছি যাকে তার ওপর কতটা আমার অধিকার সে নিয়ে বিতর্ক হোক বা না-হোক, মারের মজায় ক্ষতস্থান ভরবে কিছুটা হলেও। কারণ, শ্রমজীবী প্রলেতারিয়েত ভার্সাস পুঁজিবাদী শিক্ষিতের অসম লড়াইয়ে শ্রমজীবী মানুষ নিদারুণ পরাজিত পরাভূত হয়, সেকথা তো বাচ্চার বাচ্চাও জানে।
পাড়ার শিবলিঙ্গ অথচ শিবলিঙ্গ নয় এমন প্রস্তরখণ্ড এক অদ্ভুত রূপ পরিগ্রহ করাতে প্রবীণেরা তাকে নিয়ে বেশ কৌতুক করলেন। সেই হর্ষ-মুখর কল্লোলিনী মোড়ে এর কানের কাছে ওর মুখ নিয়ে কী কী কথা হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। তাঁরাই বলে চলেছেন যাঁরা রোঁয়া-ভাঙা কিশোর-কিশোরীদের মুখে এসব কথা শুনলে চোখ পাকান এবং দেশটা উচ্ছন্নে গেছে বলে বউয়ের কাছে পিচ পিচ করে হাপিত্যেশ করেন। এমনিতে কী সেই অজ্ঞাত কারণ, যার জন্য ভারতীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে আমরা বহন করি না, তা আমার মাথায় ঢোকে না, তার ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে জ্বালাচ্ছে এই পুংলিঙ্গ-ভিত্তিক ধর্মাচার। যাই হোক, এলাকার মুখরোচক ভ্যান্ডাল-অ্যান্ড-স্ক্যান্ডাল সম্পর্কে হাসি পেলেও হাসি দলা পাকিয়ে রইল গলায়। মর্নিং ওয়াক বিশেষজ্ঞ ভারতীয় প্রবীণদের মুখ থেকে এই ভাষা নির্গত হওয়ামাত্র বুঝতে পারলাম, মূর্তিপূজার ঘনঘটা বৃদ্ধি পেলেও এই ভুবনডাঙা, নবীনে-প্রবীণে মিলে যার পত্তন হয়েছিল গ্রামীণ গৃহস্থের মন জুড়ে, বর্তমানে এই বাসনা-বিক্ষত শহরের অন্তরে সে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করতে চায় না।
আসলে চেষ্টা করছি হালকা হতে। কিছু গল্পের মাধ্যমে অনেক পরিবেশ হালকা হয়। হালকা হতে হতে ধীরে ধীরে বিশেষ কোনো বিষয়ে ঢোকার চেষ্টা করছি অথবা চেষ্টা করছি কোনো বিশেষ বিষয় থেকে বেরোতে। আড়াই মাসের ওপর হয়ে গেল, বেশ অবসাদে ভুগছি। অবসাদের কোনো নির্ভরযোগ্য কারণ হয় না। অনেক কারণের বড়সড় একটা যোগফল। অবসাদহেতু কাজকর্ম শিকেয় উঠেছে। অনুশীলনেও গাফিলতি হয়েছে। নিজের মেহনত করার সদিচ্ছাতেও চিড় ধরেছে। বন্ধুদের সঙ্গে ফোনাফুনি পর্যন্ত হয়নি। জালাধানে বসে ফেসবুক-এ মগ্ন হয়েছিলাম। যা করি না, তাই করছিলাম। দেখছিলাম, অজানা অচেনা মানুষের সঙ্গে চ্যাট করলে কীসের এত আনন্দ, যা আমার ছাত্রছাত্রীরা আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করে অহরহ। লেখাটা যখন গড়াচ্ছে তখন যন্ত্রণার পর যন্ত্রণা ধারণ করতে করতে কেমন একটা শূন্যতা নেমে আসছে মাথার দুপাশ দিয়ে। শূন্যতা থেকে শরীর ভাঙা। শরীর ভাঙা থেকে আবারও সিঁড়ি ধরে উঠে যাওয়ার প্রচেষ্টা। অসাড় মনটায় সতেজতা ফিরে আসছে, বুঝতে পারছি, কিন্তু বিষাদের ছাই উড়ছে চারপাশে। এও বুঝতে পারছি, ফিরে আসাটায় তেমন নিপুণতা নেই। শূন্যতা ভেঙে ঘষটে ঘষটে কোনোক্রমে এগোনো। এই অদ্ভুত এগিয়ে যাওয়ার সূত্রপাত হয়েছে সেই কলেজ জীবন থেকে। এসএফআই-এর নোংরামো, কিছু শিক্ষকের সূক্ষ্ম রাজনৈতিক চাল, ধ্বংসের মুখে পড়া অ্যাকাডেমিক কেরিয়ার, মিটিং মিছিল এবং প্রতিবাদে বন্ধুকে ঘাড় ধরে লাইন থেকে বের করে দেওয়ার শত শত দৃশ্যের ভিতর দিয়ে আমি এগিয়ে গেছি। এই এগিয়ে যাওয়ায় কিছু নাতিশীতোষ্ণ মানুষের মুখোমুখি হয়েছিও বহু বার। এরা অতি-শীত অতি-উষ্ণ আবহাওয়ায় সুদীর্ঘকাল কাটিয়েছে। তাদের দেখেই আরও এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পেয়েছি। প্রেরণা পেয়েছি, ক্ষমতার নয়, অক্ষমতার স্বাদ পূর্ণ করার। কতটা অক্ষম তা চেখে নেওয়ার মোক্ষম সুযোগ পেয়েছি। দিনান্তে হেঁটে ফিরি যখন, সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে মুহ্যমান, তখন ওই মেঘলা পথে আনীল-হলুদে স্নান করি। ভেসে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ, আমার জীবন-তরণির কাণ্ডারি যিনি। রেখার মতো ভেসে ওঠে তাঁর একটি লাইন... "জ্যোতিষ্কলোকের পথে রেখামাত্র চিহ্ন রাখিবে না।" অর্থাৎ পণ্যবাহী সেনাদল, সে যারই নিয়ন্ত্রণে থাকুক না কেন, মিলিয়ে যাবে, নিয়ন্ত্রক সহ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। পূর্বে হোক অথবা পশ্চিমে, উত্তর-দক্ষিণ নির্বিশেষে, ইতিহাস নিজেকে যুগ যুগ ধরে এভাবেই ইতিহাস করে তোলে। তাই ইতিহাস নিজের কাছেই বহুঋণে ঋণী। একই জায়গায় স্থির হয়ে জীবন-মরণের সীমানা ছাড়িয়ে সম্প্রসারিত করে তোলে নিজেকে। যেখানে তার বাহু আছে, বন্ধন নেই; যেখানে বন্ধন আছে, বাহু নেই। কোনো কিছুরই রেখামাত্র চিহ্ন থাকে না। তবু কেন জানি না, শূন্যতা ভেঙে বেরিয়ে আসার সময়েও আমার কোথাও যেন মনে হচ্ছে, কোথাও কোথাও যেন বেয়নেটের খোঁচায় মনে হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম আসলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি, মোটা রেখায় বেঁচে আছে। ক্ষমতার উৎস এবং ক্ষমতাকে গলাধঃকরণ করতে করতে সেই রেখাটি দীর্ঘ হয়েছে, বহু জায়গায় বাঁক খেয়ে গোলকধাঁধার মতো ছড়িয়ে আছে। গোলকধাঁধার রেখাংশ যে-যে জায়গা ছুঁয়ে গেছে, তাতে আর লিচুচোরের বেঁচে থাকার কথা নয়। লিঙ্গচোরও মারা যাবে। কিন্তু ভূমিচোর? ভূমিকে চুরি করতে করতে, গিলতে গিলতে সে প্রকাণ্ড হয়ে গেছে। আমার নোকিয়া মোবাইলে সাপের খেলা আছে – Snake Xenzia। অনেকটা তার মতো। কিন্তু সেই অরাজনৈতিক সাপকেও মাথায়-লেজে সংঘর্ষ বাধিয়ে নিমেষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে দেখেছি বহু বার।
কেন হঠাৎ ভূমিচোর সিপিএম-এর পিছনে পড়লাম। দুহাজার এগারোর বিধানসভা নির্বাচনের পর ওরা তো গেছে। পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক ভূমিদূষণ ভূমিক্ষয় ঘটালেও ওরা থেকে যেতে পারেনি। জনগণ ওদের রেয়াত করেনি। ওরা গেছে এবং স্বাভাবিক ভাবেই যা রেখে যাওয়ার কথা ছিল, তাই রেখে গেছে। এক পাহাড় আঁধার। এই আঁধার বড়ো বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন। যে-অন্ধকারে ওরা পরিকল্পিত হত্যার ভাস্কর হয়ে ওঠে। আর এই নিকষ অন্ধকারে কখন এসে ওরা আমার শ্বাসরোধ করবে, আমি টেরও পাবো না। চোখ আর কতটুকু দেখে। যা দেখার তা অন্য কোনো ইন্দ্রিয় গভীরভাবে বীক্ষণ করে। তবু আমরা এই মন নামক অশরীরী শরীরটাকে আজ অবধি ইন্দ্রিয়ের মর্যাদা দিতে পারলাম না। সেই মন কত দুশ্চিন্তিত, আজ তুলোমাত্র হলেও বুঝতে পারছি। অবসাদের সর পড়ে আছে এখনও। মনের ওপর জমে থাকা সেই সর কাটিয়ে যখন বর্তমান রাজ্যের দিকে তাকাই, তখন দেখি এক নতুন দল। নতুন ক্ষমতায়ন। নতুন ভাবনাচিন্তা, বসার আয়োজন। এখন যে দলটি মন্ত্রক-মসনদে তৎপরতা দেখাচ্ছে, সেই তৃণমূল কী করবে জানি না। এই মুহূর্তে কী করণীয় তার স্পষ্ট কোনো রূপরেখা আমার দৃষ্টিপথে আসে না। অতিরিক্ত ভাবলে বলিরেখা সুস্পষ্ট হবার সম্ভাবনা থাকে, শরীর-টরিরও খারাপ হয়, তাই চিন্তার পথ থেকে সরে আসাই ভাল। আমার যেটুকু জানা আছে তাই নিয়েই বরং লেখালিখি সারি।
জানা আছে কর্মক্ষেত্রে যেতে হবে, নিয়মিত ক্লাসরুমে ঢুকতে হবে, ক্লাসরুম টিচিং যা আমার কাছে একটা আর্ট বলে মনে হয়, তাকে বাস্তবায়িত করার প্রচেষ্টা করতে হবে। এবং প্রতিদিন নিজের ওপর সমবেদনার ঝুড়ি উলটে দিয়ে মাথা হেঁট করে বাড়ি ফিরে আসতে হবে এই ভেবে যে শিক্ষকই যখন দিশেহারা, সমস্ত পরিস্থিতি যখন তার প্রতিকূল, সে তখন নামেমাত্র শিক্ষাদাতা। আসলে সে, যে-অন্ধকারে পরিকল্পিত হত্যার ছক নিপুণভাবে সাজানো হয়, তাতে হারিয়ে গেছে কবে। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, যাকে সে এখনও চিনে উঠতে পারল না, বুঝে উঠতে পারল না। যে নিজেই পথ দেখতে পাচ্ছে না, অন্যকে পথ দেখাবে কী করে। যদি অন্ধকারে সে পথ খুঁজে না-ই পেয়ে থাকে, তবে এই পথ হারানোকে কীভাবে সে প্রতিষ্ঠা করল? এতকাল সে এগিয়ে গিয়েছে কোন মাধ্যমে? তার তো মানুষজন্ম; ওড়ার সাধ্যি নেই যে পাখসাটে বাতাস উতলা করে তুলবে; সাঁতারেও অপটু, তাই জলপথের সঙ্গেও তার জল-অচল বিভাজন। তাহলে কোন মাধ্যমে এগিয়েছে সে এত পথ বা শূন্য মাধ্যম? কে দেখিয়েছে তাকে? কী দেখিয়েছে তাকে?
কেউ দেখায়নি। কেউই পথে শিক্ষা দান করে যায়নি। পৃথিবীতে কেউ শেখাতে পারে না। শিক্ষা এমন এক আলো যা শুধু গ্রহণ করা যায়, আলোকিত করা যায় নিজেকে, অভ্যন্তরকে পূর্ণ প্রতিফলক রূপে ব্যবহার করা যায়। সেই প্রতিফলকে ঠিকরে পড়া আলোয় নিজের আত্মার মেঝে ও পরমাত্মার ছাদ মিশে এক আলোক-সত্তায় পরিণত করা যায় অন্তর। অন্তরে আলো-আহরণ ক্ষেত্রের সেই পরিধিটাকে ক্রমশ বাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। ব্যাসার্ধ থেকে ব্যাসে বর্ধিত করা যায় নিজের অজানাকে, নিজের জানার দীনতাকে। জানা আর অজানা নিক্তিতে ফেললে অজানার পাল্লা ওই যে ভূমি ছোঁবে, আর উঠবে না। না উঠলই বা, তাতে কী এমন আসে যায়! সত্যিই তাতে নিজের কোনো দিনই কিছু আসে যায় না। ওটাই তো জানার মজা। বলা ভাল, জানতে গিয়ে অনুশীলন-জাত আক্ষেপ-জাত মজা। তবে সমস্যা অবশ্য ওখানে নয়। অন্য কোথাও। জীবন একটি আদ্যপ্রান্ত প্রশিক্ষণ, আর তার অনুশীলনে কোনো কোনো প্রশ্ন আমাকে খুব বিচলিত করে। উত্তর খুঁজে পাই না। আমার ভাঙন ঘটায়। আমাকে ছুরিকাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে। যেমন একটি প্রশ্ন বিগত দুমাসে আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। আমি কতটুকু শিক্ষক, যতটুকু হেঁটমুণ্ড? আকস্মিক বজ্রপাতের মতো এই প্রশ্ন মনে উদয় হওয়ামাত্রই বুঝতে পারলাম আমি সরকারি স্টিকার লাগানো শিক্ষক হলেও এখনও প্রকৃত শিক্ষক হয়ে উঠতে পারিনি।
শিক্ষক শব্দটি বাদ দিই বরং। শিষ্টাচার, ক্ষমা ও কর্তব্যপরায়ণতা আমার ওপর প্রয়োগ করতে পারছি না। নিজের সততার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে বলা উচিত আবরণহীন আমিই আসল মানুষ। আবরণহীন মানুষটার রূপ কেমন? সে একজন স্থলবাসী, গৃহকাতর, কিছুটা দৃষ্টিহীন, কিছুটা অদৃষ্ট-নির্ভর, লোভী, বর্বরতা-প্রিয় একজন অপদার্থ। এবং অবশ্যই হেঁটমুণ্ড। সর্বত্র সে মাথা উঁচু করে মাথা হেঁট করে থাকতেই পছন্দ করে।
হেঁটমুণ্ডের পরিস্থিতি এখনও অনেক স্কুলে রয়েছে। ক্রুর রাজনীতির শিকড় চলে গেছে ভূনিম্নস্থ গভীরতায়, আর ডালপালা ছড়িয়ে পড়েছে স্কুল থেকে স্কুলের বাইরে। প্রশাসনিক কাঠামোয় এত ছিদ্র যে প্রধান শিক্ষক থেকে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পর্যন্ত সিপিএম-এর সার্বত্রিক বিচরণ। আশ্চর্যের বিষয় এখনও তার কামড়ের দাগ আমার গায়ে। কামড়ের ক্ষতচিহ্নও পুরোপুরি শুকায়নি। থেকে থেকে জ্বালা করে ওঠে। কোথাও সেই ভয়ংকর সিপিএম নেই; কোথাও নেই বলা ভুল, কোথাও কোথাও আছে এবং আমাদের স্কুল তাদের মধ্যে অন্যতম, যেখানে সিপিএম বিগ্রহ রূপে পূজিত হয়। সিপিএম কী? একটা সময়ের পর সিপিএম কার্যত কোনো দল ছিল না। দলীয় কাঠামোর বিন্যাসে ময়ালের মতো শুয়ে থাকা এক শীতল ভয়। দলীয় রাজনীতিতে ঘৃণ্য বাহুবলী লোকদের অন্তর্ভুক্ত করতে করতে শেষমেশ এই প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক নিয়ম বলে প্রদর্শিত করে এসেছে।
বিগত আড়াই মাসে আড়াইশো বার ভেবেছি চাকরিটা ছেড়ে দেবো। এই রাজনৈতিক চুল্লি থেকে আমার নিষ্কৃতি প্রয়োজন, নয়ত অন্তরের অন্তঃস্থলটা দগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিছু দিন যেতে না যেতেই মনে হল, চাকরিটা তো সহজেই ছেড়ে যাওয়া যায়, কিন্তু শিক্ষকতা তো ছাড়তে পারব না। ও ক্ষমতা আমার নেই। ক্লাসে যাওয়ায় একটা মজা পাই, শেখাতে কি আর পারি? যা শেখার ওরা শেখে। উপরন্তু ছাত্রদের ভালবাসলে, যৎসামান্য ভালবাসলে ওদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা যায়, আর এই শিক্ষা আমার কাছে মহার্ঘ; তাকে আমি ছাড়ি কী করে? তাহলে কেন চাকরি ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা এসেছিল? নিজের পরাজয়কে মেনে নিতে পারিনি বলে? চাকরি গেলে স্ব-নির্মিত স্কুলেই কি সারা জীবন কাটানো যেত? প্রাইভেট টুইশন করেই কি হিঁচড়ে হিঁচড়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যেত মায়ার সংসার, অক্ষ(র)যাত্রা এবং পরশমেলা-দের?
বন্ধুরা আছে। শেষ দুই ক্ষেত্রে অর্থের সংকট আসবে না। কিন্তু সংকট তখন অর্থের নয়, অন্য কিছুর। আর্থিক অস্তিত্বহীনতা এখন একটা সংকট বটে, কিন্তু তার থেকেও গভীরতর সংকটে বসে আছি আমি যা আমার তোমার আমাদের মায়ার সংসারকে তছনছ করে দিচ্ছে। আমি শিক্ষক বা শিক্ষক নামের আড়ালে এক বহুরূপী। আমার কত রূপ, কতশত ছদ্মবেশ, তাদের বিস্তারিত বর্ণনা আমার দুঃসাধ্য। কারণ, প্রতিটি নতুন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার বহুরূপতার বাড়বাড়ন্ত দেখে নিজেই বাকরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছি।
যে শিক্ষক লিখছে সে শিক্ষিত, এমন দাবি করে না। বিচার-বিবেচনায় সে-ই সবথেকে অশিক্ষিত। হ্যাঁ, আমার মনে হয় আমার ন্যূনতম শিক্ষা নেই। বাংলামাধ্যম বিদ্যালয়ের এই শিক্ষক অর্ধ-ইংরেজি শিক্ষিত দরিদ্র পিউপিলদের ট্রেনার তিনি। আমি নাকি ভাষা শেখাই। কীভাবে শেখাই? না, বাংলা বোঝাই ইংরাজি দিয়ে আর ইংরাজি বোঝাই বাংলা দিয়ে। যে-কোনো ভাষার প্রতি এহেন দুর্বিনীত আচরণে ভাষার সংহার করে চলি প্রতি মুহূর্তে। তাই ভাষা-শিক্ষক হলেও ভাষা-বিনাশের এক অবিনাশী শক্তি হয়ে উঠেছি ক্রমশ। আমারই অযত্নে-লালিত যে-ভাষা, তাকে আমি ছড়াব কীরূপে? যেমন আমি, তেমনি আমার চারপাশ। কত আমি ছড়িয়েছিটিয়ে সেখানে। কেমিস্ট্রিতে দিগ্গজ মানবিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী নয় এবং অন্য দুই মানুষের সম্পর্ক নিয়ে নিরন্তর কাটাছেঁড়া করে চলেন, তিনি নাকি সমীকরণ ব্যালান্স করার জন্য ছাত্রদের খুব পীড়াপীড়ি করেন। পদার্থবিদ্যা গুলে খাওয়া শিক্ষকের মুখে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রও শোনে অপদার্থ শব্দটি। অ্যাকাউনট্যান্সি-র শিক্ষক কতিপয় মানুষের ষাট-সত্তর লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। উনি নিশ্চয়ই সে-আর বাজার-এ দক্ষ। না, কাউকে আমি দোষ দিচ্ছি না। এঁদের প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত জীবনে চরম অসুখী। স্ত্রীকে চেনেন না ঠিকমতো, বা তিনিও পুরোপুরি চিনতে সাহায্য করেন না। বিছানায় লেনদেন আর সামগ্রিক অপরিচিতি। অসুখী বলেই এই শিক্ষকরা গোটা দুনিয়া কিনতে দুনিয়াশুদ্ধু লোকের কাছে ধার চেয়ে বেড়ান। স্কুলের নির্ধারিত সময়ে দেদার হাসিঠাট্টা বিলালেও দিনের শেষে তাঁরা হ্যাঙারে ঝোলানো কান্নাঘামভেজা নিঃসঙ্গ শার্ট। ভাতের অন্তিম গ্রাস দাপটের সঙ্গে মুখে তোলার সময়ও রসায়ন, পদার্থবিদ্যা বা অ্যাকাউনট্যান্সির কালিঝুলি মাখা শিক্ষক গিলে নেন তেতো আত্মগ্লানি।
আমি লিখছি, কিন্তু অক্ষরের বিদঘুটে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছি। অট্টহাসি শরীর চনমনে রাখে। ইনকাম বেশি করতে হলে শরীর চনমনে রাখতে হবে। আমরা ইনকাম করি। ইনকাম দরকার চুনকামের জন্য। চুনকাম দরকার কামের জন্য। অর্থাৎ চাকরি, মাইনে, ঘর, বউ। জয়োল্লাসে কেটে যায় সারাটা জীবন। তাই, আমাদের সমগ্র লেখা-পড়া-শোনা চলছে কর্মক্ষেত্র আর কর্মসংস্থান সঠিক ভাবে পড়তে পারা ও বুঝতে পারার জন্য। প্রত্যেকটি সম্পর্ককে কত দ্রুত অর্থে রূপান্তরিত করা যায়, তার শিক্ষায় আমরা শিক্ষিত হয়ে চলেছি। জীবনবিমা পরিষেবার হালহকিকত যে বুঝতে পারে না, তার মতো অশিক্ষিতের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমাদের বেঁচে থাকার গণ্ডিটা এতটা সীমিত হয়ে এসেছে যে বাড়ি থেকে স্কুল, স্কুল থেকে ব্যাংক এবং আপ-টু-ডেট থাকার প্রচেষ্টা। এবং জঘন্য কর্তৃপক্ষের পদলেহনে নিরন্তর নির্যাতন করে চলা অন্যকে।
অন্য কে? কর্তৃপক্ষ, না কর্তৃত্বের পক্ষ, না কর্তৃত্বের বিপক্ষ?
নতুন এসেছেন যিনি, তিনি সুবিধার জন্য পরীক্ষা শেষ না-হতেই বেরিয়ে যাচ্ছেন। তিনটে পঁয়ত্রিশে পরীক্ষা শেষ। তল্পিতল্পা গুটিয়ে দোড় মারলেন আগের গাড়ি ধরার তাগিদে, তিনটে পঁচিশ নাগাদ, যদিও ডিপার্চারের সময় দিলেন তিনটে পঁয়তাল্লিশ। "সুবিধা দিলে কে না সুবিধা নেবে?" এ-রকম একটি কথা, বাজারে যার বেশ প্রচলন, চড়া দাম, দারুণ বিক্রিও হচ্ছে আজকাল। আসলে, সরকারি চাকরির সিলমোহর পিঠে পড়লে একটা উষ্মা প্রদর্শন করার ইচ্ছা থাকে। আমাকে সুবিধা দিচ্ছে না, আমিই সুবিধাবাদী, কর্তৃত্বের পক্ষ। সিপিএম জমানায় আমার বাপ-ঠাকুর্দার অকর্মণ্যতার অহংকার আমি বয়ে বেড়াচ্ছি। আমাকে স্কুলে সাড়ে চারটে অবধি থাকতে হয় না। আমি তাকে সুযোগ করে দিচ্ছি আমার ওপর থাবা বসানোর জন্য, পঁচিশ আর পঁয়তাল্লিশের প্রভেদ জানা সত্ত্বেও। কিন্তু কাগজে-কলমে লিখতে গেলেও কি হাত কাঁপে না? কর্তৃপক্ষ দয়ার সাগর, তিনি বলেছেন – "লেখো।" দয়া পারস্পরিক বিনিময়যোগ্য অপরাধ। কর্তৃপক্ষের দিকে তার একটি দয়ার ভোটও আবশ্যক। কারণ এরাই কর্তৃপক্ষের বিরাট শক্তি। এই বিপরীত অপরাধে তাই তিনি অবাধে সায় দেন।
আচ্ছা, কতটা সুবিধা নেবো? সরকারি বা আধা-সরকারি স্কুলের চাকরি সতত সুখের। পাঁচটা ক্লাস + মোটা মাসমাইনে = শিক্ষক/শিক্ষিকা। মাঝে মাঝে খাতা দেখা। একজন রিকশাওয়ালা, যাঁকে ছটাকা উপার্জনের জন্য প্রায় ছয় মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করতে হয়, পরবর্তী যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে একজন শিক্ষকের প্রতি মিনিটে কমপক্ষে দুটাকা আয়, ঘুমালেও আয়, ঝিমালেও আয়, রাজনীতির আলোচনা করলে আয়, নারীর দেহসুষমা বর্ণনাতেও আয়, ব্লু-টুথে আদান-প্রদান করলেও আয়, ক্লাস ছেড়ে ক্লাসের বাইরে গ্যাঁজালেও আয়। পড়তি বিকালে রোদে বাড়ি যেতে কষ্ট হয় তাঁর। তিনি রিকশা ধরেন। রিকশাওয়ালা বলেন, "ছটাকা খুচরো হবে তো?" শিক্ষক জানান, "না, দশ টাকার নোট।" রিকশাওয়ালার মুখ অন্য দিকে ফেরে, "ও অধীরদা, নিয়ে যাও তো।"... তিনি অপেক্ষা করেন এমন যাত্রীর জন্য যার কাছে খুচরো থাকবে। শিক্ষকের আয় কিন্তু শিক্ষকের কাজের অনুপাতে হয় না। ক্লাসের বাইরে কথা বললেও তাঁর নির্ধারিত মাইনের একচুলও কেউ কমাতে পারেন না। সেই কারণেই আয়মুখী শিক্ষক আয়েশ করতে শেখেন প্রথম দিন থেকেই। আমরা শ্রমিক নই; প্রথম দিন থেকেই বাবু। আর বাবুরা শ্রমিকদের বাবু হয়ে ওঠার অধিকার শোষণ করেই বেঁচে থাকে। যে-ভাবে বেঁচেছিল বা আছে সিপিএম, যে-ভাবে বেঁচে আছি আমরা।
শিক্ষাক্ষেত্রে সরকার অনুমোদিত বাংলা-মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়ে নানা প্রশ্ন উঠে থাকে। যেমন, শিক্ষকদের বিএড-ওলা কোট-প্যান্ট আছে কী না। বিএড-ওলা কোট-প্যান্ট আছে অথচ পড়ানোর সদিচ্ছা নেই এমন শিক্ষক কতটা শিক্ষক সেই প্রশ্নটাই অধিক গুরুত্ব পায়। আমাদের যাঁরা শিক্ষক ছিলেন, তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা আমাদের ভাবায়নি কোনো দিন। আমরা তাঁদের অন্তরের চোখ দিয়ে দেখে এসেছি। মজ্জাগত হয়েছে – শিক্ষক হলেন শিষ্ঠাচার, ক্ষমা এবং কর্তব্যপরায়ণতা-র এক অত্যাশ্চর্য সম্মিলন। এখনও তাঁদের কণ্ঠস্বর কানে বাজলে তাঁদের আমরা দেখতে পাই। তখন ভয় ছিল, শ্রদ্ধাও ছিল। প্রাথমিকে, যে বড়দিমণি আমার বন্ধুকে ক্লাসে পড়া না-পারার অপরাধে বেত্রাঘাত করেছিলেন, সেই বড়দিমণিকে দেখেছি, টিফিন না আনার জন্য তার সামনে নিজের টিফিনবক্স খুলে দিয়েছেন। বিজ্ঞানের যে-শিক্ষককে দেখলে হাড় কেঁপে যেত, তাঁকে দেখেছি এক বন্ধুর মাথা ফেটে গেলে স্টাফ রুম-এ চোখের জল ফেলতে। যে-শিক্ষক "শরণাগত" বানান ভুল করার জন্য আমাকে তিনটে চড় কষিয়েছিলেন, তিনি কিছু দিন আগে আমি শিক্ষক হতে পেরেছি জেনে জড়িয়ে ধরলেন। সারাজীবন এই মানুষগুলো শিক্ষকতা ধারণ করে এসেছেন বলে এঁরাই প্রকৃত ধার্মিক শিক্ষক হয়ে উঠেছেন। শিক্ষা কাকে বলে, খুব বড়ো মাপের শিক্ষক কারা, এই কথা বোঝেন তাঁরাই যাঁরা শিক্ষা এবং সাক্ষরতার ভেদ সম্পর্কে অবগত। বিগত ইতিহাস বলে, সরকার-এর মূল লক্ষ্য ছিল ভোট ব্যবসা। আর তার জন্যই বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে পাশ করিয়ে সংখ্যাতত্ত্বের খেলায় মেতে উঠেছিল। প্রত্যেকটি নীতি শিক্ষকের শিক্ষাদান পদ্ধতিকে ভেঙেচুরে তছনছ করে ছাত্রকে প্রকৃত ছাত্র হয়ে ওঠা থেকে বাধা দিতে শুরু করল। যেন-তেন-প্রকারেণ কৃতকার্য-এর তকমা ধরিয়ে দেওয়া যখন একটা রাজ্যের শিক্ষানীতির মানদণ্ড হয়ে ওঠে, আমার গর্বের উত্তর চব্বিশ পরগনায় ২০১১ সাল অবধি সাক্ষরতার হার যেখানে ৭৮.০৭ শতাংশ১ তুলে শিক্ষার হইহই-রইরই পড়ে যায়, সে-রাজ্যের ভবিষ্যৎ অতল অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে বাধ্য।
খাতা দেখতে গিয়ে বুঝতে পারি, কী কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টা এ রকম দাঁড়ায়, কালির আঁচড় কাটলেই নম্বর দিতে ইচ্ছে করে। যতই উৎসাহ দেওয়া হোক, কতিপয় শিক্ষার্থী ছাড়া কেউ পড়াশোনার ধার ঘেঁষবে না। না-ঘেঁষারই কথা। কারণ অপ্রীতিকর রাজনৈতিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক অসাম্য, বেশ কিছু দলদাস শিক্ষকের ছাত্রছাত্রীর প্রতি দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, এবং বছরশেষে তাদের কেউ আটকাতে পারবে না এই প্রকট জাতীয়তাবাদী সত্য। তারা সোৎসাহে গুলাল মেখে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হবে এবং যথা সময়ে মাধ্যমিক/উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বিদ্যালয়ের গণ্ডি টপকাবে। আর আমি, নম্বর বিক্রির ব্যবসাদার, খাতা দেখেই চলব আর পাঁচ লাইন দশ নম্বর হারে নম্বর বেচতে থাকব। ক্লাসের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে সুকৌশলে হরণ করে নেওয়া হয়েছে অবসর ও আনন্দ, যা না থাকাতে ইন-ডেপ্থ রিডিং হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। স্কুলফেরত ছেলেপিলে সাইবার ক্যাফে-তে ভিড় করে। পড়তে যাওয়ার আগে পনেরো মিনিট বা আধঘণ্টা মনিটরে সেরে নেয় ক্রিকেট ফুটবল, অথবা বাবা-মা-র মোবাইলে খুঁজে নেয় সমস্ত ক্রীড়াজগতের আনন্দ, মুক্তির উল্লাস। এই মুক্তি মোহগর্তে পড়ার মুক্তি। উল্লাসের মুক্তি মোটেও নয়। উল্লাসের মুক্তি সমূল উপড়ে ফেলা সিপিএম-এর প্রাথমিক লক্ষ্য। পড়তে যাওয়া, নোট গলাধঃকরণ, আর পরিণতি... তোতাকাহিনি-র শেষটুকু। তবেই রাজার উল্লাস। বছরের পর বছর রাজদম্ভে পূর্ণ সিংহাসনে অলস ভাবে বসে থাকতে গেলে কৌশলে নির্যাতন করা রপ্ত করতে হয়।
আমরা বাবু এবং অলস বাবুরা প্রথম থেকেই ত্রুটিহীন নির্যাতনে বিশ্বাসী। ছাত্রছাত্রীদের নির্যাতন করার পিছনে উদ্দেশ্য হল এই, যারা আমাদের বিশ্বাস করছে, খাতা-বই খুলে হাতে ধরছে কলম, আমরা যদি নিজেদের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে তাদের বিরাট বর্তমানকে ছারখার করে দিতে পারি, তবে তারা তাদের কর্মজীবনে আয়ের মুখ দেখতে পাবে সামান্যই অথবা পাবে না। আমরা কর্মসংস্থান পড়ে বুঝতে পেরে ফর্ম ফিলাপ করে চাকরির পরীক্ষায় পাশ করে অর্থোপার্জনে মনোনিবেশ করেছি। তাই তারা ভবিষ্যতে আয় না করতে পারলে বা অত্যল্প আয়ের মুখ দেখলে অনেক অর্থ, যা গ্রহণ করার জন্য তারা কর্মসংস্থান-জয়ী হতে পারেনি এবং যা বিশ্বসংসারের বাটোয়ারার নিয়ম অনুযায়ী তাদেরই প্রাপ্য, তাদের হাতে না পৌঁছে উড়ে বেড়াবে সদরে বাজারে আড়ালে। সেই অর্থেও আমরা চাইবো দাঁত বসাতে। আমাদের খাটাখাটনির জিগির তুলে একটু গণ-আন্দোলন করলেই মাস মাইনে চাঁদ-চুম্বনে মত্ত হবে। আমরা তখন শ্রেণীকক্ষে উজ্জীবিত প্রাণশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব নির্যাতনের পরিমাণ কতটা বাড়িয়ে দেওয়া যায় তার ওপর। অথচ আমাদের বিশ্বাস করে খাতা-বই খুলেছিল যারা, তারা সেই দিনেও খাতা-বই খুলতে ভুলবে না, শিক্ষকের চরণে আস্থা অর্পণ করে আবারও শিকার হবে নিপীড়নের, প্রকল্পিত হত্যার। সকল উদ্দীপনা হারিয়ে সংসার বাঁচানোর তাগিদে বা অর্থের প্রয়োজনে এরা বাধ্য হবে রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের দ্বারস্থ হতে। সামান্য অর্থের বিনিময়ে তারা দাসখত লিখে দেবে ক্যাডারবাহিনীতে।
এই যাতনার কথা, সিপিএম-প্রদর্শিত শিক্ষাব্যবস্থার ভরাডুবির কথা এক ডব্ল্যুবিটিএ সদস্যকে কথা প্রসঙ্গে জানিয়েছিলাম। তিনি হাসলেন। সত্যি, ওষ্ঠ-অধরের সংযুক্ত-দিগন্তে কত রকম হাসিই না চলে। সেই হাসিটার দুটো ভাগ ছিল। প্রথমটি ছিল আমাকে তুষ্ট করার। অর্থাৎ, হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ – এই গোছের। পরেরটি ছিল অন্য রকমের। অনেকটা – আগে ওরা শাসন করেছে, এখন আমরা – এই টাইপের। মূল সমস্যার শিকড় সেই হাসিতে আরও গভীরে প্রোথিত হল। নৃমুণ্ড থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসা অট্টহাস্যের ঝাপটা গায়ে লাগতেই বুঝতে পারলাম আমরা এখনও প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠিনি। সিপিএম-আশ্রিত সুবিধা থেকে কংগ্রেসী বা তৃণমূলীয় সুবিধায় রূপান্তরিত হয়েছি মাত্র। কলপ হোক আর কেশকালা – লক্ষ্যটা তো স্থির – চুলকে চকচকে করে তোলা। আর চকচকে হলে তবেই না শিক্ষার চাকচিক্য!
একটা চিঠির কথা উল্লেখ করা যাক। সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ-এর সেক্রেটারি পার্থ রায়-এর সই-বাহিত সার্কুলার। সার্কুলার নং EMU/C/38A/10। সার্কুলাইজ করার দিনটি ছিল দশ নয় দুহাজার দশ। তখন সিপিএম জমানা। গোটা সার্কুলার এখানে তোলার ইচ্ছে নেই। শেষে তথসূত্রে ই-ঠিকানা২ দিয়েছি; প্রয়োজন হলে দেখে নেবেন। কী লেখা ছিল তাতে? তর্জমা করলে দাঁড়ায়, "সকল উচ্চবিদ্যালয় প্রধানদের জানানো হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের পরিপূর্ণ সজাগ করার জন্য যাতে তারা নজরদারদের প্রতি দুর্ব্যবহার এবং পরীক্ষার নিয়মনীতি লঙ্ঘন না করে। পরীক্ষাকেন্দ্রের আসবাব, উপকরণ অথবা অন্য যেকোনো বস্তুর ক্ষতিসাধন করার প্রচেষ্টাকে কঠোরভাবে বিচার করা হবে। উল্লিখিত ঘটনাগুলোয় জড়িত থাকা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীদের ফলপ্রকাশ স্থগিত রাখা হবে।"
পরীক্ষাকেন্দ্রের প্রকৃত ছবিটা কী রকম? মাধ্যমিক/উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাকেন্দ্রে নজরদারি করা এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। পরীক্ষা চলাকালীন গার্ড বেশি দেওয়া হচ্ছে বলে তারা যে-কোনো সময়েই দাবি তোলে এবং নিজেদের মধ্যে অশ্রাব্য ভাষায় কথাবার্তা চালায়। বেশ কিছু দিন যাবৎ শিক্ষকদের ওপর শারীরিক নিগ্রহ হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক অতীতে এ রকম ঘটনার নজির আছে। পত্রপত্রিকায় তা আলোচিত এবং সমালোচিত। ছাত্রদের অশ্লীল ভাষা শুনে শিক্ষকদের মানসিক নির্যাতন সহ্য করে যেতে হয় ৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিট। বকাঝকা করলে তা মানসিক অত্যাচার রূপে পরিগণিত হতে বিশেষ সময় লাগবে না। আর গায়ে হাত দেওয়ায় তো সম্পূর্ণ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলত তারা শিক্ষক-শিক্ষিকাকে হেনস্থা করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। দুঃখের বিষয়, একগুচ্ছ সরকারি নিয়ম বলবৎ করতে গিয়ে শিক্ষাদান পদ্ধতিই মার খেয়ে বসে আছে। পরীক্ষাকেন্দ্রে পাশে বা পিছনে বন্ধুর খাতা দেখে অথবা মাইক্রো-জেরক্স থেকে নকল করা ঘোরতর অপরাধ। আগে খাতা কেড়ে নেওয়া হত; এখন সে পদক্ষেপও গ্রহণ করা যায় না। বারংবার টুকলির শিল্পবিপ্লবে রাশ টেনে কাগজপত্র জানলা দিয়ে ফেলে দিতে দিতে একটা সময় নিজেকেই বড়ো অসহায় বলে মনে হয়। এবং এই অসহায়তায় তারা বেশ মজা পায়, হাসাহাসি করে। একটি দিন শাস্তি দিয়ে যদি ছাত্রটিকে ফিরিয়ে আনা যায়, কত কঠিন শ্রমের বিনিময়ে অন্নসংস্থান করতে হয় তা বোঝানো যায়, তাহলে সেই শাস্তি, হোক দৈহিক, প্রয়োগ করা উচিত বলেই আমি মনে করি। পরিস্থিতি কেন সেই রকম ভয়ানক পর্যায়ে যাবে যে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলাকালীন পুলিশি প্রহরা নিতে হয়? এই চিঠি পেয়েও আমরা কিন্তু অবলীলায় পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রহসন প্রবাহিত করে চলেছি। এই দুঃসাহস কি ৯৯৯টা সাবইন্সপেকটরের পদ থাকলেও ২০১১-র এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৬১৪টা১.১ পূর্ণ আছে বলে? ঘাড় ধরে কাজ করিয়ে নেওয়ার লোকের অভাব বলে?
মহাভারত-এ আমরা দেখেছি এক অদ্ভুত প্রবহমানতা। সাত্যকি কৃষ্ণের সারথি, আবার কৃষ্ণ, অর্জুনের। অর্থাৎ প্রয়োজনবোধে যে-কোনো কাজ দেশ ও দশের জন্য কাঁধে তুলে নেওয়া। মানুষ বড়ো চালাক। লালসার লাল পড়ে তার। বিভিন্ন কর্ম একই দেহে স্থান দেওয়া এবং বিভিন্ন দেহ একই কর্মের জন্য নির্মাণ করা – এই রহস্যময় জটিল অথচ সুন্দর এককর্ম-বহুমানব এবং বহুকর্ম-একমানব-যোগের ঐক্যবদ্ধ প্রবহমানতা নস্যাৎ করল অত্যাধুনিক মানুষ। দেখুন না, ওই চিঠিটা কি আমরা মেনেছি বিশেষ? একটি এককর্মের নির্দেশকে বহুমানব আমরা প্রবহমান করে তোলা থেকে বিরত থেকেছি।
তবে সিপিএম মেনেছে। রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট কাঠামো যখন নেই, পর্ষদের নির্দিষ্ট কাঠামো থাকতে পারে না। কাজেই এই চিঠিটা এসেছে ধারণা নিয়ে, শরীর নিয়ে নয়। কাজেই শিক্ষক পরীক্ষাকক্ষে থাকলেও সাধারণ মালিকানা ছড়িয়ে যাবে পরীক্ষাকক্ষে। নির্দেশ দেওয়া হবে, নির্দেশ লঙ্ঘন করার নির্দেশও দেওয়া হবে। এটাই সিপিএম-এর নীতি যা তারা অক্ষরে অক্ষরে মেনেছে।
আচ্ছা আমারই এত অস্বস্তি হচ্ছে কেন? জাতীয় সংগীতের সময় একাদশ-দ্বাদশের ছেলেগুলো যা খুশি করুক, আমার কী! আমি কেন সুবিধা নিতে পারছি না? আমি কি বোকা? সংকল্পের সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য ঘটাতে পারছি না বলে নিজেকে কি ভিতর-ভিতর অযোগ্য বলে ভাবছি? অন্যেরাও তো বাড়ি থেকেই আসে, পড়ায় আর কথা বলে, কথা বলে আর পড়ায়, বাড়িও যায়। সমস্যা কোথায়? নাকি সমস্যা তাদেরও হয়, তারা বুঝতে দেয় না। তেত্রিশ নম্বর ঘরে বসেছে বিড়ি সহযোগে তাসখেলার আসর। আমার এত উদ্বেগ কীসের? গোল্লায় যাক – আমি বলতে পারছি না কেন। ও স্যার, আপনাকে যদি বোকাচোদা বলি, আপনি কি সত্যিই আমার বিরুদ্ধে কোনো স্টেপ নিতে পারবেন? – এতে এত যন্ত্রণা পাওয়ার কী আছে। হতে পারে, শিক্ষকতা প্রবাহিত না করতে পারলেও, ছেলেটি যে কুরুচিপূর্ণ সংস্কৃতির প্রবাহ ঘটিয়েছে তার আঘাতে আমার রুচিপূর্ণ সংস্কৃতির নদীতে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ সৃষ্টি হয়েছে।
যন্ত্রণার সোপান বেয়ে উঠে এসে একটু খোঁজখবর নিয়ে বুঝলাম ছেলেটির বাচনভঙ্গির দশা এমন কেন। ছেলেটি আসলে আমাকে গালিগালাজ করেনি। ও আসলে গোটা শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকসমাজকে হেয় করে, পারলে থুথু ছিটিয়ে প্রতিবাদ করেছে। পঞ্চম শ্রেণি থেকে অকারণে মার খেতে খেতে বড়ো হয়েছে। ওর মায়ের প্রতি কোনো প্রাক্তন স্যারের অন্য নজর ছিল। বাবা নেই। আট বছর বয়স থেকে এই ষোলোর কোঠায় এসে সে সেই স্যারকে এক বিশেষ হাসি বিকিরণ করতে করতে ঘরে ঢুকতে দেখেছে বহু বার। ছেলেবেলা থেকে জীবনযন্ত্রণার শিকার হতে হতে বর্তমানের ঝাঁ-চকচকে শিক্ষায় শিক্ষিত হতে সে উৎসাহ বোধ করেনি। এদিকে পাশ করতে হবে। তাই সেদিন যখন পরীক্ষায় টুকতে দিইনি ওকে, ওর ক্রোধ তায় ওই সেকশনে ক্লাস না থাকার কারণে প্রকৃত স্নেহ-শাসন-বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ সেদিন আমার সামনে চলে এসেছিল। তার মায়ের সংসারে দারিদ্র্যের প্রবাহে ভাঙন ঘটিয়েছিলাম রুচিপূর্ণ সংস্কৃতিবান আমরাই। আমরা তার বিক্ষুব্ধ কলজেতে স্নেহ-মমতার এক মগ জলও ঢালতে পারিনি, অথচ শ্রদ্ধা তার কাছে আশা করেছি বালতি বালতি।
ষষ্ঠ শ্রেণির অপুষ্ট ছেলেটি, দু' বছর আগে ঝড়ে যাদের চাল উড়ে গেল, কত দিন স্কুলে আসেনি। একদিন আমাকে জানালো, ক্লাস এইটের পর সে ঠেলাগাড়ির বেগুনবিক্রেতা। "বাবার শরিল খারাব, বাবার পাশে দাঁড়াতে হবে।" একে কী শিক্ষা দেব আমি! পঞ্চম শ্রেণির ছোট্ট গোলগাল কঠোরতম মনিটর, যার দিকে কোনো সহপাঠি তাকালেই নাম লিখবে, তার বন্ধুর হার্টে ছিদ্র আছে বলে খেলতে পারে না, এই কথাটা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে ফেলল। তার বন্ধু হারিয়ে যাবে এই ভেবেই সে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে, অথচ আমরা বড়োরা, শিক্ষকরা ছাত্রদের হারিয়ে ফেলছি এর জন্য কী ফুলে উঠছে? দাদাগিরি-র প্রশ্ন হতে পারে। নবীনে-প্রবীণে কুৎসিত হাসি ছড়িয়ে উত্তর খুঁজতে পারে। সঠিক উত্তর – পার্স বা পকেটবুক। শিক্ষক-শিক্ষিকা-অভিভাবক-অভিভাবকের কৌশলজাত অহেতুক বিশৃঙ্খলা, লোকদেখানো ব্যস্ততা ও তার ছুটক্লান্তির ভিতর একমাত্র যাদের ভিতর অপূর্ব সময় কাটানো যায়, তাদের আমরা প্রতিনিয়ত ধ্বংস করে চলেছি সোল্লাসে। এই মুহূর্তেই যেমন একজনের কথা জোয়ারে ভেসে এল। সাত্যকি। মহাভারত-এ সে কৃষ্ণের সারথি হলেও তার সারথি এই যুগে হয়েছিল এক জটিল ব্যাধি। মাসকিউলার ডিসট্রফিতে আক্রান্ত হয়ে চলে গেল আমার পরম প্রিয় মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। প্রি-বোর্ড পরীক্ষা তার জীবনের অন্তিম পরীক্ষা ছিল। ভেবে দেখিনি আমরা একবারও, ওকে ওই গালিগালাজ দেওয়া ছেলেটি কী সাহায্যই না করত! পরিস্থিতির বলি হয়ে সেই চওড়া-কলজে ছেলেটি যদি হেঁটমুণ্ড না হতে শেখে, যদি সে জীবনভর কৃতবর্মা হয়ে অনুশোচনা করে কেন সাত্যকি এই যুগে তার কর্তব্য পালন করল না, উপরন্তু তাকে হত্যা না করে নীরবে নিজের প্রাণনাশ করল, তাহলে এই শিক্ষকের নিজেকে পরাজিত ভেবে আকণ্ঠ নীল অবসাদে ডুবিয়ে রাখার কোনো অর্থ আছে কী? ছাত্রদের প্রতি অনুরাগে দ্রবীভূত হতেই, চোখের কোণে তপস্যা-স্নিগ্ধ জল মহাপ্লাবনের অঙ্গীকার নিয়ে আসতেই মনে হল, আমি ততটুকু শিক্ষক, যতটুকু হেঁটমুণ্ড নই।
"রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছিল খুব ছেলেবেলায়। দেখতে দেখতে রাজনীতির অঙ্গনে কেটে গেল পঁচিশটা বছর। বিবেকের অমোঘ দংশন কখনও সঠিক স্বীকারোক্তির পথ প্রশস্ত করেছে; কখনও বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আত্মসমালোচনা – উন্মোচিত করেছে অন্তরের অন্তঃস্থলে জমে থাকা বাস্তব কিছু ঘটনা – যা একান্তভাবেই আমার নিজের উপলব্ধি।" (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কৈফিয়ত, উপলব্ধি)
বাস্তব একটি ঘটনা বিবৃত করা যাক। তখন খুব ছোটো, ভোটের সময় আঙুলে কালি লাগানোর জন্য বায়না করেছিলাম বাবার কাছে। ঘর্মাক্ত লাইনে শিশুমন যুদ্ধজয়ের বাসনায় তার পিতার সঙ্গে একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে। হঠাৎ একটি গুলির শব্দ ও হাজার কাকপক্ষীর ভয়ার্ত চিৎকার। শূন্যাকাশে ত্রাস ছড়িয়ে দিয়ে একটা শীতল কণ্ঠস্বর ছুটে এসেছিল, "সব ভোট যেন সিপিএম-এর দিকেই পড়ে।" যা হয় এরপর, শ্মশান-স্তব্ধতা এবং মানুষের লাইনের পিঁপড়ে-শান্ত অগ্রসর হওয়া। বিরাট অশ্বত্থগাছের পাতা ফুঁড়ে, বায়স-কুলের স্বচ্ছ চোখে চঞ্চলতা সৃষ্টি করে সেই ছোট্টো গোল গুলি কোন গন্তব্যে পাড়ি দিয়েছিল জানি না। তবে, পাড়ি দেওয়ার সময় ভীতি গতি ধারণ করে আমার বুক না ছুঁলেও প্রাণ ছুঁয়ে গেছিল। শৈশবের ভীতিই পরবর্তীকালে আমাকে শক্তি জুগিয়েছে। ভাঙনের নদী যে-প্রত্যয়ে নিজেকে গড়ে তোলে, সেই প্রত্যয়ে আমার শক্তি অর্জন সম্ভব হয়েছে। আর সেই অর্জিত শক্তিই কখন কানের কাছে শক্তিমুখ এনে বুঝিয়ে দিয়েছে, ঈশ্বর আসলে আমার নিহত সত্তার অন্তঃস্থলেই বর্তমান। গাছের গুঁড়ি, পায়রার ডিম, কাঠবিড়ালির বাদাম, ক্রিকেট বল হারিয়ে যাওয়া ইঁদুরের গর্ত – সমস্ত শক্তির কেন্দ্রস্থলে সমস্ত শক্তির আধার হয়ে ঈশ্বরের উপবেশন। সেদিনের সেই ছোট্টো গুলিটা ঈশ্বরকে বিদ্ধ করেছিল, আজ আমি নিশ্চিত, কিন্তু মারতে পারেনি। আমরা ধরাকে সরা জ্ঞান করে তুমুল চিৎকারে ঘোষণা করেছিলাম ঈশ্বরের অনস্তিত্ব।
তখন সিপিএম কংগ্রেস বুঝতাম না। আর তৃণমূল না-থাকার কারণে তার চিন্তাও আসত না। আমার খালি মাথায় আসত টারজান আর অরণ্যদেব। যে খবরের কাগজ বাবার পড়া হয়নি, সেখান থেকেই অরণ্যদেব-এর অংশ কেটে নিতাম। আঠা দিয়ে পুরোনো খাতায় সেঁটে সপ্তাহশেষে আবার পড়তাম। এবার টানা। এ এক বিরল অনুভূতি যেখানে রাজনৈতিক অপমিশ্রণের পোড়া-ছোঁয়া লাগেনি। নিজের সত্তার সঙ্গে খোলামেলা বৈঠক সারতাম দিন রাত। ঘুমের মধ্যেই অরণ্যদেব হয়ে উঠতাম, বনে-বাদাড়ে দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম বদমাইশ পেটানোর জন্য। তবে একলা নয়, সঙ্গে পেয়ে যেতাম হি-ম্যান এবং বাঁটুল দি গ্রেট।
আমারও... শীতল-শোণিত রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছিল খুব ছেলেবেলায়।... দেখতে দেখতে যে অঙ্গনে কেটে গেল তিরিশটা বছর তার নাম পশ্চিমবঙ্গ। বঙ্গের চেহারা বলতে কলকাতার চেহারা। অবক্ষয় আমার চেহারায় পড়লেও পশ্চিমবঙ্গের চেহারায় বড়ো বেশি যে। সেই কলকাতার বুকে বইয়ের স্তূপে ডুবে যেত কিশোর চোখ... এবিটিএ টেস্ট পেপার্স...
সেই এবিটিএ আমার মাধ্যমিক উত্তরণের সোপান ছিল। আশ্চর্য, বর্তমানে জীবিকাসূত্রে সেই এবিটিএ শব্দটি কানে এলেই গা গুলিয়ে ওঠে।... "বিবেকের অমোঘ দংশন," যদি জানতাম এই ভয়ংকর লোকগুলো ওই সংগঠনের সঙ্গে সজনে-গাছে-শুঁয়োপোকার মতো সংযুক্ত, পড়াশোনা চুলোয় যাক, টেস্ট পেপারস জীবনেও সলভ করতাম না। এখন... "উন্মোচিত করেছে অন্তরের অন্তঃস্থলে জমে থাকা বাস্তব কিছু ঘটনা" – আমার ভিতরের শিশুর বিস্ময়ে ত্রাসে রিভলবারের দিকে চেয়ে থাকা; সন্ত্রস্ত শিক্ষকের আড়াই বছরের সন্তান, স্ত্রী ও মা-কে বেঁচে থাকতে দেখেও নির্মূল না-হওয়া ভয় এবং একসঙ্গে বেঁচে থাকার ভয়-জারিত ক্রোধ। এইখানে কেউ হয়ত বলতে পারেন, এ-ব্যাটা তো ভাল মতো তৃণমূল ঘেঁষা, নেপথ্যে মমতার লেখা রেখে নিজের লেখাকে একটা কালজয়ী পথ্য রূপে সমাজ সংশোধনে মগ্ন হয়েছে।
আত্মসমালোচনার বিরাট মঞ্চ অক্ষ(র)যাত্রা-র পাতা, যেখানে আমি এখনও অব্দি কোনো রাখঢাক না রেখেই নিজেকে প্রবাহিত করেছি অক্ষরে। লেখা ও জীবনকে শব্দে বিঁধিয়ে এগিয়ে গেছি। এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হচ্ছে না। বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলতে দ্বিধা নেই, আমার ভিতরের কিশোরের সঙ্গে নন্দীগ্রামের কিশোরের একটা পার্থক্য বরাবর রয়েই গেছে। স্কুলের পড়াশোনায় ভাল ফলাফল করার নাকউঁচু ভাব আছে আমার। আমি ভাষার প্রতি যত্নবান, রুচি ও শুদ্ধতা নিয়ে আমি খুব পিটপিটে। ওই দিকে ওই কিশোরের স্কুলের প্রতি বিশেষ কোনো তৃষ্ণা নেই, বিতৃষ্ণাও নেই। সর্বশিক্ষা অভিযানে এই ছেলেটিকে আদৌ আওতাভুক্ত করা যায় কী না, বা সে স্কুলছুট কী না, সে নিয়ে কৃত্রিম টেবিলঝড় ওঠানো ছাড়া আমরা আর কী করতে পারি। যত বয়স বাড়ছে, আমার মধ্যে অভাবটা ক্রমশ গাঢ়তর হয়েছে; স্কুলের পড়াশোনা না করলে বরং প্রচুর বাজে সময় নষ্ট করার অনুভূতি থাকত না। আর একটু প্রকৃত কিছু, নিখাদ কিছু শিখতে পারতাম। আমার ভৌগোলিক পৃষ্ঠায় নদী ও গ্রাম কালো হরফ ছাড়া কিছুই নয়। সে কিন্তু কত কিছুই শিখেছে। সে এলিট নয় বলে তার কাছে ভাষা নয়, ছবিই প্রধান। নদীর প্রকৃত সংজ্ঞা তার অজানা নয়, গ্রামের ধারণাও তার নিখাদ। নিজের চোখের জলে সে ওই নদীটাকে ভাসিয়ে দিয়েছে; উপুড় হয়ে নিজের পাঁজর দিয়ে গ্রামকে ছুঁয়ে দেখেছে; ডিমের মতো একটা পাথরকে শুধু বিশ্বাস করেছে শিব রূপে, শিবলিঙ্গ রূপে নয়। ঈশ্বরের শক্তির আধার রূপে; উপেন, বিষ্ণু আর ঢ্যাবলাকে নিয়ে মাছ ধরেছে ঘন্টার পর ঘন্টা। চারের ওপর অগাধ আস্থা তার। আমি তো আস্থাহীন; তাই আমার কাছে চার থাকলেও আমি নাচার।
সিপিএম ভুলে গিয়েছিল, নিটোল বিশ্বাস যার আছে সে-ই পৃথিবীতে সবথেকে বলীয়ান সশস্ত্র সৈনিক। তাই গুলি চালিয়ে উপেন, বিষ্ণু আর ঢ্যাবলাকে মারলেও – মৃতদেহে ফ্ল্যাগ পুঁতলেও পুরো গ্রামটাকে নিস্তব্ধ নিস্তেল করে দিতে পারল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লিটল বয় যেমন হিরোশিমাকে ধ্বংস করলেও তার ঠিকানা বদল করতে পারেনি। বন্ধু বিয়োগে কিশোরটির যন্ত্রণা পরিমাপ করা আমার অসাধ্য। বুঝতে পারি সে ভয় পেয়েছিল এবং এটুকুই। সন্ত্রস্ত হয়ে গুদামে চালের বস্তার পিছনে লুকিয়ে ছিল সারারাত। আর ঠিক ওই বয়সে আমি... হোমওয়ার্ক শেষ করে ঘুমোনোর আগে রোমহর্ষক গল্প পড়ছি। অরণ্যদেবের খুলিগুহায় প্রবেশ করছি অ্যাডভেঞ্চারের অন্বেষণে।
হায় রে জীবন! আমি শুধু সাক্ষর হয়েই থাকলাম; ও কিন্তু ভয়াবহ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে চালের বস্তার পিছন থেকে বেরিয়ে এলো দিনের আলোয়। যেখানে দাঁড়ালো সেই ভূমিখণ্ডের নিচেই তার বন্ধুকে পুঁতে দেওয়া হয়েছে। ভাবলো সে, বন্ধুরা নিখোঁজ। গুলির শব্দ নেই। নিঝুম সকালবেলা। ততক্ষণে অনেকটাই শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু যেটুকু শেষ হয়নি, ওটুকুই ছিল শিখা। শিখা শাখা পেল, প্রশাখা পেল। লেলিহান হতে বিশেষ সময় নিল না; ছড়িয়ে পড়ল বহ্নিশিখা হয়ে।
ঘন্টার পর ঘন্টা মাছ ধরতে পারি না বলেই আমি সিপিএম-এর বিরুদ্ধে শক্তিহীন মূঢ়তা নিয়ে বাঁচি এবং বিপুল ঐশ্বর্যশালী বুদ্ধ চাই। আর সে পারে বলেই, সিপিএম ওর বিরুদ্ধে গিয়ে শক্তিহীন মূঢ়তা নিয়ে ভূলুণ্ঠিত হয় এবং সেই ভূমিতে দাঁড়িয়েই সে তাদের দিকে না তাকিয়ে সব হারানোর বেদনা নিয়ে চায় একটু মমতা। আমরা শিক্ষকরা কি তাহলে মমতা চাইনি? অনেকে চেয়েছেন। আমিও ব্যতিক্রম নই। কিন্তু অনেক আমি-ই পালাবদলের সুযোগে চেয়েছেন ষোল শতাংশ খাঁটি মমতা। অর্থাৎ, ১৬% ডিএ। অসুখ ট্যাবলেটে সারলেও লোভ তো ট্যাবলেটে সারে না। অনেকেরই এখনও আকাশ কেনা বাকি। তাই ষোলো শতাংশ মমতার কথা মাথায় আসতেই মনে হল যুগটা তো ট্যাবলেট-পি.সি.-র।
উপেন, বিষ্ণু আর ঢ্যাবলা গ্রামবাসী। মাছ ধরার কৌশল নিয়ে ওদের মধ্যে মতানৈক্য থাকলেও ওরা বিভেদহীন। ওরা প্রকৃত সারসের কাছে গেলেও সারস উড়ে যায় না। শহরের মানুষের কে বাঁচল, কে মরল তাতে কিছু আসে যায় না। এই শহর শুধু মানুষের অর্থ বোঝে। যেখানেই আর্থিক মধু সেখানেই হানাদারি মধুকরের ভিড়। অভিবাদন হ্যালোজেনের বিস্ফোরণে। হাটেবাজারে একসঙ্গে বাঁচার অনুভূতি এবং শপিং মল-এ একা বাঁচার অনুভূতি দৃশ্যত অনুভূত হয়। মলে যে-টাইলের ওপর হাঁটছি, তা আমার হাঁটাকে নিয়ন্ত্রিত করে। অনেক বেশি নিজের প্রতি আকর্ষিত হতে শেখায়। অন্যের দিকে চোখ পড়ে কম। আর বলবেন না দিদি, যা দাম – হাটেবাজারের এই অর্থহীন শব্দমণ্ডলী সেখানে অশ্রুত থেকে যায়, বা হয়ত সেখানে অশ্রাব্য। কিন্তু যাঁরা পুরাতন বৃক্ষশাখায় দোল খেতে পছন্দ করেন তাঁরা মলত্যাগেই বিশ্বাসী – এই অলাভযোগ্য কথা ট্রেডারদের কর্ণগোচর হতেই তারা তাঁদের মলমুখী করার অশ্রুস্নিগ্ধ আয়োজন করল। গ্রাম উঠিয়ে আনা হল শহুরে বিপণনকেন্দ্রে। মোক্ষম ইমোশনাল বিটিং! ফাইভ-পয়েন্ট-ওয়ান থেকে স্টিরিও সারাউন্ড ঢাকের বাদ্যি এবং হোম থিয়েটারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। কিন্তু আত্মীয়তা ঘনিষ্ঠতার তল ছুঁল না। বরং তাঁরা হাঁটতে শুরু করলেন ভয়ে ভয়ে, আশ্চর্যান্বিত পদক্ষেপে। নিজেকে সামলানোই দায় তো পাশে সন্তানের দিকে নজর দেবেন কী করে। সন্তান অবশ্য অনেকটাই এগিয়ে গেছে। এতটা এগিয়ে গেছে যে এখন সে কোথায়, কত দূরে, তাঁরা আর দেখতে পাচ্ছেন না। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ও ঢাকের শ্রুতিমধুর শব্দের ওড়না এসে পড়ছে চোখেমুখে। শান্তি তৃপ্তি আসছে, কিন্তু স্বাভাবিক ছন্দ কেটে যাওয়াতে পূর্বপুরুষ আর উত্তরপুরুষের নৈকট্য ও সান্নিধ্য ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে এই করিডরের মধ্যস্থতায়। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ থেকে রাতারাতি ডিজে-কে বরণ করে নেওয়া স্বাভাবিক ও সংগত কারণেই মুশকিল হল।
যেখানে এখনও গ্রাম আছে, সেখানে এখনও ভারতীয় প্রদীপের শিখা ওড়ে। গ্রামভিত্তিক সভ্যতার রস পান করেই যে ভারতের মাটির উর্বরতা বজায় থাকে তা নানা ছলেবলে শহর ভুলতে শিখেছে। ব্যবসার প্রয়োজনে শহর মানুষের নিবিড়তা লাভ করেছে। আর্থিক স্টেশন ছাড়া শহর নির্গুণ সত্তা। গ্রামবাসীদের একে একে শহরমুখী করার কারণে চামড়ায় বিচ্ছিন্নতার রং ধরেছে। আর বিচ্ছিন্নতা যেখানে, সেখানে আত্মিকতা-বিচ্ছিন্ন ভোগসুখবাদী বীজকে বপন করা যায় সহজে। সে বীজ কালক্ষেপণে চারা, চারা থেকে উদ্ভিদকুলের মধ্যে গরিমা-প্রদর্শনকারী মহীরুহে রূপান্তরিত হলে মানুষের মাথা থেকে চিরকালের মতো বেরিয়ে যাবে, প্রাচীন কালে মানুষ মানুষ হয়ে মানুষের পাশেই থাকত। একসঙ্গে বাঁচার অঙ্গীকার এবং পরস্পরকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস নষ্ট করে দেওয়া বর্তমান বাণিজ্যের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। নাহলে "এটা আমার কাঁচি, ওটা আমার পেস্ট, ওটা আমার ফোন," ইত্যাদি অপকথার জন্মই হত না, আর তা নাহলে পরিবারের সদস্যপিছু কাঁচি-পেস্ট-ফোন বিকোতো না। পশ্চিমবঙ্গের সর্ববৃহৎ ব্যবসায়িক প্রশাসন সিপিএম তার লক্ষ্যে পৌঁছেছিল পারিবারিক সদস্যদের মেরুকরণের মাধ্যমে। জন্মলগ্ন থেকে শিশুকে আমি কী শেখাবো তার ওপরই নির্ভর করে ভবিষ্যতে সে কী শিখবে, কীভাবে শিখবে এবং কীভাবে শেখাবে তার পরবর্তী প্রজন্মকে। ভোর ভোর টাটার টুথপেস্টে ছেলে রাহুলের মুখ ধুইয়ে, টাটার তেল মাখিয়ে স্নান করিয়ে, টাটা স্টিলের থালায় ভাত খাইয়ে, টাটার ব্যাগে বইপত্তর গুছিয়ে বাসে উঠিয়ে টা টা দিলে তবে না শিক্ষা। সন্ধেবেলা বাবা পড়া পেয়ে খুশি, নাও এবার টাটা স্কাই! রাতে দুষ্টুমি করে বাবার পাতে টাটা সল্ট ছিটিয়ে দেয়। রাহুল যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন এই পুরোনো বাড়ি আর ভাল লাগে না তার মায়ের। সোহাগ জড়ানো গলায় ঘড়ঘড়, "টাটা প্রজেক্টের ইডেন কোর্ট দ্যাখো না, জাস্ট সেভেনটি ফাইভ ল্যাক অনওয়ার্ডস।" মায়ের ভাল্লাগছে না তো বাবার কী করেই বা ভাল্লাগে! আর এই গোটা সাম্রাজ্যের মুক্তধারায় সিপিএম-এর চকচকে হাসি ঠিকরে বেরিয়ে আসে। ঠিক সেই মুহূর্তে আমি, দোর্দণ্ডপ্রতাপ শিক্ষক, প্রস্তুতি নিচ্ছি পরের দিন দশম শ্রেণির শুরুর ক্লাসেই পার্ল এস বাক-এর উদ্বাস্তু-গাথা "The Refugee" পড়ানোর লক্ষ্যে।
আমরা ভুলেই গেছি, গণমাধ্যমের দৌলতে, দেশে কত খবর রয়েছে কুৎসিত মর্মান্তিক রাজনীতি ব্যতীত। হিংসার ডালপালা বিস্তৃত হতে হতে এখন যে-স্তরে এসে পৌঁছেছে তা বড়ো ভয়ংকর। কতটা সুখকর একটি পত্রিকার প্রথম পাতার গুলিবিদ্ধ রক্তাপ্লুত লাশ, একটি শিশুর কাছে? যে এখনও বিছানা ভেজায়, ঠাকুমা-দিদিমা যার পশ্চাদ্দেশে আদরের বাড়ি মেরে ঘুম থেকে জাগান, মা যাকে পরম আদরে কাঁথা-কাপড় বদলে দেন, সেই শিশুটি তার বাবার কোলে বসে সংবাদপত্রের প্রথম পাতাটা প্রত্যক্ষ করে। ছোট্ট গোল মাথা। ছোট্ট ছোট্ট চোখ। ছোট্ট ছোট্ট হরেক চিৎকার। আমরা বলি সে কিছু বোঝে না, সে ছোটো। বিষয়টা গা ছাড়া দিয়ে ভাবার নয় মোটে। তার কথা ফোটেনি, তাই সে বলতে পারে না যে সে বোঝে সবই, প্রত্যেক দিন একটু একটু করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে সে বড়ো হচ্ছে। আমাদের দায়িত্ববোধও কম নয়। প্রত্যেক দিন আমরা তাকে বোঝাতে শুরু করি আমরা বড়োরা কতটা ধ্বংসপ্রবণ ও হত্যাপ্রিয়।... সে সেজে ওঠে পরম আদরে বিলাসে। নিত্য আমরা তাকে সাজিয়ে তুলি পাউডার, ক্রিম, রঙিন জামা আর... রক্তে।
ছোটোবেলায় কী শেখাচ্ছি? শিশু যখন খিলখিলিয়ে হাসে, বড়ো বন্ধুর পকেটে হাত চালান করে ক্যাডবেরির লোভে, তখন তাকে আমরা অতিমাত্রিক শুদ্ধতা ধারণ করে শেখাতে শুরু করব, গঙ্গা শুধু নদী নয় বাবা, গঙ্গা আমাদের মা। সেই শিশু বেশ খানিকটা বড়ো হওয়ার পর তাকে নিয়ে যাওয়া হল নদীমাতার সামনে। কত জল! অকুল পাথার! সে নির্নিমিখ চোখে দেখতে থাকল। আরও বড়ো হলে সপরিবার হরিদ্বার। কী অপূর্ব মহিমা! মা দুটো বোতলে প্রণাম করে গঙ্গাজল ভরে নিলেন। পুজোয় লাগে, সে দেখেছে। কিশোর থেকে অতি-কিশোরে রূপান্তরিত হওয়ার সময় একদিন তার চঞ্চল চোখে স্থির হয়ে গেল, "৩৬ বছরের স্বামী নিগমানন্দ কোম্পানি-সরকার যোগসাজশের বিরোধিতায় অনশনে বসেছিলেন হরিদ্বারের আশ্রম মাতৃসদনে।" আরে! এইখানে তো সে গিয়েছিল! অনশন শব্দের অর্থও তারা জানা। কতটা কষ্ট হতে পারে অনেক দিন না খেলে সে বোঝার চেষ্টা করে। হিমালয়ান স্টোন ক্রাশার কোম্পানি গঙ্গাবক্ষ জুড়ে বসিয়েছে স্টোন ক্রাশার ইউনিট। স্টোন ক্রাশার শব্দের অর্থ সে পাশের ঘরে অফিসগামী বাবার কাছে জেনে আসে। এই বার সে ভাবে, গঙ্গা তো আমাদের মা, তার বুকে স্টোন ক্রাশার! পাথর ভেঙে তার থেকে স্টোন চিপস তৈরি করছে কিছু বদমাইশ। তাহলে ওদের কাছে কি গঙ্গা মা নয়? মা তো কত আদরে বুকে জড়িয়ে ধরেন সন্তানদের। সেই বুকেই চলছে যন্ত্রাংশের অত্যাচার! পরিবেশের ক্ষতি! পবিত্রতার ক্ষতি! "উত্তরাখণ্ড সরকার ও প্রশাসনের পূর্ণ মদতেই পাথর খাদান ব্যবসার রমরমা বাজার।" সন্ধেবেলা। বাড়ি ফিরলেন বাবা। ছেলে সংবাদপত্রে যা পড়েছে, স্কুলের অংক-ইংরাজি-পড়া মুখস্থ করার পর, তা সবিস্তারে বলল। এবার তার প্রশ্ন, "আচ্ছা, এই নিগমানন্দ কাকুর কী হল?" বাবা-মা একটু হাসলেন নিগমানন্দ-এর পর কাকুর প্রয়োগে। তারপর অফিসফেরত জুতোর গিঁটজব্দ লেস খুলে বললেন, "কে জানে! মারা-টারা যাওয়ারই কথা। আটষট্টি দিন অনশন-ফনশন কেউ করতে পারে নাকি? কী পড়ছিস ছাইপাশ রাহুল! এখন থেকেই রাইস-এর অ্যাডের দিকে চোখটোখ রাখ!" বকুনি খেয়ে সে চোখ রাখতে চায় রাইস-এর অ্যাডে, কিন্তু সংবাদপত্রটা বড়ো পিছল, তাই চোখ পিছলে যায় সংবাদের বাকি অংশের দিকে... "আটষট্টি দিনের লাগাতার অনশনের পর মৃত্যু হল..."
মা রাইস-নিষিক্ত অ্যাডে পুরোপুরি সহমত পোষণ করলেন। "ওসব গঙ্গা-টঙ্গা রাখ, বাবা যা বলছে শোন্! পরে ইডেন কোর্ট-এ জায়গা পেতে হবে তো নাকি! গা রি রি করে এখানে থাকতে!" ছেলের কাছে গঙ্গা সচকিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। সে ভাবতে লাগল, তার মা-ও কি গঙ্গাজল এনেছিলেন শুধু ব্যবহার করার জন্য? সেই প্রণামের মধ্যে প্রণম্য অহংকারবোধ ছিল, কিন্তু তার পুজোর জন্য হরিদ্বার থেকে আনা বোতলভর্তি গঙ্গাজলে প্রকৃত অর্থেই ছিল "আমার প্রয়োজনে ওকে ব্যবহার" – এই রকমের একটি মানসিকতা।
এক গভীর যন্ত্রণা কিশোর মনে দানা বাঁধতেই সে বুঝে গেল, আমাদের দেশের সম্পদে শুধু অধিকার আমাদের। দেশের প্রধান সম্পদ মানুষ। কাজেই মানুষের ওপর অধিকার বসানোও আমাদের অধিকার। এই অধিকারের শিকড় বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবার পর তার রূপ হয়ে ওঠে অন্যরকম। আমাদের কারোর ওপর সর্বাধিকার আমাদেরই কারোর। যেমন জঙ্গলমহল-এর মানুষের ওপর যৌথবাহিনীর অধিকার। যৌথবাহিনীকে যারা চালায়, অর্থাৎ কেন্দ্র সরকার-এর অধিকার আবার যৌথবাহিনীর ওপর। তাহলে কেন্দ্র সরকার জঙ্গলমহল-এর মানুষের ওপর সর্বাধিকারের অধিকার কায়েম করতে পারে। ছেলেটি কলেজে পড়ে। সার্ফিং চলে ইন্টারনেটে। আর জালে মাছ পড়ার মতো তার চোখে এসে পড়ে তিউনিশিয়ার গণ অভ্যুত্থান ও স্বৈরাচারী প্রশাসক যাইনুল আবেদিন বিন আলি-র সরকারের পতন, মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক-এর তিরিশ বছর ধরে ক্ষমতার বুলডোজার চালানো এবং তার পুত্র গামাল-এর অর্থ গায়েব করার ইতিহাস। পশ্চিমবঙ্গে গণতান্ত্রিক কঙ্কালে স্বৈরাচারের মাংস-পেশি-স্নায়ুর অবস্থান তার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। সে বোঝে, কুঠার মুষ্ঠিবদ্ধ, যেমন খুশি তেমন কাটো। জঙ্গলমহলবাসী বলে, কাট বাঁশ; যৌথবাহিনী শোনে, কার্ট ব্লাঁচ!
আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় স্বেচ্ছাচারিতার ওপর গণতান্ত্রিক পালিশটা খুব ঝকঝকে। তিনি তো রাজ্ঞী নন, গণতান্ত্রিক ভারতের সোনিয়া গান্ধি এক অতিসাধারণ মানুষ। নিউ ইয়র্ক-এর মেমরিয়াল স্লোন-কেটারিং ক্যানসার সেন্টার-এ ভর্তি ছিলেন। সাধারণ মানুষ তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছিলেন। একজন দুবেলা ভালো খাবার খাওয়া মানুষও সেখানকার খরচপাতির হিসাব শুনলে আঁতকে উঠবে। যাই হোক, তিনি আরোগ্য লাভ করলেন কী না জনগণের প্রশ্নোত্তর পর্বের ঘূর্ণন সেখানেই। আমাদের কি ওঁকে বিদ্যাসাগরের মা প্রভাবতী দেবীর সঙ্গে তুলনা করা উচিত? প্রভাবতী দেবী ছেলের দেওয়া নতুন উলের শাল পরেননি, কনকনে শীত মোকাবিলা করার গরম জামাকাপড় গ্রামবাসীদের ছিল না বলে। সোনিয়া গান্ধি যদি গ্লোবাল ভিলেজের একখণ্ড ভারতের অধিবাসীদের সন্তানের চোখে দেখতেন, তাহলে পুত্র তথা ন্যাসরক্ষক রাহুলকে বলতেন, "সুইস ব্যাংক থেকে টাকাগুলো এনে দরিদ্র সাধারণদের রোগব্যাধি দূর করার জন্য ওষুধ কিনে দে।"
কলেজ পড়ুয়া ভাবে, সে যদি ভাল ভাবে পাশ করে চাকরি পেয়ে এলআইসি-র তাৎপর্য বুঝতে পারে, অ্যাকসিডেন্ট বেনিফিট পাওয়ার জন্য যদি বাবাকে অ্যাকসিডেন্টের আওতাভুক্ত করতে পারে, ঘরবাড়ি জায়গা-জমি সবই তার সর্বাধিকারে চলে আসবে। মাকে রেখে আসবে বৃদ্ধাশ্রমে। মাকে দ্বিধাবিভক্ত করে দিতে মা তো নিজেই শিখিয়েছেন। আর সে-ছেলেটিও সেই ধারাকে অক্ষুণ্ণ রেখে স্বপ্ন দেখছে সেভেনটি ফাইভ ল্যাক অনওয়ার্ডস...
যখন ক্লাসে যাই, আমার মূল লক্ষ্য থাকে আমরা এক সঙ্গে কিছু কাজ করতে চলেছি, তাই পারস্পরিক সহায়তা আবশ্যক। যেমন, বেঁচে থাকার ঐতিহ্য পারস্পরিক সহায়তা ব্যতিরেকে অসম্পূর্ণ। বাবা-মার অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত দায়িত্ব গ্রহণ করা, তাদের দ্বিতীয় শৈশবে যথাসম্ভব তাদের পাশে থাকা। টেক্সটবুকের পাতায় তাকে আশ্রয় করেই কিশোর মনে চিরপুরাতন উদ্দীপনার আঁচ জ্বেলে দিতে পারি কী না চেষ্টা করি। কিন্তু এখন বেঁচে থাকার সংজ্ঞা পাল্টেছে। মেয়েটিকে তৈরি করা হচ্ছে একা বাঁচতে পুংলিঙ্গের সাথে। ছেলেটি তৈরি হচ্ছে একা বাঁচতে স্ত্রীলিঙ্গের সাথে। উভয় বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। অর্থের নিজস্বতায় কর্তব্য-বিযুক্ত হয়ে স্বেচ্ছাচারী থাকার, সতত সুখে থাকার সংকল্প এদের মজ্জায় প্রবিষ্ট হবে, যা বাবা-মা শুরুতে শিখিয়েছিলেন। "তোরা তোদের মতো সুখে থাক, এইটুকু চাই। যা আছে, তোদের দিয়ে-থুয়েও আমাদের দিব্যি কেটে যাবে।" আর্থিক অহংকার প্রদর্শনের এর থেকে বড়ো নমুনা আর কী-ই বা হতে পারে। পাড়ার পুজো ছাড়া কোথাও কোনো অর্থদণ্ড না দিয়ে অর্থের যে সান্দাকফু গড়ে উঠেছে তার উচ্চতা এবং উচ্চতার অহমিকা মিলে আমাদের বেঁচে থাকার যুগপৎ ঔদ্ধত্য আকাশ ছাড়িয়েছে। ভোগ সম্ভোগে পর্যবসিত হলে যা হয়। জীবন অর্থোপার্জনের উত্তেজনায় কেটে যায়। বেঁচে থাকার সংজ্ঞা বহুপর্যায়ে শল্কপত্র মোচনের পর এখন শুধু এলআইসি বা মণিপুরম গোল্ডেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন ডাউন পেমেন্ট ক্যাশে। সঞ্চয় নামমাত্র করে কাঁচা পয়সায় নিজের জীবন উপভোগের মজা বেশি। আর দুজনের জীবন নির্বাহ করা তো আরও সহজ। কার্যত, বাবা-মায়ের শ্রাদ্ধতে তাক লাগিয়ে অন্যান্যদের সাধ্যাতীত ব্যয় করা যায়। সমাজ আশুতুষ্ট হবে। মৎসমুখী স্তুতি দেবে, "এইব্বড়ো মাছের পিস, খুব ভাল রান্না হয়েছে বাবা, খালি শেষে একটা গাদা চাইলাম, দিলই না! তোমার কোনো দোষ নেই, ক্যাটেরারগুলো যা!" অর্থাৎ, আনন্দম অর্থম। আন্না হাজারের পুঁজিশক্তি-সাহায্যপ্রাপ্ত বারো দিনের অনশনে ঢেকে যায় নিগমানন্দের আটষট্টি দিনের অনশন এবং আফস্পা৩(AFSPA)-নীতির বিলোপ চেয়ে মণিপুরের লৌহমানবী ইরম ছানু শর্মিলা-র প্রায় এগারো বছরের "অর্থ"হীন অনশন। কিন্তু সত্যিই কি ঢেকে গেল? মনোরমা হত্যাকাণ্ডের কথা মনে আছে? গা রি রি করা হত্যা? সিঙ্গুর নন্দীগ্রামেও কিন্তু এই ঘটনার পুনরাবর্তন হয়েছে। জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে আমার স্কুল পর্যন্ত এরকমই দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসন চলছে। স্থান মোতাবেক তার রূপের রূপান্তর ঘটেছে। সামরিক বাহিনীকে যা খুশি করার নির্দেশ যে-আইনে লিখিত, সেখানে বিচারে-ধর্ষণ নির্বিচারে-নিহিংসন ছাড়া সুশাসন আশা করা অসম্ভব। স্কুলে ডোনেশন নেওয়া হচ্ছে কার কাছ থেকে, যার দাদা চায়ের দোকানে কাজ করে, যে-রাহুলের মা সকালে বাসন মাজতে বেরিয়ে যান। সেই ছেলেটির জ্যামিতি বক্স নেই। সেই ছেলেটি যে-ঘরে বসে, সে-ঘরে ফ্যান ঘোরে না ঠিকমতো, অথচ প্রধান শিক্ষক-এর ঘর সহ অফিস ঘরে বসেছে ফ্লোর টাইলস। দিনে দিনে স্টাফ রুম স্বাচ্ছন্দ্যের বার্তা বহন করবে আশা করি। আমরা নাকি ছাত্রদরদি; ছাত্রদের কাছে শ্রদ্ধা আশা করি। হত্যার এও এক নিপুণ ছক। এই ছকে আমি কিন্তু আর্য-অনার্য সবাইকে মিশে যেতে দেখি। অন্যকে হত্যা করে আমার বেঁচে থাকা। যার দোকানে চা পান করি, তার ছেলেকে হত্যা করেই আমার দৈনন্দিন বেঁচে থাকার উৎকর্ষ কতটা বাড়লো বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করি। নোংরা বোতামহীন জামা পরে আসার কারণে সর্বশিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষক স্বাধীনতা দিবসের দিন তাকে সারির শেষে পাঠিয়ে দেন। সেই অপুষ্ট দুর্বল ছেলে মাটিতে মিশে যায়, যখন বোঝে সে মিশে যাচ্ছে, মাটির ভিতর ঢুকে যাচ্ছে তার হাত পা মন মানসিকতা, তার মনে পড়ে তার মাকে, রোজগেরে দাদাকে। স্বাধীনতা এই সার্ফ-সোডা-বর্জিত প্রোলেতারিয়ান বালকটির কাছে তখন বোঝাস্বরূপ। সেও হয়ত বুঝবে, এইট বা তার আগেই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে দিয়ে, জঙ্গলমহল জনমানবহীন না করতে পারলে জঙ্গলে মহল বানানো যায় না।
আমরা যে-শিক্ষা দান করি, সিপিএম-প্রশিক্ষিত বাকপটুতার গুণে, তার সঙ্গে আমাদের জীবনের কোনো যোগ নেই। ছেলেবিলে বোঝে, রবীন্দ্রনাথ এদের মুখোশ, মুখোশ তুলে ফেললে ডিজে গেয়ে চলেছে – রবীন্দ্রনাথের রিমিক্স – থোড়ি সি তো লিফট করা দে।
ফেসবুক-এ পরিচয় হওয়া আমার এক অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু নিছক মজা করেই বলেছিলেন, "চাইলে মাসে প্রচুর টাকা আপনি আয় করতে পারেন।" আমি তাঁকে আমার সীমিত আয়ের প্রতি দুর্বলতা এবং আস্থাশীলতার কথা জানিয়েছিলাম। এই কথার পিছনে যথেষ্ট ভাবনা ছিল। আমি যা কাজ করি, শিক্ষক হিসেবে, ধ্বংসের যে-পরম্পরায় আমার অঙ্গীভবন, তাতে আমার মনে হয়, আমার মাসমাইনে অনেক কম পাওয়া উচিত, তৎসহ ডিএ, ইনক্রিমেন্টেও ইতি টানা উচিত সরকারের। শিক্ষকের কর্মসূচক অনুযায়ী আমার বাড়তি প্রাপ্তিযোগ ঘটছে ফিমাসে। দেশ ও রাজ্যে গণতান্ত্রিক কাঠামোয় ছোটো ছোটো অসংখ্য স্বৈরতন্ত্র রয়েছে, পরিবার থেকে শুরু করে উচ্চতম প্রশাসনিক কাঠামোয় অস্থিমজ্জার মতো যা গ্রথিত; মূল লক্ষ্য অন্যকে ধ্বংস করে এবং অন্যের অন্নকে কেড়ে নিয়ে হত্যাকারী শাসক বা একাপ্রভু রূপে বেঁচে থাকা। সৌরজগতে সূর্য-তারকা-গ্রহ-উপগ্রহগুলোর ব্যবধানেও কোথাও এই বিধ্বংসী মনোভাব গোচরে আসে না। কান পাতলে সূর্যকেও বলতে শোনা যায় – "ওরে বৃহস্পতি, কক্ষ-চ্যুত হ'সনে বাপ, আমি ভারসাম্য হারাবো।"
আমি ভার, তোদের ওপর চেপে বসব। তোরা সেই ভার গ্রহণ করে আমায় সাম্য প্রদান করবি। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম এই কাজটি করে গিয়েছে নিপুণভাবে। পোপ ষোড়শ বেনেডিক্টের কথা মনে পড়ছে। দুহাজার সাতে রোমে ফিরে আসার আগের এক রবিবার – "মার্ক্সিস্ট সিস্টেম, যেখানেই সরকারে প্রবেশ করেছে, শুধু আর্থিক এবং পরিবেশের ঐতিহ্যের ক্ষতিসাধনই করেনি, মানুষের চেতনাশক্তির বেদনাদায়ক ধ্বংসসাধন করেছে।" একের থেকে অন্য এক-কে আলাদা করতে শিখিয়েছে এবং প্রত্যেককেই শিখিয়েছে, "তুমি প্রভু হয়ে ওঠো।" অন্যকে ডলে পিষে প্রভু হয়ে ওঠার ইচ্ছা প্রত্যেকের মধ্যে জাগানো মাত্রই প্রভুর স্থান দখলের জন্য খেয়োখেয়ি বেশ ভালই চলতে শুরু করল এবং পরিশেষে মার্ক্স-এর তত্ত্বের ওপর যুযুধান দুই শ্রেণি সংগ্রাম করতে করতে মারা গেল। মার্ক্স দাসত্বকে ঘৃণা করতেন বলে তাঁর উত্তরসূরী সিপিএম অন্যকে ক্রীতদাস রূপে চালাতেই পছন্দ করে। তাদের চোখে শ্রেণিশত্রু বলে কিছু নেই; গোটা শ্রেণিটাই শত্রু। একের পর এক ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে একচ্ছত্র ক্ষমতা নিয়ে বেঁচে থাকে সিপিএম এবং তাদের ন্যাওটারা। এটাই সিপিএম-এর গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র। যক্ষপুরীতে ক্ষমতার শীর্ষাসন দখল করা। যারা সমাজের প্রায় সমস্ত শ্রম নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন, সেই শ্রমজীবী মাথাগুলো থেঁতলে ব্যালান্স করে দাঁড়িয়ে থাকা। প্রকারান্তরে, গোটা সমাজকে ভারসাম্যহীন করে দেওয়া।
অবসাদের ভিতর চিন্তাস্তিত্বে ভেসে থাকতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, দুধমধুর বিলাসে বেড়ে ওঠা রাহুল, রাইসখেকো পিতামাতার নীলমণি রাহুল, এবং ক্লাস ফাইভের নোংরা রাহুল সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারত-এর সর্বসূক্ষ্ম স্বৈরতন্ত্রের শিকার হয়ে রাজা-অমাত্য-ভৃত্য হয়েই রয়ে গেছে।
আমার বেঁচে থাকার, আমার শিক্ষক হয়ে ওঠার অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন এই শেষোক্ত ছেলেটির ভিতর দিয়ে উপলব্ধি করতে চাইছি। ওকে জড়িয়ে ধরেই আমার একপ্রজন্ম বেঁচে থাকার এবং আরেক প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রাখার দুর্ভেদ্য অঙ্গীকার। ওকে জড়িয়ে ধরলেই আমার ভিতরের আলো আরও ভিতরে অন্তর্মুখী মুক্তির খোঁজে ছড়িয়ে যায়। কিন্তু যখন অবসাদ, তখন এই অঙ্গীকার অঙ্গীভূত হয় নিশ্চল মনোবেদনায়। স্তব্ধতা দণ্ডি কেটে এগিয়ে আসে। আমি পিছিয়ে যাই।
বাইরে আমি নানা বেশে, নানা ছলে ঘুরে বেড়াই। অথচ অন্তরে সেই আমিই এক ভিন্নমাত্রার স্তব্ধতায় বসে থাকি এখন। সেই স্তব্ধতাই আমার অনন্ত আকাশ। সেখানেই আমার বন্দিমুক্তির সাধনা। পিছিয়ে যাওয়ার তীব্র পরাজয় ও আত্মগ্লানির ছাপ চোখেমুখে। কে পরাজিত করল আমায়? কেনই বা পরাজয় স্বীকার করলাম? কেনই বা পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হলাম? যার কাছে পরাজয়, সে কি ব্যক্তিসত্তা না বস্তুসত্তা, নাকি অকিঞ্চিতকর হলেও আমার দুঃসহনীয় চিন্তার পিউপা থেকে সে তার প্রকাণ্ড শরীরটা ধারণ করেছে? যার কাছে আমি পরাজিত, সে কি আমার পরাজয়ের সময় নিজেকে জয়ী হিসেবে ভাবতে পেরেছে?
কদিন আগে কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার পড়ার চেষ্টা করছিলাম। এ-রাজ্যে যারা জয়ী, তাদের বোঝার চেষ্টা করছিলাম। অত্যাচারীর ছায়ামূর্তি চিনতে না পারলে সিপিএম-কে চেনা কঠিন, এমন একটি ভাবনা আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু আমি তো সিপিএম হতে চাই না, বা তেমন কোনো কিছু হয়ে ওঠার বিশেষ কোনো সম্ভাবনাও নেই। কিন্তু পড়তে হবে; অত্যাচারীর ছায়ামূর্তির স্বরূপ উদঘাটন হওয়া প্রয়োজন বইকী। ইন্টারনেটে marxists.org থেকে তণ্ডুলমাত্র পড়ার চেষ্টা করলাম। মার্ক্স, লেনিন পার হয়ে ট্রটস্কির একটি বইয়ে হাত দিলাম, "ফ্যাসিবাদ কি ও কিভাবে প্রতিরোধ করিতে হইবে"৪। সেই চৌত্রিশ পাতার পিডিএফ-এর "বাংলা সংস্করণের মুখবন্ধ"-তে কটি অংশ আমার কাছে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হল। তুলে ধরছি বাঁকা অক্ষরে, চেষ্টা করছি বিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ের বাইরের সমাজের সঙ্গে আমার ফ্যাসিস্ট জয়যাত্রা ও আত্মার পরাজয়কে মিশিয়ে দেওয়ার...
এই পুস্তিকাটি ট্রটস্কির ফ্যাসিবাদের উপর লেখাগুলি থেকে গৃহীত সংকলন। ট্রটস্কি লেনিনের পাশাপাশি রুশবিপ্লবের অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন। পরবর্তীকালে তৃতীয় আন্তর্জাতিক যখন ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের কৌশল হিসাবে পপুলার ফ্রন্টের লাইনকে সামনে তুলে ধরল, তিনি তার বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। ভারতবর্ষে পপুলার ফ্রন্টের ক্ষতিকর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছিল – যখন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি (সি.পি.আই) আগস্ট-৪২ এর আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল। পরবর্তীকালে বাস্তব অবস্থার চাপে তারা তাদের ভুল সংশোধন করলেও পপুলার ফ্রন্টের ধ্যানধারণা আজও ভারতবর্ষের বামপন্থীদের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে পপুলার ফ্রন্টের ধ্যানধারণাকে প্রথম থেকে বিরোধিতা করেছিল বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল (আর.এস.পি)।
আর.এস.পি ট্রটস্কির অনেক মূল্যায়ণকে সঠিক বলে না মনে করলেও তারা জন্মলগ্ন থেকে “পপুলার ফ্রন্ট” অর্থাৎ বুর্জোয়াদের এক অংশের সঙ্গে সহাবস্থানের নীতিকে বিরোধিতা করে লড়াই গড়ে তুলেছিল।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরবর্তীকালে আর.এস.পি নেতৃত্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করে “বুর্জোয়াদের সঙ্গে সহাবস্থানের” নীতিকে গ্রহণ করেছে। আজ তারা সি.পি.আই, সি.পি.আই.এম এর হাত ধরে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের চৌহদ্দির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর বিপরীতে রয়েছে সি.পি.আই.এম.এল. লিবারেশন এর মতো বামপন্থী দলগুলি যারা বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অধিকতর বিপ্লবী অবস্থান গ্রহণ করেছে। তবে ঐতিহাসিকভাবে “পপুলার ফ্রন্ট” এর রাজনৈতিক লাইনের সমর্থক হবার দরুন তারা অতীতে বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের সাথে জোট গঠন করেছিল। ভবিষ্যতে এই ধরনের ঝোঁককে প্রতিহত করার জন্য মতাদর্শ বিতর্কগুলি চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। ........
কী হবে বিতর্কগুলি চালিয়ে? বিতর্কে কি তেজদৃপ্ত পাথরকে মৃদু ঘাসে পরিণত করা যাবে? নাকি বজ্রপাতকে আকাশ করে দেওয়া সম্ভব? বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল সিপিএম-এর সঙ্গে এঁটুলির মতো এঁটে আছে, কেন? অভিলাষ, ওই গগনচুম্বী ক্ষমতার ভাগীদার হওয়া। প্রত্যেকের মূল লক্ষ্য মানিব্যাগে বিস্ফোরণ! এখন ফ্রন্ট, পপুলার ফ্রন্ট, বামপন্থা, বুর্জোয়া – এসব রাসভারী তত্ত্ব তথ্য রূপে বইয়ের পৃষ্ঠায় মুদ্রিত করা বাঞ্ছনীয়। পড়ুয়া গবেষকের জন্য আদর্শ বই – কে, কবে, কেন, কোথায়, কীভাবে-তে ঠাসা। ওসব মুদ্রণ দলীয় রাজনীতির চোখে মুদ্রণ প্রমাদ। নাহলে দলের শরীর টিকবে না, দুর্বল হয়ে যাবে। বর্তমানে, রাজা-অমাত্য-ভৃত্যের জগতে যেকোনো নীতির সর্বশেষ দুর্দান্ত রূপটি হল ফ্যাসিবাদ। সেখানে নমনীয়তার কোনো স্থান নেই। উরু কাঁপানো ত্রাস ছড়িয়ে উগ্রতা উগরে দেওয়া, ব্যাসার্ধ থেকে ব্যাসে পরিণত করা ক্ষমতাকে। যে-ছেলেকে ঘিরে আমার ঘর নির্মাণ করব, ঘর নির্মিত হলে সকলের গোচরেই তাকে আমি উঠোনে গেড়ে দেব। যদি গোচরেই হয়, তখন কেন কেউ প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠবে না? কারণ তখন প্রত্যেকেই অন্যকে ঝাঁট দিয়ে মটরদানার মতো পথ থেকে সরিয়ে একাপ্রভু হয়ে ওঠার নেশায় আরন্ধ্র মাতাল। গোটা পৃথিবীর ওপর কর্তৃত্ব স্থাপনের রীরংসা জেগে ওঠে তখন। পুঁজির পাঁজি খুলে বসে প্রত্যেকে।
মুসোলিনি বলেছিলেন – "ফ্যাসিবাদ, যা নিজেকে নির্ভীকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল বলে ঘোষণা করে, নিজেকে সমস্ত রকমের উদারনীতির বিরোধী বলে ব্যক্ত করতেও দ্বিধাবোধ করে না।" জীবনে এটা মেনে এসেছি বন্ধুত্বের একটা অদ্ভুত গুণ বর্তমান। বন্ধুত্ব আনন্দকে দ্বিগুণ করে, দুঃখকে অর্ধেক। আমার প্রিয় শ্রদ্ধেয় সেই শিক্ষক-বন্ধুর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে গাঢ়তর। তার সঙ্গে এই যোগ, চায়ের দোকানে আড্ডা, উদারমনে পারস্পরিক মত বিনিময় হচ্ছে জানতে পারলেই ফ্যাসিস্ট সিপিএম-এর গাত্রোদাহ হত। আস্থা যেখানে সম্ভ্রম, ঐক্য যেখানে অপরাজেয় শক্তি, সেখানেই তারা বিপদের গন্ধ পায়।
নরমপন্থী বুর্জোয়া এবং তাদের সাথে আপোস করা বামপন্থীদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। যেহেতু তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পুঁজিবাদের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ খুব সঙ্গত কারণেই বুর্জোয়া গণতন্ত্রের চৌহদ্দির মধ্যেই ঘুরপাক খায়। পুঁজিবাদের সংকট জনগণের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করে আর বিপ্লবী পরিস্থিতির অনুপস্থিতিতে এবং প্রতিষ্ঠিত বাম দলগুলির বেইমানি ফ্যাসিস্ট আন্দোলন এবং ফ্যাসিবাদের গণভিত্তি অর্জনে সাহায্য করে।
কোনো প্রশাসনই এখন মৌলিক চাহিদাগুলি মেটানোর দিকে নজর দেয় না। কারণ সেগুলো চোখে পড়ার মতো না। যেমন ধরুন স্কুলের কোনো ছাত্রের ঘরের চাল ছাওয়ার জন্য কোনো শিক্ষক সামান্য আর্থিক সাহায্য করলে সেটা ব্যক্তিগত স্নেহ-শ্রদ্ধার ঝাঁপি ভরিয়ে তোলে হয়ত, কিন্তু রাজনীতির সমীকরণে তার কোনো মূল্য নেই। বস্তিবাসীর জন্য গৃহনির্মাণ করে প্রশাসন আশীর্বাদ পেতে পারে, কিন্তু ঝলমলে আলোর শহরে মারাদোনা বা মেসি-কে এনে কোটি কোটি টাকার শ্রাদ্ধ করা টিআরপি-র বিচারে অনেক এগিয়ে। কলকাতার এমন এলাকাও আছে যেখানে আলো যায় না। শিল্পপতিদের খাসতালুক। সেখানে আরও আলো দিতে পারলে সরকারি প্রশাসনের ভোটের বিপুল কালো খরচ যথাসময়ে উঠে আসে। এই এত আলো, তাই এত আঁধার। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্রেই তো বিস্তীর্ণ এলাকা নিষ্প্রদীপ ছিল। হুকিং করার তারটি পর্যন্ত ছিল না। তদানীন্তন প্রশাসন এদের কক্ষণও মারেনি। কিন্তু হতাশাজনিত প্রকোপের বশে শিল্পপতির গাড়ির কাচ ভাঙলে দাগি চিহ্নিত করেছে। যখন অপরাধের প্রয়োজন, অপরাধ ঘটানো হয় এদের দিয়ে। যখন অপরাধীর প্রয়োজন, তখন "শ্রেণি-বিচ্যুত" এদেরই সংগ্রহ করতে বেরিয়ে পড়ে শৃঙ্খলারক্ষক সরকার। অর্থ যার নেই তাকে বিদ্যুতের অধিকার দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, বরং তার ভাবা উচিত, সরকারি ভ্যানে তাকে তুলে নিয়ে যেতে সরকারের অনেকটাই তেল পোড়ে এবং সেই অর্থ মেটানোর জন্য পুঁজিপতির অনেকটাই অর্থদণ্ড যায়। এভাবেই আরও বড়ো অঙ্ক কষে রাজনীতির বিচারে ফর্মুলা ওয়ান বা ক্যালকাটা আই-এর চাহিদা তুঙ্গে ওঠে।
পৃথিবীতে যে-ব্যাটা আয়না তৈরি করেছিল, তার প্রতি ক্লাস ফাইভের নোংরা রাহুল ক্ষোভে ফেটে পড়ে। এত গুলিয়ে দেয় না সবকিছু, কী আর বলব! ছোটো তো, গুলিয়ে যাওয়ারই কথা। বেচারার ডান হাত, স্বেচ্ছাচারী আয়নাচিত্র অনুযায়ী, বাম হাত হয়ে ওঠে, আর ভুল উত্তরের জন্য মাথা নিচু করে থাকে। সে কি কোনো কিছুরই যোগ্য নয়? পরের বছর শিক্ষক দিবসে হয়ত সে আর স্কুলে আসবে না। সকলের আগে এসে সকলের পিছনে নোংরা জামা পরে দাঁড়াতে হবে ভেবে তার গলার ভিতরে পাথর নামতে থাকে। নিষ্পলক চেয়ে থাকে সবার জামার দিকে আর সার্ফ-এক্সেল-এর রোদ-ঝলকানো ফেনায় রাধাকৃষ্ণণের ছবিটা সে দেখতেই পায় না।
দশ নম্বর পৃষ্ঠায় ট্রটস্কি-তে চোখ আটকে গেল। কিভাবে মুসোলিনী বিজয় লাভ করল? এরপর কি? জার্মান প্রলেতারিয়েতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ১৯৩২ থেকে উদ্ধৃত:
যে মুহূর্তে বুর্জোয়া একনায়কতন্ত্র তার সংসদীয় কাঠামো ও "স্বাভাবিক" পুলিশ ও মিলিটারি পরিকাঠামোর মাধ্যমে সমাজের ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, ফ্যাসিবাদের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
আমি টিভি ও খবরের কাগজ থেকে বহু দিন বহু দূরে। যদিও বামফ্রন্ট সরকারের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের দিনগুলোয় সময় পেলেই টিভি দেখতাম। সিঙ্গুরে হত্যালীলা সংঘটিত হবার সময় স্টার আনন্দ-তে দেখেছিলাম একজন গ্রামবাসী ঘর থেকে বেরিয়ে আসামাত্রই একটি গুলি তার মাথার পূর্ব-পশ্চিম এক করে দিয়ে বেরিয়ে গেল। ছোটোবেলায় যে-গুলি আমার অনাবৃত চোখের সামনে ঈশ্বরকে বিদ্ধ করেছিল, আজ সেই গুলিরই উত্তরাধিকার আর একজন মানুষের মধ্য দিয়ে পুরুষানুক্রমে অর্জন করা হত্যার প্রতিশ্রুতি রাখল। স্বাভাবিক পুলিশ এবং পুলিশের স্বাভাবিকতা দুই-ই ধন্দে ফেলে দেয় মানুষকে। আইন এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যারা নিযুক্ত, তাদের নির্দেশ দেওয়া হল বিকট গণহত্যার নিদর্শন রাখতে। একনায়কতন্ত্রের হুংকার রাষ্ট্রযন্ত্রের আইন তোয়াক্কা করে না। আফস্পা এখানে থাকুক বা না-থাকুক চিরকালই মানসিকতায় রয়েছে। স্বাভাবিকতায় রয়েছে। গণহত্যার তালিকায় অসংখ্য নাম নথিভুক্ত করতে হবে এমন অর্ডার মেনে নেওয়া স্বাভাবিক পুলিশের কাজ নয় ঠিকই, কিন্তু একনায়কের রোষের মুখে পড়ে অর্ডার মেনে নেওয়ার পর যে হত্যালীলা সংঘটিত হয়, তা, সেই পুলিশের স্বাভাবিকতাই হয়ে ওঠে। ভারসাম্য আনার তাগিদে নিধনযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। তারই রক্তাপ্লুত ছবি খবরের কাগজের বুকে শীর্ষস্থান দখল করে। ঘুম থেকে উঠে, বাবার রবিবাসরীয় কোলে ছোট্ট গোল মাথা নিয়ে বসে, শিশুটির শৈশব এই রোষের শিকার হয়।
সিপিএম-এর অত্যাচার যৌনপীড়নের সমান। যৌন জীবনে অসুখী বলে এরা কর্মক্ষেত্রে বিরোধীর ওপর অত্যাচারের পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। স্বাভাবিক যৌনতা না মেটার জন্য ধর্ষণোন্মুখ হয়ে ওঠে। ভারতীয় ইতিহাসে যৌনজীবনের এক সুমহান ঐতিহ্য আছে, যা শিল্প মাড়াতে আর ব্যক্তিগত অর্থোপার্জন করতে গিয়ে বিনষ্ট হয়ে গেছে। বাৎসায়নের চৌষট্টি কলা নয়, দেহের ওপর দেহের আধিপত্য বিস্তার করাই মূল লক্ষ্য। ক্ষমতা এবং অর্থের লোভ মানুষকে ধর্ষক ও শোষক করে তোলে। আমার মনে হয়, এরা যৌনজীবনে বড়োই অসুখী বা শৈশব থেকে নিপীড়নের শিকার এবং সে-কারণেই সরকারি অফিসের ছাদ ফাটিয়ে দেয় শব্দবাজিতে। অবদমিত যৌনতার কুৎসিত বহিঃপ্রকাশ ঘটে বিরোধীদের সঙ্গে বিরোধে। সরকারি শিক্ষক হিসেবে বলতে পারি, কাজ বিশেষ নেই বলে, প্রশাসকের সুশাসন ধর্ম নয় বলে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার এত সময় পাওয়া যায়। বেতালা বিক্রমে যখন স্কুলবাড়ি কাঁপে, ফাইভ-সিক্সের রাহুলরা ভয় পায়, সেভেন-এইটের রাহুলরা পায় মজা আর নাইন-টেনে ভয়-মজার মিশেল ঘটিয়ে একাদশ-দ্বাদশে গালিগালাজ করতে করতে শ্রেণিকক্ষ ত্যাগ করে।
ধুর ধুর, এসব কেন বলছি! শীলার জওয়ানি আমাদের স্ত্রীর প্রতি অবিশ্বস্ততা জাগিয়ে তোলে। একথা মানতেই হয়, বিগত বহু বছর, আমরা ইংরাজি দৈনিকের কিছু পাতা সন্তানদের অলক্ষ্যে তারিয়ে তারিয়ে গিলেছি এবং মাস্টারবেট করেছি। ঘরের নারীকে নিপীড়ন করে এসেছি। পড়াশোনার ছায়াও না পাড়িয়ে ক্লাসে গিয়ে রবীন্দ্রচর্চার নামে বুজরুকি করেছি। যত খারাপ, যত নৃশংস, যত ভুল – সবকিছুই আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোয় স্বচ্ছতা এবং লেকচারের লালিমায় গুরুত্ব পেয়েছে। আমাদের স্ত্রীর শীলা না হয়ে উঠতে পারার যন্ত্রণা আছে। ততটা মাইনে বাড়েনি যাতে শীলাকে কাছে পাওয়া যায় অর্থের বিনিময়ে, সেই যন্ত্রণাও আছে। অসুস্থ অস্বাভাবিক ফ্যাসিস্ট একনায়ক বিদ্যালয় কাঠামোয় সামাজিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলেন যৌনপীড়নমূলক বেত ও বাতেলায়। নাঃ, এখন মনে হচ্ছে লেখা চলাকালীন সিপিএম-এর প্রতি ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে গেছি। কান গরম হয়ে গেছে। ক্ষেপে যাওয়ায় লেখা ভুল রাস্তা ধরেছে।... ধরুক! ধরুক ভুল রাস্তা! যেদিকে যায় যাক। পরাজিত মানুষের জন্য সমস্ত পথ খোলা। ঠিক মনে পড়ছে না, আমি বোধ হয় মুসোলিনির সঙ্গে আগ্রাসনের হাই রোড-এর পাশের ধাবায় বসে মদ গিলছিলাম। বিলিতি মদে দিশি করে তুলছিলাম আমার যাবতীয় দুঃখ।
ফ্যাসিবাদী সংস্থার মাধ্যমে পুঁজিবাদ উন্মত্ত পেটি বুর্জোয়া জনতা, শ্রেণি বিচ্যুত এবং আত্মবিশ্বাসহীন লুম্পেন প্রলেতারিয়ত – এককথায় ফিনান্স পুঁজির দ্বারা শোষিত বেপরোয়া ও উন্মত্ত জনগণকে জড়ো করে।
আমাদের স্কুলে যখন ভোট হয়, তখন জড়ো করা হয় কিছু ছেলেকে, যাদের পঞ্চম শ্রেণি থেকেই প্রস্তুত করা হয়েছে আত্মবিশ্বাসহীন লুম্পেন প্রলেতারিয়েত রূপে। সিপিএম-এর ফিনান্স পুঁজির দ্বারা শোষিত বেপরোয়া ও উন্মত্ত জনগণ-এর উত্তরাধিকার বর্তায় এদের ওপর। জনগণের এই রূপান্তরিত বিভাগকে বলা হয় ক্যাডার। আমাদের ওই পরিচিত সহকর্মী বন্ধুর বাড়িতে এরকম ক্যাডার লেলানো হয়েছিল। ত্রাস ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁর মা ও স্ত্রীর ভিতর। আড়াই বছরের সন্তানকে করা হয়েছিল কোনো ছোট্ট পিসমেকার-এর টার্গেট। কারণ, সিপিএম অঙ্ক কষে দেখেছিল, তিনি সিপিএম-এর শিক্ষক সংগঠন এবিটিএ-কে ভোট না দিয়ে বিপরীত দিকে ভোট দেবেন। নিয়মানুযায়ী, সংগঠন-বিরোধী শ্রমিককে শায়েস্তা করা বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়ে। সিপিএম-এর কাছে দলই শেষ কথা। বাবা-মা সহ পৃথিবীর যাবতীয় সম্পর্ককে নিমেষের মধ্যে আবর্জনাস্তূপে নিক্ষেপ করে এই দল। দল নির্দেশ দিলে বাবাকে দলে পরিণত করতে হয়, অথবা, বাবাকে অস্বীকার করতে হয়।
ফ্যাসিবাদের থেকে পুঁজিপতিরা দাবি করে এক ধারাবাহিক কার্যক্রম – বস্তুত, তাদের তৈরি গৃহযুদ্ধ শেষ হবার পর তারা জোর দেয় আগামী বছরগুলিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য। ফ্যাসিবাদী সংস্থা পেটি বুর্জোয়া জনতাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে তার পথের সমস্ত বাধাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে কার্যসাধন করে। ফ্যাসিবাদ বিজয় লাভ করার পর তার হাতে ইস্পাতের আধারের মতো সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানগুলি, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক এবং শিক্ষাগত ক্ষমতা, সৈন্য বাহিনী, পুরসভা, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, প্রেস, ট্রেড ইউনিয়ন, কোঅপারেটিভ সহ সমগ্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষমতা করায়ত্ত করে।
নির্বাচনে জেতার পর শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য উঠেপড়ে লাগে স্কুল কর্তৃপক্ষ। সিপিএম রাজশক্তির রূপ চেনা বড়ো দুষ্কর। ছিল বন্দুক, হয়ে গেল বন্ধু। পালন করল রাজার আচরণীয় ষড়গুণের প্রথম গুণ অর্থাৎ সন্ধি স্থাপন। "কী খবর! কেমন আছেন!" – ইত্যাদি নানান অসভ্য ব্যঙ্গোক্তিতে ঘিনঘিনিয়ে দিল স্টাফ রুম। এটা চেনা ছক। এখানেই ওদের গিরগিটির ন্যায় বর্ণ-পরিবর্তনশীল স্বাতন্ত্র্য। কারণটা সুস্পষ্ট, এখনও কটা রয়েছে, যাদের বাগে আনা যায়নি। মসৃণ পথে তাদের আনতে হবে। তাদের পরিণত করতে হবে সংগঠনে। আর একান্তই বশীভূত করা না গেলে বর্ণের অবর্ণনীয় রূপ অর্থাৎ দমনমূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে। নতুন গৃহযুদ্ধের থিম – অশালীনতা ও হিংস্রতার প্রকাশ, নতুন গৃহযুদ্ধের রক্তিম মহড়া। ধারাবাহিক কার্যক্রমের নবীকরণ। আমরাও কেমন ভোঁতা হয়ে গেছি। দেখলাম, সিপিএম ঘরে আগুন লাগালো, তারপরও তাদেরই দ্বারস্থ হলাম এই উদ্দেশে যাতে তারা অগ্নি নির্বাপক আধিকারিককে মিস্ট কল্ দেয়। ছারখার হয়ে গেল ঘর। অর্থ ও আশ্রয় দুইই চাই। তখন তারা ছুট্টে আসে, বেপরোয়া গতিতে। "সব আছে – অফুরান টাকা, ছোট্টো ফ্ল্যাট। কিন্তু টাকা দলের, ফ্ল্যাটটাও। ইশ্! তোমার এই দুর্দিন আমি মেনে নিতে পারছি না কিছুতেই! চলো তো, দেখি কী ব্যবস্থা করা যায়!" আমি চললাম, কুত্তার মতো, চলতেই থাকলাম এবং কখন যেন সিপিএম-এর ছুড়ে দেওয়া হাড়ের টুকরো মুখে তুলে নিলাম।
আমার চিন্তায় সিপিএম কতটা দানা বেঁধে আছে ভাবুন এক বার যে যাদের ঘৃণা করি তাদের বিগ্রহই পাতার পর পাতা জুড়ে স্থাপন করে চলেছি। অর্থাৎ মনেপ্রাণে সিপিএম-এর বিগ্রহ শিরোধার্য করে আল-বাল-ছাল বলে বেড়াচ্ছি। বহুমূল্য বিগ্রহ মাথায়; হৃদয় তাই মূল্যহীন।
বরাবরই চণ্ডাশোক সিপিএম মসৃণ সাফল্য পেয়েছে, কিন্তু ধর্মাশোক সে হতে চায়নি। কারণ মানবপ্রেমের বীজ, যা আমাদের কাজ শিশুমনের শস্যক্ষেতে বপন করা, সেই কৃষিকাজে সিপিএম পদ্ধতিগত ত্রুটি খুঁজে পেল। সেই শক্তি জানিয়ে দিল, শিশুরা পাখির মতো সুন্দর, ক্লাসে গিয়ে তাই পাখিপড়াও। এমনভাবে পড়াও যাতে "তুমি আমারই" একথা ছবির মতো ফুটে ওঠে। "তুমি আমার চোখ, আমার কান, আমার স্বর।" অর্থাৎ, আমি যা দেখব, তুমি তাই দেখবে। আমি যা শুনব, তুমি তাই শুনবে। আমি যা বলব, তোমার মুখগহ্বরে তা প্রতিধ্বনিত হবে।" এতে নেচে ওঠে কিছু ঘড়ামার্কা শিক্ষক, যাদের আত্মশক্তি নেই, লড়াই করার বিচি নেই, অথচ অ্যাবডোমেন গার্ডখানা আছে। নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করল এই ভেবে যে তারা বাড়তি কিছু সুযোগ-সুবিধা পাবে। সুবিধার বৃহদাংশ প্রদান করে বামপন্থী শিক্ষক সংগঠন এবিটিএ শ্রমিক শিক্ষকদের প্রতিরোধশক্তি শুষে নিল। মোটা মাইনে নিয়ে আরামপ্রিয় শিক্ষক ভুলেই গেল তার করণীয় কাজ। কর্তব্যের বিস্মরণকে অকাতরে সাধুবাদ জানাতে লাগল এই সংগঠন। সমস্ত জায়গা করায়ত্ত করল এবং স্বতন্ত্র গণসংগঠনগুলিকে বিলুপ্ত করে দিল। পূর্বে বলেছি, মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হওয়ার সোপান ছিল এবিটিএ টেস্ট পেপার্স। এখন মনে পড়ছে, তখন কিন্তু ডব্ল্যুবিটিএ টেস্ট পেপার্স বা শুধু টেস্ট পেপার্স-ও চোখে পড়েনি। এবিটিএ কোম্পানি তখন ময়ালাকার সিপিএম-এর কণ্ঠহার হয়ে গেছে। যেমন হিন্দু শাস্ত্রে৫ বলা আছে, "যদি কোনো ব্যক্তি শূদ্রবংশ সম্ভূত হইয়াও ব্রাহ্মণের লক্ষণ সমস্ত প্রাপ্ত হন তাহা হইলে তাঁহাকে ব্রাহ্মণ বলিয়া নির্দ্দেশ করা যাইতে পারে।" অর্থাৎ যা-কিছু সাত্ত্বিক, তা-ই ব্রাহ্মণ। আমি এই কথার সূত্রে আসলে বোঝাতে চাইছি, যদি সিপিএম কেউ নাও হয়, ধ্বংসের জ্ঞান উত্তমরূপে লাভের পর তাকে অবশ্যই সিপিএম বলা যায়। কিন্তু আমার কথা হল কেউ যদি ব্রাহ্মণের লক্ষণ সমস্ত প্রাপ্ত হন, তিনি ব্রাহ্মণে উন্নীত হলেন বটে, কিন্তু তাঁর এই উন্নয়নে তিনি শূদ্রত্বকে অবহেলা করলেন! আর অবহেলা যদি নাও করে থাকেন, তাকে ব্রাহ্মণের তকমা দিয়ে কারা যেন শূদ্রত্বকে অবহেলা করলেন এবং জানালেন, ব্রাহ্মণত্ব সকল শক্তির উৎস এবং শোষক। অর্থাৎ শক্তির প্রবাহপথে মোহনা বলে কিছু থাকবে না। যা থাকবে তা সিপিএম নামক বিনাশীশক্তির অবিনাশী হয়ে ওঠার প্রবাহ। যেমন আমি, পূর্বেই কদর্য শরীরী ভাষায় জানিয়েছি, "ভাষা-শিক্ষক হলেও ভাষা-বিনাশের এক অবিনাশী শক্তি হয়ে উঠেছি ক্রমশ।"
তৃণমূলের আন্দোলন দুহাজার এগারোর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক-মুহূর্তে ফ্যাসিবাদী সিপিএম-কে প্রতিহত করতে সমর্থ হয়। এবার সেই সরকার প্রতিষ্ঠিত। তার ভিতরেও উকুনের মতো লুকিয়ে অজস্র সিপিএম। অকাতরে প্রজন্ম প্রসব করছে সেখানে। দলটাকে ময়ালাকার দিতে হবে তো। একজন মহিলা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি এই দলের চোখ, তিনি অনেকেরই চক্ষুশূল হবেন, কারণ শক্তির প্রবাহপথে তিনি এখনও অব্দি মোহনা সৃষ্টিতে বিশ্বাসী। যারা চোরাস্রোতের মতো ঢুকছে, ষড়রিপু-দংষ্ট্র শিশ্নোদরপরায়ণ, তারা একাপ্রভু রূপে অন্যকে চেটেপুটে খাওয়ার আনন্দ উপভোগ করতে এসেছে কী না তা তিনি ঝালিয়ে নেন বলেই জানি। তবে যে বর্তমান মমতাকে দেখছি তার সাথে ভবিষ্যৎ মমতার কতটা পার্থক্য হবে তা ভবিষ্যতই বলবে। আবার তিনি যাদের ওপর ভরসা করে আছেন, তারা ভবিষ্যতে তাঁকে মানবে কী না, সেখানেও প্রশ্নচিহ্ন রয়েছে। যদি তারা সেই একই কাজ করে, এবং করবে বলেই আমার ধারণা, তাহলে বলতেই হবে, ধ্বংসের যে প্রবাহ সিপিএম নির্মাণ করেছিল তাতে সিপিএম একশো ভাগ সার্থক হয়েছে। কিছু দিন আগের এক মনোরম সকালে একটা এসএমএস ইনবক্সে হুমড়াল – 2 to bhalo khabar ache. 1) 7% D.A. ghosona hoyeche (central govt.) 2) amader Mukkhyamantri Mahakarone Saratchandra-er golai mala porachche! দেড়মাস হল শিক্ষক হয়ে এসেছেন এসএমএস-দাতা। তিনি ভাবলেন বিস্তর মজা পেয়েছেন দিবাকরদা। যার যেমন পাগলু ভাবনা। তিনি যে-মহিলাকে ভালবাসেন, তাঁকে তিনি বিবেকানন্দের বাণী শোনান, যাতে তাঁকে ইমপ্রেস্ করা যায়। যদি সেই শিক্ষিকা শরৎচন্দ্র ভালবাসেন, তাহলে তাঁর বাণীও বইপত্তর ঘেঁটেঘুটে পাঠাবেন। অর্থাৎ, সমস্ত জায়গায় তিনি চাইছেন কতটা ইমপ্রেস করা যায়। আমি তৎক্ষণাৎ তাঁকে ফিরতি এসএমএস-এ জানতে চাইলাম, ETar mane ki? বেশ খানিকক্ষণ পরে তিনি উত্তর দিলেন। সময়টুকু নিলেন হয়ত এইটুকু ভাবতে, "দিবাকরদা কি তাহলে চটে গেল? ঠিক তো, তার সঙ্গে পূর্বে কথা হয়েছে, আমার বোঝা উচিত ছিল।" তারপর জানালেন, এক কো-প্যাসেঞ্জার তাঁকে এই এসএমএস-টি ফরোয়ার্ড করেছেন, তিনি আমাকে। উত্তর দিলেও উতরে গেলেন না। দিবাকরদা তাঁকে প্রচুর ঝাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। ঝাড়লাম। এসএমএস-এর ১ ও ২-এর ভিতর সম্পর্ক বুঝতে চাইলাম। কিন্তু ফোনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত পারলাম না। আর এই মাথামোটাকে তিনি বোঝাতেও পারলেন না। স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাঁর মাইনে থেকে টাকা কেটে নিয়েছেন নিজের রাজনৈতিক ফান্ডের জন্য; বাকি পাঁচজনের মতো তাঁর মাইনেমুখী মেনিমুখো জীবন, অতএব এ বিষয়ে তিনি প্রতিবাদমুখর হতে চান না। ওই সুযোগে কিছু সুযোগ আদায়ের ধান্দায় রয়েছেন। ওখানেও তাঁর পদলেহন করার মনোভাব বা ইমপ্রেস করার বাসনা জেগে উঠছে। খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ, মার্কসের জন্য তিনি বেশি পড়াশোনা করেছেন, পেয়েছেন আরও বেশি, অতএব শিক্ষক হয়ে মার্ক্স-কেই তিনি গুরুত্ব দেবেন। নিজস্ব সচেতনতাকে আকর্ষ ধরে কজনই বা আর লেখাপড়া করে। শুধু লাভ আর লাভ। তাঁরও ইচ্ছে ধীরে ধীরে পুঁজিবাদের পুজো করে পুঁজিবাদের প্রতিনিধি হয়ে ওঠা। ক্ষতি যে করে খাতির সে-ই পায়। তাঁকে যিনি ক্ষতি করলেন, জ্ঞাতসারে, সরকারি বেতনের ওপর থাবা বসালেন, তিনি তাঁর কাছ থেকেই দিব্যি খাতির পেয়ে যাচ্ছেন। অধিকাংশ শিক্ষক এরকমই বিক্রি হয়ে যাওয়া বেতনভোগী নীতিবাগিশ, অধার্মিক। সিপিএম-এর স্নেহভাজন, আস্থাভাজন শিক্ষকমণ্ডলী আসলে সবকিছু "থোড়া সা" করেই খুশি হয়। কিন্তু সব কিছুই থোড়া সা করে থোড়া-কে গোটা থোড়ের মতো যে-পূর্ণতা তাঁরা প্রদান করছেন, তাতে ডিএ-র প্রতি লালা পড়াই স্বাভাবিক। তাঁর প্রধান শিক্ষক আসলে তাঁর অজ্ঞানতার কাছে একটি প্রকাণ্ড শক্তি। শক্তির কাছে মাথা যে নোয়াবে সে পক্ষান্তরে সিপিএম-এরই শক্তি হয়ে উঠবে।
ইস্তাহার বা লেনিন বা ট্রটস্কি পড়তে গিয়ে বিপ্লব ও বিপ্লবের যে-ধারা দেখি, তাতে আমার ভিতরে ভয়ের সঞ্চার হয়। যে-স্ট্র্যাটেজি একটা গোটা সমাজকে সংগঠনে পরিণত করতে পারে এবং সেই সাংগঠনিক দৃষ্টিতে সমাজের অন্যান্য সাংগঠনিক মতামতকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে চরম ঔদ্ধত্যে উড়িয়ে দেয়, সমস্ত কিছুতে যে-স্ট্র্যাটেজি আসলে পুঁজিকেই আশ্রয় করে থাবা বসায়, তার বিক্রম-নির্ঘোষ শোনা যায় না, তার ক্ষমতার উৎস অর্থাৎ বন্দুকের নল রাতের অন্ধকারে এসে আমার হৃদ্যন্ত্রকে নিঃশব্দে নিঃস্পন্দ করে যায়। যে হত্যা করে গেল, সে কি বেতনভোগী প্রলেতারিয়েত? গুণ্ডা? লুম্পেন? শ্রেণি বিচ্যুত? কেন তাহলে আমার দুঃস্বপ্নের দিন ও রাতগুলোয় সিপিএম বলল, কোনো লুম্পেন প্রলেতারিয়েতই আমাকে হত্যা করেছে? কেন বলল, হত্যার ছক কষেছে যে, সে আসলে একনায়ক প্রোলেতারিয়েত? দলীয় রাজনীতি ভাল মুখোশ পরে তখন। অর্থাৎ, সব খারাপ কাজে আশকারা দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে নেওয়ার পর হত্যাকারীকে সে আর দলের সহচর হিসেবে দেখতে চায় না। সুশান্ত ঘোষ নির্বিচারে নরদেহ মাটিতে পোঁতাকালীন বিমান বসু কত বার চেষ্টা করেছেন কিন্তু তাঁকে ফোনে ধরতে পারেননি। কী করতেন ধরতে পেলে? বারণ করতেন, পুঁতো না? হয়ত না, বরং শুনিয়ে দিতেন রাজ্য রাজনীতির সেই অমোঘ সিপিএম-নিদান, তোমাকে জড়িয়ে ফেলেছি, তুমি আর বেরোতে পারবে না। প্রত্যেক স্তরে প্রত্যেককে দিয়ে খারাপ কাজ করিয়ে নেওয়ার ফলে দলের মধ্যে এত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করেও দল ছেড়ে তারা বেরোতে পারে না। কারণ দলে থাকলে অন্যকে মেরে চেটেপুটে খাওয়ার সুযোগ এবং শয়তানের সিকিউরিটি, দল থেকে বেরোলেই দাগি অপরাধী।
আমাদের কমিউনিস্ট প্রধান শিক্ষক মহাশয় স্কুলে আগের মিটিংগুলোতে যা ম্যানিফেস্ট করে এসেছেন তা হল আদ্যন্ত এইরকম – "সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে, আপনাদের যদি এই বিষয়ে কিছু বলার থাকে বলুন।" অর্থাৎ যা তাদের পার্টি কালচার এবং উদ্দেশ্য যেন-তেন-প্রকারেণ তা সাধন করাই তাদের পার্টি কালচার এবং অঙ্গীকার। মনে পড়ছে হুগলির জনসভায় অসতর্ক অনিল বসুর দোষ ঢেকে ফেলার সতর্ক বিবৃতি – "আমাদের পার্টির নীতি ও সংস্কৃতির পরিপন্থী।" দেখুন, দলে পরিণত হওয়া মানুষের কণ্ঠস্বরের স্বতঃস্ফূর্তি! একেবারেই অনুশোচনা নেই! তিনি বলতে পারলেন না, যা বলেছি তা আমাদের অর্থাৎ ছায়াসুনিবিড় বাংলা তথা ভারতের নীতি ও সংস্কৃতির পরিপন্থী। পার্টি কী বোঝালো? দোষ করেছ, দোষ তোমার, স্বীকার করো এবং ভাষার এলিট বয়নশিল্পে পার্টিকে নিষ্কলুষ প্রমাণ করো, পার্টি তোমাকে শুদ্ধিকরণের সংরক্ষক মাখিয়ে রাজকীয় মর্যাদায় আবারও গিলে নেবে। আমাদের জানা উচিত, দুর্গাপুজোয় ঢাকবাদকের স্থান প্যান্ডেলেই। সুশান্ত, অনিল বা প্রধান শিক্ষক পার্টির ভাড়া করা ঢাকবাদক। পার্টি প্যান্ডেলেই তাদের রুটিরুজি ও আশ্রয়। যখনই পার্টি ডাকে, তখনই তাদের ছুটতে হয়, স্টেশনে বা বাঁশ-মারা পোডিয়াম-এ শোনা যায় এদের ঢক্কানিনাদ। এরা বুঝে গেছে – এরা পরাজিত এবং দলীয় আগ্রাসনের শিকার। তাই আমার মতোই "প্রাত্যহিক পরাজয়ের কথা কাউকে বলতে" পারে না বলে "অন্যকে পরাজিত করার উত্তেজনায়" আমার মতোই "ছটফট" করে। মানবতন্ত্রহীন স্কুলশিক্ষা, স্কুলশিক্ষক, অন্তর্বিগ্রহ সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক দল এবং দলীয় রাজনীতির অশালীন দেহভঙ্গিমার অদৃশ্য মুগুরে উরু ভেঙে যেতেই মনে পড়ল – রাজকীয় সিপিএম কিন্তু ভোলেনি, রাজার আচরণীয় ষড়গুণের শেষ গুণ, আশ্রয় – আশ্রয় অর্থাৎ রাজনৈতিক সহাবস্থানের নীতি এবং পদলেহন।
স্কুলে রাজনৈতিক ময়ালের আশ্রয়ে আমিও যেন আশ্রিত। সিপিএম এবং সিপিএম-এর বুকে নোঙর বাঁধা কংগ্রেস-এর বিষক্রিয়ায় তুঁতেনীল হয়ে গেছে সবকিছু। আগে নাকি বিদ্যালয়ে পরিকাঠামোর বড়ো অভাব ছিল। বাঁশ, টালি এবং দেদার শূন্যতা। ঘর ছিল না। ঘর হয়েছে। ইটের পরে ইট সাজিয়ে খেয়ালমতো দেয়াল তোলা হয়েছে। আর এখন সেখানে তো প্রাসাদোপম ব্যাপারস্যাপার। সিমেন্টে সিমেন্টে জব্দ হয়েছে শিক্ষা। অট্টালিকা প্রায়শই কেঁপে উঠছে শৃঙ্খলার ডমরুবাদনে। যদিও আমি কেবল শৃঙ্খলের ধাতব ঝন্ঝন শুনি, শৃঙ্খলার ঘুঙুর-টুঙুর কানে আসে না। শুনতে পাব, অনেকেই বলেছেন, তবে তার জন্য আমাকে অভিভাবক সভায় কান পাততে হবে। তো, যে-কটি অভিভাবক সভা হয়েছে, সেখানে নিজেকে বেঞ্চপদ্মে উপবিষ্ট রেখেছিলাম। দুঃখিত, শ্রবণেন্দ্রিয়ের সমস্যাজনিত কারণে অথবা দাঁত ওঠার আগে থেকেই আমি সিপিএম নই বলে কোনো ঘুঙুর শুনে উঠতে পারিনি। অবশ্য আমি আর কদিনই বা এই স্কুলে। পূর্বের পরিবেশ থেকে নিশ্চয়ই উন্নততর হয়েছে বর্তমান। আমার জানা নেই। আমি তো বরাবরই সেটুকু লিখে চলেছি যেটুকু জেনেছি, দেখেছি। যেটুকু ভয় পেয়েছি, যেটুকু কেঁপেছি।
জেনেছি... এক: শৃঙ্খলা আমাদের মধ্যে এতটাই প্রবল যে স্কুল নির্বাচনে এবিটিএ-র ভোট ব্যাংকে টান পড়াতে শিক্ষকের বাড়িতে গুণ্ডা লেলিয়ে তাঁর মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে বসে থাকে সিপিএম-এর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর। দুই: পোস্টাল ব্যালট প্রধান শিক্ষককে দিয়ে আইডেনটিফাই করার অব্যবহিত পরের দিন আমার বাড়িতে লোক চলে আসে ব্যালট উদ্ধারের জন্য। তিন: কোনো ছাত্র শিক্ষকের মাথা ফাটালে বা ক্লাসে ঢুকে দিদিমণিকে কুৎসিত ইঙ্গিত বা গালিগালাজ করলে অথবা বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেও নিদ্রা যান স্কুল কর্তৃপক্ষ। চার: একজন কর্তব্যবিমুখ শিক্ষক = একটা সিপিএম-এর ভোট। পাঁচ: ভোটের পর এই কর্তৃপক্ষের পুনর্বহাল। ছয়: নতুন এসেছেন যিনি তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে সচেতন মানুষগুলি থেকে দূরে রাখা।
দেখেছি... নিচের কুপনটি। পাঁচ টাকা মুক্তহস্তে দান করার মিনতি-কুপন। কেন্দ্র সরকারের সুগঠিত প্রচেষ্টা, দুঃস্থ শিক্ষকদের দিকে আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। বিষয়টি গোলমেলে ঠেকায় আমি যত জন শিক্ষক-বন্ধুকে ফোন করেছি, তাদের বেশির ভাগ শুরু করেছে এই বলে, আজকাল আর কোন্ শিক্ষকই বা দুঃস্থ রে! আমাদের ভাবনাগুলোয় মরচে ধরে গেছে এমন যে আমি দুঃস্থ নই, আমার পয়সা-পোয়াতি রূপ ও আমার একাপ্রভু সত্তা বিকশিত হচ্ছে বলে আমি ভুলেই গেছি এখনও বহু শিক্ষক দেশে আছেন যাঁরা তীব্র অর্থকষ্টে ভোগেন। যাই হোক, তাঁদের এবং তাঁদের উত্তরপুরুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে কেন্দ্র সরকারের এই মহৎ প্রচেষ্টা। প্রতি বছর শিক্ষক দিবসের প্রাক্কালে কেন্দ্র সরকার রাজ্যস্তরের শিক্ষক সংগঠনদের অনুরোধ করেন অনুদান সংগ্রহের জন্য।
জাতীয় স্বার্থের জন্য সংগৃহীত অর্থের যে-কুপন, তাতে ভারত সরকার-এর চিহ্নমাত্র নেই। অশোক স্তম্ভের ছবি নেই। কারা সংগ্রহ করছে, রাজ্যস্তরের সেই সংগঠনের নাম বা ঠিকানা নেই, কোন্ বছরের জন্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, তাও প্রদর্শিত নয়। প্রতিটি কুপন এক টাকার হলেও গ্রহণ করতে হবে পাঁচটি কুপন। উপরন্তু, কোনো শিক্ষক এই অনুদান দিতে অস্বীকার করলে, ডিআই অফিসের কোনো এক এআই জানিয়ে দিতে পারেন, যিনি দেননি তাঁর নাম পাঠাতে। এই হুংকার পার্টির কালচারের পরিবহন মাত্র। সংলগ্ল কোনো বিদ্যালয় থেকেই সংগ্রহ করা হয়নি এই অনুদান। কেন্দ্র সরকার কি তাহলে আমাদের বিদ্যালয়কেই বেছে নিলেন? একজন দাতা হিসেবে এবং তথ্যের অধিকারবলে আমারও তো জানতে ইচ্ছে করে আমার অনুদানের সঠিক ব্যবহার হল কী না।... এরপরও শুনতে হয়েছে – যাক বাদ দে, পাঁচ টাকার ওপর দিয়ে গেছে। আমরা যারা শিক্ষক তারাই এই কথা আওড়াচ্ছি। সত্যিই যদি আমাদের হুঁশ থাকত, দানে থাকত ভালবাসা বা নিতান্ত কর্তব্যপরায়ণতা, প্রতিদানে আমরা নিশ্চয়ই জানতে অগ্রসর হতাম, শিক্ষক কল্যাণ তহবিলে সেই ক্ষুদ্র দান কোনো দুঃস্থ শিক্ষকের নিকট আদৌ পৌঁছালো কী না। আমাদের ভালবাসা ছিল না, সহমর্মী নই বলে ভিতরে-ভিতরে কর্তব্যও ছিল গরহাজির। যা ছিল তা কর্তব্যের অছিলা।
জেনেছি। দেখেছি। তারপরও আমরা প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠিনি। অনেক নাকি সমস্যা আছে। আদপে সমস্যা কিছু নেই; আছে নিজস্ব প্রতিবন্ধকতা। সেই প্রতিবন্ধকতাকে আশ্রয় করে বিছানায় শুয়ে আমরা স্বপ্ন দেখি, আমাদের ভিতরে কেউ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে উঠছে। যদিও স্বপ্নে সেই নারীমূর্তির আদলে নিজের মুখটাই বসিয়ে নিই। প্রচুর লড়াই করি এবং বিজয়োল্লাসের উত্তরীয়ে নিজেকেই বরণ করে নিয়ে চিলচিৎকার করে উঠি – হি ম্যান (শি উওম্যান), দ্য মাস্টার অভ দ্য ইউনিভার্স। বাস্তবে দেখা যায়, আমরা অলস, অল্পেই উত্তেজিত হয়ে ওঠা অপদার্থ। প্রতিবাদ অন্য কেউ করবে আর যেটুকু ফসল পাওয়া যাবে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে ক্যারাভানে ভরব সকলে। কী দুর্ভাগ্য! আমাদের এতই দীনতা যে আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর দিকে তাকিয়ে থাকি এবং ভুলে যাই, সেই নীলমৃত্যু উজাগর আসলে আমাদের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন। ফ্যাসিস্টদের কবলে বলির ছাগের মতো এতগুলো বছর ছটফট করে আমাদের স্বভাবই হয়ে গেছে কিছু না শোনা, কিছু না দেখা, কিছু না বলা। শক্তির তাঁবেদারি করে, মান-মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে, গোটা জীবন আঁশটে বিজৃম্ভণ তুলে কাটিয়ে দিতেই শিখেছি আমরা।
সকল প্রতিবাদ যেন ওই এক মহিলাই করবেন। উনি অনশন করবেন, আমরা বিড়াল-ডিঙাতে-পারে-না এমন পরিমাণ ভাতে হাত ডোবাব। উনি প্রতিবাদের উচ্চগ্রামে গলা ভাঙবেন, আমরা স্টাফরুমে বসে তাঁর ভাষার ব্যাকরণগত ত্রুটি শোধরাবো। উনি সিপিএম তাড়াবেন, আমরা গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের নন্দনকাননে বঙ্গললনাকে চুমু খাব। আমরা সিপিএম নই, সিপিএম-এর প্রশিক্ষণ-প্রাপ্ত কুকুরও নই, পদমর্যাদায় আমরা তার থেকেও ইতর। অনেকটা কুকুরের লালা-ঝলঝলে জিভের মতো। ইচ্ছে হলে সিপিএম তাকে ঠেলে বার করে, ইচ্ছে মিটলে টেনে নেয় ভিতরের দিকে। তবে দু-ক্ষেত্রেই ঢিল দেয় লালায়।
কলিম খান এবং রবি চক্রবর্তী তাঁদের বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ-এ দ্বিতীয় খণ্ডে অপদার্থ শব্দের ব্যাখ্যার্থে বলছেন ... "সালফিউরিক অ্যাসিড যদি তার স্বাভাবিক আচরণ না করে, তবে সে বিশ্বব্যবস্থায় যে আসন বা পদ দখল করে আছে, তদনুযায়ী ক্রিয়া করল না। সেক্ষেত্রে সে যেরূপ পদ দখল করে ছিল, সেইরূপ আচরণ করেনি, তাই পদার্থরূপে তার যাথার্থ্য থাকছে না। তখন সেটি অপদার্থ। কথাটি মানুষের ক্ষেত্রেও খাটে। দর্জি যদি তার স্বাভাবিক আচরণ না করে, তবে সমাজের যে আসনে সে প্রতিষ্ঠিত, সেই পদের জন্য নির্দিষ্ট ক্রিয়াটি সে করল না। তখন সে পদার্থ রূপে ব্যর্থ, তাই অপদার্থ।"
আমরা অপদার্থ, তাই শিক্ষকতার আচরণ না করে সিপিএম-এর সংস্কৃতিকে বহন করে চলেছি। একটু চিন্তা করলেই দেখতে পাবো, আমরাই চলমান সিপিএম, সিপিএম-এর রক্তবীজ। কিন্তু কীভাবে। যেদিন সাত্যকি মারা যায়, সর্বশিক্ষা অভিযানের শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রকল্প চলছে পার্শ্ববর্তী স্কুলে, সেখানে ছিলাম। পরের দিন যখন স্কুলে যাই, এক সিনিয়র শিক্ষক মহাশয় জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "তুই তো গতকাল আসিসনি, তাই জানা হয়নি, সাত্যকির বাড়ি কাদের পক্ষ থেকে যাবি – এবিটিএ না ডব্লুবিটিএ?" তখনকার মতো যত শানিত উত্তরই দিয়ে থাকি না কেন, পরে গভীর বিষণ্ণতায় মনটা ভার হয়ে যায়। দলগত বিচারে আমি কোনোটিরই অন্তর্ভুক্ত নই। বহুসংখ্যক মাস্টারমশাই যেহেতু এই দলীয় রাজনীতির পদলেহনকারী, বা তাদের সর্বৈব পরিচয় দলীয় পতাকা ধারণে, অতএব, কৃতকর্মের বিচারে আমি ঝোলে বা ঝালে কোনোটিতেই পড়ি না। ফলে, কোনো দিক থেকেই আমি তাদের সঙ্গে সাত্যকির বাড়ি যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি। স্মরণশক্তির মাথা এখনও খেয়ে বসিনি বলে মনে আছে যে এক ডব্লুবিটিএ সদস্য আমাকে এই দুষ্প্রাপ্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি যতটুকু সিপিএম-এর রাজনীতি বুঝেছি, স্বচক্ষে দেখেছি বিভীষণ অন্ধকার, তাতে দ্বিপদী সারমেয়র আখড়ায় মানবিকতা সবথেকে বেশি লাঞ্ছিত। সেই রাজনৈতিক রেড অ্যালার্টে মানবিকতার প্রদর্শনই অমানবিকতা। প্রকৃত শিক্ষার উচ্ছিষ্টটুকুও তারা গ্রহণ করেনি। ডব্লুবিটিএ-র ওই সদস্য শিক্ষক সিপিএম-এর মেরুকরণের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একই অসভ্যতার সাতকাহনে জাবর কেটে চলেছেন বছরের পর বছর। রাজনৈতিক দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও মিথ্যে বাহাদুরি ও বিড়াল তপস্যায় উপকরণের কোনো অভাব রাখেন না। বর্তমানে, তৃণমূলের কারখানার পাশে ঘর নিলেও তিনি সিপিএম-এর কোঠাবাড়ির দারোয়ান রূপেই থেকে গেছেন। এই মূলভাবটি, বাক্যে-কংগ্রেস-বিনাবাক্যে-সিপিএম, যা আগে তাঁর পোশাকে চকচকে বোতামে দেখেছি, সেদিন দেখি চামড়ায় রোমকূপ হয়ে বসে গেছে। এখন অপেক্ষা তাঁর উচ্চতর সিংহাসনে বসার, যেখান থেকে রক্তরোষে বীজ ছড়াবেন সিপিএম-এর ঢঙেই।
শিক্ষক শিক্ষার্থীর জ্ঞানের প্রসার ও মানসিক বিকাশ ঘটান – এই বাক্যটি রচনা বইয়ে লেখা থাকে এবং জ্ঞানমূলক প্রশ্নের বেস্ট নোটসে। অথচ শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় শিক্ষকের জ্ঞান বা মানসিক বৃদ্ধি কতটা হয়েছে তার বিচার করা হয় না বিশেষ। যেহেতু আমার বিষয় ইংরাজি, তাই ইংরাজির একটি প্রশ্ন না বলে থাকতে পারছি না। কোনো এক এসএসসি পরীক্ষায় ভয়েস চেঞ্জ করতে দেওয়া হয়েছিল, শাট দ্য ডোর। মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী টেস্ট পেপার্স সলভ করতে গিয়ে যার মুখোমুখি হয় বারবার এবং একটু শিখিয়ে-পড়িয়ে নিলে যাকে প্যাসিভ ভয়েসে লিখে দিতে সে সচরাচর ভুল করে না। হয়ত নয়া শিক্ষকের জ্ঞান দেখার জন্য এমন প্রশ্ন করা হয়। কিন্তু শিক্ষক হতে গেলে বিষয়ভিত্তিক দৃঢ়তা কি এই প্রশ্নটি থেকে বোঝা যায়? এযাবৎ জেনারেল নলেজ এবং ইন্টেলিজেন্স-এর ওপর একটি প্রশ্নপত্র পনেরো মিনিটে সমাধান করে জমা দিয়েছেন হবু শিক্ষক-শিক্ষিকা। এই জ্ঞানতর্পণ শেষ করে বিষয়ঘটিত প্রশ্ন-ছাওয়া ভূর্জপত্রে তুমুল আঁচড়া-আঁচড়ি। পাশ করলে তবেই পার্সোনালিটি টেস্টে টুকটুক করে আসা। আমি তো এভাবেই আসি। তাঁরা ডাঁট ছাড়লেন, আমি আমার আকার দিয়ে যতটা পারি ছিবড়ে করে ফেললাম। কিনে নিলাম তাদের। কী সৌভাগ্য আমার! কোনো পর্বেই আমাকে টিচিং অ্যাপটিটিউড সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হল না। কেন হতে হল না? কারণ, সেখানেই ছিটকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মোটা মাইনের ঝাঁপিতে ঝাঁপ দিতে পোষ্যপুত্রদের রাস্তা সহজ করে দিতে হবে বইকী। সিপিএম-দূষিত শিক্ষা সিস্টেমের জং পড়া কবজায় এইসব পোষ্য এক ফোঁটা তেলও দেয় না। তারা আসে রাজার ভৃত্য হবার জন্য এবং ক্লাসরুমে ভৃত্যের সংখ্যা বাড়িয়ে তোলার জন্য। সিস্টেম ক্রমশ দূষিত হলে বছরভর দূষণ ছড়ানোর ধারাবাহিকতায় কোনো ফাঁক থাকে না। যেকোনো খারাপ লোককে সিপিএম এভাবেই দলভুক্ত করে। তাই এক্ষেত্রে আমাকেও নিয়ে নিল, ওদের ভৃত্য-পরম্পরার বাহক হব জেনেই। যাঁরা আমাকে নিয়োগ করলেন, তাঁরাও এই সিস্টেমের শিকার বলে ভৃত্য নিয়োগে ভুল লোককে নির্বাচন করে বসলেন। তিন দশকের অধিক সময় নিয়মের প্রকাণ্ড চাকায় তাঁরাই বেনিয়মের স্পোক হয়ে বসেছিলেন বলে এই ত্রুটিটা রেখে গেলেন। জলন্ত অঙ্গারের দীপ্তি আছে, আবার চোখ ঝলসানোর ভয়ও। কিন্তু নিয়োগপর্বে অঙ্গারগুলো জলে ভিজে ছিল বোধ হয়। কর্মজীবনের প্রথম দিনই প্রধান শিক্ষক এবিটিএ-র জাতীয় সংগীত গেয়েছিলেন আমার সামনে। রাজার রাজনীতি যেমন হয়ে থাকে; পাখি খাক না খাক, মটরদানা ছড়াতেই হবে। পরে কুটনৈতিক চাল – দ্যাখ দ্যাখ! তোর জন্য কীই না করেছি...। আমরা এই অকারণ মটরদানা ছড়ানোর বিরোধিতা করিনি, বরং অতি সাবধানে মটরদানা এড়িয়ে কুশল ভঙ্গিমায় পা ফেলেছি। তাই ভয় হয়। পথে পড়ে থাকা মটরদানা ঝাঁট দিয়ে সরিয়ে না দেওয়ায় ফিরে আসার সময় পা হড়কে পড়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা।
কেন জানি না এমন কেন মনে হয় যে আমার কোনো আত্মজিজ্ঞাসা নেই। নিজেকে জিজ্ঞাসা করি না, ভিতরটা পূর্ণতায় অপূর্ণ না অপূর্ণতায় পূর্ণ। আমার বেঁচে থাকার কতটুকু প্রকৃত বেঁচে থাকা, কতটুকু সাধনা, আর কতটুকু নিজের সঙ্গে ছলনা। মানবজীবন তো বড়োই দুষ্প্রাপ্য। বিশ্ববরেণ্য বিশ্ব জটিল অণু-পরমাণুর সাধনায় মানবশুক্রে স্থান দিয়েছে আমাকে। স্থান দিয়েছে তো অণু-পরমাণুর সাধনা অক্ষুণ্ণ রাখার এবং চিরায়ত করে তোলার লক্ষ্যে। আমার কত কিছুই দেখার, চেনার, জানার ছিল। মানবচিন্তা মহামানবচিন্তায় রূপান্তরিত করার কথা ছিল। মানুষ হয়ে আমার অন্ধকারের মুক্তি ছিল আলোয়।
সেই আলো অন্ধকারের উৎস হতে এখনও উৎসারিত হয়। রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরি যখন, চওড়া পথটা পিচে মাখামাখি। এখনও সূর্যের কাঁচা হলুদ আমার কাঁধে মাথা রেখে, কখনও বুকে মাথা ঘষে চূড়ান্ত উত্তেজনায় উৎসারিত আলোকে ধরার জন্য তার দিশেহারা আকুতি। আমি যেন তখনও অনুত্তেজিত; উত্তেজিতের বিহ্বলতা কাটিয়ে আমি তখন আন্দ্রিয়া বচেল্লি৬র সন্ধানে। বারো বছর বয়েস থেকে তার দুটো চোখেই সূর্যাস্ত। বারো বছর বয়স থেকেই প্রকৃত সূর্যোদয়ের সাধনা। মঞ্চ জুড়ে আলোর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, তবু সেই বিশেষ আলোর ভিতরে সুরগুলি কোথায় গলে গলে পড়বে এই কথা ভেবে তাকে গলার অদৃশ্য চুম্বকে টেনে নেওয়ার চেষ্টায় বারো বছর বয়স থেকে সাধনা করে চলেছেন।
আন্দ্রিয়া! যত দিন যাচ্ছে, আমি অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছি। ক্রমশ ডুবে যাচ্ছি তমসায়। কিন্তু এই ডুবে যাওয়ায় কি ভেসে ওঠার তপস্যা আছে? আমার নালন্দিক শূন্যতায় আমারই ষড়রিপুর স্বর শুনতে পাচ্ছি আমি। কিন্তু অবসর নিতে চাইছে তারা। ষড়রিপুর স্বর একযোগে ক্রন্দনধ্বনি হয়ে উঠছে। সেই ক্রন্দনধ্বনি ধরিত্রীর গোঙানি হয়ে উঠছে ক্রমাগত। ঝলসে যাচ্ছে আমার দৃষ্টি, জ্বলন্ত কাঠকয়লা বিস্ফোরণ আর লাভার উদ্গারে।
মান এবং হুঁশ ধারণ করে রাখাই কি আমার একমাত্র কাজ নয়? অতি তুচ্ছ এই প্রশ্নটা দেহে আত্মগোপন করা মাত্রই বুঝতে পারলাম, ভারতে পাঁচ থেকে বারো বছর বয়সের পঞ্চাশ শতাংশের অধিক শিশু কোনো না কোনো শারীরিক অত্যাচারের শিকার হলেও আমি শিক্ষক মান ও হুঁশ ধরে রাখার প্রয়োজন বোধ করছি না এবং সেই নির্দিষ্ট ক্রিয়াটি করছি না বলেই অপদার্থ অত্যাচারী অমানুষ হয়ে পথ চলেছি। এই উৎস-মোহনা-ছিন্ন একাপ্রভুর – মহিলা দেখলে বীর্য, অর্থ দেখলে লালা, প্রতিরোধ দেখলে হত্যার অন্ধকূপ ইচ্ছা, শিক্ষক দেখলে সিপিএম আর সিপিএম দেখলে পেচ্ছাপ নিঃসৃত হতে থাকে।
হে দুঃস্থ শিক্ষক! আপনি দুঃস্থ! আর আমি অতি দুঃস্থ!
আমার হাতের তালুতে যে পথনির্দেশিকা আছে তার নির্দেশ মেনেই এগিয়ে যেতে হবে সারাটা জীবন। এ যেন নদীর মতো ধীরস্থির প্রবাহের অনুভূতি। সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের প্রাণটাকে হাতের তালুতে রেখে আঙুল দিয়ে ক্ষতস্থানে হাত বুলানো। ছিন্ন পাখাটির সন্ধান চাই। অনুসন্ধান পর্বে ক্লান্তি আসছে, হতাশা আসছে, কিন্তু মিলছে না দিশা। কিন্তু এই পাখাটার শক্তিও ছিল। শক্তি-প্রাপ্ত হয়েছিল এমন অনবদ্য শিক্ষাব্যবস্থায়, যার মূল লক্ষ্য ছিল ঐক্য ও মহানুভবতা, অন্তর্দৃষ্টির উন্মোচন ও প্রবহমানতা। সর্বত্রই ঐক্যের সুর। মা শব্দটিকে পান্নালাল যে-স্তরেই উন্নীত করুন না কেন, তা সবার হয়ে উঠেছিল। মা শব্দটি যেখানেই জড়িত সেখানেই অকাতর শ্রদ্ধা, পরম ভক্তি, আঁচলের গন্ধ। কাকিমা, জেঠিমা, পিসিমা, ঠাকুমা, দিদিমা, মাসিমা, ধাইমা, বম্মা সহ কত সম্পর্কের ছড়িয়ে থাকা আলো। মুড়কি থেকে মার সবই জুটত এই আলোয়। কত কিছুই ছিল সেখানে – পাখির কুজন, গাছের ছায়া, অন্ধ কানাই। এই আলো কোনো দিনই শপিং মল-এর চোখ ধাঁধানো আলো নয়। নিবিড় আলো। আলোর সেই নিবিড়তায় প্রিয় বিশেষণটুকুর কী ঐক্যবদ্ধ প্রবহমানতা। সেখানে শিখেছি, আমি যেখান থেকে যা পাবো তাই আমার সব থেকে বড়ো উপহার। আমি যেন তাকেই গ্রহণ করতে শিখি। তার পর চোখ মেলে তাকালাম চারিদিকে, দেখি গোটা জগতটাই আমার। তেমন করেই আমার, যেমন করে সবার। এই বিরাট উলটানো জামবাটিটার নিচে কত কী ছড়ানো থাকতে পারে তা ভাবতেই রোমাঞ্চ জেগে উঠল। লুকোনো আচারের মজা থেকে বিশ্বের বিপুল কর্মকাণ্ডের আঠালো যোগ। যেভাবেই হাঁটি, যে-পথই বেছে নিই, চিটেগুড়ের মতো জগত আমার পায়ে লেগে থাকে। যে-নদীকে গঙ্গা নাম দিয়ে আমাদের অহংকার এবং অধিকার বলে আমরা শোনাচ্ছি স্টোন ক্রাশার-এর ধাতব উল্লাস, সে-নদী কিন্তু তাকেও গ্রহণ করেছে। সে যেখান থেকে যা পেয়েছে, যুগে যুগান্তরে, তাকে তার সব থেকে বড়ো উপহার মনে করে এগিয়ে চলেছে। কারণ, প্রবহমানতাকে বজায় রাখাই তার কাজ। যে-ধরিত্রী ধর্ষণে আমাদের উত্তেজনা কখনও নিবৃত্ত হয় না, সে থাকে আমাদের পায়ের তলায়। যেন সে মহান স্রষ্টার কাছে আমাদের ধারণ করার অনুমতি পেয়ে কী আপ্লুতই না হয়েছে!
আদি, মধ্য ও অন্ত্যের মুক্তি যে দেহকল্পনা, সেই মহান স্রষ্টাকে মুগ্ধ বিস্ময়ে পুজো করা হত। নদীর জলে পা ধুয়ে তিনি বসে থাকতেন পর্বত হয়ে। আবার পর্বত থেকে সারা দিনের কাজের পর নেমে আসতেন নদী হয়ে। বনসৃজনের ফাঁকে ফাঁকে মরুমায়াজালও সৃষ্টি করতেন তিনি। নিজের সৃষ্টির প্রেরণায় রূপে-অরূপে প্রাণ সঞ্চার করলেন। অথচ নিভৃতে প্রাণের প্রবাহকে রাখলেন অক্ষুণ্ণ। সেই প্রবাহের স্রোতে মানুষ নিজেকে তাঁর উত্তরপুরুষ রূপে গণ্য করতে লাগল। জলের কুমির, ডাঙার বাঘ, আকাশের পাখি বিশ্বসাথে বিহার করতে লাগল। কুমির বাঘকে দেখে ভাবল সে প্রাণের একটি ভিন্ন আকার। বাঘ কুমিরকে দেখে ভাবল, আমার মতোন কিন্তু অন্যরকম। পাখি অন্তরীক্ষে বাতাস ঠেলতে ঠেলতে নাজেহাল হয়ে মোষের শিঙের ওপর বসল। এইভাবেই সেই মহান স্রষ্টা সর্বত্র এঁকে দিলেন স্থিতি, অথচ তুলিটা রাখলেন গতিশীল। এখন মন আঁকছে সেই মহান স্রষ্টাকে... যাঁকে আমি শৈশবে গুলি খেতে দেখেছি।
মানুষের নিজেকে সেই মহান স্রষ্টার উত্তরপুরুষ রূপে ভাবার কোনো সঙ্গত কারণই থাকতে পারে না। যদি মনে করে থাকি যে সে যা ভেবেছে তা সঙ্গত, তাহলে এই সুসংঘত জীবন-সংকলনে উত্তরপুরুষ রূপে কুমির, বাঘ, পাখি, মোষ সহ যত যত ভিন্ন অবয়ব-অন্বিত প্রাণ আছে, সবাইকেই উত্তরপুরুষ রূপে ভাবা উচিত, ভাবা উচিত বিশ্বসম্পদের অংশীদার রূপে। যেহেতু যেকোনো প্রাণ উত্তেজনাসৃষ্ট ফসল, তাই পৃথিবীতে অসংখ্য প্রাণ সৃষ্টি হবে। পৃথিবীর স্থির সম্পদ বিশ্বদলিল অনুযায়ী তাদের মধ্যেও সমহারে বণ্টিত হবে। স্নায়ুসূত্রে উত্তেজনাপ্রবাহ মাত্র বাঘের শাবক হল, পাখির হল ছানা, আর মানুষের সন্তান। নির্দিষ্ট স্বাভাবিক নিয়মে সংরাগ-উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ল প্রাণশক্তি। মানুষ কিন্তু উত্তেজনার পাশাপাশি আয়ত্ত করল লালসা। মানুষ ভিন্ন অন্য প্রাণী লালসাহীন হয়ে থেকে গেল। একমাত্র মানুষ লালসাকে গ্রহণ করে নিজের ঐক্যের প্রবহমানতায় চিড় ধরাল। বাঘ কুমিরকে কুমির হিসাবেই চিনত, মোষ পাখিকে চিনত পাখি হিসেবেই, অথচ মানুষ খেয়ালখুশি মতো তাদের শ্রেণি বিন্যাস করে বসল। কত রকমের কুকুর, বাঘের ভিন্নতা এবং পাখির রকমফের – সর্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সে আকণ্ঠ ডুবিয়ে দিল নিজেকে প্রকৃতির এই অবারিত ঐশ্বর্যে কামড় বসাতে। উদ্দেশ্য স্বচ্ছ। বাঘের ক্ষিপ্রতা, কুমিরের শক্তি, মোষের এবং পাখির সৌন্দর্যকে হরণ করা।
ঠিক এই মুহূর্তে উপেন্দ্রকিশোরের চড়াই আর কাকের গল্প মনে পড়ছে। চড়াই-কাকে খুব মিতালি ছিল। চাটাইয়ে শুকোতে দেওয়া ধান আর লংকা কে আগে খেয়ে নিঃশেষ করতে পারে সেই নিয়ে ঝগড়াঝাটি হল। একে অপরের বুক খুঁড়ে খাবে এই শর্তসাপেক্ষে ধান-লংকা খাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামল তারা। শেষপর্যন্ত খপখপ করে লংকা খেয়ে কাক বিজয়ী হল এবং খুট-খুট করে ধান খেয়ে চড়াই পরাজিত। চড়াই বলল, বন্ধুর বুক খাবে খাও, কিন্তু নোংরা-ঘাঁটা ঠোঁট ধুয়ে। এরপর কী এক অদৃশ্য সূত্রে ঘটনা-পরম্পরা সংযুক্ত সেখানে। "গেরস্ত ভাই, দাও তো আগুন, / গড়বে কাস্তে, কাটব ঘাস, / খাবে গাই, দেবে দুধ, খাবে কুত্তা, / হবে তাজা, মারবে মোষ, লব শিং, / খুঁড়ব মাটি, গড়বে ঘটি, / তুলব জল, ধোব ঠোঁট – / তবে খাব চড়াইয়ের বুক।" অথচ, কাক কিন্তু কোনো দিনই চড়াইয়ের বুক খেতে পারে না। উপরন্তু গৃহস্থের হাঁড়িভর্তি আগুনে তার ছড়ানো পাখা ঝলসে সে মারা যায়। অর্থাৎ এমন ইচ্ছা যা অন্যের ক্ষতিসাধন করে, তেমন ইচ্ছা একদিন ধ্বংস হবেই। আবার ধ্বংস করল যে, সে গৃহস্থ, মানুষ, জনবহুল পৃথিবীতে বিচরণকারী দ্বিপদ। জ্যোতিষ্কলোকের পথে তারও রেখামাত্র চিহ্ন দেখা যাবে না।
প্রথমেই প্রকৃতির ওপর শাসন চালাতে গিয়ে মানুষ বুঝল খুবই কমজোর সে, শ্রদ্ধা ভালবাসা স্নেহ ও মায়া যে সর্বব্যাপী শক্তির মধ্যে প্রবহমান, তাকে দাসানুদাসে পরিণত করা অসম্ভব। কিন্তু তার মন বহুফসলি। বহু চিন্তায় সে উন্নীত, তাই রক্ষণভাগ মজবুত করল। নিজের ঘর সামলে রাখা দরকার বইকী। সকল ভুল বুঝতে পেরে সে নিজের বোকামোকেই দোষ দিল। ভাবল, সর্বাগ্রে নিজের ভিতরের নির্বোধটাকে নিকেশ করি। যেমন ভাবা তেমন কাজ। নির্বোধের পাঁজরে পাঁজরে ভালবাসা, বুকজোড়া প্রেম। নির্বোধটাকে মারতে পারলে অনুভূতিগুলোকেও মারা যাবে। অন্যকে মারার কষ্টটা অনুভূত হবে না। আর তাই, সে সাধনা করে চলল আসমুদ্রহিমাচল বিজয় লাভ করার সেই অমোঘ সূত্রের খোঁজে। সে খুঁজেও পেল, অক্লান্ত সাধনার পর। সূত্রটি তাকে স্বপ্নে কানে কানে মন্ত্রণা দিল – নিজেরও শ্রেণিবিন্যাস করেছ দেখছি। রাজা অমাত্য ভৃত্য। শ্রেণিবিন্যাস যখন করলেই, শ্রেণিসংগ্রামই বা পিছনে থাকে কেন। স্বপ্নের মধ্যে মানুষের ওষ্ঠ আর অধরের সংযুক্ত-দিগন্তরেখায় কুটিল হাসি ছড়িয়ে পড়ল এক হিংস্র জাগরণের ইচ্ছায়। সে স্বপ্নে পেল জোরালো উৎসাহ। প্রত্যেকেই পৃথিবীকে ভোগ করছে। অতএব প্রত্যেকেরই সম্পদের হক আছে, সমতট থেকে পার্বত্যভূমির এলানো ঐশ্বর্যে দাবি ন্যায্য। যদি দুটি শ্রেণি সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় এবং উভয়কে যদি চালনা করা যায় প্রভু হয়ে উঠতে তবে, হিংসাশ্রয়ী রক্তক্ষরণ সেক্ষেত্রে অবধারিত। পারস্পরিক হানাহানিতে শক্তি হারাতে হারাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে উভয়ই। হানাহানিতে যোগ দেবে কারা, যারা গ্রাম ও নদীর সঙ্গে এক আত্মা এক প্রাণ। যাদের অপরের বিরুদ্ধে সহজে খেপিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে উভমুখী অবিশ্বাসের ঢেউ তুলে। উভয় শ্রেণিই খড়্গহস্ত হবে। উভয় শ্রেণিকেই লাঠিশোটা বল্লম তলোয়ার জোগান দেবে কোনো তৃতীয় শ্রেণি। তারা নিজেদের স্বপ্নের মানুষ বলে প্রতিপন্ন করবে এবং দেশের যে যে প্রাকৃতিক সম্পদে দুটি শ্রেণি এতকাল সমৃদ্ধ হয়েছে এবং সম্পন্ন থেকেছে, সেগুলি লুণ্ঠিত হয়ে যাবে তাদের অগোচরে। গোপন মালিকানা কায়েম করবে রাজা তার সৈন্যবাহিনী মোতায়েন করে। রাজার যত দ্বেষ দুষ্ট প্রজাশ্রেণিকে কেন্দ্র করেই। নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি করে বলে তার কুম্ভীরাশ্রু নির্গত হয় এই উদ্বেগে যে প্রজার সংখ্যা ক্রমশ হ্রাসমান হলে ক্রমশ বর্ধমান সম্পদ কীভাবে তিনি দেখাশোনা করবেন। তাঁর কান্নায় প্রলেতারিয়েত প্রজারা কাঁদেন। কারণ সরল সাদামাঠা জীবনযাপনকারীদের কাছে কান্না বেঁচে থাকার এক আশ্চর্য শক্তি। যাদের কিছু নেই তাদের কান্না শূন্যতার, আর যাদের সব খোয়া যাচ্ছে তাদের কান্না খোয়ানোর। ক্ষমতার অলিন্দ দখলের স্পৃহা এদের বিশেষ থাকে না। ধরিত্রী যদি সবাইকে ধারণ করে তার কাজ নির্বাহ করে যেতে পারে, তারা কেন তাদের শ্রমের ওপর একটা দেশকে ধারণ করতে পারবে না? এই কর্মযজ্ঞের অঙ্গীকারেই তাদের চিরমুক্তি। মহাশূন্যের পথে এই শ্রমশক্তিকে ধ্বংস করা না গেলে রাজার ক্ষমতার মুক্তি হবে কী করে। চির-অপ্রকাশিত থেকে যাবে। তাই রাজারও মুক্তি চাই। তিনি নিজেকে অবিনাশী শক্তি হিসেবে ঘোষণা না করতে পারলে সর্বাধিকারী রূপে তার মুক্তির সম্ভাবনাও ক্ষীণ। কাজেই লালসা লালন করে ক্ষমতার প্রবাহকেও জিইয়ে রাখা দরকার। ক্ষমতার একক সৈন্যবাহিনী। দলকে দল তাদের প্রবাহিত করতে হবে। গ্রামের পর গ্রাম হার্মাদ। নদীর পর নদী ভৈরব।
আমাদের ইতিহাসের মাস্টারমশাই বলতেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে যদি তোরা দেখিস, খোলা চোখে, দেখবি, বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী আর বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পৃথিবী সম্পূর্ণ আলাদা। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। স্যার বেঁচে নেই বলে জোর বেঁচে গেছেন। শান্তি স্থাপনের নামে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্বকে শেখানো হল অশান্তির পারদ চড়িয়ে নিরস্ত্র মানুষকে ধ্বংস করে তার জমি জায়গার ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য স্থাপন করা যায়। দেশের যুদ্ধে মানুষ মরে। স্কুলের যুদ্ধে ছাত্রছাত্রী।
অথচ পৃথিবীর উদার ব্যাপ্তি আমাদের কি সংঘর্ষে যেতে শিখিয়েছে? না, তিনি ধরিত্রীমাতা, তিনি এমন শেখাননি। তিনি শিখিয়েছেন ধারণ করা, বানপ্রস্থের মহিমা। তুমি তোমার মতো উৎপাদন করো। কিন্তু উৎপাদিত দ্রব্যের ওপর অধিকার সকলের। পৃথিবীব্যাপী যে অসীম ঐশ্বর্য ছড়ানো তা যদি পৃথিবীর নিজের অংশ হলেও সকলে ভোগ করার অধিকার অর্জন করে, তাহলে তুমি যা উৎপাদন করবে, তাকে ভোগ করার অধিকার তো সকলেরই থাকে। সৈন্যবাহিনী ক্ষমতার উৎপাদন। খেয়াল রাখা বাঞ্ছনীয়, (ক্ষম)তার সৈন্যবাহিনী মানে সকলের সৈন্যবাহিনী। সকলের বলতে ক্ষমতা নামক শ্রেণি-কক্ষে বসবাসকারী সকলের। ক্ষমতা যার, সৈন্যবাহিনী তার। মানুষ শুধু সন্তান জন্মই দিয়েই ক্ষান্ত হল না। লালসাকে উজ্জীবিত রেখে সে সন্তানসম মারণাস্ত্রের জন্ম দিয়েছে। বাঘ, কুকুর, মোষ, পাখির ভিতরেও মারামারি হয়। প্রজনন ঋতুতে পছন্দের নারীর ওপর উত্তেজনার অধিকার সঞ্চার এবং সুরক্ষিত জায়গা দখল করে পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যত সুনিশ্চিত করার তাগিদেই। সেখানে অস্ত্র বলতে প্রকৃতি-প্রদত্ত ধারাল নখ ও থাবা, ঠোঁট বা শিং। কিন্তু এই ঋতু ছাড়া অন্য কোনো সময় তাদের নিজেদের মধ্যে শ্রেণি-গত বিরোধ থাকে না। অথচ মানুষ, যার হাত পা থাকা সত্ত্বেও মস্তিষ্কের জিংঘাসা-কেন্দ্রের সাহায্যে অনবরত অন্য অস্ত্রের সন্ধান করেছে, সবকটি ঋতুতেই রক্ত ঝরাতে চেয়েছে, ঋতু-সংহারে মত্ত হয়েছে। লালসার সর্বঘৃণ্য এবং সর্বভয়াবহ আবিষ্কার হয়ে ধরিত্রীর বুকে জন্ম দিয়েছে পিসমেকার-এর। প্রতি মিনিটে পাঁচশো রাউন্ডের বেশি গুলি বেরোয় শিল্পজাত শান্তিস্থাপকের গলা থেকে। যারই হয়ত একটি গুলি নিরস্ত্র সিঙ্গুরবাসীর মাথার পূর্ব-পশ্চিম এক করে দিয়ে তার জীবনে অন্তত শান্তি এনেছিল। এই শান্তিস্থাপক এবং তার আপগ্রেডেড ভার্সন ক্ষমতার অলিন্দে থাকা প্রত্যেক মানুষের নিকট বর্তমান। ডাইনে-বাঁয়ে বসেছে বারুদের শপিং মল। আফস্পা থেকে স্পা, সুদৃশ্য সুশান্ত বাকশো ভর্তি স্তব্ধ বারুদ। সুশান্ত নিক্তি। সুশান্ত বাটখারা। যখন প্রয়োজন হবে, অশান্ত হয়ে উঠতে হবে, কিনে নিতে হবে, বা নিজের প্রাণের বিনিময়ে ধারণ করতে হবে। মাথায়। বুকে। তলপেটে।
ক্ষমতাকে প্রবহমান রাখা লোলুপ মানুষের কথা ভাঁজতে গিয়ে মনে হল একটা কথা সহজ ভাবে বলা হয়নি – নন্দীগ্রামের যে-কিশোরের কথা বলেছিলাম, ভূমিতে পাঁজর ঠেকিয়ে মাটিতে কান পেতে সে শুনতে পেয়েছিল, লেফট রাইট লেফট।
স্পাইক মিলিগ্যানের একটি কবিতার কথা মনে পড়ছে। সেখানে এক ব্যক্তির জলে ডুবে যাওয়ার উপক্রম; বাঁচার জন্য চিৎকার করছে। বেলাভূমিতে ডাক্তারের জন্য অপেক্ষারত অসুখ-আক্রান্ত এক ব্যক্তি জানায়, ডাক্তার আসা অবধি অপেক্ষা করতে হবে। ডাক্তার মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে তাকে উপশম দিলে সে বাঁচাতে পারবে প্রথমজনকে। প্রথমজন দ্বিতীয়জনকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে বলল; কারণ প্রথমজনের বাঁচা সম্ভব দ্বিতীয়জন বাঁচলেই। ওরা পরস্পরকে আশা জোগাতে থাকল। কিন্তু ডাক্তার না আসায় দ্বিতীয় ব্যক্তি মারা গেল। আর প্রথমজন, তলিয়ে গেল অতলান্তে। কবি শেষ তিনটি লাইনে লিখলেন, এই দুটি ঘটনা এবং তাঁর ফ্ল্যাটে আগুন লাগা ছাড়া দিনটা খুবই মনোরম ছিল।
দুঃসহ যন্ত্রণায় বিদ্ধ হতে হবে, নিজের গলার স্বর শোনা যাবে না, বেঁচে থাকার অলিন্দে মৃত্যু ঘুরে বেড়াবে – যদিও প্রতিটি দিন খুবই মনোরম, যদিও প্রতিটি দিন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়তেই থাকবে – যদিও মানুষ আপডেটেড হতেই থাকবে, যদিও প্রতিটি দিন খুবই মনোরম।
হয়ত আমরা আপডেটেড হয়েছি। পাসবুক আপ-টু-ডেট করার সাথে সাথে। কিন্তু লক্ষ্যটা স্থির থেকে গেছে। সকলের থেকে ভিন্ন হয়ে ভিন্ন কিছু করার বাসনা। অর্থাৎ নতুন ক্ষমতার প্রবাহকে নিজের ভিতরে সৃষ্টি করা এবং জিইয়ে রাখা। খেয়াল করে দেখেছি হাঁটতে হাঁটতে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়; একটি পদক্ষেপে যদি ডান পা ও বাঁ হাত এগোয় তখন বাঁ পা ও ডান হাত পিছিয়ে থাকে; আবার পরের পদক্ষেপে বিষয়টি ঠিক উলটো হয়। কদিন আগে আমি কতটা ভিন্ন ক্ষমতার অধিকারী বোঝার জন্য চেষ্টায় এতটুকু ত্রুটি না রেখে স্টেশন থেকে বাড়ি ডান পা ও ডান হাত আগে রেখে আসতে চাইলাম। এই সামান্য কাজটাই আমি করে উঠতে পারলাম না। আমাকে কেউ সেদিন বাধা দেয়নি এই বলে তুমি আগে বামপন্থী হও, বা দক্ষিণপন্থী বিপ্লবীদের মিছিলে আমি স্বেচ্ছায় আটকা পড়িনি, ফোনে আমার মাও নিরুৎসাহিত করেনি। আমার নাকি সমাজ পরিবর্তনের বাঁটুল বাসনা। আমি নাকি বিদ্রোহী রণক্লান্ত। আমার অন্তরে নাকি বিংশ শতাব্দীর মৃত্যু কাঁদে। এই তো সেদিন, আমার এক বন্ধুকে দেখলাম। সাধারণত যে-ট্রেনে ফিরি, সেখানে সে ভ্রাম্যমাণ মণিহারী নিয়ে হকারি করে। একদিন পরস্পর হেসেছিলাম। পুঁজিবাদী এবং শ্রমজীবীর কুশল বিনিময়ও হয়েছিল। আমার মনে হয়েছে, স্কুলে আমরা একই সঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিলাম। আজও আমরা একই সঙ্গে যাচ্ছি। স্কুলে লেখাপড়ায় সে আমার মতোই... থুড়ি, আমি তার মতোই ছিলাম। কিন্তু আর্থিক প্রগতির পথে তাদের সংসার হাঁটতে পারেনি। সে তার পিতার মণিহার সানন্দে গ্রহণ করে পিতাকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদান করেছে। পিতা-পুত্রের পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং স্নেহের প্রবাহ সে নিপুণভাবে বইয়ে দিয়েছে। পূর্বপুরুষ ছিলেন জল; আর উত্তরপুরুষ গর্বের জলাধার। অথচ আমি ভয়ের চোটে লেখাপড়ার সঙ্গ ত্যাগ করতে পারলাম না, পূর্বপুরুষের পুঁজির অহংকার আমায় বহন করতে হবে বলে। আগে বলেছি, স্কুলের শিক্ষা কর্মসংস্থান কর্মক্ষেত্র পড়তে পারার জন্য। এই সময় অর্থ উৎপাদনের লালসা ছড়ানো হয় কিশোর মনের মাটিতে, কম্পিটিশন-এর জাঁতাকলে ফেলে। সে-বন্ধু কিন্তু হেলায় পুঁজিবাদের বাসনা ছেড়েছে। আর আমি হকার হবার ভয়েই পুঁজিবাদী পড়াশোনা ছাড়তে পারলাম না। ভারতীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতি বহন করার পরম তেজঃ আমার বন্ধুর মধ্যেই প্রকট। আমার ঘর-ফিরতি ট্রেনে সেদিন বন্ধুত্বের কোনো গৌরবগাথা সৃষ্টি হয়নি। আমার দুর্বলতাকে আমি চাক্ষুষ করেছি মাত্র।
অঞ্চল খুইয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে ক্লান্ত সারমেয়, আমার জখম সঙ্গীবিহীন অন্তরাত্মা...
সত্যি, আমার আত্মার মেঝে আর পরমাত্মার ছাদে ফাটল সৃষ্টি করেছে আমারই ভূমি-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ। আমি বড়ো ক্লান্ত। রণে ভঙ্গ দিয়ে বদ্ধভূমি থেকে পালিয়ে এসেছি। কিন্তু বদ্ধভূমি যেহেতু ভূমিচোরদের দখলে, তাই আমার পালিয়ে আসার ইতি এখনও ঘটেনি। সে-বন্ধুটি শক্তির আধার বলে জীবনটাকে শাক্ত পদাবলি করে ছেড়েছে। আর আমি, ধূর্ত চোখে ইন্টারনেট সার্ফিং করতে করতে, ব্লগ লিখতে লিখতে, ফেসবুক-এ অদৃশ্য বান্ধবের সঙ্গে গল্প করতে করতে, এখনও পালিয়ে আসার সুচতুর কৌশলকে আপগ্রেড করে চলেছি স্বীয় দক্ষতায়।
ভূমি ছিল। বদ্ধভূমি করা হল তাকে। আমাকে শেখানো হয়েছিল একটি বুলি আওড়াতে, লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই, এবং এই লড়াইয়ে, পরিবার থেকে রাষ্ট্রে স্ফুলিঙ্গ-ছড়ানো লড়াইতে অংশগ্রহণ করতে যে গররাজি, তাকে মেরেই আমার লড়াইয়ের প্রথমভাগ-এর জন্ম হবে, আমার বাঁচার সার্থকতা নির্মিত হবে। এই কথা শেখাতেও সে রাজশক্তি ভোলেনি। আমি নোটস গুলে খেলাম এবং প্রথমেই তাকে প্রশ্ন করলাম – "তুমি কি আমার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রস্তুত?" সে বলল – "বোকা কোথাকার, তোর সঙ্গে আমার আবার লড়াই কীসের? আমিই তো তোকে শেখালুম।" বললাম, "তুমি অংশগ্রহণে গররাজি হয়েছ, অতএব তোমাকে মারার মধ্যেই আমার বাঁচার সার্থকতা।" গররাজি হওয়ার কারণে সে লড়াইয়ে হেরেই ছিল, তবু পরাজিতকে পরাভূত করার মাৎসর্য একমাত্র মানুষের মধ্যেই আছে, অতএব আমার মধ্যেও বর্তমান। তাই এই লড়াইয়ে তাকে পরাভূত করে আমার বাঁচার সার্থকতা নির্মিত হল।
বিজয়ী ও পরাজিত – উভয়েই বেঁচে থাকল – অতি-সাধারণ অস্তিত্বরক্ষাকারী প্রাণী হিসেবে। ইতিহাসের পাতায় এরাই কিলবিল করে।
এখন মনে হয়, সেই পূর্বপুরুষ লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেনি, শেখানো বুলি উত্তরপুরুষের মস্তিষ্কে সঞ্চারিত করেছে মাত্র। সেই মানুষটিকে আমি বিজিতের দলে ফেললাম কোন স্পর্ধায়? লড়াইয়ে যে অংশগ্রহণ করে না, সে তো অপরাজেয় হতে পারে। যে নিশ্চুপ রইল, তাকে পক্ষে ভাববই বা কেন, আর যে আমার পক্ষ অবলম্বন করল না, তাকে বিপক্ষ বলে আঘাত হানি কোন দুঃসাহসে। তাহলে একটি বসতবাড়িতেও গড়ে তিন-চারটি সীমারেখা বর্তমান। একটা কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে যেতে হলে ইট-সিমেন্ট-রেখাংকিত সীমারেখা পার করে যেতে হয়। প্রতিটি ঘর কি বিচ্ছিন্ন দেশ? একটি ভেসটিবিউল কি নো ম্যানস ল্যান্ড? ইতিহাসের পাতা ভারি হয়ে আছে যুদ্ধোদ্ধত বুটের চাপে, জবজব করছে কানমাথা দিয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসা রক্তে। আসলে যুদ্ধক্ষেত্র রূপে দেশকে ভাবে বা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে যারা, তাদের বিজয়ী বা বিজিত কোনো গোষ্ঠীতেই ফেলা যায় না। একটা বিরাট ময়াল-ভয়াল সিপিএম এই দুপক্ষকেই অস্ত্র জোগান দেয়। তাদের মধ্যে পারস্পরিক হিংস্রতার বীজ ছড়িয়ে লড়াইয়ে বটবৃক্ষ হতে উৎসাহিত করে। লিচুচোর পরিবেশ দূষণে মারা যায়, লিঙ্গচোর নিখোঁজ থাকে, ওদিকে ভূমিচোর ভূমিকম্পে অনন্তযৌবন লাভ করে বেঁচে থাকার নিষ্ঠুর সংজ্ঞা সৃষ্টি করে। যুদ্ধংদেহি! দৈহিক উন্মত্ততায় আমি আমাকেই মারি, এটাই আমার বিমারি।
আর যুদ্ধ যারা করে, তাদের হেব্বি পয়সা! আমিও সম্পন্ন একাপ্রভু হয়ে ওঠার পথে ভেবেছি যে আত্মসুরক্ষার অজুহাতে একটা .৩২" পিস্তল কিনব। ভাবাই সার। তার জন্য কাশিপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরিকে ৮৬,১১৭ টাকা গচ্চা দিতে হবে শুনে হিমশিম খেলাম এবং আক্ষরিক অর্থেই বিএড-এর প্রতি প্রেম জেগে উঠল। শিক্ষক হতে পারি-না-পারি, ভাবখানা শিক্ষকের মতো না হলেই নয়। কোট-প্যান্ট কার না ভাল লাগে! আচ্ছা, এই শিক্ষকের ঘরে কী আছে! বুকশেলফ ১১,০০০ + কম্পিউটার ৩০,০০০ + ইউপিএস ১১০০ + অডিও সিস্টেম ৩,০০০ + প্রিন্টার ৪,৯৯০ = ৫০,০৯০ টাহা! আআহা!! আর মাত্র ৩৬,০২৭ টাকার মালপত্তর কিনতে পারলে আমার ঘর একটা পূর্ণাঙ্গ পিস্তল হয়ে ওঠার দাবিদার হতে পারবে! আর সিপিএম-এর মেরুকরণের শিক্ষায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে আমি শূন্যে গুলি ছুড়ে পরিবারের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে বাড়িকে বানিয়েছি মহাদেশ, আমার একলা ঘর আমার দেশ, পূর্বপুরুষকে বহিঃশত্রু, সহসদস্যকে শ্রেণিশত্রু এবং উত্তরপুরুষকে ক্রীতদাস! এমন ধরণিখণ্ডের চরাচর জুড়ে সিপিএম বিগ্রহ রূপে পূজিত হয়, আর তাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে সংসার! বেডরুম থেকে বাথরুম। রক্তপাতহীন সেই যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সর্বাধিক! ধীরে ধীরে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে সাধের রাজ্য, দেশ। তখন আর রক্তপাতহীন থাকে না যুদ্ধ। প্রত্যেকের হাতেই পিসমেকার। গুলির ছররা। অর্থের ছররা! আমি তো জানি, আমি মারাত্মক ভীতু, তাই পিস্তলের প্রয়োজন হয় আমারই। বাড়ি থেকে স্কুল আর স্কুল থেকে বাড়ি, স্টেশনগুলো যখন একের পর এক পার হয়ে যায়, নিজেকে সেই ইঁদুরছানার সঙ্গে তুলনা করতে বড়ো সাধ হয় যাকে আমি-আমরা শিশুর মুখে মুখে চিরকাল দুর্বল করে রাখি। প্রজন্মের পর প্রজন্মে ইগলপাখির ডানা তার ওপর বিশালাকার ছায়া ধারণ করে নেমে আসে।
কী হবে এই ক্ষয়ক্ষতি করে! আমার পিস্তলের সরু ব্যারেল আর বিসমিল্লার সানাইয়ের ক্ষীণতনু মধ্যভাগের আকারগত বিশেষ পার্থক্য চোখে পড়ে না। অবশ্য পার্থক্য আছে কার্যক্ষেত্রে, যা এখনকার জগতের কাছে বিশেষ অর্থ বহন করে না। সুরগুলি কেটে গেছে কবে। পরস্পর যুক্ত না থেকে তারা শুধু সুর ও গুলি হয়েই রয়ে গেছে; নিকটে আসতে চায় না – সাহচর্য চায় না।
কিছু ইঁদুরছানা অবশ্য ভয়ে মরে না। হাঁটুমুড়ে বেঁচে থাকার থেকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মরা ভাল বলেই মনে করে। যে-ছেলেটি আমাকে গালাগালি দিয়েছিল, সে আমাকে একটা দিশা দেখিয়েছে। ও কিন্তু হাঁটু মুড়ে বেঁচে নেই। ছোটবেলা থেকেই ওর উরুদুটো শিল্প-সাহিত্য-শিক্ষা-রাজনীতির আঘাতে আহত। জীবন, জঙ্গল, মহল, সিপিএম, তৃণমূল – এই শব্দগুলো কানে এলে ছেলেটি প্রতিটি সাবধান-বিশ্রামে তাদের বুঝিয়ে দেয়, "সাবধান! আমি কিন্তু বিশ্রাম নিচ্ছি।"
কর্মক্ষেত্রে যারা বসে থাকে, তাদের আমার কর্মক্ষেত্র মাড়ানো লিঙ্গহীন বলেই মনে হচ্ছে এখন। আমিও বশীভূত সেখানে। একটা সময়ের পর প্রতিবাদ প্রতিরোধেও ক্লান্তি আসে! "আমার ছেলেমেয়েদের আলাদা আলাদা ব্যাচ। ক্লাস এইট-নাইনের মেয়েদের আলাদা ব্যাচ করেছি আমি। আই হ্যাভ টাচট এভরিথিং অভ এভরি গার্ল।" করজোড়ে অব্যাহতি চাইলাম সেই প্রেতাত্মার নিকট। করদুটো জুড়লাম, জীবনের তিনটি অসহায় মুহূর্তে, তিন বার। তাতেও ছুটকারা নেই। স্টাফ ল্যাভেটরির অভ্যন্তরে পাওলি দাম দেখে সেটি শিল্প না শিল্প-না, সেই নিয়ে ছিঃ, ছিছি এবং ছাইভস্ম-এর ছত্রাক গজিয়ে তুললেন চারিদিকে! অনুব্রতকে আলোচনা-বহির্ভূত রাখলেন তিনি, কারণ, ছুট্টে গিয়ে পায়খানার অভ্যন্তরে মোবাইলে চোখ রাখার সময় অনুব্রতের জায়গায় নিজেকে স্থাপন করেও সম্পূর্ণ স্থাপন করে উঠতে পারেননি। তাই তার ক্রোধ পাওলি দাম-এর দিকে চলে গেল। ষড়রিপুর পরাধীনতা এখানেই। স্বাধীন যদি না হতে পারে তবে অস্থিরতা চোখেমুখে ভেসে ওঠে। অর্থসম্পন্ন এই রিপুবিলাসী ভদ্দর লোক বড়ো একা। রিপুবিলাসেও একা। লোভ সংবরণ করতে পারেন না বলে অতি-সাবধানে থাকেন, পাছে ভুলেও সংশোধিত হয়ে যান। কর্তব্যে গাফিলতি এবং গাফিলতির কর্তব্য তিনি উত্তরপুরুষের ক্রোমোজমে এঁকে দেবেন এবং শ্রেণিকক্ষে সিপিএম-এর দাস তৈরি করবেন পড়ানোর অছিলায়। অন্ধকার থেকে আরও অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়াই তাঁর দলীয় রাজনীতি তাঁকে শিখিয়েছে। তলিয়ে যাচ্ছেন জেনেও ভেসে ওঠার বাসনা তাঁর নেই। নিজস্ব নৈতিকতার ওজনস্তরে প্রতিনিয়ত চিপিং করছেন জেনেও পরিবেশের ধ্বংসে তিনি উদ্বিগ্ন। তাঁকে দেখি আর বোঝার পরেও বোঝার চেষ্টা করি, নিজেকে কতটা বন্ধক রাখলে বিশ্বের মানচিত্রকে একটু একটু করে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবন্ধকতা প্রদান করা যায়।
সিপিএম-এর শিক্ষায় আত্মজিজ্ঞাসাহীন আমরা জেনে এসেছি, নিজস্ব প্রতিবন্ধকতাই স্বাধীনতা। এযাবৎ বেঁচে থাকায় সিপিএম আমাকে রবীন্দ্রনাথ অপেক্ষা কার্ল মার্ক্স-এর নাম বেশি শুনিয়েছে। আমার দেশের রূপ রস রঙ নিয়ে যিনি সাধনা করে গেলেন, তাঁকে সরিয়ে দিয়ে গ্রহণ করেছে এমন একজন মানুষকে যিনি এখানকার আবহাওয়া, মানুষজন, গ্রাম-শহরের জীবনের সঙ্গে জড়িত নন। অদ্ভুত লাগে, সোনিয়া গাঁধিকে যতই বিদেশিনী আখ্যা দিই মার্ক্সকে ভারতীয় বলেই মেনে নিয়েছি। পূর্ব-পশ্চিম, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটু বিভিন্নতার রেখা টেনেই বলি, পশ্চিমবঙ্গে এযাবৎ মার্ক্স-কে সামনে রেখে যথেচ্ছাচারে ব্যবহার করা হয়েছে পশ্চিমি সংস্কৃতিকে। ইংল্যান্ডের দুটো লক্ষ্য পূরণের কথা মার্ক্স বলেন তাঁর ১৮৫৩ সালে রচিত "India" প্রবন্ধে৭ – এক: প্রাচীন এশিয় সভ্যতার বিলোপ। দুই: এশিয়ায় পশ্চিমি সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। জার্মানদের হাল-না-ছাড়ার গুণপনা ভারতের নদীর বুকে হাল-না-ছাড়া নাবিকের ওপর পশুশক্তি প্রয়োগে আরোপ করা হয়েছে। কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, মার্ক্স একজন প্রথিতযশা চিন্তাবিদ এবং তাঁর তত্ত্বের মাধ্যমে কোনো সত্যের দিকে পৌঁছানোর বাসনা তাঁকে সুউচ্চ স্থান দিয়েছে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎদ্রষ্টা রূপে। কিন্তু আমরা নিজেরা যেহেতু কখনও মার্ক্স-এর বইপত্তর উলটাই না, অলস অপদার্থ বলে, কিছু লোক যারা অত্যাচার এবং শোষণ করার জন্য যেটুকু পড়লে চলে সেটুকু পড়ে নিজেদের কার্যসিদ্ধির জন্য মাইক্রোফোনের সামনে প্যারাফ্রেজ করে ত্রুটিমুক্ত ঔদ্ধত্যে, তাদের সেই সব কথা হজমি গুলির মতো চেটে-চুষে-চিবিয়ে ইতিহাসের পাতায় লীন হয়ে যেতে বসেছি আমরা। আত্মশক্তিহীন আমরাই কর্তৃপক্ষের বর্ম যাদের যুদ্ধশেষে খুলে রাখা হয়। ভারতের ইতিহাসের অদৃশ্য পাতায় সময়ের হাতকড়া পরে দাঁড়িয়ে আমি অঝোর ধারায় কেঁদেছি। কাঁদলে কী হবে, সত্য চোখের জলে ধুয়ে যায় না, বরং ঝাপসা হয়। দক্ষিণ ভারতকে সফটির কোণ ছাড়া কিছু ভাবতে পারিনি, পশ্চিমকে ভেবেছি প্লুটোর হাঁমুখ, উত্তরকে জ্বালামুখ, কখনও বা গোটা ভারতকে রেলের জালিকাকার শিরাবিন্যাস মেপেঝেপে একাকার করেছি। কিন্তু মানচিত্র-বহির্ভূত ভারত, যার মাতৃভৌম রূপ আমার মায়ার সংসারের অকল্পনীয় মজবুতি, আমার মৃত চিন্তার দোসর হয়ে অনন্ত রৌরবযাত্রা করেছে। এক অব্যক্ত অনুভূতির অশ্রুগ্রন্থি উত্তেজিত করে। সেখানে যখন দেখি মার্ক্স-কে আমরা ফোকাস করেছি আর ভারতমাতা-র পূজারী রবীন্দ্রনাথকে ব্লার করে কাজ সেরেছি, সে ভাবনা ঠিক স্বতঃস্ফূর্ত মনে মেনে নিতে পারিনি। রবীন্দ্রনাথকে বস্তাবন্দী প্রবচন রূপে রেখে দিল অধ্যাপকের দল। রবীন্দ্রনাথের ওপর বিশ্বভারতীর সর্বাধিকার প্রয়োগ করে জাতির রক্তে মিশতে দেওয়া হল না অথবা ততটুকুই মেশানো হল যতটুকু মেশালে রবীন্দ্রনাথের সমাজভাবনাকে আড়াল করা যায় জনজাতির ভাবনা থেকে। প্রায় দুশো বছরের পরাধীনতার পর স্বাধীনতার ভোর আসলেও পরাধীন করে রাখার বিকট ইচ্ছের ব্যাটনটা বহন করতে শুরু করল হাজার হাজার রাজনৈতিক পশু। ফলে আমাদেরই কারোর ওপর আমাদেরই কারোর সর্বাধিকার ঘোষিত হল নিঃশব্দে। ফেলে আসা বছরগুলোয় পশ্চিমবঙ্গবাসীর ওপর সিপিএম এই স্বঘোষিত অধিকার কায়েম করেছিল সব ক্ষেত্রে। ছিল ব্যাটন, হয়ে গেল বেয়নেট। গুলির ছররায় পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীর ভারতীয় আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিল। চোখের সামনে কর্মসংস্থানের ধুয়ো তুলে, তথ্যপ্রযুক্তি আর শপিং মল-এর ঝাঁ চকচকে ঘরবাড়ি বানিয়ে, গ্রাম-শহর ও বসতি-বস্তির দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজেরা নিজেদের সামনে রক্তকরবীর অন্ধকার জাল নির্মাণ করল। অন্য দিকে পাঠ্যপুস্তকের বিষয় সরলীকরণের নামে অতি নিম্নমানের লেখায় শিশুপাঠ্য সাজিয়ে দিল। রাহুলও অনুসরণ করতে বাধ্য হল। সরাসরি ছুরিকাঘাতে তার জ্ঞানচক্ষুতে নেমে আসল অকাল সূর্যাস্ত। সে সোনার তাল খুঁজে তুলে দিল জালের ওপারে থাকা সিপিএম শাসকের হাতে, অমাত্যদের মারফত। যক্ষপুরীর নিরন্তর উন্নতি হতে থাকল। কিন্তু সেই যে আটকা পড়ল সোনার সান্দাকফু-র অন্ধকারে সুড়ঙ্গ-খোদাইকর মানবসন্তান, সারাজীবন সে আর বন্দিমুক্তির স্বাদ পেলো না।
কিন্তু এবার সে কি মুক্ত হতে পারে? ৩৮৫টা সাবইন্সপেক্টরের শূন্যপদ পূর্ণ হলে কি সমস্ত সমস্যার নিরসন হবে? বোধহয় হবে না। আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া কাল আমাদের দোল। সকালে সিপিএম। রাতারাতি তৃণমূল। ইহাই পদবাচ্য। কংগ্রেস জমানায় অন্ধকারে হত্যার নিপুণ ছক ছিল। পরিবর্তন চেয়ে মানুষ যে-বামফ্রন্টকে আনে, সে সিপিএম হয়ে গেল অচিরেই। সেই সিপিএম-কে হটিয়ে দিয়ে মানুষ তৃণমূলকে বেছে নিল। গ্রামেগঞ্জে অসংখ্য লাশে হুমড়ি খাওয়ার পর। যদিও চৌত্রিশ বছর অতিক্রান্ত। জনসংখ্যার নিরিখে বলে দেওয়া যায়, তৃণমূলের অধিকাংশ আসলে উৎকট সিপিএম-এর বংশধর। আত্মসচেতনতাহীন বলে আমরা প্রতিক্ষণে যেভাবে বদলে যাই, তাতে কত দিন আর বদল চাইব কে জানে!
হয়ত বদল হয়ে গেছে, তবে তা হাতবদল; হয়ত হতে চলেছে যা, ভোলবদল।
আমাদের রাজনীতিতে রবীন্দ্রনাথ, জীবনবোধে রামকৃষ্ণ এবং স্বজাত্যবোধে নজরুলের কোনো স্থান নেই। কোনো একটা সময় তাঁরা করেকম্মে খেয়েছেন বলেই আমি জানি। মুখে বলি না, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন সে-স্বাক্ষর বহন করে। প্রয়োজনের সময় কাদের কীভাবে ইউজ করতে হয় তা যদি সিপিএম-এর কাছে না শিখে থাকি তাহলে পশ্চিমবঙ্গে আমার জন্ম বৃথা। এতটুকু শ্রদ্ধা এই মহান ভারতীয়দের প্রতি নেই আমাদের। সংস্কৃতিবোধের নলি কেটে আমরা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছি। সাংস্কৃতিক গৌরবের প্রদীপ দিন-ফিন উদ্যাপন করতে করতেই নিভে গেছে। বহু দিন আগেই, যে করাল অন্ধকারে পরিকল্পিত হত্যার ছক নিপুণভাবে সজ্জিত হয়, সেখানে ওঁদের দেহ টুকরো টুকরো করে কেটে ছড়িয়ে দিয়েছি। আমাদের জোর-যার-মুলুক-তার রাজনীতিতে, ভাবতন্ময়তাহীন জীবনবোধে এবং জাতি-বিনাশী স্বজাত্যবোধে ওঁরা বিরোধী শক্তিই ছিল।
একটি সুইডিশ প্রবচন বারবার আমাকে নাড়া দিতে লাগল – "একটি সাহায্যকারী হাত খুঁজে পাওয়ার সব থেকে সুন্দর জায়গা তোমার বাহুর শেষপ্রান্ত।" অর্থাৎ, নিজের সত্তাকে জাগ্রত করো। আদি অকৃত্রিম যে-মানুষটা তোমার ভিতর লুকিয়ে আছে, তোমার যাবতীয় স্নায়ুযুদ্ধ শেষে তাকে ডাক দাও। সকল চাপানউতোর থেকে অর্বুদ যোজন দূরে, জনহীন প্রান্তরে তার সাথে একা কিছুক্ষণ কাটাও। এই প্রবচনকে মাথায় রেখেই ইতিহাসের পাতায় ঝাপসা আলো ফালাফালা করে আর্তনাদ করে উঠলাম রবীন্দ্রনাথের প্রতি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সাড়া দিলেন না। মহান স্রষ্টার নিথর দেহের পাশে তাঁর নিমীলিত চোখে বসে থাকা আমাকে শুধু নাড়া দিয়ে গেল। আমার বোবাকান্না, অবসাদের স্তর পার করে যখন যুগ-যন্ত্রণাকাতর নদী হতে চাইল, দেখলাম, অসহায় ঝোপের আড়ালে দগ্ধ বৃতি থেকে নিষ্পাপ মুখ বার করে দুলে চলেছে রক্তকরবী।
আমি তাকে স্পর্শ করার স্পর্ধা দেখায়নি। বরং হতাশার কান্না মুছে ব্যস্ততা দেখিয়ে চলে
এসেছি। নিজের মোবাইলে নিজেরই মোবাইল নম্বর ডায়াল করছি এবং শুনছি সেই নম্বরটি ব্যস্ত। কই, আমি তো ব্যস্ত নই। একেবারেই নই। নিজের সঙ্গে মজা করলেই দোষ? আসলে যা বুঝলাম তা এই যে নম্বরটির মালিক এখন একা। হয় সে বলছে এবং শুনছে, নয় শুনছে কিন্তু বলছে না, নয় বলছে কিছু শুনছে না, অথবা অপেক্ষা করছে কখন ওপাশের ফোনে কেউ কথা বলবে। এই এতগুলো সম্ভাবনার যেকোনো একটি ঘটতে পারে তখন। তবু, মোবাইল পরিষেবায়, একাকিত্বের দারিদ্র্য দূর করার জন্য, একটা পুরুষ/নারী কণ্ঠ বসিয়ে রেখেছে আমাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য। অর্থাৎ কোনো ভাবেই মানুষকে কিছু ভাবতে দেবে না যন্ত্রসভ্যতা। সে-ই জানান দেবে ওপারের ব্যস্ততা সম্পর্কে। ভাবনাচিন্তার দায়িত্বও সে তুলে নিয়েছে। পৃথিবী জুড়ে এই নির্লজ্জ বেসাতির রমরমা বাজার – যন্ত্রানুসঙ্গ দিয়ে নিঃসঙ্গ করে তোলা।
যখন নিঃসঙ্গ বোধ হচ্ছে, যখন শূন্যতাই আমার শোভা, তখন দ্বিতীয় উপসর্গ আমার এই জীবনসর্গে ঢুকে পড়ল সমস্ত শক্তি নিয়ে। সমকালীন সন্ধ্যা কাঁপিয়ে দলবদ্ধ প্রশ্ন ছুড়ে দিল। বন্ধুরা কোথায়? কেমন আছে ওরা? তাদের খোঁজ রাখো?
"তারা কি খোঁজ রাখে?" চিৎকার করে উঠলাম, যেমন করে চিৎকার করে অন্যের গলার স্বরকে পরাজিত করে এতকাল বেঁচে থেকেছি, সেভাবে! শান্ত ক্ষমাহত হারিয়ে যাওয়া স্বর পুনরুদ্ধার করে সে নির্বাপিত দীপে আলো জোগাল, "কথা তো তোমার এমন ছিল না। তোমার কাজটা কী? খোঁজ নেওয়া। সেটাই তোমার জীবনের লক্ষ্য। তুমি বিচ্যুত হয়েছ। অভ্যন্তরে ক্ষয় পেতে পেতে তুমি তোমার স্বাধীনতাকে হরণ করেছ।"
অভিমানী জোয়ার ঠান্ডা হল একসময়। মনে পড়ল আমার দিনপঞ্জিতে আমি আসলে ডাকহরকরাই ছিলাম। কিন্তু পায়ের তলা থেকে সর্ষে সরিয়ে দিয়েছি। বাগবাজারের ঘাটে কতকাল যাওয়া হয় না। দেখা হয় না কতকাল বৈরাগী জলধারার সাথে। সেখানে কোনো যুদ্ধ নেই। জয়-পরাজয়ের ক্ষুদ্র তুচ্ছ চিন্তা সেখানে অবর্তমান। নিশ্চুপ বসে থেকে জলের ওপর বাতাসের শিখা উড়ে যাওয়া দেখতে কার না ভাল লাগে। প্রকৃতির রহস্য তার অসীম উন্মোচনেই। সেখানে গেলেই বোঝা যায়, জীবনভর এই মৃত্যু উপত্যকা, যে আমার মাতৃভূমি, কীভাবে শ্বাস নেয়, বেঁচে থাকে। মার্ক্সিজম, হেডনিজম, লেনিনিজম আর ফেমিনিজম-এর তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়ে কি জীবন চলে? ওসব জলে যায়। আস্থা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, স্নেহ এবং মানবতার কাছে কোনো ইজম কোনো দিন বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে পারে না।
আমার তো নিজের বলে কিছুই নেই, যা কিছু সবই এই বিশ্বের। কাজেই সবটুকু তাকে দিলেই বা আমার কী। অন্য কারোরই বা এতে সমস্যা কোথায়। মোটামুটি যা বুঝে গিয়েছি, পঞ্চমশ্রেণির নোংরা রাহুলকে আমরা আর কোনো দিনই ভাষা ও গণিত সঠিকভাবে শেখাবো না অথবা সেই পরিবেশ গড়ে তুলব না যেখানে ভাষা ও গণিত তার কাছে আলোর ছবি হয়ে উঠতে পারে। অন্য কেউ শেখাতে গেলেও সমালোচনার লালা ছড়াব। সারাদিন আমি এ.টি., মধ্যরাতের সিডি, রাতের অ্যাসিডিটি – এই করেই কর্মজীবনের অবসর নেওয়ার দিনের দিকে অগ্রসর হব। একশো কোটি টাকার ক্যালকাটা আই-এর দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে হাপিত্যেশ করে বউকে বলব, "আগের দশকে শিশুদের সাথে এই দশকের শিশুদের পার্থক্য রয়ে গেছে।" মেডুসার রোম্যান্টিক ঘড়ঘড়, "তোমার লোবোটমির প্রয়োজন!" আমরা হাসতে থাকব বৃষ্টিবিঘ্নিত দিনে। আধুনিকতাকে বহন করে চোখের সামনে শোঁ করে হয়ত একলাখি ন্যানো স্পিড বোট বেরিয়ে যাবে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমার ছাত্র, ঠেলাগাড়ির বেগুনবিক্রেতা, কীভাবে কোন পথে ঠেলবে নিজের জীবন বুঝেই উঠতে পারবে না। আর মা মারা গেলে দাদাকে পাশে নিয়ে কমিউনিস্ট সভ্যতার টার্গেট রাহুলের বাটির মুড়ি তখন ছড়িয়ে একাকার।
শুরুতে শিক্ষক হিসেবে অহংকার প্রদর্শন করেছিলাম এই বলে, একটি দিন শাস্তি দিয়ে যদি ছাত্রটিকে ফিরিয়ে আনা যায়, কত কঠিন শ্রমের বিনিময়ে অন্নসংস্থান করতে হয় তা বোঝানো যায়, তাহলে সেই শাস্তি, হোক দৈহিক, প্রয়োগ করা উচিত বলেই আমি মনে করি। এখন নিজেকে জিজ্ঞাসা করছি, "শাস্তি কাকে দেব? সে কি কোনো শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে আদৌ?" জন্মানোর পর জন্মানোদের দ্বারা যে-শাস্তি সে পেয়ে চলেছে, পূর্বপুরুষের ঋণের যে-ভার তাকে নিল ডাউন করিয়ে রেখেছে, রাজ্যকে বিকিয়ে দেওয়া কমিউনিস্ট কালচারের আড়াই প্যাঁচে প্রতিদিন তাকে যে কুরবান যেতে হচ্ছে – তাকে আর কত শাস্তি দেব? কত অত্যাচার করব?" যে শিশু হারিয়ে গেছে যন্ত্রসভ্যতার ভিড়ে, যার জীবন এতটুকু বয়সেই শ্যাওলা-তছনছ, যে নিহত তাকে আমার আহত সত্তা "The Lost Child" পড়াবে কোন মুখে?
অর্থভোগ্যা বসুন্ধরায় আমার অন্তরাত্মা কুকুরটি এখন আর কাঁদে না। নিহত আত্মার অন্তঃস্থলে সে ডগ নয়, প্রকৃত অর্থেই গড। আমৃত্যু জন্মহীন গড – যার মানুষজন্ম – যে সর্বদা মাথা উঁচু করে মাথা হেঁট করে থাকতেই পছন্দ করে। অসংখ্য দেয়াল উজিয়েছে তাকে ঘিরে। অসংখ্য ওয়াল। এখন আদমের ফেস-এ ভরাডুবির আশংকা। ইভের বুকে স্টোন ক্রাশারের ক্ষতচিহ্ন। দিনের মধ্যে কয়েকবার স্টেটাস আপডেট করার মাধ্যমে তারা জানান দেয় – আমরা, কান্নাঘামভেজা নিঃসঙ্গ শার্ট, আত্মগ্লানির হ্যাঙারে ঝুলে আছি, নরহত্যা ও দুর্ভিক্ষের মধ্যে বিদঘুটে হাসি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছি, সারা শরীর বিষে জ্বলেপুড়ে গেলেও লিঙ্গহীন প্রস্তরখণ্ডের মতো আমরা টিকে আছি, শ্বাস নিচ্ছি। এই ভাবেই বেঁচে আছি, এবং বেঁচে আছি, কিন্তু বেঁচে আছি, অথবা বেঁচে আছি – অনেকদিন।
বেঁচে যখন আছিই, সুতোচ্ছিন্ন শিক-ঠিকরানো অন্ধকারের-রং-চটা আমার কে. সি. পাল রিকশাওলাকে এগিয়ে দিতে আমার আপত্তি থাকার কথাও নয়। কেউ গ্রহণ করেন, কেউ সচেতন ভাবেই প্রত্যাখ্যান করেন। সে যাই হোক, নিয়মিত রিকশা চড়ব। লিঙ্গচুরির ভয়টয় নেই। যার সত্তাই চুরি গেছে, তার আবার লিঙ্গ চুরি যাওয়ার ভয়। আমার উপার্জনের একতুলো পরিমাণ ভাড়া রিকশাওয়ালাদের নিয়মিত দেবো। প্রতি মাসে অর্থের দানবীয় উল্লাস, যা আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়, তার অতিক্ষুদ্র পরিমাণ তাদের তুলে দেব। আমার মতে পারিশ্রমিক বলে কিছু হয় না। যদি পারিশ্রমিক বলে কিছু থেকেও থাকে, ওদের পরিশ্রমের পারিশ্রমিক আমার অর্থ থেকে দেওয়া সম্ভবপর নয়। কিছুটা স্থানগত বিনিময়। আমি হাঁটব না, চড়ব। আমাকে তিনি চড়াবেন, তাই আমি স্থানান্তরিত হব। এবার আমি বলব, এই নিন। দূরত্ব দূরীকরণের জন্য আমি তাঁকে অর্থ প্রদান করব না। আমার এই অর্থ প্রদান অভ্যাস দুই দিকে যদি এতটুকু সামঞ্জস্য আনতে পারে, এই ভেবেই এই কাজ এবং কাজের পুনরাবর্তন। আমার পুজো আছে। ওদেরও আছে। আমার ছেলের পুজো আছে। ওদের ছেলেমেয়েরও পুজো আছে। দেখুন, কীভাবে আটঘাট বেঁধে আমরা-ওরার শ্রেণি বিভাজন করে ফেললাম। কীভাবে আমি সিপিএম-এর শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে হত্যাকারী পূর্বপুরুষের ব্যাটন বয়ে বেড়াচ্ছি। রিলে রেস-এ জয়ী হবার বাসনা তো আমারও। তবু তার মধ্যেও অক্ষ(র)যাত্রা-য় ছাপানোর লালসা সংবরণ করতে না পেরে কতগুলো ভাল ভাল কথা লিখে দিলাম। উত্তরপুরুষেরও কোথাও ক্ষতস্থান রয়েছে, বুঝিয়ে দিলাম। বুঝিয়ে দিলাম শ্রেণি-ফেনি নিয়ে কত চিন্তিত। আমার দুঃখফেনায় ঢেকে দিলাম নিহত রাহুলদের শোকগাথা। আমার ভিতরেই নির্মাণ করলাম অজস্র শ্রেণি। আমার এক বাহ্যরূপ। অন্তরালে বহুরূপতা। আমার ভিতরে থাকা অসংখ্য শ্রেণিতে আসলে প্রবাহিত হচ্ছে লালসার উষ্ণ শোণিত। সেই উষ্ণতায় ভালবাসার কবোষ্ণতা বাড়ন্ত। সেখানে উচ্চ তাপমাত্রায় প্রবাহিত হচ্ছে লালসার লাভাস্রোত। সেই গলিত লালসা যে যে অঞ্চল ছোঁয়, যে যে মানুষকে স্পর্শ করে, ক্ষুধার্ত ময়ালের মতো গিলে খেতে থাকে এবং ক্রমবর্ধিত শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলে। তখন তার সচেতন রূপও ভুলে যায়, রিকশাওয়ালার ছেলেরা তার স্কুলেই পড়ে। তখন সে এই প্রকল্পিত গণহত্যার অংশ এবং অংশীদার – ময়ালাংশ। সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতির দিক থেকে সরকারের সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে আমি, দিবাকর সরকার, ওরফে পূর্বোদ্ধৃত Snake Xenzia-র সেই সাপ, আমার পাকস্থলীতে হাজার হাজার মানুষ সহ মানবিকতাকে গলাধঃকরণ করে চলেছি ক্রমাগত।
কথিত আছে, শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মের পূর্বে তাঁর পিতামাতার সম্মুখে বেশ যে-কটি অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল তাদের মধ্যে একটি ছিল: সন্তানসম্ভবা চন্দ্রমণি দেবী দেখেছিলেন শিবলিঙ্গ থেকে নির্গত একটি জ্যোতি তাঁর গর্ভে প্রবেশ করছে। ফ্রয়েডিয় ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না। আমার কাছে এই চিত্রের বিস্ময়টাই মুখ্য। আমি পূজার্চনার ধার দিয়ে যাই না ঠিকই, কিন্তু তাই বলে উপহাস করি না। আমাদের পাড়ার ওই মন্দিরে নতুন শিবলিঙ্গ আনা হয়েছে। এবার আরও দামি। কিন্তু তার থেকে আর কোনো রামকৃষ্ণ জ্যোতিরূপে বেরোবেন কী? যে সন্তানসম্ভবা মা মেয়ের সঙ্গে বসে শীলার জওয়ানি-তে গলা মেলাচ্ছেন উৎকৃষ্ট সংগীত ভেবে, তাঁর গর্ভে এরকম কোনো জ্যোতি প্রবেশ করার অধিকার পাবে কী? প্রবেশের অধিকার পেলেও হয়ত বেরোতে চাইবে না। অথবা চাইবে গর্ভপাতের বিনিময়ে জন্ম।
আমি তো আর মাতৃগর্ভে ফিরে যেতে পারব না। জ্যোতিষ্কলোকের পথে হাঁটতে হাঁটতে বিলীন হয়ে যাওয়া ছাড়া আমার আত্মসমীক্ষার অন্ত্য নেই। ইতিহাসের বাহু আছে তো বন্ধন নেই, বন্ধন আছে তো বাহু নেই। যা আছে, তা অনন্ত।
প্রাতরাশ থেকে নৈশভোজ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের রক্ত মিশিয়ে এই বেঁচে থাকার পর বাঁচার ফুরসুতটুকু হারিয়ে ফেলেছি। এখন আর শিবের সামনে দাঁড়ানো যায় না। ক্ষমা চাওয়া যায় না এত বিষাক্ত ক্ষতস্থান সৃষ্টি করার পর। ইট'স সো টাফ আ জব, না? মানুষ ও মানবিকতা মেরে ফেলে সচল পাথর হয়ে ঘুরে বেড়াই। আমি গোটা একটা স্টোনের ওপর বিল্ড করা। তাই এতটুকু অনিশ্চয়তা নেই আমার, এই মুহূর্তে। আমার বদলে দামি পাথর জায়গা করে নেবে। জবার ঘন লালের বদলে পাতার ঘন সবুজ ও অন্ধকারের মূর্ত বিস্ময়! তার মধ্যেই ভাসমান ছিন্নবিচ্ছিন্ন মায়ার সংসার। স্তম্ভ-স্তব্ধতায় এই ভগ্নদেহে বেড়ে ওঠা চেতনাহীন অধার্মিক একাপ্রভুর এখন শুধুই রৌরবযাত্রার অপেক্ষা। এই আত্মসমালোচনামূলক প্রবন্ধে, প্রবন্ধের বাইরে, রাজনীতি ও রাজনীতির বাইরে, অলি থেকে গলি, পথ থেকে রাজপথ, কণ্ঠ থেকে উপকণ্ঠে, জন্মান্ধ আঁধারে অকাল বার্ধক্য নিয়ে অপেক্ষা করে চলেছি সেই শুভক্ষণের যখন সেই রাজনৈতিক সাপ জ্বলন্ত অঙ্গারের অদৃশ্য ঘূর্ণনের ভিতর মাথায়-লেজে সংঘর্ষ বাধিয়ে নিমেষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
যাঁদের কাছে ঋণী: মা, এ, কুকি, স্নেহা, অনিন্দ্য, অর্চ, উজ্জ্বল, উমা
তথ্যসূত্র:
Restructuring of School Education System in West Bengal : Interim Report
Indian Institute of Management Calcutta , May 12, 2011
http://www.wbsed.gov.in/wbsed/readwrite/55.pdf
১। Table 2.3 District-wise Literacy rate : পৃষ্ঠা ৭৩
১.১। Table 6.32 School Inspection Staff Strength : পৃষ্ঠা ১০৩
২। সার্কুলার: http://wbbse.org/notice.htm [Sl No 05.]
৩। আফস্পা: AFSPA: Armed Forces Special Powers Act
৪। http://www.marxists.org/bangla/archive/trotsky/FascismBangla.pdf
৫। হিন্দু শাস্ত্র: http://dspace.wbpublibnet.gov.in/dspace/handle/10689/1001
বিপিনবিহারী ঘোষাল, প্রকাশকাল ১৮৮৫
৬। আন্দ্রিয়া বচেল্লি: প্রখ্যাত ইতালীয় গায়ক
৭। India: Karl Marx: New-York Daily Tribune, August 5, 1853
ক্লাসরুম টিচিং দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।ারও একটা ঘটনা বলি,আমার এক বন্ধু ২০০৯এ প্রাইমারি স্কুলেচাকরি পেয়েছিল।ওর যাবতীয় কাগজপত্র এবং যোগদানের চিঠিটিও তথাকথিত এল।সি থেকে সং গ্রহ করতে হয়েছিল পাঁচ হাজারটাকা চাঁদা দিয়ে।অর্থাৎ যেই প্রাথমিকবিদ্যালয়ের শিক্ষক,সেই সিপিএমের নানা নামের সং গঠনেরও সদস্য হবে এটা ছিল বাধ্যতামূলক।প্রথম আপোসের সঙ্গে সঙ্গে যেখানে শিক্ষকতার মত কর্মজীবন শুরু হয় সেখানে এর বেশি বিবেক দংশন কাজের কথা নয়।সব কিছু গলা টীপেই তবে বাঁচা।আপাত সুখী মানুষের মত।
ReplyDelete